বাসাবাড়ির বর্জ্যের জন্য দু’বার কর দিতে হবে ডিএসসিসি’কে!

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ০৯:০০, জুলাই ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:১০, জুলাই ১৫, ২০২০

ডিএসসিসিবাসাবাড়ির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা টেন্ডারে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সংস্থাটি প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে বাৎসরিক ভিত্তিতে প্রাইমারি কালেকশন সার্ভিস প্রোভাইডারকে (পিসিএসপি) এই ময়লা সংগ্রহের দায়িত্ব দিচ্ছে। এজন্য দরপত্র আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত প্রতিটি পিসিএসপি’কে প্রতি মাসে এক লাখ টাকা করে দিতে হবে। এজন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাত থেকে চলতি অর্থবছরে নয় কোটি টাকা রাজস্ব আয় ধরেছে ডিএসসিসি। তবে বিষয়টিকে ‘তুঘলকি কাণ্ড’ আখ্যা দিয়েছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন করে কর আরোপ আইনসিদ্ধ নয়। কারণ নাগরিকরা হোল্ডিং ট্যাক্সের সঙ্গেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর দিয়ে থাকেন। এভাবে এক সেবার জন্য দুবার কর ধার্য হতে পারে না।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, করপোরেশনের আওতাধীন বাড়ি মালিকরা তাদের বাড়ির মোট মূল্যের ১২ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে সাত শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স, দুই শতাংশ সড়ক বাতি ও তিন শতাংশ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য। অর্থাৎ মোট হোল্ডিং ট্যাক্সের ২৫ শতাংশই দেওয়া হয় ময়লা ব্যবস্থাপনার জন্য। চলতি অর্থবছরে (২০২০-২১) নতুন করে ১৯টি খাতে করারোপ করতে যাচ্ছে ডিএসসিসি। এর মধ্যে এই খাতটিও রয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে বর্জ্য সংগ্রহের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিতে দরপত্র আহ্বান করেছে ডিএসসিসি।

গত ২৫ জুন ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. বদরুল আমিনের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘ডিএসসিসির আওতাধীন এলাকায় নিয়োজিত ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহ সেবার (পিসিএসপি) মেয়াদ ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাজের গতিশীলতা ও মনোন্নয়নের লক্ষ্যে ৭৫টি ওয়ার্ডে নতুনভাবে পিসিএসপি নিয়োজিত করার জন্য নিবন্ধন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে আগ্রহী প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে আগামী ৭ জুলাইয়ের মধ্যে অফেরতযোগ্য পাঁচ হাজার টাকা জমা দিয়ে আবেদনপত্র সংগ্রহ করার জন্য অনুরোধ করা হলো।’

নিয়ম অনুযায়ী সিটি করপোরেশন নাগরিকদের বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করে নিয়ে তা ব্যবস্থাপনা করবে। এজন্য সিটি করপোরেশনকে হোল্ডিং ট্যাক্সের সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নির্ধারিত কর পরিশোধ করা হলেও করপোরেশন ময়লা সংগ্রহ করে না। এই সুযোগেই এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠন বাসাবাড়ি থেকে এই ময়লা সংগ্রহ করে করপোরেশনের নির্ধারিত বিনে ফেলে। আর সেখান থেকেই করপোরেশনের গাড়ি ময়লা অপসারণ করে থাকে। এজন্য এলাকাভিত্তিক সংগঠনগুলো নাগরিকদের কাছ থেকে নিজেদের ইচ্ছেমতো অর্থও আদায় করে আসছে।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করছে তাদের পারিশ্রমিক সিটি করপোরেশনেরই দেওয়া উচিত। কারণ, এ ময়লা সংগ্রহ করে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনেরই। এজন্য হোল্ডিং ট্যাক্সের সঙ্গে নাগরিকরা অর্থ পরিশোধ করে আসছেন। কিন্তু সিটি করপোরেশন তার মূল দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে আবার নাগরিকদের ওপর দ্বিতীয় দফায় কর আরোপ করতে যাচ্ছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য না। আর এ খাত থেকে যে টাকাটা আয় ধরা হয়েছে তা তো নাগরিকদের কাছ থেকেই আদায় করা হবে। এছাড়া যারা ময়লা সংগ্রহ করবে তাদের পারিশ্রমিকসহ অন্যান্য খরচ তো থাকবেই।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এই সিদ্ধান্ত তুঘলকি কাণ্ড ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ এক সেবার জন্য তো দুইবার কর ধরা যায় না। নাগরিকরা কেন দুইবার ট্যাক্স দেবেন? ডিএসসিসিকে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত।’

জানতে চাইলে প্রাইমারি ওয়েস্ট কালেকশন সার্ভিস প্রোভাইডারের সভাপতি নাহিদ আক্তার লাকি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এই সার্ভিসটি সেবা হিসেবে আমরা করপোরেশনের অনুমোদন নিয়েই করে এসেছি। সেখানে শুধু কর্মচারীদের বেতনভাতা বাবদ যে টাকাটা ব্যয় হতো সেই টাকাটাই বাসাবাড়ি থেকে আদায় করা হতো। এই কাজকে যদি করপোরেশন টেন্ডারের মাধ্যমে দেয় তাহলে সেখানে কাজটি স্থানীয় মাস্তান ও কাউন্সিলরদের দখলে চলে যাবে। তখন করপোরেশন ধার্যকৃত টাকা আদায় করার জন্য অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে এই সেবার সঙ্গে সাড়ে চার হাজার হতদরিদ্র ও দলিত সম্প্রদায়ের লোক জড়িত রয়েছেন। এটি টেন্ডারে গেলে এই লোকগুলো কর্ম হারাবেন। ডিএসসিসির এমন সিদ্ধান্তের কথা শুনে অনেকেই এরই মধ্যে আমাকে ফোন করেছেন। তারা নিয়মিত আমার অফিস ও বাসায় আসা শুরু করেছেন। সবাই একটা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। এই মানুষগুলো কোথায় যাবেন? এটাতে তো সিটি করপোরেশন নতুন করে ট্যাক্স ধরতে পারে না। এটা পুরোপুরি বেআইনি।’

এদিকে সোমবার (১৩ জুলাই) বিকালে নগর ভবনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এক বৈঠকে ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম নতুন কর্মপরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হচ্ছে। আমরা ডিএসসিসির প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন করে মোট ৭৫ জন প্রাইমারি বর্জ্য সংগ্রহ সেবাদানকারী (পিসিএসপি) নিয়োগ করবো। সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি উল্লেখ করে তাদের নিবন্ধিত করা হবে। শর্ত ভঙ্গ করলে তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হবে।’

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. এমদাদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা একটা নীতিমালার মাধ্যমে এই কাজটি পরিচালনা করতে চাই। এজন্য কিছু শর্ত যুক্ত করে দেওয়া হবে। এখান থেকে আমাদের রাজস্বও আসবে।’

/এমএএ/এমএমজে/

লাইভ

টপ