X
শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১০ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

তিস্তা জার্নাল | পর্ব চার

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ১৩:৩৯

বাঁধের ঠিক নিচ থেকে চরের ওপর দিয়ে উত্তরের দিকে চলে গেছে কাকিনার রাজার বানানো ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা। ছবি : লেখক

পূর্বপ্রকাশের পর

আমার আজকের উদ্দেশ্য ধামুরের চরের জীবন দেখা, তারপর চরের উপর দিয়ে হেঁটে যাত্রা করে নদীদর্শন। যে দোকানঘরের বেঞ্চিতে বসে গল্প করছিলাম, সেটারই পাশ দিয়ে বাঁধের ঢালের বোল্ডারের বাঁধুনি বেয়ে নেমে চরের প্রান্ত; বাঁধের ছেদের পর সেখান থেকেই আবার শুরু হয়েছে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা। খড়ের গাদা পেরিয়ে দুধারে লাগানো সবজি ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে ফুট আড়াই চওড়া একটা অগভীর নালার মতো পথ সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। ক্ষেতের সেচের আর্দ্রতায় পথের ঐটুকু অংশ ভেজা, তারপর সেটা শুকনো বালুর চিকন ধারা হয়ে বাঁয়ে বাঁক নিয়ে চরের আদিগন্ত বিস্তারের মধ্যে মিশে গেছে। চরে নামার পর ঐ বালুর ধারা ধরে যখন সামনের ক্ষেতগুলোর দিকে এগোচ্ছিলাম, তখন ওটা যে গঙ্গাচড়া বাজারের পর বটগাছটার তলা থেকে শুরু হয়ে বাঁধে এসে ঠেকা সেই ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পিচঢালা মসৃণ রাস্তাটারই চরের অংশ, সেটা কল্পনাও করতে পারিনি। দুধারে সবজি আর আলুর ক্ষেত, সেখানে মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে গ্রামের গৃহস্থরা যে যার জমিতে কাজ করছেন। চরের সব অংশ সমানভাবে আবাদযোগ্য নয়; ক্ষেতের মাঝে মাঝে রুক্ষ-শুষ্ক বালুর খণ্ড খণ্ড বিস্তার, সেখানে শক্ত কাশের নিচু ঝোপ কিংবা নাড়া মরুভূমির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। পরের ভূমিখণ্ডটাতেই আবার শ্যালো পাম্প দিয়ে তোলা পানির সেচনে জীবন্ত গাঢ় সবুজ মাথার উপরের মেঘহীন নীল আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে চাইছে। সেচের ব্যবস্থা করা গেলে বছরে তিন ফসলের আবাদ করা চলে। সবজি, আলু, তামাক এসবের চাষ সব সময়ই ছিল, পরে তাতে যোগ হয়েছে ভুট্টা। শুকনো বালুময় একটা জমিতে এক চাষী কোদাল নিয়ে কাজ করতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন দেখে অবাক হলাম। এই মাটিতে ফসল হবে কী করে! হবে, কৃষক জানালেন, কারণ সেটা বিশেষভাবে ‘তৈয়ার’ করা হয়েছে। যে জমিটায় বালি আর শুষ্কতা বেশি সেটাতে প্রথম বছর ফেলা হয় শুধু ধনচের বীজ, তাতে জমিতে ‘রস’ আসে। পরের বার সেটায় নিয়মিত ফসলের আবাদ করা যায়। দূরে পুবে-পশ্চিমে বিস্তারিত দিগন্তে ক্ষেত, বাড়িঘর, বালুর রেখা আর ময়াল দেখা যায়। ডানদিকে মহীপুর ব্রিজটা দিগন্ত জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আধা কিলোমিটারের মতো যাবার পর নদীর পথের দিশা না পেয়ে অনতিদূরে আলু ক্ষেতে কাজ করতে থাকা কৃষককে জিজ্ঞেস করতেই বাঁয়ে হাত দেখিয়ে বললেন, এদিকে পথ পাবেন না। ঐ যে সামনে ধানের আাঁটির গাদাটা দেখা যায়, তার পাশ দিয়ে ‘বড় রাস্তা’ গেছে—ওটা ধরে উত্তরে এগিয়ে যান। অবাক হয়ে বাঁয়ে তাকিয়ে বড় রাস্তা তো দূরের কথা, পায়ে হাঁটা পথেরও আভাস পাই না। বোধহয় কথাটা আমার বিশ্বাস হয়নি এমনটা আন্দাজ করে পথনির্দেশদাতা অভয় দেন, যান যান, রাস্তা পাবেন। ঐ বড় রাস্তাই নদী পর্যন্ত গেছে। দ্বিধা নিয়ে সামনে এগিয়ে একটা বালিময় পথের আভাস পাই বটে, কিন্তু সেটাকে বড় রাস্তা বলে আমার কিছুতেই বিশ্বাস হয় না। ভাবছিলাম, এখানে রাস্তাই আসবে কোত্থেকে, বড় রাস্তা তো দূর অস্ত। যাই হোক, সেই আভাস-পথ ধরেই সামনে এগোই, আর যত এগোতে থাকি, রাস্তার আকৃতি ততই স্পষ্ট হতে থাকে, বিস্তারও বাড়তে থাকে। বালুর নদী যেন সেটা, গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে যায় বালুতে।   

তিস্তার চরের উপর দিয়ে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পুরনো রাস্তা এখানে দু’ভাগ হয়ে দুদিকে চলে গেছে। ছবি: লেখক এক চাষীকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, গত কয়েক বছর নদীটা এদিকে ভাঙছে না। এদিকটা ‘কাইম’-এর মতো হয়ে গেছে। বুঝলাম খামখেয়ালি তিস্তার তীরে ‘কাইম’ হলো ‘কায়েম’, অর্থাৎ পরপর কয়েক বছর ভাঙন না হওয়ার সুযোগে স্থায়ী হয়ে যাওয়া এলাকা। তবে ভাঙন না থাকলেও বর্ষায় তিস্তার বিস্তার চলে যায় সেই বাঁধের নিচ অবধি। ক্ষেত, শুকনো জমি, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা—সব ডুবে একাকার হয়ে যায়। তাহলে পানি নেমে গেলে তিস্তাপাড়ের মানুষজন তাদের জমির সীমানার দিশা পায় কী করে! রাস্তাটার অবস্থান আর মাপেরই বা হিসেব হয় কীভাবে? সেসব বের করা হয় ‘আমিন’ দিয়ে জমির মাপজোক করেই, এক কৃষক জানালেন।  

চরের মাঝখানে একটা জায়গায় এসে রাস্তাটা দুভাগ হয়ে দুদিকে চলে গেছে। ডানদিকের রাস্তাটা চলে গেছে শংকরদহ, তারপর নদী পেরিয়ে কাকিনা। বামের পথটা চরের ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে উত্তর-পশ্চিমে বিনবিনার চরের দিকে। আরও দূরে নদী, ওপাড়ে আবুলিয়া। তার আগে ধামুর মৌজার শেষে সীমানা-নির্ধারক লাল নিশানটা দেখা যায়। নিশান পেরিয়ে ঐ যে বালির ওপর একটা টিনের চালের ছোট ঘর বসানো, সেটা নদীর পাড়েই। বোল্লার পাড়ের বাঁধের ওপর থেকে দূরে ডানদিকে যে বাড়িঘরগুলোর আভাস দেখা যায়, সে জায়গাটা শংকরদহ। তারপর বালির রেখা। সেই সাদা রেখার পরেই নদীর বর্তমান ধারা। 

দুই রাস্তার সংযোগস্থল থেকে শংকরদহই তুলনামূলকভাবে কাছে মনে হলো। লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে তাঁরাও তাই জানালেন। চরে অনভিজ্ঞের পক্ষে দূরত্ব আন্দাজ করা মুশকিল। শংকরদহ যেতে এখান থেকে কতক্ষণ লাগবে? সামনের রুক্ষ শুকনো কাশঝোপে ভরা বিস্তীর্ণ জমিটা দিয়ে কোদাল কাঁধে নীল শার্ট আর চেক লুঙ্গি পরা সাদা চাপদাড়িঅলা গাট্টাগোট্টা এক চাষী যাচ্ছিলেন, তিনি জানালেন ঘণ্টাখানেক তো লাগবেই। এক ঘণ্টা! দেখে তো মনে হচ্ছে দু’মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যাবে। বিনবিনার চর তো আরও অনেক দূরে। পশ্চিমের আকাশের দিকে তাকালাম। সূর্যটা পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণে নীল আকাশের পটভূমিতে জ্বলছে, রোদটা এখনও বেশ গরম। তাই শুধু একটা শার্ট গায়ে শেষ অঘ্রানের এই বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গায়ও ঠাণ্ডা লাগছে না। বরং একটু একটু ঘামছিই।           

দ্বিধায় পড়লাম। এখন নদী পর্যন্ত গিয়ে বেলাবেলি ফিরে আসতে পারব তো? পারলেও হয়তো তাড়াহুড়োয় কিছু দেখাই হবে না ভালো করে। ডানদিকের পথটার মাথায় শংকরদহের বাড়িগুলো টানছিলো। এই বাড়িগুলো এ বছরেই বানানো। গত কয়েক বছর ধরে ঐ জায়গাটা ছিল তিস্তার গর্ভে। অধিবাসীরা সরে গিয়েছিল যে যেখানে পেরেছিল; মহীপুরে, বোল্লার পাড়ে, ওপাড়ে কাকিনায়, কেউ-বা বাঁধে অস্থায়ী আবাস গেড়েছিল। এবছর চর জাগতেই অনেকেই ফিরে এসে যার যার জমি খুঁজে নিয়ে ঘর বেঁধেছে আবার। ফসল ফলাচ্ছে। হাতেগোণা কয়েকটা মাত্র ঘর, দূর থেকে মনে হলো টিনে ছাওয়া, বাঁশ আর কাশের বেড়া দেওয়া। এখান থেকেই দেখা যায় ছাউনির টিনগুলো নতুন-পুরনোয় মেশানো। বোঝা যায়, পুরনো টিনগুলো কয়েক বছর আগে সর্বশেষ ভাঙনের হাত থেকে গৃহস্থ বাঁচাতে পেরেছিল। হয়তো ঘর হারানো আর ঘরে ফেরার অনিশ্চিত সম্বলহীন সময়টায় ওগুলোই তার মাথায় আচ্ছাদন জুগিয়েছে। কিংবা হয়তো আবার ঘরে ফেরার নিশ্চিত আশায় ওগুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছিল।

এরকমই জীবন তিস্তার তীরের মানুষের। আপন ভিটার প্রতি, নিজের ‘ঘরের’ প্রতি নিরুপায় নাছোড় টানের চিহ্ন হয়ে যেন বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে আমার দৃষ্টিসীমার মধ্যেই; এত কাছে এসে সেগুলো না দেখে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিলো না। আমার পায়ের নিচে রুক্ষ শুষ্ক বালিময় জমি—দুর্বা আর কাশের কঠিন বিস্তার তার রূপকে কিছুটা সবুজের কোমলতা দেওয়ার বদলে আরও ঊষর করে তুলেছে। ঊষর, এবং উদাসী; যেন চরের এটাই আসল চেহারা। জীবনের প্রসারিত নির্জনতা, অস্থায়িত্ব, অনিশ্চয়তা যেন রূপ ধরে এখানে বিরাজমান। এর সৌন্দর্য অনন্য—কাছে ডাকে, আবার দূরেও সরিয়ে দিতে চায়।

একটা কাশঝোপের পাশে দাঁড়িয়ে সময়ের হিসেব করলাম। তারপর কিছুটা এগিয়েও শেষ পর্যন্ত আজ আর যাব না বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। পাশের ক্ষেতে কাজ করতে থাকা গৃহস্থ আর মজুরেরা মাঝে মাঝে আড়চোখে আমার দ্বিধা দেখছিলো। শেষে আমাকে ফিরতি পথ ধরতে দেখে একজন চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী ভাই, যান না?” নাহ্, আজ থাক। সন্ধ্যা হয়ে যাবে। বলতেই লোকগুলো সমস্বরে যেন কিছুটা মজা পেয়েই বলল, “আরে না না, এই তো বেশি দূর না। যান যান, অসুবিধা নাই। ফিরি আইসা যাইবে।” ভাবলাম, এই বালি আর কাশঝোপের প্রান্তর আর ফসলের ক্ষেতের খোলা গোলকধাঁধা তাদের আজন্ম চেনা, এখানে তাদের যে অবাধ গতি, সেই বিচারেই তারা দূরত্বের হিসাব করছে। আমার হিসেব তার সাথে মিলবে না।

তিস্তার চরের শুষ্কতায় মানুষের আঁকা আর্দ্রতা আর সবুজের রেখা। ছবি : লেখক ফিরে চললাম। সামনে দূরে বাঁধের পাড় ধরে গ্রামের সবুজের রেখা, ফসলের গাদা আর বাড়িগুলোর ঝাপসা কাঠামো পরিচিত পরিবেশে ফেরার স্বস্তি দিচ্ছিল। ভাবছিলাম, নদীভাঙনে বারবার বাড়িঘর হারানো তিস্তার চরের মানুষ কোনটাকে ‘বাড়ি’ বলে মনে করে। চরের মাঝখানটায় বালিসর্বস্ব বড় রাস্তার পাশে এই মুহূর্তে এক কৃষক তার চার বছরের ছেলেটাকে নিয়ে শ্যালো মেশিন দিয়ে আলুক্ষেতে সেচের আয়োজন করছে। কথা বলে জেনেছি, বছর চল্লিশেক আগে ঐ ক্ষেতটাই ছিল তার বাড়ি। ওটাই তার জন্মভিটা। এখন বোল্লার পাড়ের বাঁধ থেকে গঙ্গাচড়া যেতে রাস্তার পাশেই বড় পুকুরটার বাম ধারে টিনের চালের পাকা বাড়িটা তার। এখানে আসার পথে খেয়াল করেছি বাড়িটা। পুকুরটার ওপর একটা বাঁশঝাড় বাড়িটাকে শীতলতা আর অন্তরঙ্গতার একটা আবহ দিয়েছে। বেশকিছু বাঁশের আগা পুকুরটার ওপর নোয়ানো, তাতে এই আসন্ন শীতের মৌসুমে অগভীর পুকুরের পানির কালচে রঙ প্রায় অন্ধকারের রূপ নিয়েছে। বাড়িটা বরাবর রাস্তার ওপাশে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে এখন-শূন্য ধানক্ষেত, যদিও একদা-বিরাট রাস্তাটা ধরে আজ আর ফাঁকা জায়গা তেমন নেই—শুধু বাড়িঘর। ধানক্ষেতটার ওপর দিয়ে পশ্চিমের বাতাস এসে পুকুরের ওপরের বাঁশঝাড়টাকে সারাক্ষণ অস্থির করে রাখে; পাতাগুলো ঝিরঝির করে। এই বাড়িটাতেই নিশ্চয়ই চার বছরের ছেলেটার জন্ম—তার কাছে চরের হারানো বাড়ির কোনও অস্তিত্বই নেই। কিন্তু ঐ কৃষকের মনে বাড়ি কোনটা? চরের বুকে খামখেয়ালি তিস্তার নিরন্তর ভাঙাগড়ায় ভিটা থেকে বালিময় চাষজমি হয়ে-ওঠা ক্ষেতটায় কাজ করতে করতে বেলা পড়ে এলে গোধূলির আলোর মায়ার প্রভাবে কখনও কি দু-এর পলের জন্য তার মন ধন্দে পড়ে? কোথায় দাঁড়িয়ে আছে সে—বাড়িতে না চরের ক্ষেতে? 

পৃথিবীর যে প্রান্তেই মানুষ থাকুক, বাড়ির কথা সে কখনও ভোলে না। কিন্তু ‘বাড়ি’ একই সঙ্গে নিতান্তই বস্তুগত এবং একান্তই নির্বস্তুক। নির্মাণসামগ্রীর যে ভৌত কাঠামোটাতে আমরা প্রতিদিন দিনশেষে ফিরি, সেটাই বাড়ি নয়। বাড়ি হলো সেই কাঠামোটার সাথে যুক্ত সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র, দৃশ্য-স্বাদ-গন্ধ-বর্ণ-স্পর্শের সম্মিলিত স্মৃতির একটা মাথায়-গেঁথে-যাওয়া ছায়া, শুধু মনে ছাড়া যার অস্তিত্ব কোথাও টিকে থাকে না। তাই ঘরছাড়া মানুষ চিরকাল নিজের সাথে সেই ঘরটাকেই বহন করে বেড়ায়, যতই সে নতুন নতুন স্থান-কালে নতুন নতুন ঘর বাঁধুক।

ছোটবেলা থেকেই একটা শব্দ আমার বাবার মুখে অসংখ্যবার শুনেছি—‘পুরান বাড়ি’, যে বাড়িতে তাঁর জন্ম হয়েছিল আর শৈশব-কৈশোর কেটেছিল। সে বাড়ি আজ নদীগর্ভে। তারপর অনেকবার বাড়ি বদলাতে হয়েছে তাঁকে—চাকরি কিংবা সন্তানদের লেখাপড়ার সুবিধার প্রয়োজনে। ধীরে ধীরে বুঝেছি, ঐ ‘পুরান বাড়ি’ তাঁর মনে কোনও দিন সময়ের, বাস্তবতার নদীভাঙনে বিলীন হয়নি।    

এই ‘পুরান বাড়ি’ কথাটা তিস্তাতীরের মানুষের অভিধানের সবচেয়ে দৈনন্দিন, জীবন্ত, প্রতিধ্বনিময় শব্দগুলোর অন্যতম। এখানে সবার ‘পুরান বাড়ি’ আছে, যদিও নদীর বর্তমান ধারা, তার তীরের বালির বিস্তার, ফসলের ক্ষেত, ‘কাইম’ কিংবা চরের কাশ আর বুনো ঝোপে ছাওয়া কোনও গোপন প্রান্তে তার কোনও অস্তিত্ব নেই।

আজ অবশ্য সবচেয়ে বয়স্ক ‘নদীভাঙা’ মানুষদের পক্ষেও তাঁদের ‘পুরান বাড়ি’র স্মৃতি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর কারণ এ কালে চরের দ্রুত পরিবর্তমান বাস্তবতা। একদিকে যেমন নতুন নতুন ফসল চাষের উদ্ভাবনী চিন্তা চরের মানুষকে বছর জুড়ে আগের চেয়ে বেশি কর্মতৎপর, সুখী এবং সচ্ছল করে তুলছে, তেমনি অন্যদিকে আধুনিক যন্ত্র ও প্রযুক্তি চরের জীবনের নির্জনতা, ধীরগতি আর মানসিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আনছে। তিস্তার চরে তামাক, ধান, আলু, সবজি চাষের রীতি সব সময়েই ছিল। এখন তামাকের চাষ কমে আসছে—বাড়ছে আলু আর সবজির আবাদ। ফসলের তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে ভুট্টা। শ্যালো পাম্প সেচের সক্ষমতা বাড়িয়েছে, যদিও একটা প্রধান নদীর দু’তিন কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে সেচের জন্য পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে—এই বাস্তবতা বেশ অদ্ভুতই। প্রাচীন হাল-গরুর চল আর নেই, জমি চাষের পুরো কাজই হয় ট্রাক্টরের সাহায্যে। সার, ফসল আর অন্যান্য সামগ্রী পরিবহনে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তায় চলছে ট্রাক্টরের ইঞ্জিনে টানা ট্রলি।

বর্তমান প্রজন্ম শিক্ষিত; উন্নত রাস্তা আর যানবাহনের সৌজন্যে শহরের সাথে পুরনো দিনের তুলনায় অনেক বেশি যুক্ত। ফেরার পথে বাঁধের নিচেই এক দম্পতিকে পাওয়া গেল একমাত্র শিশুসন্তানকে নিয়ে চলেছেন চরের পারিবারিক জমিতে সার দিতে। পুরুষটির বয়স ত্রিশের মধ্যে, কাঁধে সারের বস্তা। তাঁর স্ত্রীর কোলে বাচ্চা। পরিবারটিকে দেখে চরবাসী গৃহস্থ কৃষকের স্বাভাবিক চেহারার সাথে মেলাতে পারছিলাম না। কৌতূহল হচ্ছিল। সপরিবারে কোথায় চললেন, এমন প্রশ্ন করতেই কিছুটা সলজ্জ স্মিতহাস্যে জানালেন, আর কি করা! স্বামী স্ত্রী দুজনেই এমএ পাশ করেছেন—স্বামী রংপুর সরকারি কলেজ আর স্ত্রী কারমাইকেল কলেজ থেকে। কিন্তু চাকরি জোটেনি। আর এখন তো করোনা সব আশা শেষ করে দিয়েছে, অন্তত আপতত। তাই চরের পৈত্রিক জমিতে নিজের হাতে চাষবাসের চেষ্টা চলছে। বুঝলাম, উচ্চশিক্ষিত যুবক-যুবতী কৃষিকাজকে চাকরির তুলনায় রীতিমতো লজ্জার কাজ মনে করেন।  “আমার একটা ছবি তুলবেন?”—ক্যামেরা দেখে চরের বালকের অনুরোধ। পিছনে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা। ছবি : লেখক

পাশেই একটা বড়সড় পরিষ্কার খোলা জায়গা কাদামাটি দিয়ে লেপা। একজন কৃষাণী সেখানে মাড়াই করা ধান বাতাসে কুলা দিয়ে উড়িয়ে পরিষ্কার করছেন। আশেপাশে খড় আর ধানের আঁটির গাদা, কৃষিকাজের অন্যান্য চিহ্ন, সরঞ্জাম। একটা বছর দশেকের ফরসা ছেলে একটা সাদা প্লাস্টিকের বস্তায় কী যেন ভরছিল। ক্যামেরা দেখে সহাস্যে সামনে এসে বলল, “আমার একটা ছবি তুলবেন?” ক্যামেরা তাক করতেই এক হাতে বস্তাটা ধরে অন্য হাত কোমরে দিয়ে ‘পোজ’ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

চরে তখন শেষ বিকেলের সোনালি রোদ সূক্ষ্ম কুয়াশার কণা মিশে সাদাটে হতে শুরু করেছে। সামনেই বাঁধের ওপর একটা ব্যাটারিচালিত রিকশাভ্যান দেখতে পাচ্ছি। ওটায় উঠে বসব বলে বাঁধে ওঠার জন্য ঢালের দিকে এগোলাম। চলবে

 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

শূন্য প্রান্তরে একা

শূন্য প্রান্তরে একা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

ঐশী গল্প

ঐশী গল্প

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

সর্বশেষ

শূন্য প্রান্তরে একা

শূন্য প্রান্তরে একা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

ঐশী গল্প

ঐশী গল্প

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune