কোভিড-১৯: প্রথম ৫৮ দিনের শনাক্তের সংখ্যা শেষ ৩ দিনের প্রায় সমান

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১০:০০, জুন ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:১৬, জুন ০৭, ২০২০

করোনাভাইরাসবাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম তিন জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়। শুক্রবার (৫ জুন) ৯০তম দিনে এসে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার শীর্ষ ২০-এর তালিকাতে সংযোজিত হয়েছে বাংলাদেশের নাম। আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ওয়ার্ল্ডোমিটার এ তথ্য জানিয়েছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৬০ হাজার ৩৯১ জন। শেষদিকে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। শনাক্তের সংখ্যা ১০ হাজার অতিক্রম করেছিল ৫৮তম দিনে এসে। অথচ ৮৭তম দিনে ৫০ হাজার শনাক্তের পর ৯০তম দিনেই তা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে।

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার সংবাদ জানিয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশে তিন জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন পুরুষ, অন্যজন নারী। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এই তিন ব্যক্তির মধ্যে  ইতালি থেকে দেশে ফেরা দুজন।

সে সময় আইইডিসিআরের পরিচালক আরও জানান, ইতালি থেকে আসা দুজন ভিন্ন পরিবারের সদস্য। তাদের একজন বাসায় আসার পর তার মাধ্যমে একজন নারীও আক্রান্ত হয়েছেন।

৮ মার্চের পর শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়ায় ৫৮তম দিনে। ওইদিন শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ১৪৩ জন। ২০ হাজার ছাড়িয়েছে ৬৯তম দিনে, সেদিন পর্যন্ত শনাক্ত হয় ২০ হাজার ৬৫ জন। ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে ৭৬তম দিনে, শনাক্ত হয় ৩০ হাজার ২০৫ জন। ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে ৮২তম দিনে, শনাক্ত হয় ৪০ হাজার ৩২১ জন। ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে ৮৭তম দিনে, সেদিন পর্যন্ত শনাক্ত ছিল ৫২ হাজার ২৪৫ জন। ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে ৯০তম দিনে অর্থাৎ ৫ জুন। এদিন পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে ৬০ হাজার ৩৯১ জন।

এদিকে, লকডাউন শিথিলের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু দেশে কোভিড-১৯ রোগী শনাক্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তারা বলছে, করোনাভাইরাসের মহামারি এখনও চলছে এবং সংক্রমণ এড়াতে মানুষকে যেমন নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করতে হবে, সরকারগুলোকেও পরীক্ষা চালিয়ে যেতে হবে।

প্রসঙ্গত, দেশে ৬৬ দিন পর সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মেয়াদ শেষ হয় গত ৩০ মে। আর সেদিনই এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ ৪০ জনের মৃত্যুর সংবাদ জানায় স্বাস্থ্য অধিদফতর। ২৬ মার্চ থেকে শুরু হয় সাধারণ ছুটি। কিন্তু তার ঠিক একমাস পর ২৬ এপ্রিল পোশাক কারখানা খুলে দেওয়া হয়। এর ঠিক দুই সপ্তাহ পর থেকে সংক্রমণের দশম সপ্তাহ (১০ থেকে ১৬ মে) দেশে করোনা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি শুরু হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সবদিক থেকেই ঊর্ধ্বমুখী। নমুনা পরীক্ষা যেমন বাড়ছে, তেমনি শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কার্যত সাধারণ ছুটি কার্যকর না হওয়া, চলাচল নিয়ন্ত্রণ, পোশাক কারখানা খুলে দেওয়া, ঈদের সময় বাড়ি যেতে দেওয়া, কমিউনিটি থেকে রোগী শনাক্ত না করা, মাস্ক না পরা, সামাজিক দূরত্ব না মানা এবং দ্রুত রোগী শনাক্ত না করতে পারার কারণে এটা হচ্ছে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ঢাকায় আনা, ঢাকা থেকে ফেরত যাওয়া, ঈদ উপলক্ষে শপিং মল সীমিত হলেও খুলে দেওয়ার ফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। তারা বলছেন, সামনের অবস্থা আরও খারাপ হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের উচিত ছিল ভাইরাসের আগে আগে চলা, কিন্তু সেটি উল্টো হয়ে ভাইরাসের পেছনে ছুটছি আমরা। এই ভাইরাসের যে গতি-প্রকৃতি তাতে করে এর সংক্রমণ আর আমাদের যে কর্মকাণ্ড, সেটা সাংঘর্ষিক।’

তিনি বলেন, ‘শুরুর দিকে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা কম ছিল, কিন্তু এখন সেটা বেড়েছে। এছাড়া সাধারণ ছুটি তুলে দেওয়া, সঠিকভাবে হোম কোয়ারেন্টিন-আইসোলেশন না মানা, কয়েক দফায় পোশাক শ্রমিকদের ঢাকায় আনা-নেওয়া, সাধারণ ছুটি না মানার কারণে তাই রোগী সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে।’

দেশের সব রোগীকে পরীক্ষা করা হচ্ছে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘গ্রামের কেউ তো এখনও টেস্টের আওতায় আসছে না। সেটা যদি করা যেত তাহলে রোগী সংখ্যা আরও বাড়তো।’

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘টেস্ট বেশি বা কম হোক, সংক্রমণ বাড়তে থাকবে এখন। এখনও যাদের লক্ষন-উপসর্গ রয়েছে কেবল তাদের এবং তাদের সংস্পর্শে আসাদেরই পরীক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে। নমুনা পরীক্ষার কত শতাংশ পজিটিভ সেটা গুরুত্বপূর্ণ এবং সে হারের সংখ্যা বাড়ছে।’

‘প্রাকৃতিকভাবে এই রোগ বাড়ে-কমে না। যত বেশি সংক্রমিত ব্যক্তি অন্যদের সংস্পর্শে আসবে ততই এই রোগ ছড়াবে। তাই লকডাউন-আইসোলেশন না মানা, সাধারণ ছুটি তুলে দেওয়ায় ভবিষ্যতে আমরা আরও খারাপ অবস্থাতে যাবো। এখন থেকে রোগী লাফ দিয়ে বাড়তেই থাকবে। এছাড়া ল্যাবরেটরি পরীক্ষা যত শনাক্ত হচ্ছেন তার বাইরেও অসংখ্য মৃদৃ লক্ষণযুক্ত রোগী রয়েছে।’ বলেন ডা. মুশতাক হোসেন।

তিনি বলেন, ‘সংক্রমণের উৎস কমাতে কমিউনিটি থেকে রোগী শনাক্ত করে আইসোলেট করে চিকিৎসা দেওয়া গেলে ভালো হতো। যেটা টোলারবাগ বা মাদারীপুরের শিবচরের ঘটনার পর আইইডিসিআর করেছিল। সেটি এখন আর সম্ভব হচ্ছে না, যদিও লাল-হলুদ-সবুজ অঞ্চল ভাগ করে এখন আবার করা হচ্ছে।’

সাইলেন্ট সংক্রমণের সংখ্যা কিন্তু আমরা এখনও জানি না মন্তব্য করে জনস্বাস্থ্যবিদ চিন্ময় দাস বলেন, ‘যত টেস্ট করা যাবে ততই রোগীর সংখ্যা বাড়বে। একই সঙ্গে, করোনাকে মোকাবিলা করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল তার কোনোটাই করা হয়নি। তাই যতই মানুষের মুভমেন্ট বেশি হবে ততই সংক্রমণ বেশি হবে। শুরুর দিকে একটা “কমপ্লিট লকডাউন” দরকার ছিল, যেটা করতে পারিনি। জনগণের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করা হয়নি এবং কখনোই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কথা নীতিনির্ধারকরা শোনেননি। শুরুর দিকে যদি দুই থেকে তিন সপ্তাহ একটা পারফেক্ট লকডাউন করা যেত তাহলে সংক্রমণের সংখ্যা অনেক কমে যেত, যেটা ভিয়েতনাম-কেরালাতে করা হয়েছে।’

প্রতিদিন যে চিত্র আমাদের বলা হয় সেটা প্রকৃত চিত্র নয়, উল্লেখ করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারছি না। আর যদি প্রতিরোধ না করা যায় তাহলে প্রতিদিন হয়তো ২০০ থেকে ৪০০ মানুষ মারা যাবে।’

‘লকডাউন উঠে গেলো, আইসোলেশন-কোয়ারেন্টিন হচ্ছে না, দ্রুত রোগী শনাক্ত হচ্ছে না। এতে সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশে সংক্রমণ সহজে কমবে না। একই সঙ্গে যদি অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়, তাদের হাসপাতালে ভর্তির দরকার হলে তখন কী হবে সেটাই চিন্তার বিষয়।’ বলেন অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ।

 

/এমএএ/

লাইভ

টপ