কোভিড-১৯ নিয়ে ভ্রান্তি দূর হবে কবে?

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ২০:০৬, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪১, ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০


BT New Temp‘চীন থেকে আসা সহকর্মীদের দেশে কোথাও অ্যালাউ করছে না। একই সঙ্গে চীনফেরতদের সহকর্মী হওয়ার কারণে সব জায়গায় আমাদেরও বলা হচ্ছে, “আপনারা পরে আসেন।” তাদের ধারণা, আমাদের থেকে যদি তারা সংক্রমিত হন। সহকর্মীদের নিয়ে রাস্তায় বের হলে দেখতে পাই, আমাদের সঙ্গে তাদের দেখে অন্যদের মুখভঙ্গিতে একটা অবজ্ঞা, অবহেলা, আতঙ্ক।’ বলছিলেন করোনা ভাইরাস থেকে সৃষ্ট রোগ কোভিড-১৯ নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হয়রানির শিকার ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আবদুল মোমিন রনি।















চীন, দক্ষিণ কোরিয়া বা ইরান থেকে এলেই কেউ কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত নন। অথচ এসব দেশ থেকে আগতদের এখন অন্য চোখে দেখা হচ্ছে। বিদেশি নাগরিকদের বাড়ি ভাড়া দিতে চাচ্ছেন না বাড়িওয়ালারা। চীনের উহান থেকে ৩১২ জনকে দেশে এনে কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছে। তারা সবাই নিরাপদ অবস্থায় সেখান থেকে ফিরেছেন। অথচ নিজ দেশে তাদের অনেককেই সামাজিকভাবে হেয় করা হচ্ছে। চিকিৎসকসহ ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছে, ‘আমরা এগোচ্ছি না, পেছাচ্ছি। এই সমাজ এখনও সচেতন নয়, কবে সচেতন হবে?’

বিড়ম্বনার কথা জানিয়ে চীনফেরতদের সঙ্গে কাজ করা রনি আরও বলেন, ‘অনেক বড় কোম্পানিও রয়েছে যাদের সঙ্গে আমাদের অফিসিয়াল মিটিংয়ের তারিখ অনেক আগে থেকেই ঠিক ছিল। কিন্তু এখন তারা আমাদের সঙ্গে মিটিং করতে চাচ্ছেন না। তারা বলছেন, “ফরেন কেউ অ্যালাউ না।” এমনকি অনেক জায়গায় যাওয়ার পর তারা আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎই করেননি, এমন ঘটনাও ঘটেছে। তাদের অফিসে ২০ জনের বেশি চীনা নাগরিক কাজ করছেন। এমন অফিসও রয়েছে। কাউকে বোঝানো যাচ্ছে না। করোনা আতঙ্কের পর থেকেই এটি শুরু হয়েছে। এখন কলিগরা বাইরে বেরোলেই মাস্ক ব্যবহার করছেন, যেন সহসা তাদের দেখে কেউ চিনতে না পারে।’

চীনফেরত ৩১২ জনের মধ্যে এক দম্পতি সেখানে গিয়েছিলেন পিএইডি করার জন্য। ছুটিতে ঢাকায় এসেছেন। তাদের একজন রোকাইয়া সুলতানা (ছদ্মনাম) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিন-চার মাস পরপর ঢাকায় এলে আমরা বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকি। যে রাতে আমাদের হজক্যাম্প থেকে ছেড়ে দিল সে রাতে বাড়িওয়ালা আমাদের ফোন করে বলল, “আপনারা বাসায় উঠতে পারবেন না।” ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার পর এমন ফোন পেয়ে ভীষণ শকড হই। ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনের পর বাসায় যাওয়ার জন্য উদগ্রীব ছিলাম। অথচ বাড়িওয়ালা শুধু আমাদেরই ফোন করেননি, এলাকার কমিশনারকে ফোন করে বলেছেন, আমরা যেন বাসায় না উঠি। আমাদের থেকে ছড়াতে পারে।

‘ওই রাতে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না, কোথায় যাবো। পরদিন সকাল ৬টায় এক বিভাগীয় শহরে যাওয়ার ফ্লাইট ছিল। ঢাকার আত্মীয়দের ফোন করলাম, তাদের বাসায় যাওয়ার জন্য। “আসতে পারেন, সমস্যা নেই।” বললেও, পরে তদের ফোনও বন্ধ পাই। অন্যদিকে বাড়িওয়ালা বলছিলেন, আমাদের আসার কথা শুনে অন্য ভাড়াটিয়ারা রিঅ্যাক্ট করেছেন, অভিযোগ করেছেন। পরে বাড়িওয়ালাকে অনেক বোঝালাম যে, আমরা বাসাতেই থাকবো, বাসা থেকে বের হবো না। অনেক অনেক করে বোঝানোর পর তিনি রাজি হলেন।’

বাংলা ট্রিবিউনকে আরেক বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথাও জানান রোকাইয়া। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাসায় যে গৃহকর্মী আছেন, তিনি অন্য যে বাসাগুলোতে কাজ করেন, তারা নিষেধ করেছেন এ বাসায় আসতে। তাকে বলেছেন, তিনি এ বাসায় এলে করোনা হবে, আর তার থেকে তারাও আক্রান্ত হবেন। অথচ তাদের পরিবারটি শিক্ষিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সেই পরিবারের মানুষরাও গৃহকর্মীকে বলেছেন, এ বাসায় এলে তিনি ওই বাসায় যেতে পারবেন না। কিন্তু গৃহকর্মীর সঙ্গে আমার অনেক দিনের সম্পর্ক। তিনি লুকিয়ে এসেছিলেন আমাকে দেখতে। এই খবর জানার পর তাকে কাজে যেতে নিষেধ করে দিয়েছেন ওই শিক্ষক!…যে শিক্ষক এই কাজ করেন, সে সমাজ কবে শিক্ষিত হবে?

‘আর যারা কাছের মানুষ তারা কেউ একবারের জন্যও আমাকে দেখতে আসেনি। ফোনেও যোগাযোগ করেনি। এর আগে যখনই এসেছি, বাসায় একটু রেস্টও নিতে পারতাম না। তারা বাসায় আসার জন্য অস্থির হয়ে যেতেন! আমি কোথাও যাইনি, কারও সঙ্গে যোগাযোগ করিনি, অথচ কতদিন পর নিজের এলাকাতে এসেছি।’

৩১২ জনের মধ্যে রয়েছেন তিন ভাই। সঙ্গে তাদের স্ত্রী ও সন্তানরা। কিন্তু এই তিন ভাইয়ের কেউ তাদের নিজ বাড়িতে যেতে পারেননি। তাদের বাবা তাদের এলাকায় নিজ বাড়ি যেতে নিষেধ করেছেন…। এলাকার মানুষ এটা করতে তাদের বাবাকে বাধ্য করেছেন।

এই পরিস্থিতি সম্পর্কে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ( আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেকোনও রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় গুজব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি মোকাবিলায় প্রতিদিন আইইডিসিআর সংবাদ সম্মেলন করছে, যাতে সঠিক তথ্য মানুষের কাছে যায়, মানুষ যেন বিভ্রান্ত না হয়। আইইডিসিআরের হটলাইনে প্রতিদিন ফোন আসে, তার মধ্যে বেশির ভাগই আসছে কোভিড-১৯ নিয়ে। এখন এই কলের অনেকটা অংশ জুড়েই এসব বিভ্রান্তিমূলক প্রশ্নের জবাব দেওয়া হচ্ছে।’

অধ্যাপক সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জায়গায় অতি উৎসাহী লোকজনের বাড়াবাড়ি বিভিন্ন কার্যক্রমে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। বিদেশি নাগরিকদের বাড়িওয়ালারা বাসা ভাড়া দিচ্ছেন না, এমন অভিযোগও আমাদের কাছে আসছে। একজন করোনাতে আক্রান্ত নন এমন একজন চীনা নাগরিক তার ভাড়া করা বাসায় উঠতে গেলে তাকে উঠতে দেওয়া হয়নি। পরে তিনি একটি হোটেলে রাত কাটিয়েছেন। এমন অনেক তথ্য আমাদের কাছে আসে। বিষয়গুলো আমাদের মতো করে ডিল করছি।’

সবাই সামাজিকভাবে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে জানিয়ে অধ্যাপক সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘এসব হয়রানির ভয়ে অনেকে আমাদের কাছে আসছেও না। এটিই এখন সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয়। কারণ, কারও মধ্যে যদি লক্ষণ-উপসর্গ থাকে আর তিনি যদি সময়মতো আমাদের কাছে না আসেন তাহলে তিনি এর উৎস হবেন। তার মাধ্যমে ভাইরাস ছড়িয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি একটি স্থলবন্দরে একজন সরকারি কর্মকর্তা একজন মানুষের অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য কোনও রকম যাচাই না করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিলেন এবং তাকে আক্রান্ত বলে দিলেন, অথচ ওই ব্যক্তি আক্রান্ত ছিলেন না। ওই কর্মকর্তা যেটা করেছেন তা শুধু আমাদের বিব্রত করেনি, সেই মানুষটিকেও সামাজিকভাবে হেয় করার বা হেনস্থা করার মতো একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।’

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘চীন থেকে যারা আসছেন তাদের যদি ঠিকমতো গ্রহণ না করি তাহলে আমাদের ১০০-১৫০ বছর আগের দিনে ফিরে যেতে হবে। তখন গুটিবসন্ত, কলেরাতে আক্রান্তদের নদীর পাড়ে, নির্জন স্থানে ফেলে রেখে আসতো। আমরা তো সেই যুগে ফিরে যেতে পারি না। কিন্তু কোভিড-১৯ এসে দেখালো, আমরা আসলে এগোচ্ছি না। সংশ্লিষ্ট ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের চাইতে আমরা বেশি বুঝে ফেলছি।’

‘যে মানুষগুলোর সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে তারা সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে যাচ্ছে, যেন তারা অচ্ছুত। এই বিষয়গুলো তাদের মনে দাগ ফেলবে, যেটা পুরো জীবনে প্রভাব ফেলবে। অথচ কেউ যদি প্রকৃতপক্ষেই কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হন, তাহলে তখনও তার সঙ্গে আমরা এটা করতে পারি না। এ রিজেকশন থেকে মানুষ আগ্রাসী হয়, উন্ম্মত্তার সৃষ্টি হয়। এর কুফল কিন্তু ছোট না, অনেক লম্বা।’ বলেন ডা. হেলাল।

 

/এমএএ/

লাইভ

টপ