কেন ডেকে এনে সিটি মেয়র পদে প্রার্থী করে জাপা?

Send
আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ২২:০৪, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৯, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৯

জাতীয় পার্টিঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে জাতীয় পার্টি (জাপা)-এর কোনও নেতাই প্রার্থী হতে চান না।  নির্বাচনের ফল পক্ষে আসবে না—এমন আশঙ্কা থেকে কেউ প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ দেখান না বলেও জানিয়েছেন দলটির একাধিক শীর্ষ নেতা। তারা বলছেন, এ কারণেই শেষমুহূর্তে দলের বাইরে থেকে মেয়র প্রার্থী হতে আগ্রহীদের ডেকে আনে জাপা। এরপর দলে যোগদান দেখিয়ে আগ্রহী নেতাকে দলীয় মনোনয়নও দেওয়া হয়।

২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকাকে ভাগ করে উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ—দুটি সিটি করপোরেশন করা হয়। বিভক্ত ঢাকার প্রথম নির্বাচনে উত্তর সিটিতে জাপার প্রার্থী ছিলেন বাহাউদ্দিন আহমেদ বাবলু। নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন আনিসুল হক। আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তরে উপনির্বাচনে বাহাউদ্দিন আহমেদ বাবলু আর প্রার্থী হতে রাজি হননি। তখন জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) ছেড়ে জাপায় যোগ দেওয়া সংগীতশিল্পী শাফিন আহমেদকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেয় দলটি। নির্বাচনে পরাজয়ের পর জাপার কোনও অনুষ্ঠানে শাফিন আহমেদকে দেখা যায়নি।

আগামী ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি নির্বাচন। এই নির্বাচনেও ঢাকা উত্তর সিটিতে মেয়র পদে জাপা থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন শুধু মঙ্গলবার (২৪ ডিসেম্বর) জাপায় যোগ দেওয়া অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কামরুল ইসলাম। দলটির পক্ষে থেকে তাকেই মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।  

জাপা নেতারা বলছেন, কয়েকটি কারণে ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে কেউই জাপা থেকে মেয়র প্রার্থী হতে চান না। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে—সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে নির্বাচন করতে প্রচুর টাকা খরচ হয়। জাপার প্রার্থীকে দল থেকে কোনও  খরচ দেওয়া হয় না। প্রার্থীকে নিজের খরচেই নির্বাচন করতে হয়। এর বাইরে অন্য কারণগুলো হলো—ঢাকা সিটিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাংগঠনিক শক্তির তুলনায় খুবই দুর্বল জাপার সাংগঠনিক অবস্থা। সেই অবস্থা বিবেচনায় নির্বাচনি ফলও জাপার প্রার্থীর পক্ষে আসার সম্ভাবনা খুই ক্ষীণ। এছাড়া নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অংশ নিলে পরিস্থিতি ভিন্নরূপ নেয়। সবদিক বিবেচনায় জাপার কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান না। এই জন্য অন্য কোনও দলের নেতা বা কোনও ব্যক্তি জাপার মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করতে চাইলে তাকে ডেকে এনে যোগদান করিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয়। 

জানতে চাইলে জাপা মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘দলের কেউ ডিএনসিসিতে মেয়র পদে নির্বাচন করতে আগ্রহ প্রকাশ করেননি। মঙ্গলবার (২৪ ডিসেম্বর) জাপায় যোগ দেওয়া  ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) কামরুল ইসলাম উত্তর সিটিতে মেয়র পদে নির্বাচন করতে আগ্রহ প্রকাশ করে দলের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। ফলে তাকে আমাদের চেয়ারম্যান মনোনয়ন দিয়েছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ফয়সাল চিশতি বলেন, ‘ঢাকা উত্তর সিটিতে মেয়র পদে আমারই নির্বাচন করার কথা ছিল। কিন্তু মেয়র পদে নির্বাচন করতে অনেক টাকা লাগে। সেই পরিমাণ টাকা আমার নেই। ফলে যারা নির্বাচন করতে আগ্রহী, তাদেরই আমাদের দলে যোগদান করিয়ে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়।’

চিশতি আরও বলেন, ‘কামরুল ইসলাম সেনাবাহিনীতে একজন দক্ষ ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি পরিচ্ছন্নও। এবার তাকে মনোনয়ন দিচ্ছি। তবে, কাউন্সিলর পদে আমাদের অনেক প্রার্থী রয়েছেন। সেখান থেকে যোগ্যদের মনোনয়ন দেওয়া হবে।’

এদিকে, গতবার নির্বাচন করলে এবার কেন প্রার্থী হতে হচ্ছে না জানতে চাইলে শাফিন আহমেদ কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জাপার নেতারা বলেন,  জাপা দৃশ্যমান বিরোধী দল হলেও আমরা সরকারেরই একটি অংশ। একাদশ সংসদ নির্বাচনেও আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করেছি। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর রংপুর-৩ উপনির্বাচনে তারা আমাদের ছেড়ে দিয়েছে। সেই কারণে ১৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া চট্টগ্রাম-৮ আসন উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সমর্থন জানিয়ে জাপা প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এখন ঢাকা সিটিকে সরকার কোনোভাবেই তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেবে না। অন্যদিকে এই নির্বাচনে বিএনপিও অংশ নেবে। ফলে, ভোটের মাঠের পরিস্থিতি বুঝে যেকোনও সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে জাপার প্রার্থীকে সরে যেতেও হতে পারে। এ কারণে অনেকে নিজের সম্মানের দিকে তাকিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী হননি।

এই প্রসঙ্গে মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘জাপায় প্রার্থী সংকট রয়েছে, বিষয়টি ঠিক নয়। আবার আমরা যেহেতু সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করেছি, ফলে অনেক সময় তাদের জন্যও আমাদের ছাড় দিতে হয়।’ 

জাপার এক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘জাতীয় পার্টিতে কোনও সমস্যা সৃষ্টি হলেই সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া সমাধান করতে পারি না আমরা। সেখানে নির্বাচন তো বহু দূরের বিষয়। ফলে কেউ নিজ থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহ প্রকাশ করলেই তাকে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এজন্য গত দুইবার উত্তর সিটি নির্বাচনে জাপা থেকে যারা নির্বাচন করতে চেয়েছেন, তাকেই দল মনোনয়ন দিয়েছে। আর দক্ষিণে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন প্রতিবারই নির্বাচন করতে চান। দল তাকেই মনোনয়ন দেয়।’ মিলন নিজের খরচেই নির্বাচন করেন বলেও তিনি জানান। 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সাধারণ সম্পাদক বদিউল আমল মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  ‘একটা সময় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিওতে একটা আদেশ ছিল যে, কোনও দল থেকে নির্বাচন করতে হলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেই দলের সদস্য হতে হবে। আমার যতদূর মনে পড়ে, সেটি এখন আর নেই।’ তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টির তো জনসমর্থনের কোনও ভিত্তি নেই।  ফলে বিকল্প না পেয়ে যিনিই আসছেন, তার কাছেই টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন বিক্রি করছে দলটি। আর এসব লোক আসেনই এই আসায়, যে দলে যোগ দিলেই মনোনয়নন পাবে। এটি তো কোনও রাজনৈতিক দলের আচরণ হতে পারে না।’ রাজনৈতিক দল হতে হলে তার একটা নীতি-আর্দশ থাকতে হবে বলেও তিনি মনে করেন। 

 

/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ