ফের ক্যাসিনোপাড়ায় জুয়াড়িরা, দুষ্ট চক্রের দৃষ্টি অনলাইনে!

Send
শাহরিয়ার হাসান
প্রকাশিত : ১৯:১৫, অক্টোবর ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৫৮, অক্টোবর ২৫, ২০২০

মিনি ক্যাসিনোক্যাসিনোবিরোধী অভিযান বন্ধ হওয়া পর ক্লাবগুলোর সামনে আবারও জুয়াড়িদের আনাগোনা বেড়েছে। বিকাল হলেই ক্লাবগুলোর সামনে আড্ডায় মেতে উঠছেন জুয়াড়িরা। স্থানীয়রা বলছেন, রমরমা ক্যাসিনো চলাকালীন সময়ে তারাই ছিলেন মূল হোতা। সুযোগ বুঝে এখন আবার ফিরছেন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে আপাতত এই চক্রের মনোযোগ অনলাইন ক্যাসিনোতে।

রবিবার (২৫ অক্টোবর) ক্যাসিনোবিরোধী সবচেয়ে বেশি অভিযান পরিচালনাকারী সংস্থা র‍্যাব এবং পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে। তারা ক্যাসিনো কারবারিদের এই অপতৎপরতার কথা অস্বীকার করছেন না।

কারবারিদের সব কর্মকাণ্ড গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে জানিয়ে র‍্যাব বলছে, ‘মূল শহরের বাইরে গিয়ে নিরাপদে নিরালায় ক্যাসিনো চালাচ্ছে ব্যবসায়ীরা। তাদের জোগানদাতা হিসেবে কাজ করছেন পুরানো ক্যাসিনো কারবারিরা। তাদের সঙ্গে এবার আরও যোগ হয়েছে অনলাইন ক্যাসিনো। বিদেশি বিভিন্ন ডোমেইন থেকে অনলাইন ক্যাসিনো চলাচ্ছেন তারা। তবে সেগুলো ছোট পরিসরে। এখনও সাড়া ফেলতে পারেনি।’

সরেজমিন রাজধানীর মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় দেখা যায়, সব ক্লাবেরই দরজায় তালা ঝুলছে। তবে ক্লাবের সামনে মানুষের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। কোনও গ্রুপ সিগারেট হাতে গল্প করছেন, আবার কেউ গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা বলছেন, ‘মতিঝিলের যখন ক্লাবপাড়ার রমরমা অবস্থা ছিল, তারাই ক্লাবগুলোতে নেতৃত্ব দিতেন। দিন রাত পড়ে থাকতেন। মাঝে আসেনি, এখন আবার সবাই আসা যাওয়া শুরু করেছেন। ভেতরে ক্যাসিনো চলছে সেটাও হতে পারে।’

এদিকে গত শনিবার  (২৪ অক্টোবর) ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার কাইচাবাড়ি এলাকায় মিনি ক্যাসিনোর সন্ধান পেয়েছে র‍্যাব। প্রায় দেড় বছর ধরে ক্যাসিনোটি বিরতিহীনভাবে চলছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। র‌্যাব-৪ অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খুবই কৌশলে এই কারবারিরা প্রায় দেড় বছর ধরে কাসিনোটি চালিয়ে আসছিল। এখানে কোনও বড় খেলোয়াড় আসে না। সবাই অল্প আয়সম্পন্ন মানুষ। তবু প্রতি মাসে প্রায় ৩ কোটি টাকার মতো খেলা হতো।’

র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘শুধু আশুলিয়া নয়, মিরপুরসহ আরও বেশ কয়েকটি জায়গায় পুরোদমে ক্যাসিনো চলার তথ্য পেয়েছি। মূল কারবারিরা ছোট পরিসরে নতুন মানুষ দিয়ে এই ক্যাসিনো পরিচালনা করছেন। তাদের নজরদারিতে রেখেছি। অভিযান চালিয়ে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’

র‍্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, প্রায় এক বছর আগে শুরু হওয়া সেই অভিযানের কারণে যারা গ্রেফতারের ভয়ে লুকিয়েছেন, তারা পাড়ি জমিয়েছেন বিভিন্ন দেশে, তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে দেশে ফিরে এসেছেন। তারা আবারও নতুন করে এই ক্যাসিনো শুরু করতে চাচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য আছে।

অনলাইন ক্যাসিনোঅনলাইন ক্যাসিনো
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আপাতত ঝুঁকি এড়াতে মূল ক্যাসিনোতে জোর কম দিয়ে অনলাইন ক্যাসিনোতে মনোযোগ দিচ্ছে কারবারিরা। অনলাইন ক্যাসিনোর মূল হোতা সেলিম প্রধান যেভাবে ক্যাসিনো চালিয়েছেন, সেই আদলেই নতুন কারবারিরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তথ্য বলছে, পিটুফোর গেমিং হচ্ছে একটি অনলাইন বেটিং সাইট। সাইটের মেন্যু থেকে যেকোনও খেলার ওপরে তারা বেটিং করে। তার আগে অনলাইন থেকেই তার টাকা বা ডলার দিয়ে বিট কয়েন কেনে। বেটিং করা এবং উপার্জিত অর্থ গ্যাম্বলিংয়ের মাধ্যমে দ্বিগুণ বা চারগুণ হওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়।

এমন তথ্য থাকার পরও কিছু সীমাবদ্ধতার জন্য অনলাইন ক্যাসিনো বন্ধে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। খেলাগুলো বিদেশ থেকে কয়েকটি অপরাধী চক্র নিয়ন্ত্রণ করছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশি কিছু করতে পারছে না। অন্যদিকে অনলাইন ক্যাসিনো থেকে কোটি কোটি টাকা পাচারের তথ্য পেয়েছে সিআইডি। সংস্থাটি বলছে, যত দ্রুত সম্ভব তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনলাইন ক্যাসিনোতে কারা সক্রিয় জানতে চাইলে র‍্যাবের মুখপাত্র আশিক বিল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশে অনলাইনভিত্তিক ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান মূলত র‌্যাবই প্রথম করেছে। এর মূল আসামি সেলিম প্রধান বর্তমানে কারাগারে আছেন। বর্তমান সময়ে ছোটখাটো অনলাইনভিত্তিক যেসব অভিযোগ পাচ্ছি, তা বড় ধরনের সংগঠিত নয়। দেখছি বিভিন্ন বিদেশি ডোমেইন থেকে এসব অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালিত হচ্ছে। এরকম বেশ কিছু বিষয় আমাদের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে র‌্যাব কাজ করছে।’

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোস্তফা কামাল বলেন, ‘অনলাইনে ক্যাসিনো বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারীদের তথ্য-উপাত্ত কিছু আমাদের কাছে আছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে অপরাধীদের গ্রেফতার করার কাজ চলছে।’

প্রসঙ্গত, গত বছর ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান প্রথম শুরু হয় রাজধানীর ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাবে। অভিযানের দিন সন্ধ্যায় যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর একে একে গ্রেফতার করা হয় আরও অনেককে।

ইয়ংমেনস ক্লাব ছাড়াও ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালানো দেশের আলোচিত ক্লাবের মধ্যে রয়েছে, মতিঝিলের ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র, কলাবাগান ক্রীড়া চক্র, ধানমন্ডি ক্লাব, ফু-ওয়াং ক্লাব, চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব, আবাহনী ক্লাব, মোহামেডান ক্লাব। এছাড়া বনানীর গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি ক্যাসিনোতে অভিযান পরিচালনা করা হয়।

৫০টি অভিযানে গ্রেফতার ২৯৬ জন
ক্যাসিনোবিরোধী ৪৯টি অভিযান পরিচালিত হয়। এরমধ্যে ৩৩টি র‌্যাব এবং ১৭টি অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। এসব অভিযানে ২৯৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এরমধ্যে ঢাকায় ২৪৩ জন এবং ঢাকার বাইরে ৫৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

জব্দ
অভিযানে ৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, ১৬৬ কোটি টাকার এফডিআর, ১৩২টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই এবং ১১ কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক জব্দ করা হয়। এছাড়া আট কেজি সোনা, ২২টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ ও ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

জামিনে মুক্ত যারা
ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হওয়া কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সভাপতি ও কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ ও মোহামেডান ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া জামিনে বেরিয়ে গেছেন। গত ১৯ মার্চ লোকমান হোসেন ভূঁইয়া কাশিমপুর-১ থেকে ও ১ জানুয়ারি শফিকুল আলম ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান।

মামলা
এসব ঘটনায় দায়ের করা হয় ৩২টি মামলা। এরমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ১৪টি মামলা তদন্ত করে র‍্যাব। ইতোমধ্যে র‍্যাব ১৩টি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেছে। এছাড়া এখনও একটি মামলা তদন্ত করছে র‌্যাব। বাকি ১৮টি মামলা তদন্ত করছে পুলিশ। পুলিশের তদন্ত করা মামলাগুলোর মধ্যে সাতটি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।

গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও রুপন ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে অর্থপাচারের পাঁচটি মামলার মধ্যে চারটির চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

/এনএস/এমওএফ/

লাইভ

টপ