‘গণমাধ্যমে বিধি নিষেধ আরোপ করে সরকারের চাওয়া পূরণ হবে না’

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৫:৫২, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৭, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০

গণমাধ্যমের প্রচার, প্রকাশনায় বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকারের চাওয়া পূরণ হবে না বরং প্রচার-প্রকাশ করতে দিলে স্টাবলিশার বা সরকার যা চায় তা পূরণ হবে বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ‘উগ্রবাদ রোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় দেশের বেসরকারি টেলিভিশনের দায়িত্বরত সিনিয়র সাংবাদিক ও কর্মকর্তারা এই দাবি করেন।

সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিসা) আয়োজিত আলোচনা সভায় একাত্তর টিভির কর্ণধার মোজাম্মেল বাবু বলেন, ‘বাংলাদেশে ২০টির বেশি টেলিভিশনের দরকার নাই। কিন্তু সরকার লাইসেন্স দিয়েছে ৪০টি। এতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এভাবে আমাদের শক্তি কমিয়ে ফেলা হচ্ছে। মূলধারার মিডিয়ায় ছাঁটাই চলছে। আবার সরকারের কাজ মিডিয়ার টুঁটি চেপে ধরা নয়, কিন্তু সত্য প্রচারেরও টুঁটি চেপে ধরা হয়। একটি নিউজ অন এয়ার করা হলে স্টাবলিশার (সরকার) থেকে বলা হচ্ছে, থামান। লাইনে লাইনে সংশোধন করতে হচ্ছে। আমাদের ওপর আস্থা নেই স্টাবলিশারের। কিন্তু আপনি কিছু না দেখালে গুজব আরও বেশি ছড়াবে।’

মতিঝিলে হেফাজতের তাণ্ডবের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথমে লাইভ বন্ধ করতে বলা হলো, আমরা মিনিটে মিনিটে দেখালাম। যারা বন্ধ করতে বলেছিল, পরে তারাই আবার ফুটেজ চেয়েছিল। গুজব বন্ধ করতে হলেও সত্যটাই প্রকাশ করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের সময় কেউ কি বলতে পারবো কোথাও ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়নি? একটা ঘটনা ঘটলেই হলো। আমাদের নিউজ বন্ধ করতে বলা হচ্ছে। কেন্দ্রে বিএনপি বা সরকারি দলের প্রতিপক্ষের এজেন্ট নেই, এটা লাইভ দেখাতে নিষেধ করা হলো, দেখানো যাবে না। কিন্তু আমরা যদি ওই এজেন্টকে খুঁজে বের করে দেখাই যে, সে বাসা থেকে বের হয়নি, কেন্দ্রে আসবে কীভাবে? এতে কি স্টাবলিশার (সরকার) লাভবান হতো না? আজ আইপি-টিভি নিয়ন্ত্রণে নাই। অথচ আমাদের জবাবদিহি করতে হচ্ছে।’

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য অনেক ঝুঁকির দিকে আছে। কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থা উন্নতির দিকে। ২০১৭ সালের গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ঝুঁকির তালিকায় ১৯ নম্বরে ছিল, ২০১৮ সালে কমে ২৫ নম্বরে আসে এবং ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ৩১ ধাপে উন্নীত হয়েছে। ভারত-পাকিস্তান এই ঝুঁকির তালিকায় ১০-এর ভেতরে রয়েছে। পশ্চিমা অনেক দেশের চেয়ে আমাদের ঝুঁকি কম।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সহিংস উগ্রবাদ দমনে সুনির্দিষ্ট জাতীয় কোনও স্ট্রাটেজি নেই। এটা করতে সময় লাগে। তবে আমরা কাউন্টার ভায়োলেন্স এক্সট্রিমিজম (সিভিই) করতে যাচ্ছি। দুভাবে আমরা কাজটা করছি, প্রথমত জেনারেল অ্যাপ্রোচ এবং দ্বিতীয়ত ভালনারেবল অ্যাপ্রোচ। সেজন্য আমরা বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে কথা বলছি। ১৫-৩০ বছরের ছেলেরা সবচেয়ে বেশি উগ্রবাদে জড়াচ্ছে। এসব ভালনারেবল গ্রুপকে মোটিভেট করতে তরুণ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করছি। একই সঙ্গে আলেম-ওলামাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত আলোচনা করছি।’

তিনি বলেন, ‘দেশের বাইরের লোক মনে করে বাংলাদেশের রাস্তায় বের হলে জঙ্গিরা চাপাতি দিয়ে কোপানো শুরু করে। বাস্তব অবস্থাটা গণমাধ্যমকেই প্রচার করতে হবে। যারা অভিযান চালাবে, তাদের স্বচ্ছতা থাকতে হবে। মিডিয়া হাউজের সোশ্যাল রেসপন্স রয়েছে। এটা বাড়াতেই সিনিয়র সাংবাদিকদের নিয়ে আজকের এই আয়োজন।’

এক প্রশ্নের উত্তরে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারের উদ্যোগে আমরা দেশীয় অবস্থার প্রেক্ষাপটে উগ্রবাদ প্রতিরোধে কাজ করছি। কিন্তু ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ সংস্থার মতো বিদেশি বিজ্ঞাপনের আদলে প্রচারণা চালিয়ে তারা যে ভুল করছে আমরা সেটা করছি না, অ্যাকাডেমিক রিসার্স হচ্ছে। ’

জিটিভি ও সারাবাংলা ডটনেটের প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, ‘কোথায় জঙ্গি আটক বা গ্রেফতার হলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে জেহাদি বইসহ যোদ্ধা আটক হয়েছে। কিন্তু এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করলে জঙ্গিবাদকে এক ধরনের উদ্বুদ্ধ করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সবাই রেসপনসিবল জার্নালিজম করতে বলেন, কিন্তু গুড ডেমোক্রেসির কথা বলেন না। গুড ডেমোক্রেসি না হলে গুড জার্নালিজম হবে না।’

সিনিয়র সাংবাদিক মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, ‘বাংলাদেশের মূলধারার মিডিয়াগুলো এখন আর ধর্ষণের শিকার নারীর ছবি প্রচার করে না। অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় ছাপা হয় না। এক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে।’

মাছরাঙ্গা টিভির হেড অব নিউজ রেজওয়ানুল হক রাজা বলেন, হলি আর্টিজানের সময় নিবরাজদের ৫ জনের হাসির ছবি অনেক মিডিয়ায় ছাপা হয়েছে। সেটা ছাপা ঠিক হয়নি। একজন বক্তা মাওলানা দেলাওয়ার হোসেইন সাঈদীর সুনাম ও নারী নেতৃত্ব বিরোধী কথা বলে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেলেন। এটা নিয়ে আপনাদের কাজ করতে হবে।

এটিএন বাংলার হেড অব নিউজ জ ই মামুন বলেন, ‘জঙ্গিবাদ দমনে সরাসরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভূমিকা বাড়াতে হবে। পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। ২০১৫ সালের প্যারিস হামলার পর এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে পুলিশ কাউকে এমনকি এমপি-মন্ত্রী-রাষ্ট্রপতিকেও ঢুকতে দেয়নি। আমাদেরও এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে। ’

এনটিভির বার্তা প্রধান জহিরুল আলম বলেন, ‘মিডিয়ার নিজেদের পক্ষ থেকে বেশি কিছু করার থাকে না। কারণ আমরা নানা সংকটে থাকি। সিটিটিসি যদি মিডিয়ার জন্য গাইডলাইন তৈরি করে, তাহলে ভালো হতো।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে একটি সহিংস ঘটনার কথা মনে আছে। যেটা মূল ধারার মিডিয়ায় না এলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় কিন্তু ছড়িয়ে পড়ে।’ 

ডিবিসি নিউজের সিইও মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘রাষ্ট্রের সঙ্গে গণমাধ্যমের স্থায়ী বোঝাপড়া থাকবে। জঙ্গিবাদ গবেষণা রাষ্ট্রীয় গবেষণার চেয়ে অগ্রগামী, সেভাবেই তারা সামনে এগিয়ে যায়। বিভিন্ন মাদ্রাসা, মসজিদ, স্কুলের এখনও জঙ্গি রিক্রুট হচ্ছে। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও জঙ্গি রিক্রুট হচ্ছে। এসব নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যেন ধর্মপ্রচার বন্ধ না হয়। গণমাধ্যমের চেয়েও বড় প্রতিদ্বন্দ্বী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।’

একুশে টিভির মোস্তফা মহসীন আব্বাস বলেন, ‘আমরা কোনও টেররকে হিরো বানাবো না। আমাদের বেসরকারি টেলিভিশন শিল্পের বয়স মাত্র ২০ বছর। এটা খুবই কম সময়। আমাদের এই শিল্পের নীতি নির্ধারণ নিয়ে এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।’ 

/এআরআর/এএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ