যেভাবে ব্যাটিংয়ের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছিলেন জয়াসুরিয়া-কালুভিতারানা 

স্পোর্টস ডেস্ক
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০০আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০০

ব্যাটারদের নিচে নেমে এসে খেলা বোলারদের জন্য নতুন কিছু নয়। প্রায়ই এমনটা দেখা যায়। কিন্তু ওয়ানডের এমন একটা সময়ে, যখন উইকেট হাতে রাখাই মূল লক্ষ্য থাকতো, তখন প্রথম ১৫ ওভারের মধ্যেই কেউ যদি দুঃসাহসিকভাবে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে বোলারকে আক্রমণ করেন, সেটি কেবল আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। এর পেছনে ছিল অন্যরকম একটি মানসিকতা- যাকে বলে আগ্রাসন।  যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘ইনটেন্ট’। প্রথম ১৫ ওভারের মধ্যেই দুই ওপেনারকে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে আক্রমণ ব্যাটিং করতে দেখলে কার কথা মনে পড়ে? আমাদের সবারই হয়তো আলাদা আলাদা উত্তর আছে। তবে সেই উত্তরগুলোকে পূর্ণতা দিতে হলে ফিরে তাকাতে হবে নব্বইয়ের দশকে।

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ পর্যন্ত সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ওপেনিং ব্যাটসম্যানদের প্রধান কাজ ছিল নতুন বলকে যথাসম্ভব সাবধানে সামলানো, উইকেট অক্ষত রাখা এবং শেষ ১০ ওভারে ঝড় তোলা। প্রথম ১৫ ওভারে ফিল্ডিংয়ের বিধিনিষেধ থাকলেও ৫০ রানকে তখন মোটামুটি ভালো স্কোর হিসেবেই বিবেচনা করা হতো।

কিন্তু সেই ধারণা খুব দ্রুত বদলে গেলো। শ্রীলঙ্কা নিয়ে এলো আক্রমণাত্মক ক্রিকেটের এক নতুন ধারা। ফিল্ডিং বিধিনিষেধের পুরো সুবিধা নিয়ে প্রথম ১৫ ওভারেই যত বেশি সম্ভব রান তুলে নেওয়াই হয়ে উঠলো তাদের কৌশল। আর এই বিপ্লবের কেন্দ্রে ছিলেন দুই ওপেনার সনাথ জয়াসুরিয়া ও রমেশ কালুভিতারানা।

সনাথ জয়াসুরিয়া শ্রীলঙ্কা দলে এসেছিলেন বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে। কিন্তু বলকে প্রচণ্ড জোরে মারার সামর্থ্য তাকে ব্যাটিং অর্ডারের ওপরে তুলে আনার পথ তৈরি করে। ওপেনিংয়ে তাকে নামানোর সিদ্ধান্তটি পরবর্তী সময়ে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বড় মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ এরপরই জয়াসুরিয়া হয়ে ওঠেন বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম ভয়ংকর ওপেনিং ব্যাটসম্যান।

অন্যদিকে, রমেশ কালুভিতারানাও তখন মূলত মিডল অর্ডারে ব্যাট করতেন। যেখানে সাধারণত একজন উইকেটকিপার ব্যাট করেন। কিন্তু তার ব্যাটের গতি এবং বলকে অনেক দূরে পাঠানোর ক্ষমতা অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গার নজর এড়ায়নি। তাই জয়াসুরিয়ার সঙ্গে ওপেনিংয়ে তাকে তুলে আনার সিদ্ধান্ত নেন রানাতুঙ্গা।

১৯৯৬ বিশ্বকাপের মাত্র দুই-তিন মাস আগে নেওয়া সেই সিদ্ধান্তই পরে রানাতুঙ্গার অধিনায়কত্বের অন্যতম সেরা চাল হিসেবে প্রমাণিত হয়।

১৯৯৬ সালের বেনসন অ্যান্ড হেজেস ওয়ার্ল্ড সিরিজে কালুভিতারানা নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন। তিনি করেন ৭৭, ৭৪ ও ৫০ রান। তিন ম্যাচেই তার পারফরম্যান্স শ্রীলঙ্কাকে জয় এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে ওই সিরিজে জয়াসুরিয়া কিছুটা সংগ্রাম করলেও কালুভিতারানা নিশ্চিত করেছিলেন, শ্রীলঙ্কা যেন শুরুতেই ভালো রান তুলতে পারে এবং ফিল্ডিং বিধিনিষেধের সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে পারে।

এতে রানাতুঙ্গার আস্থা আরও বাড়ে। ফলে বিশ্বকাপেও একই ওপেনিং জুটি ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। প্রথম ১৫ ওভারে বোলিং আক্রমণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল জয়াসুরিয়া ও কালুভিতারানার। ওপেনিং জুটি ব্যর্থ হলে পেছনে ছিলেন রানাতুঙ্গা ও অরবিন্দ ডি সিলভার মতো অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানরা। তারা এসে ইনিংস সামলে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করতেন।

এই কৌশলই ১৯৯৬ বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কাকে অভাবনীয় সাফল্য এনে দেয়। পাওয়ারপ্লেতে ভারতের বিপক্ষে ১১৭ এবং কেনিয়ার বিপক্ষে ১২৩ রান করে চমকে দেয় তারা।

চাপের ম্যাচেও থামেনি সেই আগ্রাসন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে প্রথম ১৫ ওভারে শ্রীলঙ্কা তোলে ১২১ রান। সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে করে ৮৬। শুরুতেই এমন দুর্দান্ত গতি পাওয়ায় পরের ব্যাটসম্যানদের জন্য বড় স্কোর গড়া কিংবা রান তাড়া করা অনেক সহজ হয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত ফাইনালে রানাতুঙ্গা ও ডি সিলভা দায়িত্ব নেন। শ্রীলঙ্কা সবাইকে চমকে দিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয়।

বিশ্বকাপে কালুভিতারানার পারফরম্যান্স অবশ্য খুব উজ্জ্বল ছিল না। ৬ ইনিংসে তিনি করেন মাত্র ৭৩ রান। তবে তার সঙ্গী জয়াসুরিয়া সেই ঘাটতি পুষিয়ে দেন দারুণভাবে। ১৩১.৫৪ স্ট্রাইক রেটে ২২১ রান করেন তিনি। ব্যাট হাতে তার সেই তাণ্ডবই তখনকার ওয়ানডে ক্রিকেটে ওপেনিং ব্যাটিংয়ের সংজ্ঞা বদলে দেয়।

জয়াসুরিয়া ও কালুভিতারানা একসঙ্গে ১০৫ ইনিংসে ৩ হাজার ২৩০ রান করেন। এর মধ্যে ছিল ছয়টি শতরানের জুটি। কালুভিতারানা ওয়ানডে ক্রিকেটে উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যানের ভূমিকাকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, একজন আক্রমণাত্মক উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান কীভাবে ফিল্ডিং বিধিনিষেধের সুবিধা নিয়ে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।

১৮৯ ওয়ানডেতে কালুভিতারানা করেছেন ৩ হাজার ৭১১ রান, ব্যাটিং গড় মাত্র ২২। তার পরিসংখ্যান হয়তো খুব বেশি উজ্জ্বল নয়। সংখ্যাগুলোও শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটে তার প্রভাবের পুরো গল্প বলতে পারে না। কারণ তার আসল অবদান ছিল ক্রিকেটের ধরন বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে।

আর জয়াসুরিয়া তো নিজেই হয়ে উঠেছিলেন শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের অন্যতম মহাতারকা। ৪৪৫ ওয়ানডেতে তিনি করেছেন ১৩ হাজার ৪৩০ রান। একই সঙ্গে বিশ্ব ক্রিকেটকে দেখিয়েছেন, একজন ‘পিঞ্চ হিটার’ আসলে কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারেন।

তাদের পর বিশ্ব ক্রিকেটে আরও অনেক ওপেনিং জুটি এসেছে, যারা রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়েছে। কেউ রান সংখ্যায় ছাড়িয়ে গেছে, কেউ গড় কিংবা স্ট্রাইক রেটে এগিয়ে গেছে। কিন্তু একটি বিষয় বদলাবে না। আর সেটা হচ্ছে জয়াসুরিয়া ও কালুভিতারানা বিশ্ব ক্রিকেটের অসংখ্য বোলিং আক্রমণের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা, তারা ওয়ানডে ক্রিকেট খেলার ধরনটাই বদলে দিয়েছিলেন।

 

/এফআইআর/
সম্পর্কিত
এশিয়ান গেমস থেকে ছিটকে গেলেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে নাটকীয় জয় থেকে বিশ্বকাপের শিক্ষা নিতে চায় অস্ট্রেলিয়া
জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ, দক্ষিণ আফ্রিকাকে পেছনে ফেললো অস্ট্রেলিয়া
সর্বশেষ খবর
‘যুদ্ধ শেষ হয়নি’, সংঘাত বাড়লে নতুন অস্ত্র-লক্ষ্যবস্তু ব্যবহারের হুমকি ইরানের
‘যুদ্ধ শেষ হয়নি’, সংঘাত বাড়লে নতুন অস্ত্র-লক্ষ্যবস্তু ব্যবহারের হুমকি ইরানের
ট্রাম্পের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হচ্ছে না: হুমায়ুন কবির
ট্রাম্পের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হচ্ছে না: হুমায়ুন কবির
স্পাইসজেটের ক্যাপ্টেন ও ফার্স্ট অফিসাররা কত বেতন পান
স্পাইসজেটের ক্যাপ্টেন ও ফার্স্ট অফিসাররা কত বেতন পান
এআই নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার শঙ্কা, মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র-চীনের উদ্যোগ
এআই নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার শঙ্কা, মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র-চীনের উদ্যোগ
সর্বাধিক পঠিত
রুপির বিপরীতে কেন এত শক্তিশালী হলো টাকা?
রুপির বিপরীতে কেন এত শক্তিশালী হলো টাকা?
রাশিয়ার নির্বাচনে আবারও জয়ী পুতিন, কত ভোট পেলেন
রাশিয়ার নির্বাচনে আবারও জয়ী পুতিন, কত ভোট পেলেন
১০ কোটি টাকার সেতুতে রডের বদলে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঢালাই, তাও রাতের বেলায়
১০ কোটি টাকার সেতুতে রডের বদলে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঢালাই, তাও রাতের বেলায়
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিশেষ মুহূর্ত: মাহদী আমিন
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিশেষ মুহূর্ত: মাহদী আমিন
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দ. কোরিয়াকে হারালো বাংলাদেশ 
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দ. কোরিয়াকে হারালো বাংলাদেশ