জামায়াতে সাঈদীর অবস্থান কী?

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ২১:৩৭, মে ১৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২১, মে ১৪, ২০১৭

 

মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীমানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে জামায়াতে ইসলামীতে।  সাঈদীর আদৌ কোনও পদ আছে কি নেই, থাকলে পদ কী, এই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে দলের ভেতরই। তবে বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল পর্যায়ে কথা বলে দুই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। কেউ বলছেন, গত নভেম্বরে গঠিত কমিটিতেই ছিলেন না মাওলানা  আবদুস সুবহান ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের পাশাপাশি দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী। আবার নেতাকর্মীরা জোর দিয়ে বলছেন, মাওলানা সাঈদী এখনও জামায়াতের নায়েবে আমির পদেই আছেন।

গত ২৪ ঘণ্টায় বাংলা ট্রিবিউনের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে জামায়াতের সারাদেশের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ১২ জনের সঙ্গে কথা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় অবস্থানরত কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার দুই জন সদস্য জানান, তারা এ ব্যাপারে জানেন না। মাওলানা সাঈদী দলে কোনও পদে অবস্থান আছেন কি নেই, এ নিয়ে কোনও মন্তব্য তারা করতে চাননি। তবে ঢাকা মহানগর জামায়াতের মজলিসে শুরার এক সদস্য জানান, এখনও সাঈদী জামায়াতের নায়েবে আমির।

এদিকে সিলেট জেলা দক্ষিণ জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান শুক্রবার মধ্যরাতে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উনি তো জেলে আছেন, কিভাবে মনোনিত হবেন। এটিএম আজহার সাহেবও নেই।’ প্রতিবেদকের আরেক প্রশ্নে মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এখন তো তুলনামূলক তরুণরা দায়িত্বে আছেন।’

এ নিয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ডা. রিদওয়ানুল্লাহ শাহেদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ সব বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। আমার জানা নেই।’

জানতে চাইলে মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি তো জামায়াতের কেউ না, এ ব্যাপারে জানিও না। তবে যারা ট্রাইব্যুনালের মামলায় দণ্ডিত, তারা কমিটিতে নেই বলেই জানি।’ 

জানতে চাইলে মাওলানা সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি, তিনি দলের নায়েবে আমির হিসেবেই আছেন। সর্বশেষ কমিটিতে সে হিসেবেই নাম ছিল।  পরবর্তী সময়ে কোনও পরিবর্তন হয়েছে কিনা, জানি না। আর আমাকেও জানানো হয়নি।’

সাঈদী ইস্যুতে জামায়াতের বিক্ষোভ

কারা ছিলেন নতুন কমিটিতে?

গত বছরের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ২০১৭-১৯ মেয়াদের জন্য ঘোষিত জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটিতে (কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ) নায়েবে আমির হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। তার সঙ্গে আগের কমিটির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা আবদুস সোবহান ছিলেন নতুন কমিটিতেও। নতুন হিসেবে চট্টগ্রাম জামায়াতের সাবেক আমির মাওলানা শামসুল ইসলাম, খুলনা মাওলানা মিয়া গোলাম পরওয়ার ও  রাজশাহীর অধ্যাপক আতাউর রহমান মনোনিত হয়েছিলেন কমিটিতে। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে দলটির আগামী দিনের কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ নিয়ে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণেই আতাউর রহমানকে নায়েবে আমিরের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে তার সদস্যপদ বহাল আছে। কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য হিসেবেও তিনি বহাল আছেন। এ ঘটনাও জামায়াত প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি।

গত নভেম্বরে হওয়া নতুন কমিটিতে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পদে নতুন পাঁচ জন নিযুক্ত হন। তারা হচ্ছেন, দলীয় প্রধান নির্বাচন পরিচালক এটিএম মাসুম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, ঢাকা মহানগর জামায়াতের সাবেক আমির রফিকুল ইসলাম খান, সাবেক সেক্রেটারি মাওলানা হামিদুর রহমান আযাদ ও অধ্যক্ষ মাওলানা মু. আবু তাহের। সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পদে পুরনোদের মধ্যে আছেন এটিএম আজহারুল ইসলাম ও ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করা এটিএম আজহারুল ইসলাম মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে আছেন। তাকেও নতুন কমিটিতে রাখা হয়নি বলে প্রচার হচ্ছে।

উল্লেখ্য যে, দলের নতুন কমিটি নিয়ে এখন পর্যন্ত জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি।

কী আছে গঠনতন্ত্রে?

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ২৬ নং ধারা ‘নায়েবে আমির’ সংক্রান্ত। এতে বলা হয়েছে, ১। আমিরে জামায়াত মজলিসে শুরার পরামর্শে সদস্যদের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নায়েবে আমির নির্বাচন করবেন। ২। নায়েবে আমীর নির্বাচিত হওয়ার পর আমিরে জামায়াতের কাছে শপথ নেবেন। ৩। নায়েবে আমিররা আমিরে জামায়াতকে সব কাজে সহযোগিতা করবেন।  আমিরে জামায়াত যাকে যে দায়িত্ব দেবেন, তিনি তাই করবেন।  ৪। আমিরে জামায়াত যদি কোনও  অধিবেশনে উপস্থিত না থাকলে নায়েবে আমিরদের একজন সভাপতিত্ব করবেন।

এ প্রসঙ্গে জামায়াতের একনেতা জানান, ‘আমির চাইলে যতজন ইচ্ছে নায়েবে আমির নিয়োগ দিতে পারেন। বর্তমানে চারজন নায়েবে আমির আছেন।’

 

জামায়াতের বিবৃতি

নেতাকর্মী ও সমর্থকরা যা বললেন

জামায়াতের একাধিক সূত্র জানায়, নতুন কমিটিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক ও সাজাপ্রাপ্ত নেতাদের মধ্যে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মাওলানা আবদুস সুবহান ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পদে এটিএম আজহারুল ইসলামের নাম ছিলা। এ নিয়ে ওই সময় প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলা ট্রিবিউন। এরই ধারাবাহিকতায় নেতাকর্মীরাও জানতেন, মাওলানা সাঈদী দলে নায়েবে আমির হিসেবেই আছেন। তবে অনেকটাই হঠাৎ জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের মেইল থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে সাঈদীর পরিচয় দেওয়া হয়  ‘অন্যতম শীর্ষ নেতা’ হিসেবে।

বিষয়টি নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা হয় জামায়াতের ভেতরে-বাইরে ও সমর্থক পর্যায়ে অনেকের সঙ্গে। ঢাকা মহানগর জামায়াত দক্ষিণের এক শীর্ষ নেতার অনুসারী একজন কর্মী জানান, সাঈদী নায়েবে আমির হিসেবেই আছেন। সাবেক এক কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতার সন্তান জানান, ‘আমাকে একজন জানিয়েছেন, নতুন কমিটিতেই মাওলানা সাঈদী, এটিএম আজহার ও মাওলানা সুবহানকে রাখা হয়নি। তবে ব্যক্তি আলাপে সাঈদীর এক সন্তান তাকে জানান, দলে তার বাবার পদ আছে সেটিই জানতেন। এখন নেই কি না, সেটি তিনি জানেন না।’

তবে সমর্থক পর্যায়ের একজন জানান, ‘একজন অসমর্থিত ব্যক্তির তথ্য, নতুন কমিটিতে নাম আসার পর সাঈদীই জেল থেকে অনুরোধ করেছেন, কমিটিতে না রাখতে।’

শনিবার বিকালে জামায়াতের ঢাকা মহানগরের বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, মাওলানা সাঈদীসহ সাজাপ্রাপ্তদের কমিটিতে রাখা হয়নি, এ পুরনো খবর। যদিও এই সূত্রটিই গত ২৪ ঘণ্টায় কয়েকবারের যোগাযোগে সাঈদীকে নায়েবে  আমির বলে জানায়। তবে সূত্রটি শনিবার ফের জানায়, দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে যেখানে কমিটির তালিকা পাঠানো হয়, সেখানেও সাঈদীসহ  মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আসামিদের রাখা হয়নি।

শনিবার সাঈদীর মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ

এদিকে ১৩ মে শনিবার সারাদেশে মাওলানা সাঈদীর মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছে জামায়াত। রাজধানীতে কয়েকটি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এই বিক্ষোভগুলোর ব্যানারে সাঈদীকে অন্যতম শীর্ষনেতা বলা হলেও কোনও পদবি উল্লেখ করা হয়নি। মিরপুরে আয়োজিত বিক্ষোভে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরীর উত্তরের সেক্রেটারি ড. মুহা. রেজাউল করিম বলেন, ‘সরকার দেশকে পরাশ্রয়ী করদরাজ্য বানানোর জন্যই সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ করে রেখেছে। কিন্তু দেশের তৌহিদী জনতা সাঈদীর কারা নির্যাতন আর মেনে নেবে না।’

/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ