টেস্ট কম শনাক্তও কম!

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১০:০০, জুলাই ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০৮, জুলাই ১৩, ২০২০

করোনা পরীক্ষাকরোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ‘টেস্ট, টেস্ট অ্যান্ড টেস্ট’।  কিন্তু বাংলাদেশে গত কয়েকদিনের করোনা পরীক্ষার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায় নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার সংখ্যা কমে গিয়েছে। নমুনা পরীক্ষা কমে যাওয়াতে দেশে শনাক্ত রোগীর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আর এক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রেখেছে বিনামূল্যে পরীক্ষা করানোর পরিবর্তে ২০০ টাকা করে ফি নেওয়া। এটা একেবারেই অনুচিত বলেও মন্তব্য করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ২০০ টাকা ফি নির্ধারণ, সুস্থতার সংজ্ঞা নির্ধারণ—এসব কারণে টেস্টের সংখ্যা কমেছে, তাতে করে কমেছে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা। আর ঝুঁকি বাড়ছে এতে।

শনিবার (১১ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনলাইন বুলেটিনে জানানো হয়, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে করোনা আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৬৮৬ জন। এদিন মোট নমুনা সংগ্রহ করা হয় ১১ হাজার ৪৭৫টি। নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১১ হাজার ১৯৩টি। পরীক্ষার তুলনায় ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ২৪ শতাংশ। এর আগের দিন শুক্রবার (১০ জুলাই) ১৪ হাজার ৩৭৭টি নমুনা সংগ্রহের কথা জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। সেদিন নমুনাসহ পরীক্ষা করা হয়েছে ১৩ হাজার ৪৮৮টি। তাতে শনাক্ত হন দুই হাজার ৯৪৯ জন। শুক্রবারের চেয়ে শনিবার নমুনা সংগ্রহের সংখ্যা কমেছে দুই হাজার ২৯৫টি। ৯ জুলাই নমুনা সংগ্রহ হয় ১৫ হাজার ৮৬২টি, পরীক্ষা হয় ১৫ হাজার ৬৩২টি। তাতে রোগী শনাক্ত হন তিন হাজার ৩৬০জন। ৮ জুলাই নমুনা সংগ্রহ হয় ১৫ হাজার ৮৮৩টি, আর পরীক্ষা হয় ১৫ হাজার ৬৭২টি নমুনা। তাতে করে রোগী শনাক্ত হন তিন হাজার ৪৮৯ জন। গত ৭ জুলাই ২৪ ঘণ্টায় ১৩ হাজার ৪৯১টি নমুনা সংগ্রহের কথা জানায় স্বাস্থ্য অধিদফতর। এর মধ্যে পরীক্ষা করা হয় ১৩ হাজার ১৭৩টি নমুনা। তাতে শনাক্ত হন তিন হাজার ২৭ জন। ৬ জুলাই নমুনা সংগ্রহ হয় ১৫ হাজার ২০১টি আর পরীক্ষা হয় ১৪ হাজার ২৪৫টি। তাতে করে শনাক্ত হন তিন হাজার ২০১ জন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১০ জুন প্রথম ১৫ হাজার ৯৬৫টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। এরপরে ১৫ হাজার থেকে ১৮ হাজারের মধ্যে পরীক্ষা করা হয়। ২৬ জুন একদিনে সর্বোচ্চ নমুনা পরীক্ষা করা হয় ১৮ হাজার ৪৯৮টি, সেদিন রোগী শনাক্তের হার ছিল ২০ দশমিক ৯১ শতাংশ। ৫ জুলাই  ১৩ হাজার ৯৯৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। রোগী শনাক্তের হার ছিল ১৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। তারপর থেকে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা দিন দিন কমছে। এর আগে ১ জুন ১১ হাজার ৪৩৯টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। ৪০ দিন পরে শনিবার আবারও ২৪ ঘণ্টায় ১১ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা হলো।

এদিকে, কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি জানিয়েছে তারা মনে করছেন, পরীক্ষার সংখ্যা ও মানোন্নয়নের জন্য কোভিড-১৯ পরীক্ষাগারের সংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা বেশি প্রয়োজন। অটো-এক্সট্র্যাকশন মেশিনের সহযোগিতায় পরীক্ষাগারে কোভিড-১৯ পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধি করা সম্ভব।

দেশে বর্তমানে ৭৭টি ল্যাবে করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু যে অনুপাতে এই ৭৭ ল্যাবে পরীক্ষা হওয়ার কথা, সেটা হচ্ছে না। একইসঙ্গে গত ২৯ জুন থেকে করোনা পরীক্ষার জন্য সরকার ২০০ টাকা ফি নির্ধারণ করে। বুথে বা হাসপাতালে গিয়ে নমুনা পরীক্ষা করালে ২০০ টাকা আর বাসায় গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হলে ৫০০ টাকা। এর আগে এটা বিনামূল্যে করা হতো। ঢাকার ভেতরে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা করা প্রতিষ্ঠানটি হচ্ছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার। গত ৩০ জুন এখানে পরীক্ষা হয়েছে তিন হাজার ২২টি নমুনা। শনিবার ( ১১ জুলাই) পরীক্ষা হয়েছে মাত্র ৭৬৯টি।

প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শামসুজ্জামান তুষার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তাদের ল্যাবরেটরিতে সারাদেশ থেকে নমুনা আসতো, সেগুলো তারা পরীক্ষা করতেন। কিন্তু চলতি মাসের শুরু থেকেই সারাদেশ থেকে নমুনা আসা কমে গিয়েছে।

বরিশাল বিভাগের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. বাসুদেব কুমার সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পুরো বরিশাল বিভাগে একটিমাত্র ল্যাবে পরীক্ষা হতো, নমুনা বেশি হলে সেগুলো ঢাকায় পাঠানো হতো। আমাদের ল্যাবে সর্বোচ্চ সাড়ে পাঁচশ’র মতো পরীক্ষা হলেও গত কদিনেই সেটা কমেছে।  এমাসের শুরু থেকেই সাড়ে তিনশ’ থেকে চারশ’র ভেতরে থাকছে পরীক্ষা।

চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগেও পরীক্ষা কমেছে। চট্টগ্রামে গত চার থেকে পাঁচদিন হলো পরীক্ষা করার হার কমেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই তৃতীয়াংশ পরীক্ষা কমেছে, আগে যদি দিনে দেড় হাজার পরীক্ষা হতো তাহলে এখন সেটা হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০। তিনি বলেন, চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করে মানুষ এখন বুঝতে পারছে তাদের কী করা উচিত, আইসোলেশনে যেতে হবে, প্যানিক কমেছে অনেক। একইসঙ্গে ফোর্সফুল একদল মানুষ আগে টেস্ট করাতো, সেটাও এখন কমেছে।

তবে ২০০ টাকার একটা বিষয় আছে মন্তব্য করে একই বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এটা অস্বীকার করা যাবে না। এখন মানুষের আয় নেই, যে মানুষ দিনে ২০০ টাকা আয় করবে সে কখনও ঘরে খাবার না কিনে পরীক্ষা করাবে না। তবে এতে করে ঝুঁকিও বাড়ছে। কোনোভাবেই সরকারি এই ফি নির্ধারণ করা উচিত হয়নি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, করোনা পরীক্ষার জন্য ২০০ টাকা ফি নেওয়া অযৌক্তিক এবং অনুচিত। লাইনে দাঁড়িয়ে, নানা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকে পরীক্ষা করাতো। তারা আর পরীক্ষা করাবে না। এর ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে গেলো। পরীক্ষা বাড়ানো উচিত, অথচ উল্টো কমে গেলো। অ্যাক্টিভ সার্ভিলেন্স (বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ) আগা-গোড়াতেই ছিল না, সেখানে এখন আরও সমস্যা হলো। এখন মানুষ এসে পরীক্ষা করছে, একে প্যাসিভ সার্ভিলেন্স বলে। সেগুলো পরীক্ষা হচ্ছে। আবার নতুন করে সুস্থতার সংজ্ঞাতে আগের তিন টেস্টের পরিবর্তে এখন একটা করে টেস্ট হচ্ছে, এতেও কমেছে টেস্টের সংখ্যা।  

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ফি নির্ধারণের কারণে টেস্টের সংখ্যা কমেছে, প্রান্তিক মানুষরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে টেস্ট করতে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশের বন্যা পরিস্থিতি। এসব এলাকার মানুষের টেস্ট করাটা কঠিন হয়েছে। তবে টেস্টের অনুপাতে পজিটিভ রোগীর হার কমেনি।

তিনি বলেন, টেস্ট আরও বেশি করা উচিত, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আমাদের ল্যাবরেটরির সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু টেস্টিং সক্ষমতা বাড়াতে হবে, এর কোনও বিকল্প নেই।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র ডা. আয়েশা আক্তার টেস্ট কম হবার কারণ হিসেবে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে টেস্ট বন্ধ থাকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বেসরকারি ল্যাবগুলোতে আবার একটি মেশিন চালু করতে ৯৪টি নমুনা দরকার হয়। সেটা যদি না হয়, তাহলে মেশিন চালু করা যায় না, সেখানেও সময় যাচ্ছে। আবার কিছু কিছু এলাকায় বন্যা হচ্ছে, সেখানেও সমস্যা হচ্ছে। আবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন গাইডলাইন অনুযায়ী পরপর তিনদিন উপসর্গ না থাকলে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় টেস্ট করার দরকার নাই। এতে করেও পরীক্ষার সংখ্যা কমেছে।

/এমআর/এমএমজে/

লাইভ

টপ