X
সোমবার, ০৮ আগস্ট ২০২২
২৩ শ্রাবণ ১৪২৯

সামাজিক কর্মকাণ্ড ও নেতৃত্বে আগ্রহ হারাচ্ছে তরুণরা

শাহেদ শফিক
০৬ অক্টোবর ২০২১, ২২:০৩আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২১, ১১:২০

এসটি শাহীন। পথ শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে একটি ভ্রাম্যমাণ স্কুল স্থাপনের স্বপ্ন দেখেন। সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ‘জুম বাংলাদেশ স্কুল’ নামে একটি স্কুল গড়ে তোলেন। ২০১৬ সালে ১৩ জন শিশুকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে চালু করা তার ওই স্কুলের এখন শিক্ষার্থী সংখ্যা ৭০ জন। বর্তমানে ঢাকায় ৬টিসহ সারাদেশে আরও ৫ জেলায় তার এই কার্যক্রম চলছে। সবগুলো স্কুলের শিক্ষার্থী সংখ্যা সাড়ে চার শ‘।

এই স্কুল স্থাপন করতে তাকে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়েছে। প্রথমে অনেকেই শিশু পাচারকারীসহ নানা নেতিবাচক ধারনা করতো। সেগুনবাগিচার যে স্থানে ক্লাস নেওয়া হতো, পরদিন সেখানে আশপাশের মানুষ বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখতো। বিভিন্ন দাতা সংস্থার স্কুল মনে করে বখাটেরাও চাঁদা দাবি করেছে। এমনকি উদ্দেশ্য করে নানা কটূক্তি করতো। কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে শাহীনের স্কুল এখন আলো ছড়াচ্ছে পথ শিশুদের মাঝে।

সাহীনের ‘জুম বাংলাদেশ স্কুল’

বাংলা ট্রিবিউনকে শাহীন বলেন, ‘আমি কষ্ট পেলেও হতাশ হইনি। অনেকেই আমাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেছে। আমি মনে করে তারা এখন নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে। এখন মানুষ আমার প্রতি আস্থা অর্জন করেছে। ঢাকার পাশাপাশি অন্যান্য জেলায়ও এখন কাজ চলছে। আমাদের স্কুল থেকে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা শিক্ষা পাচ্ছে।’

তিনি বলেন, আসলে একটি ভালো কাজ করতে গেলে অনেক বাধা আসবে। এটি আমাদের সমাজের একটা প্রচলিত রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কারণে অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে তরুণ সমাজ মাদকাসক্তসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে যোগ্য নেতৃত্বও সৃষ্টি হচ্ছে না।

দেশের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া। এই দ্বীপকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু সামাজিক সংগঠন গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ কুটির হাতিয়া। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মুশফিকুর রহমান মঞ্জু। সামাজিক কাজ করতে গিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিকদের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে হামলার মুখেও পড়েছেন। ২০২০ সালে গড়ে তোলা এই সংগঠন থেকে দ্বীপের অসহায় ৪৮টি পরিবারকে ঘর বানিয়ে দেওয়া হয়। তরুণদের অনুদানেই সমাজে আলো ছড়িয়ে আসছিল এই ‘কুটির’। তাদের কাজে  স্থানীয় প্রশাসনও এখন বেজায় খুশি।

তরুণদের উদ্যোগে হাতিয়া দ্বীপে নির্মিত হচ্ছে বাস্তুহারাদের ঘর।

ঝড়ে ঘর হারা মানুষের জন্য সরকারিভাবে ২০০ বান টিন বরাদ্দ আসে হাতিয়ায়। সুষ্ঠু বণ্টনের জন্য এ বরাদ্দ থেকে ৫০ বান টিন বিতরণের জন্য তাদের কাছে তালিকা চান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এই `চাওয়া‘ কাল হয়ে দাঁড়ায় মঞ্জুদের জন্য। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এতে চরম ক্ষুব্ধ হন। এজন্য মঞ্জুর ওপর হামলাও হয়েছে।

মঞ্জু জানান, এখন পর্যন্ত তাদের সংগঠন থেকে অর্ধশতের মতো বাস্তুহারা মানুষকে ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। জটিল রোগে আক্রান্ত অনেকেরই চিকিৎসা করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের কাজে এলাকার বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ঈর্ষান্বিত হন। 

এই তরুণ সমাজকর্মীর অভিযোগ, মানবিক কাজ করতে গেলে রাজনৈতিকভাবে বাধা আসে। রাজনৈতিকরা এগুলোকে ‘লোক দেখানো কাজ’ বলে অপবাদ দেয়। কারণ মানুষ তাদের কাছে তো তেমন কিছু পাচ্ছে না। তাই নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে। এসব চাপের কারণে অনেক তরুণ সমাজকর্মীও আমার সঙ্গ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু তাতেও আমি পিছপা হইনি।

তরুণদের উদ্যোগে হাতিয়া দ্বীপে নির্মিত বাস্তুহারাদের ঘর।

শাহীন ও মঞ্জুর মতো বাধা উপেক্ষা করেও কিছু তরুণ টিকে আছেন, সমাজে আলো ছড়াচ্ছেন। তারা অদম্য মনোভাব ঠিক-ই হৃদয়ের গভীরে ধরে রেখেছেন। তবে অধিকাংশ তরুণ সমাজে খুব বেশি অবদান রাখতে পারছেন না। তারা বাধাবিপত্তি-প্রতিকূলতা ডিঙাতে পারছেন না। গ্রাম্য রাজনীতি, সমাজপতি ও পারিবারিক চাপসহ নানা কারণে বাধার মুখে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। অনেকেই হতাশ হয়ে সে পথ থেকে সরে আসছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন- সামাজিক অবক্ষয়, আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা, স্বার্থপরতা, রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন, পারিবারিক মনোভাব, উপার্জনের ওপর স্বীকৃতি, কল্যাণমূলক কাজে বহুমুখী বাধা, অবমূল্যায়ন, শিক্ষক ও ছাত্র অপরাজনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, বেকারত্ব, হতাশা, সামাজিক বৈষম্যসহ নানা কারণে তরুণরা সামাজিক ও মানবিক কাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কেউ কেউ উগ্র রাজনীতির প্রভাব ও অসহযোগিতায় নিজেকে সমাজসেবা থেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। এজন্য রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পাশাপাশি পারিবারিক শিক্ষাও দায়ী।

সমাজ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এক সময় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ছড়াছড়ি ছিল। স্কুল-কলেজে পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা পড়ালেখার ফাঁকে বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকতেন। এতে একে অপরের সঙ্গে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় থাকতো। কিন্তু বর্তমানে সেসব সংগঠন ও ক্লাব আর নেই। শিশু থেকে শুরু করে অধিকাংশ যুব-যুবারা ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন নেতিবাচক কাজে আসক্ত হচ্ছে। কেউ কেউ মাদকসহ ভয়াবহ নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। আত্মকেন্দ্রিকতা তাদের গ্রাস করে নিয়েছে। নিজেকে নিয়েই তারা ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করছেন বেশি।

এক সময় মেধাবীরাই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতেন। মেধাবীরাই সমাজে নানা ধরনের স্বেচ্ছাশ্রমের দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতেন। একইভাবে সমাজও তাদের এই কাজের স্বীকৃতি দিতো। খেলাধুলা, গান, কবিতা, আবৃত্তি, নাচ, সাহিত্য আড্ডা, ছাত্ররাজনীতিসহ সমাজের সর্বস্তরেই মেধাবীদের জায়গা ছিল। কিন্তু বর্তমানে সব ক্ষেত্রে চরম দৈন্যতা লক্ষণীয়। না আছে খেলার মাঠ, না আছে সাংস্কৃতিক আড্ডা। প্রগতিশীল রাজনীতিও আগের মতো শক্তিশালী নয়। যে কারণে সমাজের সব ক্ষেত্রেই জেঁকে বসেছে সুবিধাবাদ, ভোগবাদ আর আত্মকেন্দ্রিকতা। 

তরুণদের ওপর চালানো এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রচলিত রাজনীতিকে দেশের প্রায় ৬০ ভাগ তরুণরা পছন্দ করেন না। এ ক্ষেত্রে রাজনীতির ‘নগ্ন’ রূপকেই তারা দায়ী করেন। তাদের কাছে রাজনীতির সংজ্ঞাটাই হলো ক্ষমতার ভাগাভাগি আর সুবিধাবাদ কেন্দ্রিক দলীয় চর্চা। তারা প্রচলিত রাজনীতিকে দেশের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক বলে উত্থাপন করেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, দেশের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও প্রতিহিংসার কারণে অনেক তরুণ তার লক্ষে পৌঁছোতে পারছে না। যার কারণে যোগ্য নেতৃত্ব হয়ে গড়ে উঠছে না। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, আমরা জাতি হিসেবে লাইনচ্যুত হয়ে গেছি। যে আশা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, সেটা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে দেশ। সংবিধানে গণতন্ত্র, সামাজিক সুবিচার, ধর্ম নিরপেক্ষতাসহ যে মৌলিক নীতিগুলো রয়েছে; সেখান থেকে রাষ্ট্র এখন অনেক দূরে সরে পড়েছে। স্বার্থপরতা, মানুষের অধিকার হরণ সবই হচ্ছে। দিন দিন এই অপসংস্কৃতি আরও ব্যাপক হারে ছড়াচ্ছে। সারাদেশে সিন্ডিকেট সৃষ্টি হচ্ছে। সামাজিক বন্ধন ও নেতৃত্ব সৃষ্টিতে সহায়ন পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটা তরুণদের প্রধান বাধা। এ ছাড়াও যুব নেতৃত্ব সৃষ্টিতে সঠিক কর্ম পরিকল্পনা নেই।

তিনি আরও বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন ঝুঁকি নিয়ে একটি ভিন্ন ধরণের বাংলাদেশ সৃষ্টি করার জন্যই আমরা কাজ করেছি। এখন আমরা এ থেকে অনেক দূরে। আমাদের তরুণরা আশাহত হয়ে এখন পালাতে চায়। এটা দুঃখজনক ও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পরিণতিও অনেক খারাপ হবে।

তার মতে, স্বার্থপর ব্যক্তিরা দেশের স্বপ্নটা ছিনতাই করে নিয়েছে। এর সুযোগটা এখন দুর্বৃত্ত ও বখাটেরা নিচ্ছে। সামাজিক সব কর্মকাণ্ড এখন তাদের দখলে চলে যাচ্ছে। তাদের আধিপত্যে যোগ্যরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।

পথ শিশুদের পড়াচ্ছেন সাহীন।

যুক্তরাজ্যের সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণদের নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় জানা গেছে সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত না হতে পেরে অধিকাংশ যুবক ইন্টারনেটে যুক্ত হচ্ছেন। এরমধ্যে ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ৪ ঘণ্টার বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন। বাকিরা ১ থেকে ৩ ঘণ্টা ইন্টারনেট ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন। সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে না পেরে তারা ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়েন। আর অতিরিক্ত ইন্টারনেটের আসক্তি পড়ুয়াদের পড়াশোনা বিমুখ করে তুলছে।

দেশের তরুণদের মাঝে যারা রাজনীতি করেন, তাদের অনেকের মধ্যেই প্রতিবাদী মানসিকতা নেই। সিনিয়রদের অন্যায়ে তারা চুপ থাকেন। সহপাঠী নির্যাতনের শিকার হলেও পাশে দাঁড়ান না। উপরন্তু অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতকের ভূমিকা নেন। ফলে তাদের ভয়ে আতঙ্কে থাকেন অন্যরা। নেতারা তাদের দল ও ক্ষমতা ভারি করার জন্য এদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন। এ সুযোগে অজপাড়া গ্রামের বখাটেরাও কৌশলে রাজনৈতিক বা দলীয় নেতৃত্ব দখল করে নেন।  

/এনএইচ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সদরঘাটে দুই লঞ্চের চাপায় যাত্রীর মৃত্যু
সদরঘাটে দুই লঞ্চের চাপায় যাত্রীর মৃত্যু
জননী সাহসিকা-বঙ্গমাতা
জননী সাহসিকা-বঙ্গমাতা
পঞ্চগড়ে পুকুরে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু
পঞ্চগড়ে পুকুরে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু
মাতৃত্বকালীন বিষণ্নতায় ভোগেন দেশের ৩৯ শতাংশ নারী
মাতৃত্বকালীন বিষণ্নতায় ভোগেন দেশের ৩৯ শতাংশ নারী
এ বিভাগের সর্বশেষ
বন্যার্তদের জন্য কনসার্ট
বন্যার্তদের জন্য কনসার্ট
ব্যাংককে অ্যাওয়ার্ড পেলেন সীমা হামিদ
ব্যাংককে অ্যাওয়ার্ড পেলেন সীমা হামিদ
বন্যার্তদের সহায়তায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনী
বন্যার্তদের সহায়তায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনী
এসডিজি ইয়ুথ সামিটের নিবন্ধন শুরু
এসডিজি ইয়ুথ সামিটের নিবন্ধন শুরু
যেখানে বিনামূল্যে ইফতার করেন হাজার মানুষ
যেখানে বিনামূল্যে ইফতার করেন হাজার মানুষ