X
সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১, ৫ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

কথোপকথন ।। কবি শামীম রেজা ও কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২০, ১১:৩৪

সম্প্রতি কবি শামীম রেজা ও কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর মধ্যে ফেসবুক লাইভে কথোপকথন অনুষ্ঠিত হয়। সেই আলাপের অংশবিশেষ আজ কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর জন্মদিন উপলক্ষ্যে প্রকাশ করা হলো।

বামে কবি শামীম রেজা এবং ডানে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী

শামীম রেজা : শুভসন্ধ্যা, বুকের মধ্যে কুমার নদ, মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরায় পদ্মা-বুড়িগঙ্গার ঢেউ বহমান। নোনা জলে বোনা সংসারে মধুময় দুপুরে কিংবা প্রাতঃসন্ধ্যায় কিংবা সকালে যিনি ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৪৮ সালে জন্মেছেন, ফরিদপুরের রসুলপুর গ্রামে। তিনি ষাটের অন্যতম প্রধান কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। পৃথিবীর এই দুর্যোগময় মুহূর্তে আপনাকে পেয়ে আমরা আনন্দিত। অভিবাদন হে, প্রিয় কবি।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : ধন্যবাদ, কবি শামীম রেজা। সকলকে ভালোবাসা ও অভিবাদন জানাই। বিশেষ করে এই আয়োজনের সাথে যারা যুক্ত আছেন কবি শামীম রেজা ও তার বন্ধুবর্গ তাদের সকলকে আমার প্রীতি, শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ।




শামীম রেজা : সবাই জানেন কবির উল্লেখযোগ্য বই হলো—কবিরাজ বিল্ডিংয়ের ছাদ, স্বপ্নহীনতার পক্ষে, সিংহদরজা, ছিন্নভিন্ন অপরাহ্ন, সারিবদ্ধ জ্যোৎস্না, সুগন্ধ ময়ূর লো, নির্বাচিত কবিতা, একা ও করুণা, মিশ্রমিল, বি ডি মিস্ত্রি ফেসবুক, সুবাসিত রক্তের গম্বুজ, শ্রেষ্ঠ কবিতা, কবিতা সংগ্রহ ১, কবিতা সংগ্রহ ২; এছাড়া এবারে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ "ঈহা"। এই কবিতার বই থেকে আমরা কয়েকটি গান তৈরি করেছিলাম এবং কবিতার বইটি সুফিবাদী ঘরানার। উনি যেটা ধারণ করেন, পরাবাস্তবতা ও প্রতীকের ধারণা এখানে স্পষ্ট। অনুবাদ গ্রন্থের মধ্যে আমরা যেটা পড়ে বড় হয়েছি, রসুল হামজা তওফের কবিতা। এই কাব্যগ্রন্থ ছাড়া আমরা রসুলকে জানতে পারতাম না, তার কবিতাকে জানতে পারতাম না। আর "মওলানার মন" রুমীর কবিতা তিনি অনুবাদ করেছেন। আমার জানতে চাওয়া আছে হাফিজের কবিতা তিনি অনুবাদ করেছেন কিনা—এর পরে আমি গল্পে আসবো। আর শিশুসাহিত্য লিখেছেন প্রচুর, কিশোরদের জন্যও লিখেছেন। উপন্যাসও লিখেছেন, গদ্য খুব সাবলীলভাবেই তার হাতে ওঠে আসে। তিনি "আমার কুমার" নামে যে বই লিখেছেন সে বইতে তিনি বেড়ে ওঠা নদের পলি-জল মাখা শৈশবের কথা বলেছেন। কবি ও অধ্যাপক মাসুদুজ্জামানকে বলেছিলেন প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি না হয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার গল্প, সেই শিক্ষককে প্রণতি জানিয়েছেন। জাতির জনকের ঐতিহাসিক ফরিদপুর, পল্লীকবি জসীম উদদীনের ফরিদপুর, পৃথিবী বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনের ফরিদপুর, হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ফরিদপুর। এই যে আপনার বেড়ে ওঠা, আর যন্ত্রকৌশল বিভাগের মতো জায়গা থেকে কিভাবে কবিতায় এলেন?





হাবীবুল্লাহ সিরাজী : ধন্যবাদ, শামীম রেজা। আপনি যেভাবে শুরু করলেন। এই শুরুর রেশ ধরেই বলতে চাই। আমার ‘ঈহা’ কাব্যগ্রন্থের পরেও এ বছর আমার আরেকটি বই বেরিয়েছে ‘জমিনে ফারাক নেই’। আপনি এতো সুন্দর করে বইয়ের কথা বললেন এবং বেড়ে ওঠার প্রসঙ্গে কুমার নদকে নিয়ে আসলেন। কুমার একটি নদ, নদী নয়। ব্রহ্মপুত্র একটি নদ, কপোতাক্ষ একটি নদ, কুমার একটি নদ। ‘আমার কুমার’ এই গ্রন্থখানি কখনো লেখা হতো না, বাংলা একাডেমি থেকে নিয়মিত বের হয় ‘ধান শালিকের দেশ’ এবং এটা কিশোরদের ও আমাদের মধ্যেও জনপ্রিয়, উপভোগও করতাম। একবার ‘ধান শালিকের দেশ’ এর সম্পাদক মাহবুব আজাদ চৌধুরী আমাকে বলেছিলেন ঈদের উপরে আমার অভিজ্ঞতা লিখতে। আমি টানা দশ বছর গ্রামে কাটিয়েছি, আমার জন্ম ফরিদপুর শহর থেকে দশ-বারো মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে রসুলপুর গ্রামে। সেই গ্রামেই কুমার নদ, কুমার নদটি পদ্মা থেকে নানা জায়গা হয়ে শেষ পর্যন্ত মাদারীপুর হয়ে গেছে। কুমারে পরে আসবো, আমি মাহবুব আজাদকে কথা দিলাম লেখাটা দেবো কিশোর তরুণদের উপযোগী করে। লেখাটা লিখতে গিয়ে আমি উপযোগী ভাষা সৃষ্টি করতে গিয়ে হিমশিম খেলাম। বড় ও ছোটদের মাঝখানে যে ভাষা সেটার বাক্য তৈরি ও গঠন ভিন্ন। আপনি দেখবেন আমার অন্য গদ্যের সাথে ‘আমার কুমার’ এর শব্দ, বাক্য, যতিচিহ্নের অনেক পার্থক্য রয়েছে। এমন চেষ্টা করলাম এই ভাষার মধ্য দিয়ে আমি আমার শৈশব ও বাল্যকালকে তুলে ধরার। এটি আমার দশ বছরের খণ্ডকালীন আত্মজীবনী বলতে পারেন। যারা আত্মজীবনী লেখেন তারা নিজেদের একটি জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছেন বলে সাহস করে লেখেন কিন্তু সেই সাহস এখনো আমার নেই এবং এই লেখায় অনেক ভ্রান্তি আছে। কিন্তু অতি সম্প্রতি আমাকে এক মহান লোক বলেছেন, ‘নিজেকে কখনো ছোট লেখক ভাববেন না এবং বলার সময় দ্বিগুণ করে বলবেন।’ তাই আমি এখন চারগুণ করে বলবো, আমি অনেক অনেক বড় লেখক। লেখাগুলোকে চেয়েছিলাম আমার বাল্যকালের সাথে যুক্ত করতে। বলতে চেয়েছিলাম নদটি কেমন ছিল, গ্রামটি কেমন ছিল, মানুষজন কেমন ছিল। আজ থেকে প্রায় একাত্তর-বাহাত্তর বছর আগে আমার জন্ম সে সময়ে একটি গ্রামের অবস্থা কী হতে পারে। রাতে আলো বলতে হারিকেনের আলো, কুপির আলো, চাঁদের আলো, জোনাকির আলো। যাতায়াত বলতে ছিল নদীপথ। একটি বাজার, সে বাজারকে কেন্দ্র করে এর ব্যাপ্তি ঘটেছে। একটি দাতব্য চিকিৎসালয় আছে, একটি প্রি-প্রাইমারি স্কুল আছে, একটি কামারখানা আছে, একটি কুমোরের দোকান আছে, ময়রার দোকান আছে, পাশাপাশি বেনে দোকান থেকে শুরু করে মালাকারের দোকান। এই প্রজন্মের অনেকে মালাকার চেনে না, ওরা টোপর বানায়, শোলার কাজ করে। এই যে অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে একটু হতদরিদ্র মুসলমানরা কৃষিকাজের সাথে যুক্ত ছিল। ক্ষৌরকর্ম থেকে বাকি যে কর্মযাপন তা সনাতন ধর্মাবলম্বী লোকেরা করতো। অসম্ভব সম্প্রীতির সাথে সবাই থাকতো। ১৯৭১ সালে আমি আমার মাতুলালয়ে ছিলাম সেখানে ব্যক্তিগত যত আক্রোশই থাকুক না কেন সাম্প্রদায়িক আক্রমণ কেউ কাউকে করেনি। বরং অনেক মুসলিম পরিবার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আশ্রয় দিয়েছে। বলতে পারেন আপনি এটা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলছেন। না, এটা আমার নিজের দেখা। এই পরিবেশ থেকে আমার লেখালেখির সূত্র। আমি জন্মেছি মাতুলালয়ে এবং মা নানার একমাত্র কন্যা হওয়ার ওখানে বাল্যকাল কেটেছে। বাবার চাকরি সূত্রে অনেক জায়গায় গিয়েছি। লেখালেখি ব্যাপারটি মাথায় না থাকলেও বাল্যকালে তার উপকরণ ছিল প্রচুর। তাই এই পরিবেশ, প্রকৃতি, এই নদটি আমাকে লেখালেখির দিকে নিয়ে গিয়েছে। আমার লেখালেখি যেভাবে শুরু করেছিলাম একটু বর্ণনাত্মক, কিছু abstract বিষয়ও আছে। আমি ন্যারেটিভ কবিতা লেখার পাশাপাশি রাজনৈতিক কবিতাও লিখেছি। কিন্তু এখন আমি ফিরে গেছি আগের জায়গায়। শব্দের ব্যবহার, এমনকি একটি যতিচিহ্নের ব্যবহারও যাতে পরিমিতভাবে করতে পারি সেদিকে খেয়াল রেখেছি। আমার অনেক কমতি আছে তবে একটি জিনিস আমি বলতে পারি আমি কখনো ফাঁকি দেইনি। না ব্যক্তিগত জীবনে, না বন্ধুত্বে, না সম্পর্কে, না কবিতায়। আমি কখনো আমার দেশ ও জন্মভূমির সঙ্গে অসৎ আচরণ করিনি, ফলে কখনো আমি বঙ্গবন্ধু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারিনি। আমার যা কিছু সব জন্মভূমির জন্য, বঙ্গবন্ধুর জন্য। যদি আপনারা ধরে নেন এটা আমার বেশি আবেগ-উচ্ছ্বাস, তবে তাই। ‘সুবাসিত রক্তের গম্বুজ’ বইটি উনাকে নিয়ে লেখা, একটু আড়াল থেকে লেখা।

 

শামীম রেজা : এই যে আপনার সততা, দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি, লেখার প্রতি, বঙ্গবন্ধুর প্রতি। তার জন্য আপনাকে অভিবাদন, হে কবি। মহামারী ও যুদ্ধ দুটি আপনার অভিজ্ঞতার মধ্যে, এই দুই জীবনের অভিজ্ঞতা যদি আমাদের ভাগাভাগি করেন। বিশেষ করে বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আপনার জন্ম, একাত্তরের যুদ্ধ আপনি দেখেছেন। এই যে এখন আমরা মহামারীর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, আপনি কতটা আশাবাদী?





হাবীবুল্লাহ সিরাজী : এই যে মহামারী তে আমরা নিমজ্জিত, এটা যুদ্ধের চেয়েও ভয়ংকর। যুদ্ধে অন্তত আমরা বুঝতে পারি আমাদের প্রতিপক্ষ কে এবং আত্মরক্ষায় কী কী করতে হবে। কিন্তু এই যে মহামারী আমাদের তছনছ করে দিয়েছে, আমাদের পরিবারের মধ্যেও প্রবেশ করছে, এর মতিগতি বোঝা মুশকিল। প্রাদুর্ভাব এমন একটি শব্দ যা, দূর হতে চায় না, রেশ রেখে যায়। আর আমি অন্তত বিশ্বাস করি প্রতিটি যুদ্ধের পরে একটা নতুন সৃষ্টি হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে আমরা সারা পৃথিবীর অবস্থানগত দিকটি দেখেছি। বিশেষ করে ইউরোপের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন রেখা তৈরি হলো। যুদ্ধের পরে বিশেষ করে সাহিত্যে যে নতুন ধারা, এই উপমহাদেশেও ত্রিশের দশকটি পাই যুদ্ধপরবর্তী সময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফসল সাম্রাজ্যবাদী বেনিয়াদের আত্মসমর্পণ এবং এই ভারত বিভাগ। দেশবিভাগ আমাদের কাছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও ভয়ংকর ছিল। পাঞ্জাব ও বাংলার যে সকল মানুষ এই রক্তক্ষয়ী অবস্থার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন তারা এখনো তাদের ক্ষত শুকাতে পারেনি। কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে অর্জনের সীমা ও আহরণের সীমা বিস্তৃত হয়েছে পৃথিবীতে। এখন মহামারীর কথা যদি বলি স্প্যানিশ ফ্লুতে প্রচুর প্রাণ ক্ষয় হয়েছে কিন্তু এই মহামারীর শেষটা তো এখনো আমরা জানি না। এই মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকবে আমরা কিন্তু জানি না। এই যে মহামারী সারা বিশ্বকে যেভাবে খাবলে ধরেছে হয়তো তার অর্থ ভয়াবহ। ভয়াবহ এই অর্থে এটা পরবর্তী সময়ে আমরা যদি নতুন একটি নতুন পৃথিবীতে বসবাস করি তবেই মানব প্রজাতি থাকবে। মানুষ তার মেধা ও বুদ্ধির জন্য সমস্ত প্রাণীর উপর কর্তৃত্ব করছে, মানুষের চেয়েও দশগুণ শক্তিশালী প্রাণী থাকা সত্ত্বেও সে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছে। এই পৃথিবীর অবস্থানগত কারণে হয়তো হাজার বা কোটি বছর টিকতে পারে, তখন প্রাণী জগতে একটি বিপ্লব আসবে। আর হয়তো এই মহামারী প্রাণী জগতের বিপ্লবের প্রথম সোপান। এবারের মহামারী কিন্তু পৃথিবীব্যাপী, আগের প্লেগ থেকে শুরু করে স্প্যানিশ ফ্লু কিন্তু অঞ্চলভিত্তিক ছিল। যে পিঁপড়া কাঁধে খাদ্যকণা তুলে তার ঘরে সংগ্রহ করছিলো তাকেও কিন্তু আমি পদদলিত করে চলে গেছি। আর এখন এই ক্ষুদ্র খালি চোখে দেখা যায় না ভাইরাস আমরা যারা কথায় কথায় পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি দিই তাদের কাত করে দিচ্ছে। নতুন জীব পৃথিবীকে শাসন করবে সেই ভাবনা আমি শুরু করেছি, হয়তো কোটি বছর লাগবে। সেই কারণে পাথর থেকে শুরু করে বৃক্ষের শিকড় পর্যন্ত আমি যেন নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি। জড় ও চৈতন্যের concept ভেঙে যাবে। জড়, চৈতন্যে রূপান্তর হবে। আমি সহজ করে বলি, এই যে মার্বেল-পাথর প্রকৃতি থেকে রূপান্তর করে আপনি ঘরের মেঝেতে ব্যবহার করেন, এটাও কিন্তু রং বদলায়। মেঝেতে পড়া বিভিন্ন জিনিস শুষে নেয় এই যে প্রাণের অস্তিত্ব এটা সবকিছুর মধ্যে এসে যাবে। আর এসে গেলেই পৃথিবী নতুন রূপে প্রকাশিত হবে। এই কয় মাসে প্রকৃতি কিন্তু তার আগের রূপ ফিরে পেতে চলেছে। এখন একটি বড় প্রশ্ন আমাদের সামনে চলে এসেছে যে, জীবন আগে না জীবনধারণ আগে। যদি জীবন না থাকে কোন কিছুই থাকে না, আর জীবন রাখতে জীবনকে ধারণ করতে হয়। এই খাদ্যবস্তু যা কিনা জড়, কিন্তু তা গ্রহণ করে আমি চৈতন্যে জেগে থাকি। চৈতন্য জেগে থাকার জন্য উপাদান আসছে জড় থেকে। নতুন উপাদান জড়ের কাছ থেকে আসছে চৈতন্যের জন্য, এটি একটি বড় সংকেত মানবজাতির জন্য। শামীম রেজা আপনি কবি, আপনার নিজস্ব একটা ভাবার দৃষ্টিভঙ্গি আছে, প্রত্যেকের আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি আছে, আমারও আছে। আমি নিজের লেখালেখির প্রতি কখনো অবিশ্বাস রাখিনি, লেখালেখির উপর অনাস্থা রাখিনি। আমি অবাক হয়ে গেছি আমি একসাথে ত্রিশটি করোনাভিত্তিক, জীবনভিত্তিক, মৃত্যুভিত্তিক কবিতা লিখে ফেলেছি। আমি এখন ‘মুহূর্ত’ নামে সিরিজ লিখছি, আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি যে আমি কিভাবে লিখছি! আমি দৈবে বিশ্বাস করি না কিন্তু আমি নিজের উপর আস্থাহীনতার ভিতর দিয়ে আস্থা খোঁজার চেষ্টা করছি এবং সেটাই হবে আমাদের জন্য বড় বিষয়। মহামারীর বিষয়টি কিন্তু এতো সহজভাবে দেখার মতো না। এটা ট্রাম্পের হুট করে প্রেসিডেন্ট হয়ে যাওয়া না, এটা নর্থ কোরিয়ার হুমকি না, এটা উহানের অল্প দিনের ব্যাপার না। এ চক্র বিশাল, এ চক্রে মানবজাতির ইতিহাস নতুনভাবে, নতুন বৈচিত্র্যে, নতুন উপাত্তে, কী ধ্বংসে বা কী সৃষ্টিতে নির্লিপ্ত হবে। তারই বীজ রোপিত হচ্ছে। তাই আসুন, আমাদের চলাচলের অংশটুকু আমরা সহমর্মিতায় প্রশস্ত করি।

 

শামীম রেজা : অনেক ধন্যবাদ, আপনি বিজ্ঞানকে সম্পৃক্ত করে আমাদের যাপিত জীবনের অংশটুকু বর্ণনা করেছেন। ‘বিপ্লব বসত করে ঘরে’র ধারণা একটু বলুন।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : আমার ঐ লেখাটির নাম "বিপ্লব বসত করে ঘরে" এবং এটি খুব আক্ষেপের লেখা। এটি বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করে লেখা বই। উৎসর্গলিপির শেষ দুটি লাইন হলো, "এভাবেই একদিন দেশের নাম বাংলাদেশ হয়ে গেলে, মানুষের নাম হয় শেখ মুজিবুর রহমান।"
জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে পূর্ব-পশ্চিমের যে দ্বন্দ্ব তাতে আমরা বাধ্য হলাম বিভক্ত হতে। এই যে প্রেক্ষাপটটি আমরা রচনা করে যাচ্ছি তা আমাদের দিয়ে রচিত করতে বাধ্য করা হয়েছে যার ফলাফল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। সারা পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আমাদের জাতীয়তাবাদের ভিতর দিয়ে আন্তর্জাতিকতায় প্রবেশ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার পূবেও নাই পশ্চিমেও নাই। মহা পশ্চিমে যিনি বসে আছেন তিনি তো কামান দাগা ছাড়া আর সমুদ্রে তরী ভাসানো ছাড়া কিছুই বুঝে না। আর ইউরোপ! যাকে আজ থেকে চারশো বছর আগেও লুটেরা, বর্বর ছাড়া আর কিছু ভাবা যেত না। এইসব কিছুর মধ্যেও যেটা দুঃখজনক যে আজকে মার্ক্স বা এরকম ব্যক্তিদের মুখেও শ্যাওলা পড়তে দেখা যায়, ধুলি পড়তে দেখা যায়। ইশ্ কি ধুলো, মাকড়সার জাল মার্ক্সের গালে! এই যে নিজের প্রতি ধিক্কার ও ঘৃণা এটিই "বিপ্লব বসত করে ঘরে"। সেই বিপ্লবকে আমি নিজের থেকে নতুন করে শুরু করতে চাই। এই গ্রন্থে তৎকালীন রাজনৈতিক অ্যালিগ্যারি ছিল।

 

শামীম রেজা : আপনি অতীতে এবং ভবিষ্যতে থাকেন এটা আপনার বিভিন্ন লেখায় আমি পেয়েছি। ফলে আমি পিছনে যাচ্ছি এবং সামনে আসছি। এবার আবার পরিবার এবং বাল্যকালে ফিরে যাবো, সেই কথা শুনবো।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : শামীম, আমি কুমারের পাড়ে ছিলাম, এবার পদ্মা আর বুড়িগঙ্গায় যাবো। ১৯৫৯ সালে আমি ফরিদপুর শহরে আসি বিদ্যা শিক্ষার জন্য। বিদ্যা শিক্ষা বইয়ের শব্দ ব্যবহার করলাম কারণ আমার শিক্ষা গুরু স্বর্গীয় সুধন্য চন্দ্র ঘোষ বলেছেন, একটি ধর্ম শিক্ষা, যার সাথে বিদ্যা শিক্ষাও যুক্ত। আরেকটি শিক্ষা, আপন শিক্ষা, নিজ শিক্ষা। এটি তোমার নিজের, নিজে তৈরি করবে পরিপার্শ্ব দিয়ে। গ্রামে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত আছে, ফলে বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন ক্লাস সিক্স থেকে শহরে পড়ানোর জন্য। উনি শহরে একটা ঘর ভাড়া করলেন, বাইশ টাকা ভাড়ার একটি ঘর। ফরিদপুর জেলা স্কুলে পড়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু তখন ক্লাস সিক্সে সিট না থাকায় ফরিদপুর হাইস্কুলে ভর্তি হলাম। ক্লাস সেভেনে ফরিদপুর জেলা স্কুলে ভর্তি হই এবং ওখানে S.S.C করি, বিজ্ঞান শাখায়। রাজেন্দ্র কলেজ থেকে এইচএসসি করেছি, বিজ্ঞান শাখায়। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরে উচ্চশিক্ষা দরকার। এখন যেমন তখন তো এতো বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, অনার্স ছিল না। শুধুমাত্র সাধারণ B.A. কিংবা Bachelor of Science কিংবা bachelor of arts করা যেত। পরিবার যেহেতু নিম্ন মধ্যবিত্ত, আয়ের ব্যবস্থা সামান্য ভূমি আর বাবার চাকরি। ফলে তারা চান তাদের প্রথম সন্তানকে উপার্জনক্ষম করতে। তার জন্য তারা চায় হয় ডাক্তার হও, না হয় ইঞ্জিনিয়ার হও। না হয় অন্য চাকরি করো। তাই বাবা চাইলেন ঢাকায় গিয়ে বিজ্ঞান পড়ি। এবার আমি পদ্মা পাড়ি দিয়ে ঢাকায় আসলাম একা, এক বন্ধুর সঙ্গে। এখনকার মতো বাবা মা যেমন ক্লাস ওয়ান থেকেই সন্তানের সাথে সাথে যাওয়া আসা করে আমাদের সময় তো তেমন না। জীবনে শুধু একবার মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় বাবা সাথে এসেছিলেন, এমনকি আমার স্কুলের ভর্তির ব্যপারটাও আমার এক কাজিনের সহযোগিতায় করেছিলাম। ঐদিন বাবা আমার জন্য একটা ডাব নিয়ে এসেছিলেন, এটা খুব আনন্দের। আমি যখন ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে আসি বাবা আমার জন্য একটা চাদর কিনেছিলেন এবং আমি সেদিন খুব আপ্লুত হয়েছিলাম। তিনি গত হয়েছেন ১৯৯২ সনে, এই উপলক্ষে আমি তাকে স্মরণ করি যে আমি পড়তে যাচ্ছি আর আমার বাবা আমার জন্য একটা চাদর কিনে দিয়েছেন। আমার লেখালেখির অংশটুকু যেদিন কুমারকে সঙ্গে নিয়ে পদ্মা পাড়ি দিয়ে বুড়িগঙ্গার পাড়ে আসলাম সেদিন থেকে এক অর্থে শুরু বলতে পারো।

 

শামীম রেজা : আমরা আবেগের অন্য জায়গায় চলে গিয়েছিলাম বাবার চাদর কিনে দেওয়ার গল্প থেকে। সবারই এইরকম কিছু গল্প থাকে আর এটা থেকেই সুখ দুঃখের আদান প্রদান ঘটে। আমার উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু নিখিলেশ রায় একটি প্রশ্ন বা মতামত রেখেছে তা থেকেই বলছি, অন্যান্য ভাষার জনগোষ্ঠীর বই প্রকাশের জন্য বাংলায় এবং তাদের ভাষায় তার জন্য একটা নির্দিষ্ট কর্নার থাকা দরকার বা প্রাধান্য দেওয়া দরকার। এখনই আমাকে বাংলা একাডেমির প্রসঙ্গে ঢুকে পড়তে হচ্ছে, কারণ আপনি সেই চেয়ারে অধিষ্ঠিত যেখানে আমরা আপনাকে প্রশ্ন করতে পারি। আপনার চিন্তায় এরকম কোন প্রকল্প আছে কিনা?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : বিষয়টি যদি মোটা দাগে দেখি তো তবে একরকম দাঁড়াবে। এই ব্যাপারটি নীতি নির্ধারণী ব্যাপার এবং এর সাথে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যুক্ত। আমি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে এটুকু বলতে পারি যদি কেউ আগ্রহ নিয়ে আসেন এবং বাংলা ভাষায় ও তাদের ভাষায় গ্রন্থ প্রণয়ন করতে চান, এখানে যৌথভাবে কথাটা এজন্য বলছি নীতিমালার কারণে। নীতিমালা অনুযায়ী যারা বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন তাদের বই ছাপানো হয় বাংলা একাডেমি থেকে। তবে এটুকু বলা যায় আমরা আমাদের দিক থেকে সার্বিক সহযোগিতা করবো এবং আপনারা জানেন এখানে গারো ভাষা, মণিপুরী ভাষা নিয়ে কাজ হয়। আমরা চাচ্ছি আপনারা প্রস্তাব নিয়ে আসুন এবং আমরা সেই কাজটি করবো। এই বাংলাদেশে বিভিন্ন ভাষাভাষীর যারা রয়েছেন, এমনকি যারা উর্দু ভাষার লোক রয়েছেন তাঁদেরকেও স্বাগত জানাই, আসুন আমরা আছি। আপনাদের লেখা নিয়ে আমরা সম্মিলিতভাবে হয়তো চেষ্টা করতে পারবো কিন্তু এককভাবে পারবো না। প্রবন্ধের বই হয়তো এককভাবে আমরা করতে পারবো। কিন্তু সৃজনশীল লেখা যেমন, কবিতা, গল্প আমরা পারবো না। আপনারা আমার ভাই, আপনারা আমার বন্ধু, আপনারা আমার আত্মীয়, আপনারা আমার গুরুজন। আসুন সবাই মিলে আমাদের ভাষার সঙ্গে পৃথিবীর সবার ভাষার প্রতি যেন শ্রদ্ধাশীল হই। এই প্রসঙ্গে একটু যুক্ত করি, বিভিন্ন ভাষায় যারা কাজ করছি তাদের প্রধান সমস্যা হলো কিছুদিন পরে খেই হারিয়ে ফেলেন। আমি বাইরে কাজ করতে গিয়েও দেখেছি। আমরা যে অবস্থান থেকে কাজগুলো করতে চাই এগুলো নিয়ে একটি দীর্ঘ মেয়াদের পরিকল্পনা থাকে। যেমন, অনুবাদ নিয়ে আমরা নতুনভাবে ভাবছি। বাংলা একাডেমি ভাবতে শুরু করেছে বাংলা কবিতার আবৃত্তি নিয়ে। অনুবাদ নিয়ে আমাদের একটি প্রকল্প আছে। আর বাংলা কবিতা কেন, কিভাবে আমি পাঠ করবো, বাংলা একাডেমি এ ব্যাপারে একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের কথা ভাবছে। আসুন আমরা বাংলা একাডেমি নিয়ে নতুনভাবে কাজ করি আগামী দিনে আমাদের সন্তানেরা যাতে তার ফল লাভ করে।

 

শামীম রেজা : আবার পিছনে যাই, আপনি পদ্মাপাড় থেকে বুড়িগঙ্গার পাড়ে আসলেন। আপনার হল নিয়েও বিশেষ একটি গল্প আছে। তার আগে প্রথম প্রেম, বিয়ে, সংসার।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : শামীম, এখানটায় আমি বলি আত্মজীবনীর ব্যাপারে সুনীল দা একটা ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন যে, ‘অর্ধেক জীবন’-এ। আমি অন্তত বিশ্বাস করি বাঙালি কোন লেখক তার পুরোপুরি জীবন তার লেখায় আনতে পারেননি। তাই এই যে প্রেমের কথা, বিয়ের কথা, সংসারের কথা তা বললে মেকি কথা হয়ে যাবে। তবুও আমি সংক্ষিপ্ত করে গ্রহণযোগ্য করে বলি, যে প্রেমের বিয়ে। কিন্তু প্রেমের নানাবিধ পন্থা থাকে, পথ থাকে সুচারুভাবে প্রেমের বিয়ে। তারপরে সংসার, ভালো এবং মন্দ মিলানো। যদি স্বামী হিসেবে আমার কর্তব্যের কথা বলতে বলেন তো সবাই মেনে নেবে আমার চেয়ে সংসারধর্ম পালনে খারাপ স্বামী আর হয় না। যদি উপার্জনের কথা বলেন, আমার শেষ উপার্জনটুকুও চেয়েছি সন্তানের সাথে, স্ত্রীর সাথে, পিতামাতার সাথে ভাগাভাগি করে নিতে। দায়িত্বের কথা যদি বলেন, তবে আমি চেষ্টা করেছি। আমি কখনো দেশের বাইরে চাকরি করতে চাইনি, কষ্ট করেও দেশে থাকতে চেয়েছি। ১৯৭২ সালে এমনও দিন গেছে যে অফিস থেকে এসে একটি প্যান্ট কেচে শুকিয়ে আবার পরেরদিন পরে অফিসে গেছি। তবুও কষ্ট ছিল না। কিন্তু ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে মনে অনেক কষ্ট নিয়েই আমাকে দু'বার দেশের বাইরে যেতে হয়েছে। ১৯৮০ সালের পরে ও ১৮৯৩ সালে এবং পরেরবার দীর্ঘ পাঁচ বছর দেশের বাইরে থাকতে হয়েছে। শুধু উপার্জন এর মূল ব্যাপার ছিল না, পেছনে অন্য কারণ বা কার্যকর করণ ছিল। ঐ যে বললাম আত্মজীবনীতে পুরোটা বলা যায় না। আমি পাঁচ বছর মালয়েশিয়ায় ছিলাম, একবছরের বেশি সময় কুয়েত ও ইরাকে ছিলাম। ওখানে যা দেখেছি বিদেশে যে প্রবাসীরা কাজ করেন তাদের দেশের জন্য টান অসামান্য, দেশকে, দেশের মানুষ তারা অসম্ভব ভালোবাসেন। আমরা যখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতাম ওনারা কতটা ভালোবাসার সাথে গ্রহণ করতেন তা বলার মতো না। আমার লেখালেখির জীবন অনুবাদ দিয়ে শুরু। দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আজাদে আমার প্রচুর লেখা ছাপা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে আমি শ্রদ্ধেয় স্বর্গীয় রণেশ দাশগুপ্তকে স্মরণ করি, উনি আমাকে যথেষ্ট প্রশ্রয় দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তার মতো প্রশ্রয় পেয়েছি আমি আহসান হাবীব ভাইয়ের কাছ থেকে দৈনিক বাংলার সময়ে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কিছু কথা বলি, আমি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিয়াকত হলের ছাত্র ছিলাম, যেটা এখন সোহরাওয়ার্দী হল। এই হলের নাম পরিবর্তন হয় মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলনের সময় এবং আমাদের বন্ধু ড. মোজাম্মেল খান লিয়াকত হলের ছাত্রলীগের সভাপতি থাকা অবস্থায় লিয়াকত হলের নাম পরিবর্তন করার প্রস্তাব করেন। তখনই একটা কাগজে লিখে এটা টাঙিয়ে দেয়া হয়। আমি হলের ৪০৩ নাম্বার রুমে টানা ১৯৬৬ থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় ১৯৭২ পর্যন্ত কাটিয়েছি। আমি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও আমার বন্ধুদের একটা বড় অংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। এখানে আমি একটু বলি, ষাটের দশকে শিল্প, সাহিত্যের ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে রাজত্ব ছিল, তাতে কারো প্রবেশ বা গমন দুঃসাধ্য ছিল। আমি ও আমার বন্ধুদের বেলায় দেখিনি প্রকৃত অর্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা মূলধারার, যারা সাহিত্য চর্চা করছেন তাদের কাছে কোন পাত্তা পান! স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত এই অবস্থা ছিল। হ্যাঁ, আমার ব্যক্তিগতভাবে বন্ধু ছিল অনেকেই কবি মোহাম্মদ নূরুল হুদা, হুমায়ুন কবীর, ছফা ভাই আমি আরো অনেকের নাম বলতে পারি। কিন্তু এটা আমার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে সমষ্টিগতভাবে গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। পরবর্তী সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিল্প ও সাহিত্যের সঙ্গে যেভাবে কাজ করে এগিয়ে গেছে। এখন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে সবাই যেমন গ্রাহ্য করে তখন তেমন ছিল না। এটি আমার জন্য একটি বড় সংকট ছিল, আমাকে বা আমাদের এককভাবে লড়তে হয়েছে। তবে যারা অভিনয় করতেন, গান করতেন বা অন্যকিছু যেমন, আবুল হায়াত ভাই তিনি তার মতো করে করতেন এবং পরবর্তী সময়ে তিনি দাঁড়িয়ে গেছেন। কিন্তু তার এ সংকট ছিল না। আবার অন্য দিকে দেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে এসেছিলেন, যেমন এনামুল হক তাদের অবস্থা ভিন্ন ছিল, তারা নাট্যদলের সাথে যুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ একজন আবুল হায়াত যে অবস্থানে ছিলেন আমরা সাহিত্য করতে গিয়ে সে অবস্থায় ছিলাম না। একটা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সেমিস্টার সিস্টেমে কতটুকু সময়ই বা সাহিত্যে দেবে বা তার পড়ালেখায় দেবে বা কতটুকু সময় তার কর্মজীবনের জন্য তৈরি হবে! স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে আমরা যখন ঢাকায় আসলাম তখন আমাদের সংকট, কী করবো! এর মধ্যে ১৯৬৯ সালে আন্দোলন করেছি, ৭ মার্চের ভাষণ শুনে ধানমন্ডি ৩২-এ যাওয়া, যুদ্ধে অংশগ্রহণ এগুলো সাধারণ। এগুলো নিয়ে বড়াই করে বলার কিছু নেই এগুলো সেই সময়ের সাধারণ ব্যাপার, এমনকি আমার বন্ধুরা আমার চেয়ে অগ্রগামী ছিল। ১৯৭২ সালে আমি প্রথম চাকরি করি। আছির উদ্দীন সাহেব তখন ঝিনুক নামে একটা কাগজ করতেন, এটি নন্দলাল দত্ত লেন থেকে বের হত। এই চাকরির বেতন ছিল তখন আড়াই'শো টাকা। যেহেতু এই টাকায় চলা মুশকিল তাই তখন সাপ্তাহিক বাংলাদেশ নামে একটি পত্রিকা বের হতো সেটাতেও কাজ করি, এটার সাহিত্য পাতা দেখতাম। দুপুর পার করে ঝিনুকে, আর সন্ধ্যাকালীন সময়ে সাপ্তাহিক বাংলাদেশে কাজ করতাম। পরে অক্টোবর মাসে আর্থিক সংকটের কারণেই আমি ঐ চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে আসি। এই আয়ে বিয়ে করে ঢাকা শহরে সংসার করা অসম্ভব, তারপরে পরিবার-পরিজন, পিতামাতাকে দেখতে হয়েছে। সর্বোপরি এর মধ্যেও সময় বের করতে হয়েছে সাহিত্যের জন্য, লেখালেখি জন্য, আড্ডার জন্য। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে বিয়ে করি, আমার বড় দুই মেয়ে আর একটি পুত্র সন্তান। আমার স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। আর আমরা দুই ভাই, ছয় বোন ছিলাম, বাবা কৃষি বিভাগে চাকরি করতেন। এই হলো মোটা দাগে পরিচয়। আর প্রথম বই করার ব্যাপারে আমি এখন স্মরণ করবো আমাদের প্রয়াত আবদুর সাত্তার ভাইকে। ওনাকে অনেকেই চিনবেন, আরবি কবিতা অনুবাদ করতেন। ভালো অনুবাদক, ভালো লেখক, সর্বোপরি ভালো মানুষ। মুক্তধারা তখন নতুনদের বই বের করছে। ডেকে নিয়ে সাত্তার ভাই বললেন বই দেন, বই করবো। আমার সৌভাগ্য যে আমার প্রথম কবিতার বই ‘দাও বৃক্ষ দাও দিন’ মুক্তধারা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। আমার এখনকার শেষ বই ‘জমিনে ফারাক নেই’ প্রথমা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। আমি আমার প্রকাশকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই যে আমার মতো অভাজন লেখককে সহ্য করেছেন। আমার পাঠকদের প্রতি কৃতজ্ঞ যে আমার মতো অভাজন লেখকের লেখা পড়েছেন।

 

শামীম রেজা : আমি এবার সরাসরি কবিতায় প্রবেশ করতে চাই। আপনার কবিতার মধ্যে একটা মেট্রোপলিটন মন উপস্থিত যেমন, আত্মহত্যার মতো পরিস্থিতি—এইরকম বহু বলা যাবে। গ্রামের ছেলে কিন্তু মেট্রোপলিটন মন, দুটোর সংঘর্ষ ঘটে কি?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : না, ঘটে না। এটা আসলে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু নয়। আমার যে গ্রামের অবস্থান আর মেট্রোপলিটন অবস্থান এর মধ্যে ফারাক খুবই কম। আমরা খুব উচ্চাভিলাষী হয়ে শহরকে অনেক বড় জায়গায় নিয়ে গিয়েছি। মনে হয় যেন নিউইয়র্ক বা টোকিওর পাশে ঢাকাকে রাখতে চাই, আবার গ্রামকে ঐ যেন অজপাড়াগাঁ হিসেবে ফেলে রাখতে চাই। আমাদের এই হীনমন্যতার জন্য আমাদের শহর ও গ্রাম পরস্পর থেকে দূরে সরে গেছে। গ্রাম ও শহর অঙ্গাঅঙ্গী ভাবে জড়িত। আমার শুরু থেকেই উদ্দেশ্য ছিল আমি অন্য দৃষ্টিতে জীবনকে দেখবো, অন্য দৃষ্টিতে বিজ্ঞান পড়বো। আমি বারবার বলি যে আমার কোন বর্তমান নাই, আছে শুধু অতীত আর ভবিষ্যৎ। আমি বর্তমানকে ডিঙিয়ে যাই। মেট্রোপলিটন আর গ্রাম কোন ভিন্ন কিছু নয়, এটা শুধু দৃষ্টিভঙ্গি, লেখার দৃষ্টিভঙ্গি, প্রকাশের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আধুনিকতার দৃষ্টিভঙ্গি।

 

শামীম রেজা : আপনার বই ‘জো’ এই যে আঞ্চলিক কবিতাগুলো আপনি লিখেছেন সাম্প্রতিক সময়ে। এটার ব্যাপারে একটু বলুন।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : ‘জো’ লেখার অনুপ্রেরণা আপনারা, আমার তরুণ বন্ধুরা। এই আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে আমাদের অগ্রজ সৈয়দ শামসুল হক কাজ করেছেন, অনুজ বন্ধু রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ কাজ করেছেন। তাদের কাজের অংশটুকু একরকম ছিল। ‘জো’-এর মধ্যে দুটো মজার বিষয় আছে যদি আপনি খেয়াল করেন। বাংলা ভাষায় পঞ্চাশটি বর্ণ নিয়ে পঞ্চাশটি কবিতা আছে এবং বাংলাদেশের পঞ্চাশজন মহান ব্যক্তি নিয়ে কবিতা আছে। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য ছিল আমার কুমারের ভাষা, আমার রসুলপুর অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা তুলে আনা। একজন হাজেরা খাতুন বা একজন আব্দুল আলীমের গানের ভাষ্যে কিন্তু পার্থক্য আছে, সেই পার্থক্যটা কিন্তু আমার ‘জো-এ আছে। তার জন্য আমি হয়তো সৈয়দ শামসুল হক বা রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ থেকে আলাদা।

 

শামীম রেজা : পুঁজিবাদ, শিল্পের যে আড়াল, প্রতীক, রূপকল্প, চিত্রকল্প যা বিশেষত প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কাল থেকে চর্চা শুরু হলো প্রবলভাবে। এতে শুধু শিল্পের কথা বলে, আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিকরা বললেন, মানুষের কথা সমাজ-রাষ্ট্রের প্রতি কমিটমেন্টের কথা। এটিরও চর্চা হলো। কোন ধরনের কবিতা আপনার পছন্দ?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমাদের এই অঞ্চলে বাংলা কবিতার যে অংশটুকু ছিল এবং পশ্চিমবঙ্গে ছিল তা নিয়ে আমরা মোটা দাগে একটা কথা বলে আসছি। আমরা একজন নজরুলের কথা বলে আসছি, আমরা একজন জীবনানন্দ দাশের কথা বলে আসছি। আমরা ত্রিশের উত্তরণের কথা বলে আসছি। চল্লিশে আমরা একজন সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে, একজন অরুণ সেনকে পেয়েছিলাম। এই যে পাওয়া এটা ছিল ভিন্ন পাওয়া। বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দিকে লক্ষ্য রেখে, রুশ বিপ্লবকে সামনে রেখে আমাদের এই কাজকে আমরা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু পঞ্চাশের নব উত্থানের পরে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবক্ষয়ের পরে, ধ্বংসের পরে আমরা নতুনভাবে কবিতার অংশটুকু দেখতে শুরু করলাম। আর ষাটের দশকে নৈরাজ্য ও নৈরাশ্য আমাদের ভিতরে যেভাবে কাজ করলো যে আমাদের মধ্যে নিউরিয়েলিজম, সুরিয়ালিজম একদম ঢুকে গেল, তা যে খারাপ এমন নয়। কিন্তু বক্তব্যের দিক থেকে আমরা চাইলাম নির্ভার হতে। এই নির্ভার হওয়ার অংশ হিসেবে আমরা অনেককে পেয়েছি, অনেকের নাম করা যায়। কিন্তু আমাদের অংশে আমরা বাংলার যে মূল কবিতার সাথে যুক্ত হয়েছিলাম, বাংলার যে চিত্রকল্পের সাথে যুক্ত হয়েছিলাম। বাংলা কবিতার ধারাবাহিকতা ও পরম্পরার সাথে যুক্ত হয়েছিলাম তা যেন বারবার আমাদের পদাবলীর কাছে টেনে নিয়ে যায়। এটি আমাদের একরকম অন্তরায় হয়েছিল। আজ পৃথিবীর এই অবস্থানে এসে কবিতার রূপ কি হবে কবি সেটা নতুনভাবে নির্মাণ করছেন। এখন কিছুটা সরে এসে আমি নির্মেদ একটা লেখা লিখছি, আমি এখন মনে করি যে আমি যদি একটি সেমিকোলন বাড়তি লিখি তো পাঠক আমাকে ক্ষমা করবে না। আমাদের এই অংশে এসে আমরা চেষ্টা করছি কবিতাকে যতটা নির্ভার করা যায়, কবিতাকে যতোটা মানুষের কাছাকাছি নেওয়া যায়।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষ

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune