‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে সিপিবি নেতাদের মধ্যে কী চলছে

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
২৭ অক্টোবর ২০২৬, ২০:০৯ আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ২০:০৯

১৯৭২ সালের পর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া না দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতাদের মধ্যে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। মূলত সোমবার (২৬ অক্টোবর) দলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন এই সংক্রান্ত বক্তব্য দেওয়ার পরই দলটির নেতারা বিভিন্ন মন্তব্য করছেন।

নিজের ফেসবুক পেইজে আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন উল্লেখ করেন, ‘কমিউনিস্ট পার্টি মুক্তিযুদ্ধের সময় জয় বাংলা স্লোগান দিয়েছে। তবে ১৯৭২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত সিপিবি তার কোনও কর্মসূচি বা সমাবেশে জয় বাংলা স্লোগান দেয়নি।’

এদিন রাতে পল্টনের মুক্তি ভবনে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘জয় বাংলা মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। আওয়ামী লীগ এই স্লোগান ব্যবহার করে অন্যায় করে থাকলেও তার অর্থ এই নয় যে, এটি পরিত্যাগ করতে হবে। জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে থাকলে তা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কার্যালয়ে হামলার অজুহাত হতে পারে না।’

ঘটনার উৎপত্তি কোথা থেকে

এর আগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) সুনামগঞ্জে নারী বাউল শিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচির আহ্বান করা হয়। রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কে ‘প্রতিবাদী শিল্পী জনতার’ ব্যানারে এই কর্মসূচিতে মূলত সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়ন ও উদীচীর নেতাকর্মীরাই অংশ নেন। কর্মসূচিতে পুলিশি বাধার অভিযোগ পাওয়া যায়। এ সময় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে পুলিশ আটক করা হয়। অবশ্য জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মোহাম্মদপুর থানা থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

অভিযোগ ওঠে, মানববন্ধন শুরুর আগে অভিনেত্রী সুমনা সোমা, নাট্যকর্মী এহসানুল আজিজ বাবু, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীল, শ্রমিক নেতা মুর্শিকূল ইসলাম শিমুলসহ বেশ কয়েকজন শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীরা আসেন। পরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে দীপক শীলকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যায়।

‎অভিনেত্রী সুমনা সোমা বলেন, ‘দেশজুড়ে বাউলদের ওপর হামলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদ জানাতে আমরা এখানে এসেছি। পুলিশের একজন সদস্য বলেছেন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া যাবে না। আমরা প্রতিবাদ করেছি। পরে পুলিশ দীপককে ধরে নিয়ে গেছে। আমরা এর প্রতিবাদ জানাই।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘জয় বাংলা স্লোগান বাঙালির অস্তিত্বের, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অর্জন। এই স্লোগান আমরা দেবোই। কেউ থামাতে পারবে না।’

পরে এর জেরে রাত ১০টার দিকে রাজধানীর পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কার্যালয় মুক্তিভবনে হামলা চালায় একদল যুবক। সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। হামলার জন্য বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের দায়ী করেছে সিপিবি। তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি জানান, সন্ধ্যায় ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে আটক ও পরে ছেড়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। হামলাকারীদের অভিযোগ, সিপিবির নেতাকর্মীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছেন। তবে সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তাদের কার্যালয় থেকে এ ধরনের কোনও স্লোগান দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে আটকের পর ছেড়ে দিলে তার সমর্থকরা উল্লাস করতে করতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। এ অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে কিছু ব্যক্তি হামলা চালিয়েছেন।

ওসি আরও জানান, সিপিবির পক্ষ থেকে হামলাকারীদের কেউ কেউ বিএনপির নেতাকর্মী বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা তা অস্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় তদন্ত চলছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে দুইপক্ষের মাঝখানে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ।

কী নিয়ে বিতর্ক

একাত্তরের পর কোনও কর্মসূচিতে কি সিপিবি আসলেই জয়বাংলা স্লোগান দিয়েছিল? এমন প্রশ্নে দলটির নেতারা দুই ধরনের ব্যাখ্যা তুলে ধরছেন। রতনের বক্তব্যের বিপরীতে দলের একটি পক্ষ মনে করে, ৭২ সালের পর ১৯৭৩ সালে দ্বিতীয় কংগ্রেসেও সিপিবির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম (বারীণ দত্ত) জয় বাংলা স্লোগান দিয়েছিলেন। এখনও মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন করলে এই স্লোগান দেওয়া হয়।

জানতে চাইলে দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় জয় বাংলা ছিল সর্বজনীন। আর কমিউনিস্ট পার্টির মূল স্লোগান দুনিয়ার মজদুর এক হও।’

প্রিন্স বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় জয় সমাজতন্ত্র ও জয় সর্বহারা স্লোগানের পাশাপাশি আমরা জয়বাংলা স্লোগানও দিয়োছ। আবার মুক্তিযুদ্ধের পরও মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিত কর্মসূচিতে আমরাও এই স্লোগান দিয়েছি। তবে ১৯৭৩ সালের ৪-৯ ডিসেম্বর সিপিবি'র দ্বিতীয় কংগ্রেসের উদ্বোধনী অধিবেশনে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ড. আব্দুস সালাম তার বক্তব্য শেষ করেন বিশ্ব কমিউনিস্ট ঐক্য জিন্দাবাদ, গণ ঐক্যজোট জিন্দাবাদ ও জয় বাংলা বলে।’

তিনি জানান, যখনই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখনই আমরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়েছি। বিশেষ করে জাহানারা ইমামের গণআদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময় আমরা এই স্লোগানের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে সক্রিয় ছিলাম।

অপরদিকে নিজের বক্তব্যের পক্ষে অনড় থেকে সিপিবি সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী (রতন) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘১৯৬৯ সাল থেকেই জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে আসছে। তখন ছাত্র ইউনিয়ন এই স্লোগান দেয়নি। আমলা পাল্টা স্লোগান দিয়েছি ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’, এবং ‘জয় সমাজতন্ত্র’।’’

তিনি বলেন, ‘৭২ সালের পর আমরা কখনও দলীয়ভাবে এ স্লোগান দেইনি। যদিও শুনেছি, ১৯৭৩ সালের দ্বিতীয় কংগ্রেসে আমাদের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম (বারীণ দত্ত)দলীয় স্লোগানের পর জয় বাংলা স্লোগানও দিয়েছিলেন। তবে আমার জানা মতে,  এর পর থেকে আমরা দলীয় কোনও কর্মসূচিতে জয় বাংলা দিইনি।’’ আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন বলেন, ‘‘এমনকি ১৯৮২ থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদবিরোধী আন্দোলনে মুজিববাদী ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নসহ বাম সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচিতেও ছাত্র ইউনিয়ন এ স্লোগান দেয়নি।’’

তবে সিপিবি সাধারণ সম্পাদক স্বীকার করেন, স্বাধীনতাবিরোধীদের বিপক্ষে বিভিন্ন সময়ে সর্বজনীন আন্দোলনে এই স্লোগান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সিপিবির একক কোনও কর্মসূচিতে কখনও জয় বাংলা স্লোগান দেওয়ার কোনও নজির নেই।

/এমকে/এপিএইচ/ইউএস/
সম্পর্কিত
সিপিবি কার্যালয়ে হামলার নিন্দা ও আটক যুব ইউনিয়নের দুই নেতার মুক্তি দাবি জাসদের
পল্টনে সিপিবি কার্যালয়ে হামলা
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের কারণ বের করতে সরকার ব্যর্থ: সিপিবি
সর্বশেষ খবর
প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের লোকজনকে আগেও দেখেননি, ভবিষ্যতেও দেখবেন না: হাসনাত আব্দুল্লাহ
প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের লোকজনকে আগেও দেখেননি, ভবিষ্যতেও দেখবেন না: হাসনাত আব্দুল্লাহ
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে কম্বোডিয়ায় পাচার, পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি
চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে কম্বোডিয়ায় পাচার, পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি
রক্ষা পেলো না মসজিদের বাক্সও, চুরি হয়ে গেলো টাকা
রক্ষা পেলো না মসজিদের বাক্সও, চুরি হয়ে গেলো টাকা
সর্বাধিক পঠিত
বন্ধ হয়ে গেলো ঢাকার দুই দশক পুরোনো শপিং মল
বন্ধ হয়ে গেলো ঢাকার দুই দশক পুরোনো শপিং মল
অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো আরেক পোশাক কারখানা
অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো আরেক পোশাক কারখানা
২১ লাখ ফলোয়ার, ভোট পেলেন মাত্র ৩৩টি
২১ লাখ ফলোয়ার, ভোট পেলেন মাত্র ৩৩টি
এ বছর শীতের তীব্রতা কেমন হবে
এ বছর শীতের তীব্রতা কেমন হবে
প্রথম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শ্যালিকাকে বিয়ে, এরপর যা ঘটলো মাসুদের সঙ্গে
প্রথম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শ্যালিকাকে বিয়ে, এরপর যা ঘটলো মাসুদের সঙ্গে