করোনার হটস্পট চিহ্নিত এলাকাগুলোতে স্বাভাবিক দাফনও বেশি

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ২০:০৭, জুন ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৯, জুন ২২, ২০২০

এক-নজরে-৯-সিটি-করপোরেশনে-দাফন-ও-দাহের-সংখ্যা
সারা দেশের সিটি করপোরেশন এলাকায় গত পাঁচ মাসে হওয়া দাফনের তুলনায় কেবল নারায়ণগঞ্জে ২৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি দাফন হয়েছে। শুরু থেকেই  করোনার হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হওয়া এই জায়গায় জানুয়ারির চেয়ে এপ্রিলে ২৭০টি দাফন বেশি হয়েছে। কবরস্থান সংশ্লিষ্ট মোহরার, খতিব ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, কয়েকটি ‍সুনির্দিষ্ট জেলা ছাড়া স্বাভাবিক সময়ের থেকে খুব বেশি দাফন বাড়েনি। তবে যেসব জেলা করোনার হটস্পট সেসব জেলায় স্বাভাবিক দাফনও অনেক বেড়েছে। তারা বলছেন, সিটি করপোরেশনে থাকা দাফনের সংখ্যার বাইরে পারিবারিক কবরস্থান, মাজারভিত্তিক কবরস্থানে দাফন করা হয়ে থাকে। যেগুলোর বিষয়ে সিটি করপোরেশন অবহিত নাও থাকতে পারে। তবে ময়নমনসিং, সিলেট ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা কম হওয়ায় এখানে মৃত্যুর সংখ্যায় কোনো অস্বাভাবিকত্ব দেখা যায়নি।

১৯ জুন পর্যন্ত হিসেব বলছে সিলেট জেলায় আক্রান্ত ১৬৪০জন, ময়মনসিংহ ১২০৪জন, এবং বরিশাল এক হাজারের কিছু বেশি। যেখানে ঢাকায় ২৪ হাজার ৫০৪ ও নারায়ণগঞ্জে প্রায় সাড়ে চার হাজার। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছেন, সাধারণত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কম হওয়ায় এই তিন সিটিতে সাম্প্রতিক সময়ের চেয়ে আগে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। এদিকে গাজীপুরের আক্রান্ত আড়াই হাজার হলেও এখানে বাইরের মানুষ বেশি হওয়ায় মৃতদেহ এলাকার বাইরে দাফন বেশি হয়।

ঢাকা বাদে সারা দেশের ৯টি সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানের কবরস্থানগুলোর সংখ্যা অনুসন্ধানে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। কবরস্থান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, গাজীপুর সিটি করপোরেশনে জানুয়ারি থেকে মে এই পাঁচ মাসে দাফন হয়েছে ২৫৯ জন, নারায়ণগঞ্জে ১ হাজার ৮৪১, চট্টগ্রামে ২৫৯, খুলনায় ১ হাজার ৬৭৪, রাজশাহীতে ১ হাজার ৯০, সিলেটে ৪২৯, বরিশালে ২৫৯, ময়মনসিংহে ৬৬৪ এবং রংপুরে ১১৪টি দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এই পর্যন্ত সব সিটি মিলিয়ে মোট দাফন ৬ হাজার ৫৮৯টি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক দাফন হয়েছে নারায়ণগঞ্জে, যার পরিমাণ সারা দেশের তুলনায় ২৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

উল্লেখ্য, দেশে প্রথম করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয় নারায়ণগঞ্জ ও মাদারীপুরের শিবচরে। পরে ঢাকার টোলারবাগসহ ঢাকার বাইরে ১৮ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। এপ্রিলে করোনাভাইরাস ছড়ানোর একটা অন্যতম বড় স্থান হয়ে দাঁড়ায় নারায়ণগঞ্জ। সারা দেশেই নারায়ণগঞ্জ থেকে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কোভিড-১৯ রোগী পাওয়ার খবর মেলে সে সময়। জতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা ৯ এপ্রিলের ব্রিফিংয়ে জানান, নারায়ণগঞ্জকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর ব্যক্তিগত সহকারী আবুল হোসেনের তথ্য মতে সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন ৩৩টি কবরস্থান ও ৩টি শ্মশান রয়েছে। গত জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সেখানে দাফন হয়েছে ১ হাজার ৮৪১টি। এর মধ্যে এপ্রিলে সর্বোচ্চ ৫৭১টি। সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে থাকা এই কবরস্থান ও শ্মশানে গত জানুয়ারিতে দাফন ও দাহ হয় ৩০১টি। পরের দুই মাস ফেব্রুয়ারি ও মার্চে যথাক্রমে ২৭৮ ও ২৬০টি। এপ্রিলে সর্বোচ্চ ৫৭১টি হলেও মে মাসে কিছুটা কমে দাফনের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৩১-তে। আবুল হোসেনের দেওয়া তথ্যমতে, নারায়ণগঞ্জে করোনা সংক্রমণ কমে আসায় এ সংখ্যা কমেছে।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের ইন্সপেক্টর দীপক মজুমদারের দেওয়া তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত মোট লাশ দাফন হয়েছে ৫২৯টি এবং ১৪৫টি দাহ করা হয়েছে। এরমধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে দেড়শ’ জনের। মার্চে ১৩৬। এবং তারপর প্রতিমাসে কমতে দেখা গেছে। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকায় মে মাসে ১১৭ জনের দাফনের খবর পাওয়া গেছে। তবে এ সংখ্যা নিবন্ধিত হওয়া সংখ্যা। এর বাইরে পারিবারিক কবরস্থানে অনেক দাফন হয়, যেগুলোর বিষয়ে সিটি করপোরেশন অবহিত নাও থাকতে পারে।

রংপুর সিটি করপোরেশন

রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্ম ও মৃত্যু শাখার নিবন্ধন কর্মকর্তা মোহম্মদ আলীর দেওয়া তথ্যমতে, এলাকার ৩৩টি ওয়ার্ডে গত ৬ মাসে ১১৪ জন মারা গেছে। এদের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯ জন। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে মারা গেছে ২১ জন, ফেরুয়ারি মাসে ১৩, মার্চ মাসে ২৪, এপ্রিল মাসে ২৭ এবং মে মাসে ২৯ জন। এই এলাকায় জুন মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে আরও দুজন মারা গেছে। নিবন্ধন কর্মকর্তা মোহম্মদ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রংপুরে মৃত্যুহার তুলনামূলক কম। সিটি করপোরেশনের অধীন দশটি কবরস্থান রয়েছে। এগুলোতে নিবন্ধিত গত পাঁচ মাসের দাফন সংখ্যায় খুব বেশি তারতম্য নেই। তবে জুনে এ সংখ্যা কিছুটা বাড়তির দিকে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অধীনে সিটি এলাকায় দুটি কবরস্থান। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুদ্দোহার দেওয়া তথ্য মতে গত পাঁচ মাসে চট্টগ্রাম সিটির এই দুই কবরস্থানে মোট ২৬০টি কবর হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে সেই সংখ্যা ৫১ থাকলেও মে মাসে এসে সেটি ৭৪ হয়েছে। তবে চট্টগ্রামে মাজারভিত্তিক ও পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা থাকায় মৃতের সঠিক সংখ্যাটি এই দুই কবরস্থান দিয়ে বিবেচনা করা যাবে না বলেও জানান তিনি।

দাফন সম্পন্ন করতে যে সংস্থাগুলো কাজ করে থাকে তাদের দেওয়া তথ্য সংগ্রহ করে জানা যায়, ৩ এপ্রিলের পরে ৩৬১ জনের দাফন সম্পন্ন করেছে। কেবল আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম গত মার্চে ২৯টি দাফন সম্পন্ন করে, যেখানে জানুয়ারিতে সে সংখ্যা ছিল ১৭। মুর্দা সেফা মে মাসে (নারীদের দাফনের ব্যবস্থা করে) ৩৬টি দাফন সম্পন্ন করেছে। গত জানুয়ারিতে সে সংখ্যা ছিল ১২, মার্চে ১৫। এপ্রিল ও মে এই দুই মাসে আল মানাহিল চট্টগ্রামে ফাউন্ডেশন ১৬৫টি দাফন সম্পন্ন করেছে। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন গত মে থেকে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৭৯টি লাশ দাফন করে। এর মধ্যে ২০ জন সৎকার, ৫৯ দাফন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অধীনে জয়দেবপুরে একটি (২৭ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত) ও টঙ্গীতে একটি কবরস্থান রয়েছে। জয়দেবপুর কবরস্থানের খতিব রকিবুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জানুয়ারিতে ১৯টি, ফেব্রুয়ারিতে ২১টি, মার্চে ২৫টি, এপ্রিলে ২৩টি, মে মাসে ২৫টি দাফন হয়েছে। টঙ্গী ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড কবরস্থানের খতিব হাফেজ কাজী আকরাম হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, জানুয়ারি মাসে এই কবরস্থানে ৩৪টি দাফন হয়। সেটি পরবর্তী সময়ে বাড়েনি। ফেব্রুয়ারি মাসে ২৪টি, মার্চে ৩১টি, এপ্রিলে ২৯টি এবং মে মাসে ২৮টি দাফন সম্পন্ন হয়।

রাজশাহী সিটি করপোরেশন

জানুয়ারি থেকে মে মাসে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬টি কবরস্থান ও দুটি শ্মশানের হিসেবে দাফন হয়েছে ১ হাজার ৯০টি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল জানুয়ারি মাসে ২৬৯টি। গত মার্চে এ সংখ্যা ছিল ২৪৮টি। এপ্রিলে কিছুটা কমে ১৮৫ এবং মে মাসে আরও কমে ১৬৭টি দাফন নিবন্ধিত হয়েছে। তবে জুনের ১০ তারিখের মধ্যেই সংখ্যা ৬৭-তে এসে দাঁড়িয়েছে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,করোনা পরিস্থিতিতে সিটি এলাকার কবরস্থানগুলো প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। এজন্য কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন লাশ দাফনে সহযোগিতা করছে। তারা আমাদের কাছে যে ধরনের সাপোর্ট চান, তা এ ব্যাপারে দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে দাফন কাজ করার জন্য আমাদের একটি টিম তাদের সঙ্গে দাফনের কাজে নিয়োজিত রাখা হয়েছে। এছাড়া নমুনা সংগ্রহসহ রাসিকের একটি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করা হচ্ছে।

বরিশাল সিটি করপোরেশন

বরিশাল সিটি করপোরেশনে দুটি কবরস্থানে গত জানুয়ারি থেকে ২৫৯টি দাফন নিবন্ধিত হয়েছে। আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের তত্ত্বাবধায়ক জাকির হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, গত জানুয়ারিতে এই দুই কবরস্থানে ৬১টি দাফন হয়, সেটিই সর্বোচ্চ ছিল। এরপরে ফেব্রুয়ারিতে ৫৯টি, মার্চে ৪৬টি, এপ্রিলে ৪৫টি, মে-তে ৪৮টি দাফন হয়েছে। চলতি জুন মাসের পুরো হিসাবে না পাওয়া গেলেও মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত ২২টি দাফনের উল্লেখ করেন তিনি।

খুলনা সিটি করপোরেশন

খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকায় সাতটি কবরস্থান, তিনটি শ্মশান, একটা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের গোরস্তান রয়েছে। সিটি করপোরেশনের দেওয়া তথ্য মতে, এখানে গত পাঁচ মাসে ১ হাজার ৬৭৪টি দাফন হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে সর্বোচ্চ ৩৯০টি দাফন হয়। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে সেই সংখ্যা কাছাকাছি ছিল যথাক্রমে ৩৮১ ও ৩৮৫। এপ্রিলে সেই সংখ্যা ২৫১-তে নামে এবং মে মাসে কিছুটা বেড়ে ২৬৭টিতে দাঁড়ায়।

সিলেট সিটি করপোরেশন

সিলেট সিটি করপোরেশনের অধীনে মানিকপীরের টিলায় একটিই কবরস্থান রয়েছে। এই অঞ্চলে মাজারভিত্তিক বেশকিছু কবরস্থান আছে, যেগুলোর হিসাব সিটি করপোরেশনে আসে না। আবার তাদের নিজেদের তত্ত্বাবধানেও তথ্য হালনাগাদ থাকে না। সিটি করপোরেশনের হিসাব মতে, সিলেট সিটিতে গত পাঁচ মাসে দাফন হয়েছে ৪২৯টি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ দাফন ছিল ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪। এরপরেই সংখ্যার দিক থেকে এগিয়ে মে মাস, ১০৩টি। মাঝে মার্চ ও এপ্রিলে কিছুটা কম দাফন হয়, যথাক্রমে ৫৮ ও ৪৭।

***প্রতিবেদনটি তৈরি করতে রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম বরিশাল, ময়মনসিংহ, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরের বাংলা ট্রিবিউন প্রতিনিধিরা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।

/এফএএন/ এমএমজে/

লাইভ

টপ