দক্ষিণখানে তিন লাশ: গৃহকর্তা এখনও পলাতক, সন্দেহে বাড়িওয়ালাও

Send
নুরুজ্জামান লাবু ও শেখ জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশিত : ২৩:২২, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৫৭, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০

বাবা রাকিব উদ্দিন ভুঁইয়া এবং নিহত দুই সন্তান ফারহান উদ্দিন (বাঁয়ে) ও লাইভা ভুঁইয়া (ডানে)রাজধানীর দক্ষিণখানে দুই সন্তানসহ এক মায়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গৃহকর্তা রাকিব উদ্দিন ভুঁইয়াকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার পর থেকে তার কোনও হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে লাশের সঙ্গে একটি ডায়েরি উদ্ধারের পর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাড়িওয়ালা ডলি বেগমকেও সন্দেহের তালিকায় রেখেছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ওই ডায়েরিতে বাড়িওয়ালা ডলি বেগমের মোবাইল নাম্বার উল্লেখ করে তাকে দায়ী করা হয়েছে। এদিকে আলোচিত এই ঘটনায় নিহত মুন্নী বেগমের ভাই মুন্না রহমান বাদী হয়ে দক্ষিণখান থানায় একটি মামলা (নং ২৪) দায়ের করেছেন।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তারা একাধিক বিষয় সামনে রেখে কাজ করছেন। একইসঙ্গে গৃহকর্তা রাকিব উদ্দিন ভুঁইয়াকে খোঁজা হচ্ছে। তাকে পাওয়া গেলে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত হতে পারে। এছাড়া এ ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় দক্ষিণখানের ৮৩৮ নম্বর প্রেমবাগানের একটি বাসার চতুর্থ তলা থেকে মা মুন্নী বেগম (৩৭) এবং দুই সন্তান ফারহান উদ্দিন (১২) ও লাইভা ভুঁইয়ার (৩) অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। স্বজন ও পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনার তিন দিন আগে থেকেই নিহত মুন্নী বেগমের স্বামী রাকিব উদ্দিন ভুঁইয়ার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। রাকিব উদ্দিন ভুঁইয়া বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেডের (বিটিসিএল) উপ-সহকারী প্রকৌশলী।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের দক্ষিণখান জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) হাফিজুর রহমান রিয়েল বলেন, ‘আমরা মামলাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। এখানে অনেক বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশা করি শিগগিরই এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করতে পারবো।’

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ধারণা করা হচ্ছে লাশ উদ্ধারের ২-৩ দিন আগে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে। নিহত মুন্নী বেগমের মাথায় হাতুড়ির আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এছাড়া দুই সন্তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর ওই বাসা থেকে সবুজ রঙের একটি ডায়েরি উদ্ধার করা হয়। ওই ডায়েরির একটি পৃষ্ঠায় লেখা ছিল—‘ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীকে খুন করা হলো। আমাকে পাওয়া যাবে রেললাইনে।’ ডায়েরিতে আরেকটি পাতায় লেখা ছিল—‘এই ডাইনি আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছে, এই ডাইনির জন্য আমার এই দশা, এই পরিণতি।’ সেখানে কারও নাম না লেখা থাকলেও একটি মোবাইল নম্বর লেখা ছিল। পুলিশ ওই ডায়েরি জব্দ করে সেখানে লেখা মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করে জানতে পারে নাম্বারটি ওই ভবনের মালিক ডলি বেগমের। পরে তাকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ওই বাড়িতে একটি সিটিসিভি ক্যামেরা ছিল। ওই সিসিটিভি ক্যামেরা জব্দের পর সেখানে কোনও ফুটেজ সংরক্ষিত পাওয়া যায়নি। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, খুনি পরিকল্পনামাফিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ মুছে দিয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরার ডিভিআরটি বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে মুছে ফেলা ভিডিও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

নিহত মুন্নীর ভাই মুন্না রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেহেতু আমার বোনের স্বামী রাকিব উদ্দিন ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ, তাই হত্যাকারী হিসেবে তাকেই সন্দেহ করছি। বিষয়টি আমি মামলার এজাহারেও উল্লেখ করেছি। রাকিব উদ্দিন ঋণগ্রস্ত। আমরা জানতে পেরেছি, সে অন্তত ১ কোটি টাকা বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে নিয়েছিল। তবে মানুষের কাছ থেকে এই টাকা নিয়ে তিনি কী করেছেন সেটা আমরা কেউই জানি না।’

স্বজনরা জানান, ‘গত ডিসেম্বরে রাকিব উদ্দিন একবার নিখোঁজ হন। বেশ কয়েকদিন পর ফিরে আসেন তিনি। নিখোঁজ থাকার সময় তার মোবাইল ফোন বাসায় ছিল। সে সময় অনেক লোক ফোন করে তার কাছে টাকা পাওয়ার কথা বলে। তখনই স্বজনরা তার এই বিপুল পরিমাণ ঋণের বিষয়টি জানতে পারেন। বাসায় ফিরে আসার পর তাকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেও সে কোনও সদুত্তর দেয়নি।’

নিহত মুন্নী বেগমের এক স্বজন জানান, ‘নিখোঁজের পর রাকিব যখন ফিরে আসে তখন পরিবারের লোকজন তাকে চাপ দিলে সে বাড়িওয়ালি (ডলি বেগম) তাকে ব্ল্যাকমেইল করছে বলে জানায়। এছাড়া একটি ডায়েরিতেও ডলি বেগমের নামে কিছু কথা লেখা রয়েছে।’ এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তারও সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে সন্দেহ করেন ওই স্বজন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দক্ষিণখান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নাসির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিহতের পরিবার থানায় মামলা করেছেন। আমরা রাকিব উদ্দিনকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। তাকে পাওয়া গেলে মামলাটির অনেক অগ্রগতি হবে।’

/এমআর/এমওএফ/

লাইভ

টপ