একান্ত সাক্ষাৎকারে হাসানুল হক ইনুবঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে জাসদ ছাত্রলীগকে দিয়ে প্রথম মিছিল করিয়েছি

Send
আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ১২:০০, মার্চ ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৭, মার্চ ৩০, ২০২০

হাসানুল হক ইনু বাঙালির পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিরল ব্যক্তিত্ব বলে মনে করেন জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে জাসদই সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাসদ ছাত্রলীগকে দিয়ে মিছিল করিয়েছে। অথচ বিএনপি-জামায়াত আমার বিরুদ্ধে অপ্রচার করে যে তার মৃত্যুর পরে ট্যাংকের ওপর ‍উঠে আমি উল্লাস করেছি। এটি ডাহা অপপ্রচার।’  

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু যখন নেতা, তখন আমি মাঠের রাজনৈতিক কর্মী। তার সঙ্গে রাজনীতি করার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তবে বঙ্গবন্ধুর বড় কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার ক্লাসমেট ও বন্ধু ছিল। একসঙ্গে ছাত্রলীগ করার কারণে তার আমন্ত্রণে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে গেলে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সালাম ও কুশলবিনিময় হতো।’

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রথম কীভাবে দেখা হয়েছিল জানতে চাইলে হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘৬০ থেকে ৭০ দশক পর্যন্ত আমি রাজনৈতিক মাঠের কর্মী। বঙ্গবন্ধু তখন যে মাপের নেতা ছিলেন তার সঙ্গে এক টেবিলে বসে রাজনীতি করার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তবে তাকে প্রথম দেখেছিলাম আগরতলা মামলা থেকে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসার পরে প্রকাশ্য সমাবেশে (দিনক্ষণ মনে নেই)। তার সঙ্গে সালামবিনিময় হতো ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে। শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে প্রায়ই আমি ৩২ নম্বরের বাড়িতে যেতাম। শেখ হাসিনা ও আমি একসঙ্গে ছাত্রলীগ করতাম। সেই কাজের সূত্র ধরে মাঝে-মধ্যে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে যেতাম, চা-নাশতা খেতাম। তখন বঙ্গবন্ধু সামনে পড়ে গেলে সালাম দিতাম।’

হাসানুল হক ইনুসাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘তবে বঙ্গবন্ধু আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তার সঙ্গে একটা ছোট সমাবেশে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। আমি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শাখার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। ছাত্রলীগের সম্মেলনে তিনি এসেছিলেন। এটা অনেকে জানেন না যে, বঙ্গবন্ধু তার জীবদ্দশায় কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দেননি। ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের আগে বুয়েটের ছাত্রলীগের সম্মেলনে এসেছিলেন এবং ভাষণ দিয়েছিলেন ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত। এই ঘটনাটা তাঁর জীবনীতে লেখা উচিত। একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। আমি যেহেতু সাধারণ সম্পাদক ছিলাম, সেই সুবাদে মঞ্চে তার পাশাপাশি বসে আলাপচারিতা হয়েছে। এটা আমার জীবনের স্মরণীয় স্মৃতি।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙালির পাঁচ হাজার বছরের একজন বিরল ব্যক্তিত্ব হিসেবে অভিহিত করে হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘কয়েক হাজার বছরের বাঙালির সভ্যতার ইতিহাসে তিনি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। কয়েক হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসের অনেক রাজা, রাজনীতিক এসেছেন। কিন্তু বহু কারণে বঙ্গবন্ধু তাদের থেকে আলাদা।’

হাসানুল হক ইনুর মতে, বঙ্গবন্ধুর পাঁচটি বিশেষত্ব ছিল। তার ভাষায়, ‘প্রথমটি সবাই বলে, আমি বলবো—বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের বাঁকে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দরজাটা খুলে দেন। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।

‘দ্বিতীয়, আজ আমরা যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চর্চা করছি, এটা হচ্ছে আধুনিক জাতীয়তাবাদের চর্চা। এই আধুনিক জাতীয়তাবাদের জনকও বঙ্গবন্ধু।

‘তৃতীয়, বাঙালি জাতি বিভিন্ন সময় লড়াই-সংগ্রাম ও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তার প্রেরণা ও উৎসাহ দিয়ে সমগ্র বাঙালি জাতিকে বীরের জাতিতে রূপান্তরিত করেছেন। তিনি নিরস্ত্র বাঙালিকে জাতিগতভাবে সশস্ত্র যুদ্ধে উজ্জীবিত করতে সক্ষম হন। সমগ্র জাতিকে বীর জাতিতে রূপান্তরিত করেন।

‘চতুর্থ, বাংলাদেশের জনগণ মাঝে-মাঝে বিভ্রান্ত হয়েছে। কখনও তারা ধর্মকে সামনে এনে বাঙালি পরিচয়টাকে পেছনে ঠেলে দিয়েছে। সেই হিন্দু, মুসলাম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানকে বাঙালিত্বের পরিচয়ে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। সাম্প্রদায়িকতার আলখাল্লাটা ঠেলে দিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাঙালি সম্প্রদায়কে উজ্জীবিত করে বাঙালিয়ানার চর্চায় শামিল করে দেন তিনি। এটা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর বিশেষ রাজনৈতিক অর্জন।

‘আর পঞ্চম, পৃথিবীর রাজনৈতিক রাষ্ট্রনায়কদের ইতিহাসে জর্জ ওয়াশিংটন থেকে ফিদেল কাস্ত্রো পর্যন্ত অনেকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল, দেশকে স্বাধীন করার জন্য ও বিপ্লবের জন্য অনেক রকম কৌশল গ্রহণ করেছেন। কেউ হয়তো যুদ্ধ করেছেন, কেউ গণঅভ্যুত্থান করেছেন, আবার কেউ কেবল নির্বাচনি পথ অনুসরণ করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিরল রাজনৈতিক প্রতিভার অধিকারী; সূক্ষ্ম রাজনৈতিক কৌশলবিদ ছিলেন তিনি। তিনি শাসনতান্ত্রিক আন্দোলন, গণআন্দোলন, নির্বাচন ও সশস্ত্র সংগ্রাম—সবগুলোর একটা অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেন, যা পৃথিবীর অন্য রাষ্ট্রনায়কেরা এতগুলো কৌশলের সমন্বয় সাধন করতে পারেননি। এজন্য আমি বঙ্গবন্ধুকে বলি, অপূর্ব সূক্ষ্ম রাজনৈতিক কৌশলবিদ।’

হাসানুল হক ইনু হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘ভারতীয় সৈন্যবাহিনীকে দ্রুততার সঙ্গে ফেরত পাঠিয়ে বঙ্গবন্ধু প্রমাণ করেছেন, সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ নিজেই যথেষ্ট। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশের যাত্রা ১৬ ডিসেম্বরে শুরু হলো, তখন বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায়, আইনগত ব্যবস্থাপনায় ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় একটা পাটাতন তৈরি করে দেন। তিনি খুব দ্রুততার সঙ্গে চার নীতিসংবলিত সংবিধান প্রণয়ন করেন। ভারতীয় সৈন্যবাহিনীকে দ্রুততার সঙ্গে ফেরত পাঠিয়ে এটাই প্রমাণ করেন, বাংলাদেশ তার সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিজেরাই যথেষ্ট, কারও মুখাপেক্ষী নয়। জাতির পিতা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে আমরা কারও ওপর নির্ভরশীল নই, নিজেদের প্রতিরক্ষায় নিজেরাই সক্ষম।’

১৯৭১ সালের ৮ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধু স্বশাসিত বাংলাদেশকে শাসন ও পরিচালনা করেছেন মন্তব্য করে হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘তার ৭ মার্চের ভাষণ একটা ঐতিহাসিক ভাষণ। বড় কথা হচ্ছে, তিনি কৌশলের অবলম্বন করে ৮ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত নিরস্ত্রভাবে বাংলাদেশের কৃতিত্ব নিজের হাতে নিয়ে স্বশাসিত বাংলাদেশের যাত্রা শুরু করে দেন। আমি মনে করি, স্বশাসিত বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৯৭১ সালের ৮ মার্চ থেকে। বঙ্গবন্ধু তার রাষ্ট্রীয় ঘোষণার মধ্যে দিয়ে স্বশাসিত বাংলাদেশকে শাসন ও পরিচালনা করেছেন। ২৬ মার্চ স্বশাসিত বাংলাদেশকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপান্তর করেন। সেই জন্য পাকিস্তানের ভেতরে কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বা যুদ্ধ আমরা করিনি। ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানি রাষ্ট্রের যুদ্ধ হয়েছে, যাতে আমরা পাকিস্তানকে পরাজিত করেছি ১৬ ডিসেম্বর।’

’৭২ সালে আওয়ামী লীগের কোনও কৃষক সংগঠন ছিল না জানিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক জাসদের সভাপতি বলেন, ‘তখন বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষক লীগ নামে একটি সংগঠন করেন। ’৭২ সালের মে মাসের ২৯ তারিখে কৃষক লীগের ৮১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন হয়। আমাকে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক করেন তিনি। খন্দকার আব্দুল মালেক শহীদুল্লাকে সভাপতি করা হয়েছিল। সদস্যদের মধ্যে অনেকে গণপরিষদের সদস্য ও নামকরা আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন। কিন্তু তিনি কেন আমাকে এত বড় একটা দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সেটা এখনও আমি জানি না। ’৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাসদ করার আগ পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি।’

কেন বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে জাসদ করেছিলেন জানতে চাইলে হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘এখন এই বিষয় নিয়ে কোনও আলোচনা করতে চাই না। কারণ, আপনি বঙ্গবন্ধুকে যে কারণে স্মরণ করে এই সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন, এতে তার শাসনকালের সমালোচনা না করাই ভালো। এই বিষয়ে কথা বললে অনেক কিছু আসবে। ফলে কথা না বলাই ভালো। আজ বরং তার ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে কথা বলি।’

হাসানুল হক ইনুর সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদক আদিত্য রিমনএকটা গুঞ্জন রয়েছে বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরে আপনি ট্যাংকের ওপরে উঠে উল্লাস করেছেন... এ প্রসঙ্গে হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘ফেসবুকে একটা গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করে জামায়াত শিবিরের বাঁশের কেল্লা। এখানে প্রথম কথা হচ্ছে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরে প্রথম দিন ঢাকা শহরে কেউ উল্লাস করেনি। আমি কেন, ট্যাংকের ওপর কোনও মানুষই ‍ওঠেনি। সেই দিন ট্যাংক ও সামরিক বাহিনী বেশি ঘোরাঘুরি করেনি। ওইদিন তারা ছিল বঙ্গভবন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শাহবাগ বেতার কেন্দ্র, রামপুরা টেলিভিশন আর ক্যান্টনমেন্টে। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরে ১৫ থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত কোনও উল্লাস বা আনন্দ মিছিল হয়নি। সুতরাং ট্যাংকের ওপর নাচানাচির ঘটনা ঘটেইনি। এটা ডাহা অপপ্রচার। জামায়াত ও বিএনপি যারা আমার রাজনৈতিক পদক্ষেপের কারণে কোণঠাসা হয়েছে, তারা চরিত্র হনন করার জন্য এই কাল্পনিক ছবি প্রচার করে। এই ছবির সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। আর আমি তখন আত্মগোপনে ছিলাম। ফলে কোনও অবস্থাতেই আমি নাচানাচি করিনি। আমার দল জাসদ ১৭ আগস্ট প্রথম জাসদ ছাত্রলীগকে দিয়ে মোশতাকের বিরুদ্ধে মিছিল করিয়েছে। মোশতাকের ৮৩ দিনের শাসনামলে তার বিরোধিতার জন্য জাসদের শতাধিক নেতাকর্মীকে আর্মি দিয়ে হত্যা করা হয়।

/এইচআই/এমএমজে/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ