করোনা: দেশে প্রতি ১০০ টেস্টে শনাক্ত ১১ জন, ৮৪ শতাংশ রোগী ঢাকা বিভাগের

Send
আমানুর রহমান রনি ও মিজানুর রহমান
প্রকাশিত : ০১:২৭, মে ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১২, মে ০৪, ২০২০

করোনা পরীক্ষা

দেশে করোনাভাইরাসের পরীক্ষায় শনাক্তের হার ১১ শতাংশ। অর্থাৎ উপসর্গ আছে এমন গড়ে ১০০ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করলে ১১ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়ও মোট রোগীর ৮৪ শতাংশ শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে।

ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ এ বিভাগের অন্যান্য জেলাগুলোতে এ রোগের ব্যাপ্তি মারাত্মক আকার ধারণ করলেও করোনার তেমন প্রকোপ দেখা যাচ্ছে না রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও খুলনা বিভাগে। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ঢাকার বাইরের অঞ্চলগুলোতে সচেতনতার অভাবে মানুষ উপসর্গগুলোকে আমলে না নেওয়া এবং তুলনামূলক টেস্টও করা হচ্ছে কম।

দেশের সবগুলো জেলার সিভিল সার্জন এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) কাছ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিটি অঞ্চলে এই ভাইরাসের উপস্থিতি ও শনাক্তের হার একইরকম নয়।

আইইডিসিআরের ২৮ এপ্রিল সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী সারাদেশ থেকে মোট নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা ৫৪ হাজার ৭৩৩টি এবং এসব নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে মোট ছয় হাজার ৪৬২ জন করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ টেস্টের বিপরীতে শনাক্তের হার ১১ শতাংশ, যা বিশ্বের ব্যাপকভাবে আক্রান্ত দেশগুলোর চেয়েও বেশি।

তথ্যানুযায়ী, সারাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ৩৩ জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে। কেবল ঢাকা বিভাগের হিসাব করলে এই হার দেখা যায় ৬৬ জন। আবার কেবল ঢাকা জেলার হিসাব করলে এই হার ১০৫ জন। অর্থাৎ বাংলাদেশে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ঢাকা ও ঢাকা বিভাগকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে।

সারাদেশের করোনা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে কয়েকটি সূচকের অধীনে বিভাগ ও জেলাগুলোর করোনা পরিস্থিত পর্যালোচনা করা হয়েছে। সূচকগুলো হচ্ছে: টেস্ট অনুপাতে শনাক্তের হার, প্রতি লাখে টেস্টের হার এবং প্রতি লাখে আক্রান্তের হার।

DHK

আক্রান্ত ৮৪ শতাংশই ঢাকা বিভাগে, প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি নারায়ণগঞ্জে

বাংলাদেশে করোনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত অঞ্চল হচ্ছে ঢাকা বিভাগ। এই বিভাগের সবকটি জেলাতেই করোনার সংক্রমণ হয়েছে। সারাদেশে যত করোনা আক্রান্ত, তার ৮৪ শতাংশই এই বিভাগ থেকে। তবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলায়। নারায়ণগঞ্জ জেলায় প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ২২ জন মানুষ করোনায় আক্রান্ত। ঢাকা জেলায় এই সংখ্যা ১৯ জন। এই তালিকায় এর পরেই আছে কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ ও গোপালগঞ্জ। ঢাকা বিভাগের এসব জেলায় প্রতি লাখে আক্রান্তের সংখ্যা চার থেকে ছয় জন।

টেস্টের বিবেচনায়ও ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি টেস্ট করা হয়েছে। ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে যত টেস্ট করা হয়েছে, তার ৫৫ শতাংশ এই বিভাগ থেকে হয়েছে।

জনসংখ্যার অনুপাতেও টেস্টের হার ঢাকা বিভাগেই বেশি। এই বিভাগে প্রতি লাখ মানুষের মধ্যে গড়ে ৬৬ জন মানুষকে টেস্ট করা হয়েছে। রাজশাহী বিভাগে এই গড় সর্বনিম্ন ১৪.২।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগে টেস্টের বিপরীতে শনাক্তের হার সবচেয়ে বেশি ১৬%, যা দেশের অন্যান্য বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ এই বিভাগে প্রতি একশ’ জনকে টেস্ট করলে ১৬ জন করোনাভাইরাস শনাক্ত পাওয়া যাচ্ছে। এই সূচক অনুযায়ী বিভাগের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলা নারায়াণগঞ্জ। এই জেলায় টেস্ট অনুপাতে শনাক্তের হার ২৮ শতাংশ। কিশোরগঞ্জ ও ঢাকা জেলায় এই হার ১৮ শতাংশ। নরসিংদী ও গাজীপুরে এই হার যথাক্রমে ১৩ ও ১২ শতাংশ।

Ctg

 

চট্টগ্রাম বিভাগে ছড়ানোর মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কম

দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হলেও চট্টগ্রামে করোনার সংক্রমণ ঢাকার তুলনায় এখনও উল্লেখযোগ্য হারে কম। ঢাকা বিভাগে যেখানে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার, সেখানে চট্টগ্রাম বিভাগে এই সংখ্যা গত ২৮ এপ্রিল  পর্যন্ত ২২৭ জন। এ বিভাগ থেকে নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৭৭০৫টি। অর্থাৎ সারাদেশ থেকে পরীক্ষা করা নমুনার মধ্যে ১৪ শতাংশ চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে পরীক্ষা করা হয়েছে, যার বিপরীতে শনাক্তের হার তিন শতাংশ। এই হার ঢাকা বিভাগের ১৬ শতাংশের তুলনায় অনেক কম।

উল্লেখ্য, দেশে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত করোনামুক্ত চারটি  জেলার মধ্যে দুটি চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্গত। পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি থেকে যথাক্রমে ১১৬ ও ১৪৭টি নমুনা পরীক্ষা করা হলেও কোনও করোনাভাইরাস আক্রান্ত শনাক্ত হয়নি। (যদিও পরবর্তীতে খাগড়াছড়িতে একজন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে, তবে তা ২৮ এপ্রিলের পরে শনাক্ত হওয়ায় এই উপাত্তে বিবেচিত হয়নি।)

চট্টগ্রামে প্রতি লাখে টেস্টের সংখ্যা ২৩.৫। করোনায় আক্রান্তের হার প্রতি লাখে একজনেরও কম।

Mymen

ময়মনসিংহে শনাক্তের হার ঢাকার পর সর্বাধিক

ডাটা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঢাকা বিভাগের পর টেস্ট অনুপাতে শনাক্তের হার সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহে। এ বিভাগটিতে পরীক্ষা করা নমুনার সাত শতাংশ করোনা আক্রান্ত পাওয়া যাচ্ছে। এই বিভাগের চারটি জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে ময়মনসিংহ জেলাটি। এই জেলায় টেস্টের বিপরীতে ১২% পজিটিভ শনাক্ত হচ্ছে। এছাড়া, নেত্রকোনায় শনাক্তের সংখ্যা ২৭ হলেও পরীক্ষা অনুপাতে এই সংখ্যা ৭ শতাংশ।

barishal

বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও খুলনা বিভাগে আক্রান্ত ১০০ অতিক্রম করেছে

 রাজশাহী ছাড়াও দেশে মোটামুটি কম আক্রান্ত বিভাগগুলো হচ্ছে বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও খুলনা।তবে এই বিভাগগুলোর প্রতিটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ১০০ অতিক্রম করেছে। গত ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত বরিশালে আক্রান্তের সংখ্যা ১১১, সিলেটে ১০২, রংপুরে ১০৪ এবং খুলনায় ১০১ জন।

Sylhet

এই বিভাগগুলোর ২৮টি জেলায় মোট ১১ হাজার ১২৮টি টেস্ট করে মোট ৪১৮ জন আক্রান্ত পাওয়া গেছে। এই চারটি বিভাগের ২৮টি জেলার মধ্যে কোনও জেলাতেই আক্রান্তের সংখ্যা এখনও ৫০ অতিক্রম করেনি।

Rang

যদিও নড়াইল জেলায় টেস্ট অনুপাতে সংক্রমণের হার ১১ শতাংশ, যা সংক্রমণের সম্ভাব্য ব্যাপ্তি নির্দেশ করে।

Khulna

 

দেশের সবচেয়ে কম আক্রান্ত বিভাগ রাজশাহী

২৮ এপ্রিল পর্যন্ত রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় দুই হাজার ৯২৮টি টেস্ট করে শনাক্ত করা হয় ৬২ জনকে। বিভাগভিত্তিক পর্যালোচনায় দেশের সবচেয়ে কম আক্রান্ত বিভাগ হচ্ছে রাজশাহী। এই বিভাগের সর্বোচ্চ আক্রান্ত জেলা হলো জয়পুরহাট, যেখানে করোনা রোগীর সংখ্যা ২১ জন। উল্লেখ্য, রাজশাহী বিভাগে প্রতি এক লাখ মানুষে টেস্টের সংখ্যাও সর্বনিম্ন। প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে গড়ে মাত্র ১৪ জন মানুষকে টেস্ট করা হয়েছে এই বিভাগে। অর্থাৎ কম টেস্টের ভিত্তিতেও সবচেয়ে আক্রান্ত রাজশাহী বিভাগ।

Raj

টেস্টের বিপরীতে করোনা শনাক্তের হার যেসব জেলায় বেশি

টেস্টের সংখ্যা অনুপাতে শনাক্তের হার মোতাবেক দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলো হচ্ছে— নারায়ণগঞ্জ, যেখানে প্রতি ১০০টি টেস্ট করালে ২৮ জন শনাক্ত হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের পরে আছে ঢাকা ও কিশোরগঞ্জ। এই দুটি জেলায় ১০০ জনে শনাক্তের হার ১৮। নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও মুন্সীগঞ্জে এই হার যথাক্রমে ১৩, ১২, ১২, ১২। নড়াইল ও মাদারীপুরে এই হার ১১ ও ১০ শতাংশ।

 

 

পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে ২ থেকে সর্বোচ্চ ৫ দিন অপেক্ষা

দেশের জেলাগুলোতে নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষার ফল (রিপোর্ট) প্রাপ্তি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে— নমুনা সংগ্রহ যত বাড়ছে, ফল পেতেও গড়ে সময় বাড়ছে। জেলা শহরগুলোতে নমুনা সংগ্রহ করার পর গড়ে দুই থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ দিন সময় লাগছে ফল দিতে। কখনও কখনও একসপ্তাহ হয়ে যায়। তবে এসময় সন্দেহভাজনদের বাড়িতেই আইসোলেশনে রাখার নির্দেশ দেন চিকিৎসকরা।
ফল প্রাপ্তিতে সময় লাগার বিষয়ে সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. প্রেমানন্দ মণ্ডল বুধবার (২৯ এপ্রিল) সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে টেস্ট হয়। বিভাগের চার জেলার নমুনা এখানে আসে। সিলেট জেলা ও মহানগরীর সব নমুনা এখানে আসে। সবমিলিয়ে প্রতিদিন শত শত নমুনা জমা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের এখানে টেস্টের সক্ষমতা রয়েছে দৈনিক ১৮০টি। তাই জমে যায়। কিছুদিন আগে আমরা ঢাকায় কিছু নমুনা পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তারপরও কিছু জমে গেছে।’

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

দেশে করোনাভাইরাসে মোট সংক্রমণের ৮৪ শতাংশই ঢাকা বিভাগ থেকে শনাক্ত হয়েছে। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ৬৮ শতাংশ শনাক্ত হয়েছে কেবল ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুস্তাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঢাকায় ঘনবসতি বেশি এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতাও অন্য জেলার তুলনায় একটু বেশি। এখানে একজন আক্রান্ত হলে তার আশেপাশের সবাই টেস্টের আওতায় আসছে। সেটা সামাজিক চাপ হোক, বা প্রতিবেশীর চাপ হোক, অথবা নিজের ইচ্ছায় হোক, তারা টেস্ট করতে যাচ্ছে। সেজন্য ধরাও পড়ছে। এছাড়া, ঢাকায় প্রবাসীরা এসেছেন বেশি। আবার চিকিৎসার জন্য অনেকেই ঢাকায় আসছে। এসব কারণে ঢাকায় ছড়িয়েছে।’ 

অন্যান্য জেলায় আক্রান্ত কম হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘ঢাকার বাইরে প্রথমত ঘনবসতি কম। তাছাড়া, মানুষের ভেতরে সচেতনতাও কম। সাধারণ জ্বর সর্দি নিয়ে কেউ চিকিৎসকদের কাছে যাচ্ছে না। ঢাকায় হাসপাতালে এখনও যেমন ভিড় দেখা যাচ্ছে, অন্য জেলার হাসপাতালে মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকার বাইরের জেলা শহরে মানুষের শরীর বেশি খারাপ বা অসুস্থ হলে তখন যাচ্ছে। তখনই টেস্ট হচ্ছে। তখনই ধরা পড়ছে।’

অন্য জেলায় সংক্রমণ প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে ডা. মুস্তাক বলেন, ‘আমাদেরকে চিকিৎসক টিম করে ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। যদি কারও উপসর্গ থাকে, তাহলে তাদের নমুনা নিতে হবে। পরীক্ষা করে আক্রান্তদের আলাদা করে ফেলতে হবে দ্রুত।’

তিনি বলেন, ‘কেবল লকডাউন দিয়ে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যাবে না। পাশাপাশি আক্রান্তদের চিহ্নিত করতে হবে এবং আলাদা করতে হবে। তাহলে সুফল পাওয়া যাবে।’ 

 সারাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের চিত্র দেখুন:

Test to affected ratio

/এপিএইচ/টিএন/

লাইভ

টপ