পুলিশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা যেভাবে নিষ্পত্তি হয়

Send
জামাল উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৫:০০, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪৩, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০

পুলিশ (ফাইল ফটো)পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে এ বাহিনীর সদর দফতরে করা অভিযোগের নিষ্পত্তি হয় মূলত বাংলাদেশ পুলিশের নিজস্ব আইন (পিআরবি) অনুযায়ী। অভ্যন্তরীণ কিংবা বাইরের কারও কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর প্রাথমিক তদন্ত শেষে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ফরমে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়। এরপর বিভিন্ন পদ্ধতি ও পর্যায় অতিক্রম শেষে শাস্তির আদেশ কিংবা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হয়।

পুলিশ সদর দফতরের একাধিক সূত্রে জানা যায়, ইন্সপেক্টর, এসআই (সাব ইন্সপেক্টর), সার্জেন্ট, এএসআই (এসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর), হাবিলদার, নায়েক ও কনস্টেবলদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কারণে ১৯৪৩ সালের পিআরবিতে (পুলিশ রেজুলেশনস, বেঙ্গল) বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৭৬ সালের পুলিশ অফিসার্স (বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ অনুযায়ীও বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালাটিও প্রযোজ্য হয় বিভাগীয় মামলার ক্ষেত্রে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (অধস্তন কর্মকর্তাদের শৃঙ্খলা ও আপিল) ২০০৬ সালের বিধিমালা অনুযায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে তদূর্ধ্ব পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও নিষ্পত্তি করা হয় সরকারি চাকরি আইনের (শৃঙ্খলা ও আপিল) নিয়ম অনুযায়ী। কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পর্যন্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় পুলিশ সদর দফতরের পক্ষ থেকে। তবে অভিযোগ আসার পরপরই অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গা থেকে প্রথমে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই নিয়ম এএসপি থেকে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও মানা হয়। যদিও তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পুলিশ সদর দফতরের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়। তখন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, অভিযোগ ওঠার পর যে কেউ সাময়িক বরখাস্ত হতে পারেন। তবে আপিলে যদি সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য অভিযোগ খণ্ডন করতে পারেন, তাহলে আবারও তাকে চাকরিতে নিয়মিত করা হয়। অন্যথায় চূড়ান্তভাবে চাকরি থেকে তাকে বরখাস্ত, কিংবা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রেও কেউ কেউ সরকারি চাকরির নিয়ম অনুযায়ী সুবিধা পেয়ে থাকেন। আবার কাউকে চাকরি জীবনের সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই বাড়ি চলে যেতে হয়। আর ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং সাজা ভোগ করতে হয়। তবে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হলে বাংলাদেশ পুলিশের (বিপি) নির্দিষ্ট ফরমে কার্যবিবরণী গ্রহণ করতে হবে— এছাড়া সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর শাস্তি নেওয়া যাবে না।

বিভাগীয় মামলার আগে যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়

অভিযোগের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে নির্দিষ্ট সময় দিয়ে কারণ দর্শানো নোটিশ দিতে হবে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যকে। নোটিশের জবাব পাওয়ার পর ব্যক্তিগত শুনানি করতে হয়। লিখিত ও শুনানিতে জবাব সন্তোষজনক না হলে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হয়। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার চূড়ান্ত মতামত পাওয়ার পর আবারও ব্যক্তিগত শুনানি করতে হয়। অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে শাস্তির অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়ে কেন শাস্তি আরোপ করা হবে না তার কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রসিডিং সংক্রান্ত সব কাগজপত্র সরবরাহ করতে হবে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে। এই কারণ দর্শানো নোটিশের জবাব পাওয়ার পর সন্তোষজনক মনে না হলে শাস্তির চূড়ান্ত আদেশ জারি করবে— পুলিশ সদর দফতরের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। শাস্তির চূড়ান্ত আদেশ হাতে পাওয়ার ৩৭ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বরাবরে আপিল করার সুযোগ পাবেন অভিযুক্ত সদস্য।

কী ধরনের অভিযোগ বেশি

আইজিপি কমপ্লেইন সেলে সাধারণত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে পারিবারিকভাবে যেসব অভিযোগ বেশি আসে সেগুলো হচ্ছে—বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক, স্ত্রী-সন্তানদের ভরণ পোষণ না দেওয়া, যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে নির্যাতন করা। এছাড়া ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ঘুষ আদায়, অবৈধ অস্ত্র, ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিলসহ মাদক ও ডাকাতির মামলায় আসামি করে দেওয়ার হুমকি, পুরনো মামলায় অজ্ঞাত আসামির তালিকায় নাম দিয়ে চালান করে দেওয়ার হুমকি, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ঘুষ, নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ। ভুক্তভোগীর মামলা না নেওয়া কিংবা মামলা দায়েরের পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়া। মামলার সঠিকভাবে তদন্ত না করা ও তদন্তে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি, আদালত থেকে আদেশ পেলেও  আসামি গ্রেফতার না করা এবং মামলার জমিজমা সংক্রান্তসহ নানা অভিযোগ। এসব অভিযোগেই সাধারণত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

বিভাগীয় মামলায় যেসব শাস্তি দেওয়া হয়

পিআরবি (পুলিশ আইন) অনুযায়ী, কোনও পুলিশ সদস্য অপরাধমূলক কাজে জড়ালে তার বিরুদ্ধে দুই ধরনের বিভাগীয় শাস্তির (লঘু ও গুরু) বিধান আছে। গুরুদণ্ডের আওতায় চাকরি থেকে বরখাস্ত, পদাবনতি, পদোন্নতি স্থগিত, বেতনবৃদ্ধি  স্থগিত ও চাকরিকালীন সুযোগ-সুবিধা রহিত করা হয়। মামলায় অপরাধ প্রমাণিত হলে বরখাস্ত করা হয়। গুরুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ আছে। ছোট অনিয়ম বা অপরাধের জন্য দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার, অপারেশনাল ইউনিট থেকে পুলিশ লাইনস বা রেঞ্জে সংযুক্ত করে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। বিসিএস ক্যাডারের পুলিশ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ (শৃঙ্খলা ও আপিল) অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগে একটি সেল রয়েছে।

পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে রুজু হওয়া বিভাগীয় মামলা কীভাবে নিষ্পত্তি করা হয় জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ বিভাগের এআইজি মো. সোহেল রানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারি চাকরি আইনের শৃঙ্খলা ও আপিল রুলস অনুযায়ী অভিযোগ নিষ্পত্তি ও শাস্তি দেওয়া হয়। কারণ, আইনে সবই সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে।

/এপিএইচ/আপ-এনএস/এমএমজে/

লাইভ

টপ