মশার ওষুধ: ধার করে চলছে ঢাকা দক্ষিণ

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ১৯:১২, জুন ০৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:২২, জুন ০৬, ২০২০

ফগার মেশিন দিয়ে মশা নিধনের ওষুধ ছিটাচ্ছেন একজন মশকনিধন কর্মীদীর্ঘদিন ধরে উড়ন্ত মশা মারার ওষুধ ছিটানো বন্ধ থাকার পর অবশেষে উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে ওষুধ ধার নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সংস্থাটির ভাণ্ডারে বিদেশ থেকে আমদানি করা ওষুধ থাকলেও সেটি ফরমুলেশন (মিক্সিং) করতে না পারায় এমন সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে ওষুধ ফরমুলেশনের জন্য ৬ মাস ধরে দুই দফা টেন্ডার আহ্বান করলেও এখন পর্যন্ত তা চূড়ান্ত করতে পারেনি সংস্থাটি। দুই সিটির সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্র বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছে।

তবে মশার ওষুধ নিয়ে ঢাকা দক্ষিণে দীর্ঘদিন ধরে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেটি ভাঙতে উদ্যোগ নিয়েছেন ডিএসসিসির বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। এরইমধ্যে তিনি সংস্থার ভাণ্ডার বিভাগ পরিদর্শন করে নতুন আমদানিকৃত মূল ওষুধ নিজে উপস্থিত থেকে মাঠপরীক্ষা করেছেন। এছাড়া ভবিষ্যতে ওষুধ ফরমুলেশনের সব কাজ ডিএসসিসি থেকে করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও ডিএসসিসির একটি সূত্র জানিয়েছে।

জানা গেছে, মশার ওষুধ সংকট দেখা দেওয়ায় ডিএসসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে গত সপ্তাহের শুরুর দিকে ৫০ হাজার লিটার ওষুধ ধার চেয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে একটি পত্র দেওয়া হয়। এরমধ্যে ২৫ হাজার লিটার ওষুধ ধার দিতে ফাইল অনুমোদন দিয়েছে ডিএনসিসি।

গত বছর ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাবের পর বিদেশ থেকে সরাসরি ওষুধ আমদানি করার অনুমতি দেওয়া হয় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে। এরপর ভারত থেকে ম্যালাথিউন ৫% আমদানি করে ডিএসসিসি। কিন্তু আমদানিকৃত ওষুধটি সরাসরি ব্যবহার উপযোগী নয়। এর সঙ্গে ৯৫ শতাংশ ডিজেল ও ২৫ থেকে ৫০ এমএল সাইট্রোনেলা মিশ্রিত করে নগরীতে ছিটাতে হয়। এজন্য ডিজেল এবং ওষুধের ফরমুলেশন (মিশ্রণ) সঠিক হতে হয়। আর এই কাজটি করার জন্য সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কোনও প্রযুক্তি নেই। এজন্য দ্বিতীয় পক্ষ দিয়ে কাজ করতে হয় নগর ভবনকে।

আর এই কাজটি সম্পন্ন করতে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ৬ লাখ ৪০ হাজার লিটার অ্যাডাল্টি সাইটিং ওষুধের জন্য টেন্ডার আহ্বান করে ডিএসসিসি। তাতে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি ৪১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এতে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় দ্য লিমিট অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি লিটার ওষুধের ফরমুলেশন করতে দর দেয় ১৭২ টাকা। কিন্তু গত বছর মানহীন ওষুধ সরবরাহের অভিযোগ থাকায় প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল মেসার্স ফরওয়ার্ড ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি লিটারের জন্য দর দেয় ১৮৫ টাকা। আর তৃতীয় অবস্থানে ছিল জাহিন কনস্ট্রাকশন। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি লিটারের দর দেয় ১৯৫ টাকা। কিন্তু প্রথম অবস্থায় কোনও প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ না দিয়ে ফের টেন্ডার আহ্বান করে ডিএসসিসি।

পুনঃটেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় মেসার্স ফরওয়ার্ড ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি সর্বনিম্ন দর দেয় ১৫৫ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মেসার্স দ্য লিমিট অ্যাগ্রো প্রোডাক্ট দর দিয়েছে ১৬৩ টাকা। তৃতীয় অবস্থান থাকা মেসার্স নোকন লিমিটেড দর দেয় ১৮৩ টাকা। আর মেসার্স মার্শাল এগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড চতুর্থ অবস্থান থেকে দর দেয় ১৮৯ টাকা।

এদিকে টেন্ডার কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় ওষুধ সংকটে পড়ে ডিএসসিসি। এ সময় সংকট মেটাতে প্রথম ধাপে সর্বোচ্চ দরদাতা হওয়া মেসার্স মার্শাল অ্যাগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে এক লাখ লিটার ওষুধ দেওয়ার জন্য মৌখিকভাবে অনুরোধ করে ডিএসসিসি। প্রথম দফায় প্রতিষ্ঠানটি ডিএসসিসিকে ৬০ হাজার লিটার ওষুধ ফরমুলেশন করে দেয়। একই সময় দ্য লিমিট অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেড থেকেও ৪০ হাজার লিটার ওষুধ নেওয়া হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেই ওষুধ ব্যবহার করেছে ডিএসসিসি। কিন্তু বিনা টেন্ডারে নেওয়া সেই ওষুধের বিল এখনও পরিশোধ করেনি ডিএসসিসি। 

বিষয়টি সম্পর্কে মেসার্স মার্শাল এগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, আমরা উত্তর সিটি করপোরেশনেও ফরমুলেশনের কাজ পেয়েছি। সে সুবাদে একদিন দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আমাকে খবর দেন। আমি সেখানে গেলে তারা আমাকে বলেন, ‘আমাদের ফরমুলেশনকৃত ওষুধ প্রায় শেষের পথে। আপনারা যেহেতু ঢাকা উত্তরের ওষুধ ফরমুলেশন করছেন, তাই আপৎকালীন কিছু ওষুধ আমাদের ফরমুলেশন করে দেন। আমরা পরে সেগুলো এডজাস্ট করে নেবো।’ এরপর আমরা ওষুধ ফরমুলেশন করে সরবরাহ করেছি। এখনও আমাদের সেই বিল দেওয়া হয়নি। এখন কীভাবে তারা বিল পরিশোধ করবে সেটা তারাই জানেন। নিশ্চয় কোনও একটা পথ বের করে নেবেন।

এদিকে দ্বিতীয় দফায় সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া মেসার্স ফরওয়ার্ড ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেওয়ার জন্য সংস্থার তৎকালীন দায়িত্বে থাকা মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের দফতরে পাঠানো হয়। তবে এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে গত বছর মানহীন ওষুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দ্য লিমিট অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেডের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে—এমন অভিযোগে সেই ফাইল সই করে যাননি তিনি। বর্তমান মেয়রও এখন পর্যন্ত ওই ফাইলে অনুমোদন দেননি। তিনি ওষুধের কার্যকারিতা আরও যাচাই-বাছাই করে যাচ্ছেন। এজন্য প্রতিষ্ঠানটির সাভারে অবস্থিত কারখানাও পরিদর্শন করেছেন বলে জানা গেছে।

ভাণ্ডার সূত্র আরও জানায়, এভাবে টেন্ডার কার্যক্রম চলতে চলতে ছয় মাস চলে গেছে। এরইমধ্যে ডিএসসিসির ভাণ্ডারে ব্যবহার উপযোগী ওষুধ শেষ হয়ে যায়। ফলে নগরীতে উড়ন্ত মশা নিধনে এখন ফগিং করা হচ্ছে না। এতে মশার উৎপাত বেড়েই চলেছে। এরই মধ্যে চলতি বছরের শুরু থেকে বৃহস্পতিবার ৪ জুন পর্যন্ত ৩০৫ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ।

দক্ষিণ সিটির একাধিক মশক সুপারভাইজার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত এক মাস ধরে তারা তারা উড়ন্ত মশা মারার জন্য ঠিকমতো ওষুধ পাচ্ছেন না। অনেক আগ থেকেই ওষুধ কমে এলে খুব অল্প অল্প করে দেওয়া হতো। বর্তমানে তাদের হাতে কোনও ওষুধ নেই। ভাণ্ডার বিভাগ ওষুধ সরবরাহ করতে পারছে না।

তবে মশার ওষুধ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও কথা বলতে রাজি নন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা। মশার ওষুধ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কোনও কথাই বলতে রাজি হননি ডিএসসিসির প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. ইমদাদুল হকের দফতরে কয়েকদিন ধরে গিয়ে সাক্ষাৎ চাইলেও পাওয়া যায়নি। পৃথক দুটি খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি। বৃহস্পতিবার প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (ডা.) মো. শরীফ আহমেদের দফতরে গিয়ে তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। ফোন করলেও তারা রিসিভ করেননি। বিষয়টি উল্লেখ করে খুদেবার্তা পাঠালেও উত্তর দেননি।

তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ওষুধ চেয়ে দক্ষিণ সিটি থেকে আমাদের একটা চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমাদের মেয়র মহোদয় বলেছেন, আমরা দুই সিটি করপোরেশন একসঙ্গেই কাজ করবো। মশা নিয়ে কোনও অবহেলা নয়। তিনি অত্যন্ত পজিটিভ। তাই তিনি ওষুধ দিতে বলেছেন। আমরা অনুমোদন দিয়ে দিয়েছি।

/এমআর/এমওএফ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ