যত টেস্ট প্রয়োজন, তত হচ্ছে না

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ২৩:৩০, মার্চ ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১৩, মার্চ ৩০, ২০২০

করোনা ভাইরাস

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, টেস্ট, টেস্ট অ্যান্ড টেস্ট।  অথচ গত ২১ জানুয়ারি থেকে আজ (২৯ মার্চ) পর্যন্ত অর্থাৎ ৬৮ দিনে বাংলাদেশে টেস্ট হয়েছে মাত্র এক হাজার ১৮৫ জনের। শুরু দিকে খুব কম টেস্টই হয়েছে। দিন দিন টেস্টের সংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় তা একেবারেই কম। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর কথা জানায় আইইডিসিআর। বর্তমানে দেশে আক্রান্তে রোগীর সংখ্যা ৪৮ জন। গত দুই দিনে করোনাভাইরাসে  আক্রান্ত  কোনও রোগী পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘সাদা চোখে’ একে ‘সুখবর’ বলে ধরে নিলেও বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। এমন মিরাকল কিছু ঘটেনি যে দেশে কেউ শনাক্ত হবে না। প্রথমদিকে করোনাভাইরাসের পরীক্ষা হতো কেবল সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা (আইইডিসিআর) প্রতিষ্ঠানে। চলতি সপ্তাহে যোগ হয়েছে আরও তিনটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যেখানে হাজার হাজার পরীক্ষা দরকার সেখানে গত ২৪ ঘণ্টায় ১০৯ জনের পরীক্ষা করার বিষয়টি ‘হাস্যকর’ বলছেন অনেকেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্যের ঘাটতি ভয়ঙ্কর জিনিস। এটা এমন অনেক কিছু বিশ্বাস করাবে যা ভিত্তিহীন আশ্বাস ছাড়া কিছু নয়।

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ১০৯ জনের পরীক্ষা হলেও নতুন করে কেউ শনাক্ত হয়নি। এমনকি পর পর দুই দিন নতুন করে রোগী পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে আইইডিসিআর। যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করোনাভাইরাসের পরীক্ষার সুযোগ থাকলেও সেখানে গত কয়েকদিন কেউ আসেনি। তিনি বলেন, খালি ফ্যাসিলিটি বাড়ালেই তো হবে না, লোকজনও আসতে হবে।

আইইডিসিআর গত শনিবার ( ২৮ মার্চ) জানায়, তারা নমুনা পরীক্ষায় পরিবর্তন আনছেন। আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘প্রথমদিকে যারা বিদেশ থেকে এসেছেন অথবা করোনা আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসেন, শুধু তাদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে এখন যারা বিদেশ ফেরতদের সংস্পর্শে এসেছেন তাদেরও নমুনা পরীক্ষা করছে আইইডিসিআর।’

গত ২৪ মার্চ কোভিড-১৯ নিয়ে আয়োজিত স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি বিশেষ বৈঠকে উপস্থিত একাধিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক নাম গোপন রাখার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের হাতে নমুনা পরীক্ষা করার ‘সক্ষমতা’ থাকায় তারা বিব্রত। তাই সরকার এখন এই প্রতিষ্ঠানের বাইরেও পরীক্ষা করার কথা ভেবেছে এবং সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রথম থেকে যদি এটা করা হতো তাহলে আরও পরীক্ষা করা সম্ভব হতো এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতো।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক রবিবার ( ২৯ মার্চ) কোভিড-১৯ নিয়ে আয়োজিত অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত হয়ে জানান, করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় দেশের আরও কয়েকটি হাসপাতালে এই রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ১১টি জায়গায় টেস্ট করতে সক্ষম হবো। ইতোমধ্যে ছয় থেকে সাতটি জায়গায় টেস্ট শুরু হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে টেস্ট ক্যাপাসিটি স্থাপন করার জন্য।’

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, ‘আইইডিসিআর কোভিড-১৯ রোগের মহামারি শুরুর পর থেকে গণমাধ্যমে একের পর এক মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে আসছে। কিন্তু সত্যটা হলো ঢাকা ও চট্টগ্রাম মিলিয়ে ১০টি প্রতিষ্ঠানে করোনাভাইরাস পরীক্ষার সক্ষমতা ছিল। তাহলে প্রথম থেকে তারা কেন করোনাভাইরাস শনাক্ত করতে যে মানের ল্যাবরেটরি (পরীক্ষাগার) প্রয়োজন সে মানের ল্যাব বাংলাদেশে শুধু তাদেরই আছে বলে জানিয়েছে?  গত ২৬ মার্চ প্রথম প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বলেছেন, ঢাকার আইপিএই ও শিশু হাসপাতালে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। যদি অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা না থাকে তাহলে এখন এসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা হবে কীভাবে?’

ডা. জাহিদ বলেন, ‘শুধু আইইডিসিআরের ওপর নির্ভর না করে এই ল্যাবগুলোকে আরও দুই মাস আগে থেকে প্রস্তুত করা হলে এই দুরবস্থা হতো না। সাসপেক্টেড কেসগুলোকে পরীক্ষার আওতায় আনা হতো, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকতো। তাই কেবল তাদের গাইডলাইন অনুযায়ী লক্ষণ থাক না থাক, কনট্যাক্ট ট্রেসিং করে হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় যারা শনাক্ত হয়েছেন, তাদের সংস্পর্শে আসা চিকিৎসকসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীর টেস্ট করতে হবে। একইসঙ্গে সন্দেহভাজন কেউ মারা গেলে তাদের মৃতদেহ থেকে নমুনা নিয়ে টেস্ট করা অত্যন্ত জরুরি। সারাদেশের এটিপিক্যাল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের টেস্ট করতে হবে, নয়তো প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে না। বটম লাইন ইজ, টেস্ট, টেস্ট অ্যান্ড টেস্ট।’

জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘যখন করোনা ক্রাইসিস শুরু হলো তখনই পরিকল্পনা করার দরকার ছিল। প্রস্তুতির বড় একটি ঘাটতি শুরু থেকেই ছিল, তার প্রভাব এখনও শুরু না হলেও আগামী কয়েকদিনে সেটা প্রকাশ পাবে। দেশের বাইরে থেকে আসা সব মানুষের পরীক্ষা যদি করা যেত তাহলে বোঝা যেত রোগটা কতটা বিস্তার করেছে।’

এদিকে, চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানী আতিক আহসান বলেন, ‘ব্যবস্থা তখনি নেওয়া সম্ভব যখন টেস্ট হবে। আর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু টেস্টই যদি না করা হয় তাহলে রোগীর সংখ্যা দশগুণ বাড়বে। আর এটা যত দিন যাবে ততই দ্বিগুণ হারে বাড়বে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘কোয়ারেন্টিন অ্যাভয়েড করে যারা ছড়িয়ে পড়েছে তাদের নিয়ে কী করা হচ্ছে, সেটাও বুঝতে পারছি না, যারা বিদেশ থেকে এসেছেন এবং তাদের সংস্পর্শে সাসপেক্টেড যারা রয়েছেন, তাদের টেস্ট করতে হবে।’

/জেএ/এমআর/এমওএফ/

লাইভ

টপ