ল্যাপটপের বিক্রি বাড়লেও রয়েছে রাউটার সংকট

Send
হিটলার এ. হালিম
প্রকাশিত : ১১:০০, আগস্ট ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:২৪, আগস্ট ১২, ২০২০

ল্যাপটপ ও রাউটারকরোনাকালে লকডাউনের সময় দেশের প্রযুক্তি পণ্যের বাজারও বন্ধ ছিল। অনলাইনের মাধ্যমে কিছু পণ্য বিক্রি হলেও তা ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়। গত ১০ মে দেশের বড় দুই কম্পিউটার মার্কেট খোলার পর চাঙ্গা হয়ে ওঠে প্রযুক্তি বাজার। খুচরা বিক্রি বেড়ে যায়। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি পণ্য কিনতে ক্রেতারা ভিড় জমায় মার্কেট ও ছোট ছোট দোকানগুলোতে। বিক্রি বেড়ে যায় ল্যাপটপ, ট্যাব, ওয়াই-ফাই রাউটার, ওয়েব ক্যামেরা, মডেম ইত্যাদির।

দেশে লকডাউন শুরুর কিছুদিন পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইনে ক্লাস চালু করে। ল্যাপটপ, ট্যাব, ওয়াই-ফাই রাউটার, ওয়েব ক্যামেরা, মডেমের মতো ডিভাইসের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে খুচরা পর্যায়ে বিক্রিও বাড়ে। যে ল্যাপটপের বিক্রি গত দুই বছরে প্রতিমাসে ১০-১২ হাজার পিসে নেমে গিয়েছিলে, তা জুন-জুলাই মাসে বেড়ে হয়েছে ২০-২৫ হাজার পিস। বছর দুয়েক আগে ল্যাপটপের বাজার ছিল এমনই। এদিকে ঘরে ঘরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সংযোগ নেওয়া বেড়ে যাওয়ায় ওয়াই-ফাই সেবা চালুর জন্য রাউটারের চাহিদা বেড়ে যায়। এখন বাজারে রাউটারের সংকট রয়েছে। জানা যায়, গত তিন মাসে দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গ্রাহক বেড়েছে ২৩ লাখের বেশি। আর এ কারণেই বাজারে এখন চলছে রাউটার সংকট।

জানা গেছে, বাজারে রাউটারের চাহিদা এত বেশি যে, ক্রেতারা আর ব্র্যান্ড দেখছেন না। যে যেটা পাচ্ছেন তা লুফে নিচ্ছেন। কোনও কোনও ব্র্যান্ডের রাউটার এখন মার্কেটে পাওয়াও যাচ্ছে না। ফলে স্বল্প পরিচিত ব্র্যান্ডের রাউটারের বিক্রিও এখন ভালো। এ মাসের শেষ অথবা আগামী মাসের শুরুতে সংকট দূর হতে পারে বলে ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে। তারা বলছেন, করোনা সংকটের কারণে দীর্ঘদিন চীন থেকে পণ্য আমদানি বন্ধ থাকায় নতুন পণ্য দেশে ঢোকেনি। কিন্তু মার্কেট খুলে দেওয়ায় এসব পণ্যের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। খোঁজ নিয়ে দেখে গেছে, যে পণ্য দুই মাস লাগতো বিক্রি হতে, মার্কেট খুলে দেওয়ায় তা এক মাসে বিক্রি হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত স্টক না থাকায় বাজারে সংকট দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রযুক্তি ব্যবসায়ী জানান, একটি চীনা ব্র্যান্ডের রাউটার তারা জুন মাসে বিক্রি করেছেন ৬০ হাজার পিস। যদিও তাদের টার্গেট ছিল ৩০-৪০ হাজার পিস। স্বাভাবিক সময়ে যা বিক্রি হতো ২০ হাজার পিস। বাজারে রয়েছে ডি লিংক, টিপি লিংক, নেটিস, হুয়াওয়ে, টেন্ডা ইত্যাদি ব্র্যান্ডের রাউটার।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রযুক্তি পণ্য ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি মো. শাহীদ উল মুনির বলেন, ‘খুচরা পর্যায়ে (ব্যবহারকারী) বিক্রি বাড়লেও করপোরেট লেভেলে বাড়েনি। সব মিলিয়ে বলা যায় ওভারঅল বিক্রি বাড়েনি। ওয়ার্ক ফ্রম হোম ও অনলাইনে ক্লাস শুরু হওয়ায় ল্যাপটপ, ট্যাব, ওয়াই-ফাই রাউটার, ওয়েব ক্যামেরা, মডেম, হেডফোনের মতো পণ্যের বিক্রি বেড়েছে। কিন্তু অন্যান্য পণ্যের বিক্রি প্রায় শূন্য। এটা ঠিক হতে সময় লাগবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘করোনাকালে আমাদের সংগঠনের কোনও সদস্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়নি। তবে অনেকে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আর্থিক সংকটে পড়েছেন। তাদের পক্ষে ব্যবসা চালিয়ে নেওয়াটা কঠিন হবে।’

বিসিএস সভাপতি বলেন, ‘আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। বেসরকারি খাতের ব্যাংক প্রাইম ব্যাংক আমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছে। তারা আমাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। এরই মধ্যে ১০০টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমরা আবেদন পেয়েছি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে আবেদন যাচাই-বাছাই করে সেসব কোম্পানিকে ঋণ দেওয়া হবে।’ তিনি জানান, ব্যাংক থেকে পাওয়া ঋণে যদি কোম্পানিগুলো তিন মাস ভাড়া ও কর্মীদের বেতন পরিশোধ করতে পারেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও দাঁড়িয়ে যাবে।

গত ১০ মে দেশের দুই বড় কম্পিউটার মার্কেট রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিসিএস কম্পিউটার সিটি ও এলিফ্যান্ট রোডের ইসিএস কম্পিউটার সিটি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু করা হয়। পরবর্তীতে একে একে সারাদেশের কম্পিউটার মার্কেটগুলো ও দোকান খুলে দেওয়ার পরে বিক্রি বাড়তে থাকে প্রযুক্তি পণ্যের। সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদের আগে অবস্থা এমন হয় যে, স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনও অবস্থা ছিল না ক্রেতাদের মধ্যে। বিকাল ৪টার মধ্যে মার্কেট ও দোকান বন্ধের নির্দেশনা থাকায় শেষ সময়ের দিকে মার্কেট কর্তৃপক্ষ ক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি মানা ও সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারের দিকে নজর দিতে পারেনি। এখন দোকান ও মার্কেট খোলা রাখার সময় বাড়ানোয় স্বাস্থ্যবিধি মানা ও সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারের দিকে কঠোর নজরদারি করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রযুক্তি পণ্যের আমদানিকারক ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোলজিসের পরিচালক (চ্যানেল সেলস) মুজাহিদ আল বেরুনি সুজন বলেন, ‘আগস্ট মাসের শেষ অথবা সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিকে প্রযুক্তি বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়বে। তখন আর কোনও সংকট থাকবে না। রাউটারেরও সংকট থাকবে না। মার্কেট স্বাভাবিক হবে।’

তিনি জানান, তবে আগস্ট মাসের শেষ দিকে দেশে ল্যাপটপের সংকট দেখা দিতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠান ল্যাপটপের এক্সেসরিজ তৈরি করে। সেসব প্রতিষ্ঠান এতদিন বন্ধ ছিল। অন্যদিকে ল্যাপটপ নির্মাতারাও উৎপাদন বন্ধ রেখেছিল। এখন আবারও শুরু হয়েছে। নতুন ল্যাপটপ দেশে আসতে সময়ও লাগবে। ফলে এক ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।

সুজন বলেন, ‘নতুন যেসব ল্যাপটপ দেশে আসবে সেগুলোর দাম বাড়তে পারে কিছুটা।’ কারণ, হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, এক্সেসরিজ নির্মাতারা কিছু পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। ফলে নতুন ল্যাপটপের দাম ৮-১০ ডলার করে বাড়তে পারে।

ওয়ার্ক ফ্রম হোম ও শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস শুরুর পরে চাহিদা বেড়েছে হেডফোন ও ইয়ারফোনেরও। দেশে মটোরোলা পণ্যের (মোবাইল ও একসেসরিজ) পরিবেশক সেল-এক্সট্রা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিব আরাফাত বলেন, ‘এই সময়ে ইয়ারফোন ও হেডফোন ভালো চলছে। মটোরোলার তারহীন ইয়ারবাডস পণ্যর এখন বেশ চাহিদা। এগুলোর দাম ৩ হাজার ৯৯০ থেকে ৫ হাজার ৪৯০ টাকার মধ্যে।’ তিনি জানান, শিশু শিক্ষার্থীদের কাছে পছন্দের হেডফোন হলো স্কোয়াড ২০০ (১ হাজার ৮৯৯ টাকা) ও স্কোয়াড ৩০০ (৩ হাজার ২৯৯ টাকা)। এই হেডফোনের কুশনগুলো ভালো, অ্যালার্জি ফ্রি। হেডফোনে ইয়ারফোন লাগিয়ে গান বা অন্যকিছু শেয়ার করা যাবে।

/এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ