দরজায় কড়া নাড়ছে বিশ্বকাপ। রাশিয়ায় বসতে যাচ্ছে ফুটবল মহাযজ্ঞের ২১তম আসর। তার আগের প্রতিযোগিতাটিগুলো কেমন ছিল, কারাই বা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল- ফুটবল উৎসবের বানে ভেসে যাওয়ার আগে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক সেখানে-
এশিয়ায় বসে প্রথম বিশ্বকাপের আসর। প্রতিযোগিতাটির ১৭তম আসরের আয়োজক ছিল যৌথভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। ইউরোপ ও আমেরিকার বাইরে প্রথমবার বিশ্বকাপের আসর বসেছিল এশিয়ার দেশ দুটিতে। যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের ঘটনাও ছিল প্রথমবার। ২০০২ সালের এই আসরের ফাইনালে জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়ে পঞ্চমবার বিশ্বকাপ ঘরে তোলে ব্রাজিল।
‘গোল্ডেন গোল’-এর নিয়ম শেষবার দেখা যায় দক্ষিণা কোরিয়া-জাপানের বিশ্বকাপে। এই আসরে চমক যেমন ছিল, তেমনি অঘটনও ঘটেছে। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেলতে নেমে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় ফ্রান্স, গ্রুপ পর্বে মাত্র ১ পয়েন্ট যোগ করতে পারে ফরাসিরা। ‘হট’ ফেভারিট হয়ে বিশ্বকাপে নামা আর্জেন্টিনাও পেরোতে পারেনি গ্রুপ পর্বের বাধা।
অন্যদিকে সহ-আয়োজক দক্ষিণ কোরিয়া চমক দেখিয়ে খেলে সেমিফাইনাল। শেষ চারে খেলার পথে তারা হারায় স্পেন, ইতালি ও পর্তুগালের মতো দলকে। তুরস্ক আবার টুর্নামেন্ট শেষ করে তৃতীয় হয়ে। বিশ্বকাপ জেতা ব্রাজিল প্রতিযোগিতা শুরু করেছিল খুব খারাপ অবস্থায় থেকে। লাতিন আমেরিকার বাছাই পর্ব কোনও মতো পার করে পেয়েছিল মূল পর্বের টিকিট। অথচ টুর্নামেন্টের সব ম্যাচ জিতে পঞ্চম শিরোপা জেতে সেলেসাওরা।
অন্য চোখে: চীন, ইকুয়েডর, সেনেগাল ও স্লোভেনিয়া প্রথমবার সুযোগ পায় বিশ্বকাপে।
একনজরে:
আয়োজক: দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান
মোট দল: ৩২
ভেন্যু: ২০
চ্যাম্পিয়ন: ব্রাজিল
রানার্স-আপ: জার্মানি
মোট ম্যাচ: ৬৪
মোট গোল: ১৬১
সর্বোচ্চ গোলদাতা: রোনালদো (ব্রাজিল), ৮ গোল
সেরা খেলোয়াড়: অলিভার কান (জার্মানি)
সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়: ল্যান্ডন ডনোভান (যুক্তরাষ্ট্র)
সেরা গোলরক্ষক: অলিভার কান (জার্মানি)
ফরম্যাট:
১৯৯৮ বিশ্বকাপের ফরম্যাটেই খেলা হয় নতুন শতাব্দীর প্রথম বিশ্বকাপ। ৩২ দল আট গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলেছে একে অন্যের সঙ্গে। প্রত্যেক গ্রুপে থাকা ৪ দল নিজেদের মুখোমুখি হওয়ার পর পয়েন্ট টেবিলের সেরা দুই দল জায়গা করে নেয় দ্বিতীয় রাউন্ডে। এভাবে প্রত্যেক গ্রুপ থেকে আসা ২ দল নিয়ে নকআউট পর্ব শুরু হয় শেষ ষোলো দিয়ে। সেখানকার জয়ী দল কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল হয়ে জায়গা করে নেয় ফাইনালে।
গ্রুপ পর্ব:
নিজেদের প্রথম ম্যাচেই অঘটনের শিকার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। প্রথমবার বিশ্বকাপে নেমেই সেনেগাল চমকে দেয় ফুটবল বিশ্বকে। আফ্রিকান এই দেশটির বিপক্ষে ১-০ গোলে হেরে যায় ফ্রান্স। শুধু কী হার, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় সেনেগালের দুর্দান্ত ফুটবলের সামনে। ফ্রান্স ও উরুগুয়ের মতো দলকে বিদায় করে দিয়ে ‘এ’ গ্রুপের রানার্স-আপ হয় সেনেগাল, আর চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ ষোলোতে জায়গা পায় ডেনমার্ক।
বাছাই পর্বে দাপট দেখানো আর্জেন্টিনাকে নিয়ে প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। ফুটবল বিশ্লেষকরা ‘হট ফেভারিট’ তকমা সেঁটে দিয়েছিল তাদের গায়ে। অথচ ২০০২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বই পেরোতে পারেনি তারা। ‘এফ’ গ্রুপে সুইডেন ও ইংল্যান্ডের পেছনে থাকায় বিদায় নেয় আলবিসেলেস্তেরা।
‘বি’ গ্রুপ থেকে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে স্পেন ও প্যারাগুয়ে। ‘সি’ গ্রুপ থেকে যায় ব্রাজিল ও তুরস্ক। ‘ডি’ গ্রুপ থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র, ‘ই’ গ্রুপ থেকে জার্মানি ও আয়ারল্যান্ড, ‘জি’ গ্রুপ থেকে মেক্সিকো ও ইতালি এবং ‘এইচ’ গ্রুপ থেকে জাপান ও বেলজিয়াম নিশ্চিত করে শেষ ষোলো।
শেষ ষোলো:
প্যারাগুয়ের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয় জার্মানিকে। ৮৮ মিনিটে গিয়ে নিশ্চিত হয় তাদের ১-০ গোলের জয়। ইংল্যান্ড অবশ্য পায় দাপুটে জয়। রিও ফার্ডিনান্ড, মাইকেল ওয়েন ও এমিলি হেস্কির লক্ষ্যভেদে ডেনমার্ককে হারায় ৩-০ গোলে। গ্রুপ পর্বের চমক শেষ ষোলোতেই সচল রাখে সেনেগাল। নকআউট পর্বে তারা বিদায় করে দেয় সুইডেনকে। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচ ২-১ গোলে জেতে আফ্রিকার দেশটি।
স্পেনকে জিততে হয় টাইব্রেকারে। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ১-১ গোলে ড্র থাকায় পেনাল্টি শুট-আউটে স্পেন পায় ৩-২ গোলের জয়। কনকাকাফ অঞ্চলের দুই দল মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচটি জিতে নেয় ২-০ গোলে। রিভারদো ও রোনালদোর লক্ষ্যভেদে ব্রাজিল ২-০ গোলে হারায় বেলজিয়ামকে। জাপানের বিপক্ষে তুরস্ক পায় ১-০ গোলের জয়। সহ-আয়োজক দক্ষিণ কোরিয়া অবশ্য চমক দেখায়, ইতালিকে বিদায় করে দেয় তারা। নির্ধারিত সময় ১-১ গোলে ড্র থাকায় অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচের ১১৭ মিনিটে আন জাং-হাওনের ‘গোল্ডেন গোলে’ শ্বাসরুদ্ধকর জয় পায় দক্ষিণ কোরিয়া।
কোয়ার্টার ফাইনাল:
কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল ব্রাজিল-ইংল্যান্ড। শুরুতে পিছিয়ে পড়া ও পরে ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পরও ব্রাজিল পায় ২-১ গোলের জয়। মাইকেল ওয়েনের লক্ষ্যভেদে ২৩ মিনিটে এগিয়ে যায় ইংলিশরা। তবে প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে রিভালদোর লক্ষ্যভেদে সমতায় ফেরে সেলেসাওরা। এরপর বিরতি থেকে ঘুরে এসে ৫০তম মিনিটে লাতিন আমেরিকান দলটিকে এগিয়ে নেন রোনালদিনহো। কিন্তু গোল করার মিনিট সাতেক পর সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এই প্লে মেকার। যদিও বাকি সময়টা ২-১ গোলের লিড ধরে রাখতে পেরেছিল ব্রাজিল।
স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়া কোয়ার্টার ফাইনালেও ধরে রাখে সাফল্যের ধারা। স্পেনকে টাইব্রেকারে হারিয়ে নিশ্চিত করে সেমিফাইনাল। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ম্যাচ গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকারে দক্ষিণ কোরিয়া পায় ৫-৩ গোলের জয়। মাইকেল বালাকের লক্ষ্যভেদে জার্মানি ১-০ গোলে হারায় যুক্তরাষ্ট্রকে। আর তুরস্ক ‘গোল্ডেন গোলে’ ১-০ ব্যবধানে হারায় চমক দেখানো সেনেগালকে।
সেমিফাইনাল:
সেমিফাইনালে এসে থামে দক্ষিণ কোরিয়ার রূপকথার পথচলা। তাদের বিপক্ষে জার্মানি ১-০ গোলে জিতে ফাইনাল নিশ্চিত করলেও দিতে হয়েছে কঠিন পরীক্ষা। ৭৫ মিনিটে গিয়ে জার্মানদের জয় নিশ্চিত করেন মাইকেল বালাক। তুরস্কের বিপক্ষে ব্রাজিলও পায় ১-০ গোলের জয়। ৪৯ মিনিটে সেলেসাওদের জয়সূচক গোলটি করেন রোনালদো।
ফাইনাল:
টানা তৃতীয়বার ফাইনালে ওঠে ব্রাজিল। ১৯৯৪ সালের আসরে শিরোপা উৎসব করলেও ১৯৯৮ সালের ফ্রান্সের টুর্নামেন্টে স্বাগতিকদের বিপক্ষে হেরে হতাশায় শেষ হয় তাদের বিশ্বকাপ। জাপানের ইয়োকোহামা স্টেডিয়ামে চার বছর আগের সেই হতাশা দূর করার সুযোগ সামনে আসে ব্রাজিলের। রোনালদোর জোড়া লক্ষ্যভেদে জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়ে সুযোগটা দারুণভেোব কাজে লাগায় লাতিন আমেরিকার দেশটি। ৬৭ মিনিটে প্রথমবার জাল খুঁজে পাওয়া রোনালদো ৭৯ মিনিটে করেন নিজের ও দলের দ্বিতীয় গোল। যাতে জার্মানদের হারিয়ে ব্রাজিল ঘরে তোলে পঞ্চম বিশ্বকাপ।








