চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে সরকারের পরিকল্পনাহীনতা, জ্বালানি ক্রয়ে সিদ্ধান্তহীনতা ও ভুল অগ্রাধিকারের ফল বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দিবাগত রাতে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি সংকটকে আরও খারাপ করেছে, তবে সংকটের মূল কারণ যুদ্ধ নয়; সরকারের অব্যবস্থাপনা।
হাসনাত আব্দুল্লাহ দাবি করেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সরকার প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পরিকল্পনা করেনি। তার অভিযোগ, ভর্তুকির চাপ সামলাতে ক্যাপাসিটি চার্জ বা বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্দিষ্ট অর্থপ্রদানের জায়গায় কাটছাঁট না করে কয়লা ও ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আমদানি করা বিদ্যুতের অর্থ কমানো হয়েছে। এর ফলে উৎপাদন ও আমদানি কমেছে বলে তিনি দাবি করেন।
মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুনের পর দৈনিক ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কোনো কার্যকর বিকল্প পরিকল্পনা ছিল না। একই সময়ে ভারত থেকে ডিজেল, আদানি থেকে বিদ্যুৎ এবং কয়লাচালিত কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
হাসনাতের ভাষ্য, এসব জ্বালানির সবগুলো হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল নয়। তাই এগুলোর সরবরাহ কমার পেছনে যুদ্ধের পাশাপাশি বকেয়া, ক্রয়-সূচি ও জ্বালানি পরিকল্পনার ঘাটতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ সংকটের পরিসর তুলে ধরতে তিনি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্যের বরাত দিয়ে দাবি করেন, এপ্রিল ২০২৬-এ সর্বোচ্চ দৈনিক লোডশেডিং ছিল ৪১ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা, জুলাইয়ে ৩২ হাজার এবং আগস্টে তা ৫৩ হাজার থেকে ৬২ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছেছে। ১০ আগস্ট রাত ১টায় সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়েরও দাবি করেন তিনি। তবে এসব পরিসংখ্যানের স্বাধীন যাচাই করেননি তিনি।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের জন্য তিনটি নথি—ফুয়েল প্ল্যান, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান ও ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান—হালনাগাদ থাকা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন হাসনাত। তাঁর দাবি, এসব পরিকল্পনা কার্যকর থাকলে বর্তমান সংকট মোকাবিলা করা সহজ হতো।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মন্ত্রীর অতীত দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। হাসনাত বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন এবং ওই সময়ে দেশে ব্যাপক লোডশেডিং ছিল। দুই দশক পর একই মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পাওয়ার পর আবারও বড় ধরনের লোডশেডিং দেখা দিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এটিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং মন্ত্রীর কর্মদক্ষতা ও পারফরম্যান্সের প্রশ্ন হিসেবে উল্লেখ করেন হাসনাত।
এদিকে বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেই ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করিডোর নিয়ে সরকারের উদ্যোগেরও সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, ১২ আগস্ট থেকে বিদ্যুৎ বিভাগ পুনরায় ৭৬৫ কেভি কাটিহার–পার্বতীপুর–বরনগর সঞ্চালন লাইন এবং ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে সক্রিয় হয়েছে।
হাসনাতের অভিযোগ, প্রস্তাবিত করিডোরের উদ্দেশ্য বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ নয়; বরং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের মূল ভূখণ্ডে বিদ্যুৎ সঞ্চালন। অরুণাচল প্রদেশে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পরিকল্পিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সঙ্গে এই করিডোরের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ভারত, নেপাল বা ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে তার আপত্তি নেই। ডিজেল, অপরিশোধিত তেল, এলএনজি ও এলপিজি আমদানিতেও সমস্যা নেই। তবে বাংলাদেশের নদীর ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে ফেলে কোনো বিদ্যুৎ করিডোর বাস্তবায়ন করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব হিসেবে বরগুনা ও কক্সবাজারের জেলে পল্লিতে মাছ ধরার ট্রলার এবং বরফকলের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কথাও উল্লেখ করেন হাসনাত। তার মতে, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব।
স্ট্যাটাসের শেষ দিকে তিনি সরকারের প্রতি এনসিপির দেওয়া সমাধান প্রস্তাবনা অনুসরণ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ভারতের বিদ্যুৎ করিডোর বাস্তবায়ন না করার এবং যমুনা নদীর পানির ভবিষ্যৎ সুরক্ষার দাবি জানান।









