করোনায় ভার্চুয়াল রাজনীতি

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ১৯:৪৫, মে ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৮, মে ২৪, ২০২০

অনলাইনেই আলোচনা করেন রাজনীতিকরা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারি করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্বের সীমানা বজায় রাখতে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয় ও সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে ডান-বাম ও মধ্যমপন্থী কয়েকটি রাজনৈতিক দল ত্রাণ কার্যক্রম ও সহযোগিতামূলক কর্মকাণ্ড বজায় রাখলেও তাতে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতি কম। শীর্ষ পর্যায়ের দুয়েকজন নেতা শারীরিকভাবে উপস্থিত থেকে ত্রাণ বিতরণ ও চিকিৎসকদের মধ্যে সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ করলেও বেশিরভাগ দলের অধিকাংশ নেতাই কোয়ারেন্টিন মেনে চলছেন। তবে ইন্টারনেটের মাধ্যমে লাইভে এসে বক্তব্য প্রচারে ‘ভার্চুয়াল অ্যাক্টিভিটি’র (অনলাইন প্রচার) ডিজিটাল পন্থা গ্রহণ করেছেন নেতারা। চলতি বছরের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে বেড়েছে রাজনৈতিক নেতাদের বিবৃতিও।

রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, করোনাভাইরাস শেষ হওয়ার আপাতত কোনও সুসংবাদ এখনও মেলেনি। সে কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজপথের রাজনীতি ও রাজনৈতিক কর্মসূচিভিত্তিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। আর এই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য বিশ্লেষণেও। গত দুমাসে ক্ষমতাসীন জোটের শরিক দল ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারাও প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে ‘লকডাউন’ সীমিত করার সমালোচনা করেছেন। ইতোমধ্যে কয়েকটি দল কারফিউ ঘোষণার দাবি করেছে। যদিও ক্ষমতাসীন দলের কেউ কেউ লকডাউন শিথিল করার পক্ষে গণমাধ্যমে যুক্তি তুলে ধরেছেন, আবার কোনও কোনও গুরুত্বপূর্ণ নেতা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কাও করেছেন। সব মিলিয়ে নেতারা বলছেন, করোনাভাইরাসের কারণে রাজনীতিতেও নানা প্রভাব পড়বে এবং তা দীর্ঘমেয়াদে।

করোনাকালে আওয়ামী লীগ নেতাদের দলীয় সভা

করোনায় ভার্চুয়ালি চাঙা নেতারা

রাজনৈতিক দলগুলোর গত দুই মাসের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিরোধী দলগুলোর মতো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা ভার্চুয়ালি বক্তব্য দিয়েছেন। গত ১২ মে ‘বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতিশীল’ বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক, পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এর আগের দিন ১১ মে, করোনা সংকটকালে স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতার কথা তুলে ধরেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। সেদিন এক ভিডিওবার্তায় হানিফ বলেন, ‘জীবন ও জীবিকা, দুটোই আজ বিপন্ন।। করোনাভাইরাসের প্রকোপ যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাও ততটাই প্রকাশ পাচ্ছে। প্রকাশ পাচ্ছে আমাদের সামর্থ্যের ঘাটতি ও সমন্বয়ের অভাব। গত ২০ মে ওবায়দুল কাদের ভিডিওবার্তায় বলেন, ‘ঘর থেকে বের হয়ে কেউ আটকা পড়বেন না। সংকট মোকাবিলায় সরকারকে সহযোগিতা করুন। অন্যথায় সরকারকে আরও কঠোর অবস্থানে যেতে হবে।’ করোনাকালে দেশে ২১ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পান আঘাত হানে। আম্পান পরবর্তী অবস্থা বিশ্লেষণে সামাজিক দূরত্ব মেনে একটি বৈঠকও করেছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

ক্ষমতাসীন জোটের শরিক রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনু গত এপ্রিল ও মে মাসে দফায় দফায় সরকারি নানা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে নিয়মিত বিবৃতি দিয়েছেন। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫০ লাখ মানুষকে সরাসরি আর্থিক সহযোগিতা করার নির্দেশের পর এই নেতারা তার প্রশংসাও করেন।

 

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরবিএনপির ভার্চুয়াল রাজনৈতিক কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরপরই সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে দলটি। ২৫ মে পর্যন্ত দলীয় কার্যক্রম বন্ধ থাকার কথা ছিল। তবে শুক্রবার (২২ মে) বিকালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ জানিয়েছেন, দলের সাংগঠনিক স্থগিতাদেশ আগামী ২৫ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে এই সংক্রমণ দীর্ঘায়িত হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে ইতোমধ্যে দলীয়ভাবে ভার্চুয়াল আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বিএনপির কমিউনিকেশন্স সেল। গত ১৬ মে দলটির নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন আলোচনা করেছেন এই বৈঠকে। জহির উদ্দিন স্বপনের সঞ্চালনায় আগামী পর্বের সভায় দলটির আরেক নেতা নজরুল ইসলাম খান অংশ নেবেন। একদিকে যেমন অনলাইনে আলোচনা শুরু হয়েছে, অন্যদিকে এর মধ্যেই দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানাতে গুলশানে সংবাদ সম্মেলন ও ত্রাণ দিতে দক্ষিণখান, তেজগাঁওসহ কয়েকটি স্থানে গেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আর দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ নিয়মিত অনুসারী নেতাদের আয়োজনে ত্রাণ ও সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করে চলেছেন।

একইসঙ্গে নয়া পল্টনের কার্যালয় থেকে কয়েকদিন সংবাদ সম্মেলনও করেছেন তিনি, দলীয় ফেসবুক পেজে তা প্রচারিত হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নেতৃত্বে করোনা সংক্রান্ত জাতীয় পর্যবেক্ষণ সেল রয়েছে, এই সেলের পক্ষ থেকেও গত মঙ্গলবার (১৯ মে) করোনাভাইরাসের বিষয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল কয়েকটি বৈঠকের কথাও জানিয়েছেন চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান।

বিএনপির দুটি জোটের অন্যতম জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এই ফ্রন্টের শরিকদের মধ্যে বিএনপি ও নাগরিক ঐক্যের নেতারা শারীরিক দূরত্ব রেখে কয়েকটি অনুষ্ঠান করেছেন। একইসঙ্গে নাগরিক ঐক্যের পক্ষ থেকে ত্রাণ তৎপরতা ও বিভিন্ন গণমাধ্যকর্মীদের সুরক্ষাসামগ্রী প্রদান করার কথা বলা হয়েছে। সংগঠনের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ও দলের আরেক নেতা ডা. জাহেদ উর রহমান টেলিভিশন টকশোতে অংশ নিচ্ছেন নিয়মিত। গণফোরামের সভাপতি কামাল হোসেন বার্ধক্যজনিত কারণে বাসাতেই আছেন। দলের সেক্রেটারি ড. রেজা কিবরিয়া তার নির্বাচনি এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করলেও ভার্চুয়ালি একাধিকবার বক্তব্য দিয়েছেন। গণফোরাম পরিচয়ে আরেকটি অংশের নেতারাও কার্যালয়ে সামাজিক দূরত্ব মেনে অনুষ্ঠান করেছেন একাধিক। আ স ম আবদুর রব নিয়মিত বিবৃতিতে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছেন, লকডাউন শিথিল করার সমালোচনাও করেছেন তিনি।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে রাজপথে বাম গণতান্ত্রিক জোটের প্রতিবাদ

তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অধিকাংশ দলই নিষ্ক্রিয়। জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামী ত্রাণ দিয়েছে বলে প্রেস রিলিজে জানিয়েছে একবার। এছাড়া দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরসহ কয়েকজন নেতার নামে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।

দলের কারাবন্দি নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির জন্য অনলাইনে প্রচারণা চালাতে কমিটিও করেছিল জামায়াত। জোটের আরেক শরিক খেলাফত মজলিস নিয়মিত বিবৃতিতে সরকারের সমালোচনা করেছে। গত মাসে মসজিদ খুলে দেওয়ার দাবিও করেছিল দলটি। জোটের শরিক এলডিপির সভাপতি অলি আহমেদ একাধিকবার, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহম্মদ ইবরাহিমসহ শরিক কয়েকটি দলের নেতারাও বিবৃতি পাঠিয়েছেন। একইসঙ্গে ভিডিওর মাধ্যমে অনেক নেতা বক্তব্য দিয়েছেন, যুক্ত থেকেছেন টিভি টকশোগুলোতে। এছাড়া এলডিপি একাংশের মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম নির্বাচনি এলাকা লক্ষ্মীপুরে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।

করোনাকালে ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে সক্রিয় থেকেছে জাতীয় পার্টির কয়েকজন নেতা। দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের একাধিক স্থানে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। তবে ভিডিও বার্তায় রাজনৈতিক অবস্থান ব্যক্ত করেছেন নিয়মিত। যদিও তার দলের চিফ প্যাট্রন সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের কার্যক্রম কেবল কয়েকটি বিবৃতি। এছাড়া, দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হাসান বাবলা, লিয়াকত আলী সহ কয়েকজন নেতা ত্রাণ বিতরণ ও সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণে সক্রিয় ছিলেন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি বি চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট করোনাকালে সবচেয়ে বেশি নীরব। ভার্চুয়ালিও এই জোটের নেতাদের পাওয়া গেছে কম। ব্যতিক্রম জোটের শরিক বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া। তাদের নামে নিয়মিত বিবৃতি এসেছে গণমাধ্যমে। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের নানা ব্যর্থতার কথা জানিয়েছে দলটি। দাবি করেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের পদত্যাগের, মার্চের শুরুতে চেয়েছে আইনমন্ত্রীর পদত্যাগ। সাংগঠনিক, ত্রাণ কার্যক্রম সীমিত থাকলেও বিবৃতিতে দলটির অবস্থান ওপরের দিকে।

সিপিবি নেতা হাসান তারিক চৌধুরীর একটি ভার্চুয়াল বৈঠক

কোনও জোটে নেই এমন কয়েকটি দলের নেতারাও চাঙা আছেন ভার্চুয়ালি। প্রতিদিন নিয়ম করে কোনও না কোনও টেলিভিশন বা বিভিন্ন সংগঠনের অনলাইনশোতে বক্তব্য দিচ্ছেন তারা। এদের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ উল্লেখযোগ্য।

বাম দলগুলোর মধ্যে বাম গণতান্ত্রিক জোটের শরিক দলগুলো করোনাকালে সক্রিয় রয়েছে। ত্রাণ বিতরণ, সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ, আর্থিক সহযোগিতাও দরিদ্র মানুষদের করেছে কয়েকটি দল। রাজনৈতিকভাবে সর্বপ্রথম গত ১৩ এপ্রিল করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় ‘সমন্বিত উদ্যোগ’ এবং ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণার দাবি জানায় বাম গণতান্ত্রিক জোট। বামদের এই দাবির প্রতি অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলও সমর্থন জানায়। ওই সভায় আওয়ামী লীগ ও দলটির নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ছাড়া বিএনপি, সিপিবি, গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, বাম জোটসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা স্কাইপের মাধ্যমে এই পরামর্শ সভায় অংশগ্রহণ করেন। এরপর বামজোট একাধিকবার সামাজিক দূরত্বের নিয়ম মেনে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে।

জোটের শরিক দলগুলো বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত আছে। ১৮ মে বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবিতে প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করে বাম গণতান্ত্রিক জোট। ১৯ মে শ্রমিকদের বেতনের দাবিতে শারীরিকভাবে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র প্রতিবাদ সমাবেশ করে। বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতিও বিক্ষোভ করেছে রাজধানীতে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পর থেকে ত্রাণ বিতরণ, সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ ও ভার্চুয়ালি সংবাদ সম্মেলনসহ রাজনৈতিক নানা কর্মকাণ্ড করছে গণসংহতি আন্দোলন। বর্তমানে দলটির নেতা ফিরোজ আহমেদের সঞ্চালনায় করোনাকালে রাজনৈতিক আলাপ নামে একটি আলোচনা সভাও করছে সংহতি। এটি দলের ফেসবুক থেকে প্রচারিত হয়।


করোনাভাইরাসের মহামারিতেই গত ২ মে আত্মপ্রকাশ করেছে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। সাবেক জামায়াত-শিবিরের নেতাদের সমন্বয়ে এই দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটেছে অনলাইন সংবাদমাধ্যমে। সরাসরি সামাজিক দূরত্ব মেনে সংবাদ সম্মেলন করলেও এরপরের একাধিক প্রোগ্রাম করা হয়েছে ভার্চুয়ালি।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের আশঙ্কা রাজনীতিতে

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, করোনাভাইরাসের কারণে এর সমাপ্তিরেখা যেহেতু এখনও অনিশ্চিত, সে কারণে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকতে হবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই। বিশেষ করে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবে ভিডিও বক্তব্য প্রচারের মাধ্যমে বড় অংশ সক্রিয় থাকবে। জনসমাবেশ স্বাস্থ্যকর না হওয়ায় ভার্চুয়ালি নেতারা দলীয় অবস্থান তুলে ধরবেন।

বিএনপির একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে সরকারের ওপর নানা কারণে রাজনৈতিক দল ও মানুষের আস্থা কম। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ, এরপর করোনাবিষয়ক তথ্যপ্রদানে ত্রুটি, ত্রাণ বিতরণ ও বিতরণে নানা অভিযোগ করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।

বিএনপির একজন দায়িত্বশীল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। এই করোনাকাল তাদের ক্ষমতার সময়সীমাকে কোন দিকে নেবে, সেটা সময় বলবে। এই কোভিড-১৯ শেষ পর্যন্ত কী পরিস্থিতি ডেকে আনবে, তাও ঠিক নেই। সেক্ষেত্রে সরকার বিরোধী মতের ওপর নির্বিচার আচরণ অব্যাহত রাখলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে ধাবিত হতে পারে।’ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতোমধ্যে বলেছেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে করোনা মোকাবিলা দূরে থাক, সারা দেশ ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে লকডাউন শিথিল ও যথাযথ তদারকি না করে ভয়ংকর বিপজ্জনক অবস্থায় ফেলে দিয়েছে দেশকে। দাম্ভিকতা ছাড়া তাদের আর কিছুই নেই। প্রতিটি ক্ষেত্রে অদূরদর্শিতা, সমন্বয়হীনতা, উদাসীনতা ও একগুঁয়েমি মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, ‘করোনাভাইরাস কবে যাবে, তা তো বলা যাচ্ছে না। এখন সভা-সমাবেশ করা যাচ্ছে না, বন্ধ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতাদের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরিকল্পনা করতে হবে।’

আসম আবদুর রবের ঘনিষ্ঠ একজন বলেন, ‘দুঃসময়ের রাজনীতি হচ্ছে এক থাকা, ঐক্যবদ্ধ থাকা। আমাদের দলের নেতা আসম রব করোনার শুরু থেকে জাতীয় ঐক্যের মধ্য দিয়ে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। এই সময় কীভাবে মোকাবিলা করবো, তার আগে সরকার লকডাউন শিথিল করায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হচ্ছে। এ কারণে সবকিছুই অনিশ্চিত।’

 

গণসংহতি আন্দোলনের ভার্চুয়াল আলোচনাক্ষমতাসীন দলের মিত্র ইসলামিক গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এম এ আউয়াল বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে পরবর্তী সব কার্যক্রম পাল্টাবে, অর্থনীতি, রাজনীতি, সামাজিক কাঠামোসহ অনেক কিছুতেই পরিবর্তন আসবে। আমাদের সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি যেমন থাকতে হবে, পাশাপাশি অগ্রিম পরিকল্পনা করতে হবে নতুন দিনের রাজনীতি ও রাষ্ট্র নিয়ে।’

গত ১৩ মে ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আগামীতে যে ভয়াবহ মন্দার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, সরকারকে এখন থেকেই তার প্রয়োজনীয় কৌশল নির্ধারণ করে সামনে আগাতে হবে।’

কিন্তু সমস্যার দায় সরকারেরই নিতে হবে বলে গত ক’দিন আগেই ফখরুল বলেন, ‘বাংলাদেশেও আমরা এবং অন্য সব রাজনৈতিক দল জাতীয় এই সন্ধিক্ষণে ১৯৭১ সালের মতো সম্মিলিতভাবে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এ মহাদুর্যোগ মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এহেন বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতেও ঐক্যের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে সরকার একদলীয় ভিত্তিতে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে গিয়ে সবকিছু লেজেগোবরে একাকার করে ফেলেছে। এই পরিস্থিতির দায় এককভাবে বর্তমান সরকারকেই বহন করতে হবে।’

বিএনপির প্রভাবশালী একটি সূত্র বলছে, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের যেসব উদ্যোগ ব্যর্থ হচ্ছে, ঈদের পর এই ব্যর্থতাগুলো ভিন্ন চেহারা নিতে পারে। এক্ষেত্রে রাজপথে কর্মসূচিতে ফেরার সম্ভাবনা আপাতত নেই। এ বিষয়টিকে সামনে রেখেই অনলাইননির্ভর রাজনৈতিক কার্যক্রম জোরালো করবে বিএনপি। একইসঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের বাইরে নতুন কোনও উদ্যোগের সম্ভাবনা প্রবল বলে জানিয়েছে সূত্রটি।

 

/এএইচ/এপিএইচ/এমএমজে/এমওএফ/

লাইভ

টপ