করোনাকালে দেবী এলেন দোলায়

Send
সাদ্দিফ অভি
প্রকাশিত : ০০:৫২, অক্টোবর ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:০১, অক্টোবর ২২, ২০২০

দুর্গা পূজাসনাতন ধর্ম মতে, যা কিছু দুঃখ-কষ্টের বিষয়, যেমন– বাধাবিঘ্ন, ভয়, দুঃখ-শোক, জ্বালা-যন্ত্রণা এসব থেকে ভক্তকে রক্ষা করেন দেবী দুর্গা। শাস্ত্রকাররা দুর্গা নামের অর্থ করেছেন— দুঃখের দ্বারা যাকে লাভ করা যায়, তিনিই দুর্গা। দেবী দুঃখ দিয়ে মানুষের সহ্যক্ষমতা পরীক্ষা করেন। তখন মানুষ অস্থির না হয়ে তাকে ডাকলেই তিনি তার কষ্ট দূর করেন। এ বছর সেই দেবী দুর্গা এলেন দোলায় চড়ে এবং বিদায় নেবেন গজে (হাতি) করে।

সাধারণত মহালয়ার ছয় দিন পরই হয় দেবী দুর্গার বোধন। অর্থাৎ মহালয়ার পর থেকে দেবীর আগমনের ঘণ্টা বাজে। মহালয়া হয়ে থাকে শরৎ কালে। কিন্তু এক মাসে দুটি অমাবস্যা পড়লে সেই মাসকে শাস্ত্রমতে ‘মল’ মাস বলা হয়। এই মাসে কোনও শুভ কাজ করার রীতি নেই তাই এবার দেবী এলেন হেমন্তে। শরতে মহালয়া শুরু হওয়ার ৩৫ দিন পর আসবেন দেবী দুর্গা। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ জানায়, এ বছর মহালয়া ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে। মহালয়ায় পিতৃপক্ষের সমাপ্তিতে দেবীপক্ষের সুচনা হলেও এবার আশ্বিন মাস ‘মল’ মাস হওয়ায় দেবীপক্ষে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত না হয়ে প্রায় এক মাস ৫ দিন অর্থাৎ ৩৫ দিন পর হেমন্তের কার্তিক মাসে ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর আগমনের মধ্যে দিয়ে শুরু হবে দুর্গাপূজা। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ষষ্ঠী পূজা হবে ২২ অক্টোবর।

ঢাকার পূজা মণ্ডপের জন্য যেসব নির্দেশনা

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। করোনার সংক্রমণের কারণে এবার উৎসব হচ্ছে না, ধর্মীয় রীতি পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তাই পূজার উৎসবে ভাটা পড়েছে। এবার পূজার অনুষ্ঠানমালা শুধু ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে পূজা-অর্চনার মাধ্যমে মন্দির প্রাঙ্গণেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের পাঠানো নির্দেশনার মধ্যে এটি অন্যতম। অন্যান্য বছর পূজার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকলেও এবার তা হচ্ছে না। তাছাড়া আরতি প্রতিযোগিতা ও মেলা বাদ দেওয়া হয়েছে। এবার দুর্গাপূজায় শোভাযাত্রার মাধ্যমে প্রতিমা বিসর্জন হবে না। বিসর্জনের জন্য একটি ট্রাকে একসঙ্গে অনেক মানুষ গেলেও এবার একটি ট্রাকে প্রতিমা বিসর্জনের জন্য শুধুমাত্র ১০ জন যেতে পারবেন। এর বাইরে অতিরিক্ত কেউ প্রতিমা বিসর্জনের জন্য যাবে না। দিনে দর্শনার্থী সীমিত থাকলেও সন্ধ্যারতির পর মণ্ডপ দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হবে। আর প্রসাদে খিচুড়ি বিতরণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তাছাড়া মাস্ক ছাড়া কেউ মণ্ডপ এলাকায় প্রবেশ করতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন মহানগর পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদার। তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যারতির শুরুর প্রাক্কালে আমরা প্রবেশ পথ বন্ধ করে দেবো। সন্ধ্যারতিতে ৭-৮ মিনিট সময় লাগে এসময়ের মধ্যে মণ্ডপ খালি করে ফেলা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সপ্তমী,অষ্টমী ও নবমী পূজার দিন সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে মায়ের পুষ্পাঞ্জলি সরাসরি সম্প্রচার করবে কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল। একই সময়ে মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি, শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির নামের ফেসবুক পেজ থেকে মায়ের পুষ্পাঞ্জলি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। বাড়িতে বসেই এবার ভক্তরা অঞ্জলি দেবেন মায়ের চরণে।’

এছাড়া অন্যান্য নির্দেশনার মধ্যে আছে— মন্দিরের গেটে সবার জন্য সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও স্যানিটাইজেশনের ব্যবস্থা করতে হবে । আতশবাজি ও পটকার ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে, ধর্মীয় ভক্তিমূলক সংগীত ব্যতীত অন্য সংগীত বাজানো থেকে বিরত থাকতে হবে। তাছাড়া মহাসপ্তমীর দিন দুপুর ১২টা ১ মিনিটে করোনা মুক্তি এবং দেশ, জাতি ও বিশ্ব শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করতে হবে।

দুর্গাপূজাপূজার কার্যবিধি

মহাষষ্ঠী তিথিতে কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার মধ্যদিয়ে বাঙালির শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শাস্ত্রমতে, দেবী দুর্গা অসুর বধ করে ভক্তদের মধ্যে শান্তি ছড়িয়ে দিতেই কৈলাস ছেড়ে মর্ত্যলোকে নেমে আসেন। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ষষ্ঠী পূজার মধ্যদিয়ে শুরু হলো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। বুধবার (২১ অক্টোবর) বোধনের মাধ্যমে এবারের দুর্গোৎসবের আচার পর্ব শুরু হয়। ষষ্ঠীর দিন সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটে শুরু হওয়া বন্দনা পূজার সমাপন হয় বিহিত পূজায়। আবাহনের মাধ্যমে মূল মণ্ডপে দেবী আসীন হওয়ার পর সন্ধ্যায় দেবীর অধিবাস।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রঞ্জিত চক্রবর্তী বলেন, ‘বিল্ববৃক্ষ (বেলগাছ) মহাদেবের ভীষণ প্রিয়, পদ্মযোনী ব্রহ্মাও বিল্ববৃক্ষে দেবীকে প্রথম দর্শন করেন। তাই দেবীকে বিল্ববৃক্ষ তলেই আবাহন করা হয়। বিল্ববৃক্ষ তলে দেবী আবাহনের মধ্যে সংকল্প করেন ভক্তরা,দশমী পর্যন্ত যথাবিধ উপায়ে মায়ের পূজা করবো।’

রাম শরৎকালে দেবীকে আহ্বান করেছিলেন বলে এ পূজা শারদীয় দুর্গাপূজা নামেও পরিচিত। আর মর্ত্যলোকে আসতে দেবীর সেই ঘুম ভাঙানোকে বলা হয় অকালবোধন। অর্থাৎ অসময়ে দেবীকে জাগিয়ে তোলা।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকাল ১০টায় নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপনের পর শুরু হবে মহাসপ্তমীর পূজা। শনিবার মহাঅষ্টমী পূজা, সেদিন হবে সন্ধিপূজা। এদিন রামকৃষ্ণ মিশনে কুমারী পূজা হওয়ার কথা হলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার তা হচ্ছে না। রবিবার সকালে বিহিত পূজার মাধ্যমে হবে মহানবমী পূজা। আর মঙ্গলবার সকালে দর্পণ বিসর্জনের পর প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হবে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল কুমার চ্যাটার্জি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে সশরীরে পূজায় অংশগ্রহণ করে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের করোনাভাইরাসের কাছে আত্মসমর্পণ করে জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলবেন, নাকি এবারের পূজায় অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবেন— তা ভক্তদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দুর্গাপূজা পাঁচ দিনব্যাপী অনুষ্ঠান, সবার অংশগ্রহণে করোনাভাইরাসের বিস্তারের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সন্ধ্যারতির পর সর্বসাধারণের জন্য মন্দির/মণ্ডপ বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছি আমরা। এছাড়া মা সর্বত্র বিরাজমান। বাড়িতে বসে ভক্তদের প্রণাম মা নিশ্চয়ই গ্রহণ করবেন। বঞ্চিত করবেন না তার আশীর্বাদ হতে।’

উল্লেখ্য, সারাদেশে এবার ৩০ হাজার ২১৩টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। পূজার জন্য রাজধানীতে প্রস্তুত করা হয়েছে ২৩২টি মণ্ডপ। বিগত বছর সারাদেশে মণ্ডপের সংখ্যা ছিল ৩১ হাজার ৩৯৮টি, যা তার আগের বছরের চাইতে ৪৮৩টি বেশি। আর এবার মণ্ডপ কমেছে গত বছরের তুলনায় এক হাজার ১৮৫টি।

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ