জুলাই জাদুঘর থেকে শাপলা চত্বরের গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণে সেখানে থাকা ভাস্কর্যের মুখাবয়ব মুছে ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
রবিবার (৯ আগস্ট) জুলাই জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ আহ্বান জানান। এ সময় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা তার সঙ্গে ছিলেন।
জাদুঘর পরিদর্শন শেষে মামুনুল হক বলেন, “ফ্যাসিবাদের দুঃসহ স্মৃতিগুলো আমাদের সামনে ভাস্বর হয়ে উঠেছে। কীভাবে মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন ও পাশবিকতা চালানো হতো, কীভাবে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ বাংলাদেশের এই জনপদ থেকে মায়ের কোল খালি করে সন্তানকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হতো এবং হত্যার পর সেই লাশের সঙ্গেও কী বর্বর আচরণ করা হতো—তার একটি ভয়াল চিত্র এখানে তুলে ধরা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “আমরা মনে করি, এই জাদুঘর বাংলাদেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য, বিশেষ করে রাষ্ট্রের শাসকদের জন্য একটি শিক্ষণীয় পাঠশালা। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলের যে ভয়াবহ পৈশাচিকতা ও নির্মমতার নিদর্শন এখানে রয়েছে, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে ব্যথাতুর করবে।”
জাদুঘরের সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, “জাদুঘরকে আরও সুরক্ষিত করতে হবে। এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ও স্মৃতিচিহ্ন অত্যন্ত মামুলিভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে এবং অনেক মূল্যবান জিনিস মানুষের হাতের নাগালে রয়েছে। একদিকে এগুলো মানুষকে দেখাতে হবে, অন্যদিকে সংরক্ষণের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।” এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
মামুনুল হক বলেন, “ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি। ইতিহাসকে তার নিজস্ব গতিতে প্রবাহিত হতে দেওয়া দরকার। ইতিহাস অনেককেই অনেকভাবে চিত্রায়িত করবে। কোনও পক্ষের মুখের দিকে তাকিয়ে নয়, বরং সত্য ও বাস্তবতার ভিত্তিতে সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “২০১৩ সালে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর সারাদেশে যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস এখানে সংরক্ষিত হয়নি। ২০১৫-১৬ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাড়ির সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করার পর সারাদেশে যে আন্দোলন হয়েছিল, সেটিও যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।”
শেখ হাসিনার শাসনামলের বড় আন্দোলনগুলোর একটি ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সেই আন্দোলনেরও উল্লেখযোগ্য কোনও স্মৃতি এখানে সংরক্ষিত হয়নি। অথচ সেই সময়ের শহীদ ও আহত ব্যক্তিরা এখনো আমাদের মাঝে জীবন্ত ইতিহাস হয়ে রয়েছেন।”
১৯৭১ সালের ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার স্মৃতিগুলো যেভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করা হয়েছে, একইভাবে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড ও মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিগুলোও সংরক্ষণ করা দরকার। সেখানে কোনও রাষ্ট্রের বর্বরতার প্রমাণ থাকলে সেটিও ইতিহাসের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা উচিত। কারও মুখের দিকে তাকিয়ে দেশের গৌরবোজ্জ্বল ও বেদনাবিধুর স্মৃতি সংরক্ষণ থেকে পিছিয়ে থাকা উচিত নয়।”
জাদুঘরে থাকা প্রাণীর ভাস্কর্য প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, “প্রতিটি ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দৃশ্যকে তার মূল চেতনাসহ ধারণ করা উচিত। ফ্যাসিবাদের সময়ে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গিয়েছি—সেটি হলো ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলন। আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় মুসলিম সংস্কৃতি ও মূল্যবোধবিরোধী মানুষের ভাস্কর্য থাকতে পারে না।” সে জায়গা থেকে শাপলা চত্বরের শহীদদের মুখাবয়ব বাদ দিয়ে তাদের স্মৃতি ও ঘটনাকে চিত্রিত করার পরামর্শ দেন তিনি।
জাদুঘরে বৈষম্য করা হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, “জুলাই ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের অংশীজনদের যার যতটুকু ভূমিকা, সেভাবেই তাদের স্বীকৃতি দেওয়া দরকার। এক্ষেত্রে যথেষ্ট বৈষম্য করা হয়েছে। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে এটি কোনোভাবেই সমীচীন হবে না।” এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ফেলানী হত্যার স্মৃতি প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, “ফেলানীর ঝুলন্ত লাশের ছবির চেয়ে বড় ফ্যাসিবাদী নির্যাতনের ছবি আমাদের সামনে আসেনি। এই একটি দৃশ্য পুরো বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছিল। সেটি জাদুঘরে স্থান পাবে না—এটি কোনোভাবেই চিন্তা করা যায় না।”









