মালয়েশিয়া পাঠানোর ফাঁদে ফেলে মুক্তিপণ আদায়: ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

Send
রাফসান জানি
প্রকাশিত : ০৫:৪১, জুলাই ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৫১, জুলাই ০১, ২০২০

মানব পাচার

বিনা পয়সায় মালয়েশিয়া পাঠানোর ফাঁদ পেতেছিল একটি মানবপাচার চক্র। টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের ফাঁদে পা দেওয়া ব্যক্তিদের এনে সাগরপথে পাচার করতো তারা। ২০১৫ সালে তাদের ফাঁদে পড়ে পাচার হওয়ার সময় ১২ জনকে উদ্ধার করেছিল র‌্যাব-১২। এরপর দীর্ঘ তদন্তে এই মানবপাচার চক্রের সঙ্গে ২১ জনের সম্পৃক্ততা পায় তদন্ত কর্মকর্তারা। তবে তিন জনের সঠিক নাম পরিচয় না পাওয়ায় ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত ১৮ জন গ্রেফতার রয়েছে বলে জানিয়েছেন মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুহম্মদ মহিউদ্দিন ফারুকী।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, '৩০ জুন টাঙ্গাইলের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গ্রেফতার ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। আসামিরা বিনা পয়সায় মালয়েশিয়া পাঠাবে বলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোক সংগ্রহ করে সাগরপথে মাছ ধরার ট্রলারে করে পাচার করতো। প্রলোভনে পড়ে পাচার হওয়া ব্যক্তিদের দফায় দফায় নির্যাতন করা হতো এবং তাদের কান্না ও আর্তনাত শুনিয়ে দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে দফায় দফায় মুক্তিপণ আদায় করতো বলে জানান বর্তমানে র‌্যাব-২ এ কর্মরত সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক মুহম্মদ মহিউদ্দিন ফারুকী।

যেভাবে ১২ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার

২০১৫ সালের ১২ মার্চ র‌্যাব-১২ তে অভিযোগ করেন টাঙ্গাইলের ফজলু ও আনিছুর রহমান নামে দুই ব্যক্তি। তারা জানান, সাগরপথে মাছ ধরার ট্রলারে করে মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা তাদের দুই সন্তান জাহাঙ্গীর ও সোহেলকে মালয়েশিয়া পাচার করছে। চক্রের সদস্যরা তাদের সন্তানদের কান্না শুনিয়ে প্রত্যেকের কাছে দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা করে দাবি করেছে এবং টাকা পরিশোধ না করলে তাদের সাগরে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।

র‌্যাবে কর্মকর্তা মহিউদ্দিন ফারুকী বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর অনুসন্ধান করে ২২ মার্চ অভিযানে নামি। আমরা টাঙ্গাইল থেকে দুজনকে গ্রেফতার করি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে চট্টগ্রামে থাকা কয়েকজন সদস্যের নাম জানতে পারি। এরপর আসামিদের নিয়ে টাঙ্গাইল থেকে চট্টগ্রাম গিয়ে আরও তিন জনকে গ্রেফতার করি। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাগর পথে মালয়েশিয়া পাচারের উদ্দেশে কক্সবাজার পাঠানো ১২ জন ভিকটিমকে উদ্ধারের জন্য অভিযান পরিচালনা করা হয়। কক্সবাজারের উখিয়া থানার খুনিয়া পালং থেকে আরও দুই আসামিকে আমরা গ্রেফতার করি এবং তাদের হেফাজতে থাকা ১২ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করি। ইতোমধ্যে গ্রেফতার হওয়াদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যে ঢাকা থেকে দু'জনকে গ্রেফতার করা হয়।'

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, 'তদন্তে এ পর্যন্ত ১৮ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। আরও ৩ জন আসামির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলেও তথ্য প্রমাণ ও সঠিক নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।'

১৮ আসামির নাম পরিচয়

অভিযোগ পত্রে দাখিল করা ১৮ জন আসামি হলো—টাঙ্গাইল চৌবাড়ীয়ার মো. রুহুল আমিন রুবেল (২৬), মো. শহিদুল ইসলাম (২৭), চট্টগ্রাম আকবর শাহ এলাকার মো. আবু মোহাম্মদ (৪২),  চুয়াডাঙ্গার আলম ডাঙ্গার মো. পিন্টু আলী (২৭), চট্টগ্রাম উখিয়ার মো. আনোয়ার ইসলাম (৩২), কক্সবাজার রামু এলাকার মো. মাহমুদল হক (৪০),  মো. হামিদুল হক ওরফে কামাল ডাকাত (৩৫), টাঙ্গাইলের ইছাপাশা গ্রামের ইউনুছ আলী (৩৫),  মো. শওকত আলী (৩৬), কক্সবাজার রামুর বাপ্পী বাকুইল্ল্যাহ ওরফে শফি (২৪), মো. আব্দুল করিম (৪৫), ধোয়া পালংয়ের মনসুর (৫২), আবদুল গফুর (১৯), টেচার দ্বীপ দক্ষিণপাড়ার আবুল কালাম(৩৮), বেলাল, রামুর পূর্ব গোয়ালিয়ার মো. সুরুত আলম (৩৮), উখিয়া ছেপদ খালীর মো. আকবর ওরফে ছৈয়দ আকবর (৩৩)  ও  রামুর দোয়াপালংয়ের সাবু।

বিনা পয়সায় মালয়েশিয়া পাঠানোর ফাঁদ ও নির্যাতন

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মুহম্মদ মহিউদ্দিন ফারুকী জানান, আসামিরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাধারণ নিরীহ লোককে বিনা পয়সায় মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে দালালের মাধ্যমে লোক সংগ্রহ করতো। টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রীদের প্রথমে চট্টগ্রাম নিয়ে আসতো। এরপর চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের টেকনাফে নিয়ে আসে। টেকনাফ থেকে ধাপে ধাপে তাদের মালয়েশিয়াগামী মাছ ধরার ট্রলারে উঠায়। ট্রলারের উঠানোর পর থেকেই যাত্রীদের বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করে। নির্যাতন ও অনাহারে যাত্রীদের মধ্যে কোনও যাত্রী গুরুতর অসুস্থ বা মৃত্যুবরণ করলে তাদের সাগরে ছুড়ে ফেলা হয়। মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার জলসীমায় ট্রলার পরিবর্তন করে যাত্রী হস্তান্তর করা হয়। এভাবে মালয়েশিয়া সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছার আগেই জীবিত সব যাত্রী ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।'

তদন্তের বরাত দিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আসামিরা প্রতিনিয়ত মালয়েশিয়ায় যাতায়াত করে। সমুদ্র পথে প্রেরণ করা যাত্রীদের মালয়েশিয়ায় গ্রহণ করতো তারা। যাত্রীদের গ্রহণ করার পর মালয়েশিয়ার সাগর তীরবর্তী অঞ্চলে টর্চার সেলে নিয়ে যেত। সেখানে চালানো হতো নির্যাতন। নির্যাতনে তথ্য দেশে থাকা স্বজনদের জানাতো। কখনও কখনও ভিডিওকলের মাধ্যমে মারধরের দৃশ্য দেখাতো। এসব দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছে মুক্তিপণ চাইতো। যারা টাকা দিতে পারতো না, তাদের ক্ষেত্র বিশেষে সাগরে ছুড়ে মেরে ফেলা বা নির্যাতন করে পঙ্গু করে দিতো এই চক্রের সদস্য।

মালয়েশিয়ার সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলের জলদস্যুদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে এই টর্চার সেল তৈরি করা হয়েছিল বলে জানান সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক মুহম্মদ মহিউদ্দিন ফারুকী। বিচারে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে পরে এ ধরনের মানবপাচারে সম্পৃক্ত হতে অপরাধীরা সাহস পাবে না বলে মনে করেন তিনি।

 

/আইএ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ