X
বৃহস্পতিবার, ০৫ আগস্ট ২০২১, ২১ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

বসন্তের লঘু হাওয়া

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০

এখন বলবো নিজের অন্ধকারে বসে
একেকটি সাদা পৃষ্ঠার চেয়েও নিরবতা, ঘরে;
অন্তরীক্ষ তো আছেই তারা ঝিলমিল

সম্ভবত, কলম থেকে রক্ত বের হচ্ছে
বা লেখাটা রক্ত দিয়েই

[কোলাহল]
: নিয়ন্ত্রিত মুখ কথা বলছে
: বা কীবোর্ড
: বা আঙুলের ডগা
: বা আঙুলসমেত মানুষ
: বা মানুষের রাষ্ট্র
: বা মানুষের ভূমি

চারদিকে পুলিশ পুলিশ
[ভ্র ভ্র ভ্র ঠা ঠা ঠা
আলোয়, না-আলোয়, অন্তর্নগরে]

আমি চুপ থাকবো না

ভেতরে হাত ঢোকাবে?
যেভাবে ছেঁড়ে শিশুর কুঁড়ি?

আমি আরো অনিশ্চিত ঘরে
ঢুকে পড়বো
দেয়ালগুলো টর্চার সেল থেকে
খুলে এনে লাগাবো

যাতে বাইরেই থাকে বসন্তের লঘু হাওয়া

[ঘোষক]
: কেউ কি প্রস্তুত আছে লাশের ভার বহন করার?
[ফিসফিস]
: লাশ? কার লাশ কীসের লাশ?
: না, আমরা কেউ নিহত নই
: আমরা ঠিক ঠিক গুনে দেখেছি, কেউ নিখোঁজ নই

মর্গে শোনা যায় কুহু কুহু

/জেডএস/

সম্পর্কিত

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

নতুন বইয়ের খবর

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২১, ১০:১৫

গত ২ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে হারুকি মুরাকামির গল্পের বই ‘জো-নো-শোমেৎসু’-এর বাংলা অনুবাদ ‘হাতিটা উধাও’। অনুবাদ করেছেন অভিজিৎ মুখার্জি, অনুরাধা চট্টোপাধ্যায়, রীমা রায় এবং শুভা বসু। প্রকাশ করেছে যাদবপুর ইউনিভার্সিটি প্রেস, প্রচ্ছদ করেছেন কৌস্তভ চক্রবর্তী, ২৭৯ পৃষ্ঠার বইটির মুদ্রিত মূল্য ৪৫০ ভারতীয় রুপি।  

পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন;
মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে

সভ্যতার যে কোনো পর্যায়েই মানুষকে তার নিজের অস্তিত্বের নানা বিপন্নতার সার্বিক চিত্রটার মুখোমুখি হতেই হয়। খুঁজে বের করতে হয় আবহমান কালের মানুষী সত্যের পরিপ্রেক্ষিতে তার সেই সময়কার চাহিদা ও চেতনার পরিস্থিতিটা কী। প্রাণীজগতে বিবর্তনের পথে মানুষের উদ্ভব হওয়া ইস্তক সভ্যতার নানা পর্যায় পার হয়ে আসতে আসতে মানুষ অর্জন করেছে তার স্বভাবের কিছু প্রাথমিক দিক, যা দু’চার সহস্রাব্দ সময়ের বা ভৌগলিক দূরত্বের প্রভাবের ঊর্ধ্বে। স্বভাবের এই প্রাথমিক দিকগুলোর হদিস যেমন নৃতাত্ত্বিকরা দেন, মনস্তত্ত্ববিদরা দেন, দার্শনিকরা দেন, ইতিহাসের কিছু কালজয়ী প্রজ্ঞার রেখে যাওয়া বাণীও সেগুলোর সঙ্গে মানুষের পরিচয় করিয়ে দেয়। নানা সভ্যতার ধারার সম্মিলিত এক অখণ্ড প্রবাহের গর্ভ থেকে উঠে এসে, দৈনন্দিন জীবনধারণে ব্যস্ত সাধারণ মানুষের কাছে সেইসব মানুষী সত্য পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করে সাহিত্যের হাত ধরে। কি উপন্যাস, কি ছোটগল্প, একেকটা ছোটো ছোটো জানালা খুলে দেয়, কিছুটা কিছুটা করে সেই সত্য যাতে মানুষের গোচরে আসে, নিজের সভ্যতার, সমাজের বর্তমান রূপটিকে বিচার করতে শেখে মানুষ আবহমানের পরিপ্রেক্ষিতে। বর্তমান সময়ের বিশ্বসাহিত্যের পাঠকের বৃহত্তম অংশের কাছে ঘনিষ্ঠতম হয়ে ওঠার গৌরব, তর্কসাপেক্ষে হলেও, যে জাপানি সাহিত্যিকের ওপর ন্যস্ত হতে পারে, তাঁর নাম মুরাকামি হারুকি। ২০২১ সালে, এই অনুবাদ প্রকাশের সময় আর নতুন করে মুরাকামি সম্বন্ধে নানা তথ্য পাঠকদের জানানোর তেমন প্রয়োজন নেই। নিজস্ব আখ্যানশৈলিতে আবহমান কালের মানুষী সত্যের সঙ্গে এই শতাব্দীর মানুষী বিপন্নতার মুখোমুখি দেখা করিয়ে দেওয়াই তাঁর জনপ্রিয়তার ভিত্তি বলে অনেকেই মনে করেন। উপন্যাস ও ছোটগল্প উভয়ক্ষেত্রেই অনায়াস বিচরণকারী এই লেখকের প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘জো-নো-শোমেৎসু’, এ-যাবৎ প্রকাশিত হওয়া তাঁর সমস্ত গল্পসংকলনের মধ্যে সবচেয়ে সমাদৃতও বটে। সাহিত্যের ভূমিকার যে সংজ্ঞা দিয়ে এই লেখাটা শুরু করেছি, সেটিকে সর্বাংশে সার্থক হয়ে উঠতে দেখা যায় এই সংকলনের গল্পগুলোতে। ২০০৫ সাল থেকে শুরু করে, মাঝখানে বেশ দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান রেখে রেখে এই সংকলনের কিছু গল্প অনুবাদ করেছিলাম বিভিন্ন পত্রপত্রিকার জন্য। প্রত্যাশাতীত সাড়া পেয়ে, মনে একটা ইচ্ছে তৈরি হয়েই ছিল পুরো সংকলনটাই অনুবাদ করে ফেলার।

ঐতিহাসিক কারণেই বাঙালি সাহিত্যমোদীর সঙ্গে পশ্চিমী সাহিত্যের যতটা ঘনিষ্ঠ পরিচয়, জাপানি সাহিত্যের সঙ্গে ঠিক অতটা নয়। কিন্তু অতি-সাম্প্রতিক কালে তরুণ প্রজন্মের বাঙালি পাঠকদের একাংশের মধ্যে একেবারে এইসময়কার জাপানি লেখকদের গল্প উপন্যাস ইংরিজি অনুবাদে পড়ার ঝোঁক চোখে পড়ার মতো বেড়ে গিয়েছে। সেটা লক্ষ করেই মনে হলো যে ‘জো-নো-শোমেৎসু’ সংকলনটা অনুবাদে প্রকাশ করার একটা দায়িত্ব স্পষ্টতই তৈরি হয়েছে। সংকলনের গল্পগুলোর প্রাসঙ্গিকতা ও আবেদন এই দেড় দশকে এতটুকুও হ্রাস পায়নি, বরং কিছু ক্ষেত্রে সম্ভবত বেড়ে গিয়েছে।

কলকাতায় যেসব তরুণ তরুণীরা জাপানি ভাষা শেখেন, ভাষাগত দক্ষতার একটা পর্যায়ে পৌঁছে তাঁরা যদি জাপানি সাহিত্য অনুবাদে আগ্রহী হন, পাঠকেরা প্রভূতভাবে এই সমৃদ্ধ সাহিত্যের স্বাদ গ্রহণ করে আনন্দিত ও উপকৃত হবেন। সেই কারণে আমার মনে হয়েছিলো, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপানি ভাষার শিক্ষক হিসেবে যাঁদের ছাত্রছাত্রী হিসেবে পেয়েছি, তাঁদের মধ্য থেকে কেউ কেউ দু’একটা করে গল্প অনুবাদ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করলে, অনতিদূর ভবিষ্যতে নিজেরাই অনুবাদের কাজে হাত দেওয়ার ব্যাপারে ক্রমেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারবেন। আমার তিন ছাত্রী, শ্রীমতি শুভা বসু, শ্রীমতি রীমা রায় ও শ্রীমতি অনুরাধা চ্যাটার্জি এই সংকলনের মোট সতেরোটা গল্পের মধ্যে, একেকজন দু’টি করে, মোট ছ’টা গল্প অনুবাদ করেছেন। প্রস্তাব দেওয়ামাত্র, কর্মব্যস্ততার মধ্যেও নির্দ্বিধায় অনুবাদের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছেন বলে তাঁরা আমার ধন্যবাদার্হ।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যে হাই-ভোল্টেজ ল্যাবরেটরি আমার কর্মক্ষেত্র, তার থেকে দশ কি পনেরো গজ দূরত্বে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনার যে দপ্তর, সেখানকার পরিবেশ, যাঁরা নিবিষ্ট হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন বলে সর্বদা দেখা যায়, তাঁদের নিষ্ঠা, যোগ্যতা, এতটাই আমার ভরসার জায়গা যে আলস্যের শিকার না হয়ে বেশ কিছুদিন টানা পরিশ্রমে আমারও উৎসাহ আদ্যন্ত বজায় ছিলো। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনার ডিরেক্টার অধ্যাপক অভিজিৎ গুপ্ত, আর যাঁরা পাণ্ডুলিপিকে মুদ্রণযোগ্য পর্যায়ে উপনীত করাতে আন্তরিক নিষ্ঠা নিয়ে কাজ করেছেন, সেই শুচিস্মিতা ঘোষ, কৌশিক আনন্দ কীর্তনীয়া, এঁদের কারুকেই ঠিক ধন্যবাদ দেব না, কারণ আমরা একসঙ্গে কাজ করে এই বইটাকে একটা রূপ দিয়েছি, পাঠকের ভালো লাগলে, আমরা এই ক’জন তৃপ্ত।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

নতুন বইয়ের খবর

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২১, ২০:৩৮

ভিনদেশের স্মরণীয়-বরণীয় এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিভিন্ন লেখক থেকে শুরু করে স্বল্প পরিচিত, কিন্তু প্রতিভাবান তরুণ লেখকদের নানান স্বাদের এবং আলাদা মেজাজের চব্বিশটি ছোটগল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে ‘ভিনদেশের সেরা দুই ডজন গল্প’ সংকলনটি।

এই সংকলনের গল্পগুলোকে তিনটি পৃথক পর্বে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম পর্বে আছে চার দেশের পাঁচজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখকের আটটি গল্প—রাশিয়ার ইভান বুনিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্নেষ্ট হেমিংওয়ে ও টনি মরিসন, মিশরের নাগিব মাহফুজ এবং পোল্যান্ডের ওলগা তোকারজুক রয়েছেন এই তালিকায়। দ্বিতীয় পর্বে রয়েছেন তিন দেশের তিনজন ম্যান বুকার পুরস্কার বিজয়ীর চারটি গল্প—নাইজেরিয়ার বেন ওকরি, কানাডার মার্গারেট অ্যাটউড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ স্যন্ডার্স রয়েছেন এই তালিকায়। তৃতীয় পর্বে রয়েছে ছয় দেশের নয়জন লেখকের বারোটি গল্প। এরা হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেট চপিন, জয়েস ক্যারল ওটস্, শারম্যান আলেক্সি, লুসিয়া বার্লিন, ইজরায়েলের এটগার কেরেট, নেপালের বিশ্বেশ্বর প্রসাদ কৈরালা, নয়নরাজ পান্ডে ও দিলীপ আচার্য্য, ভারত বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান অনুকৃতি মিশ্র, ভূটানের পেমা চইডার এবং মালদ্বীপের মাদুলু ওয়াহিদ ।

পাঠকের সুবিধার্থে প্রতিটি গল্পের শুরুতে গল্পকারের পরিচিতি ও সাহিত্যকর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হয়েছে, যা গল্পকার সম্পর্কে উৎসুক পাঠকের মনে সামান্য ধারণা দিতে সক্ষম হবে। এছাড়া প্রতিটি গল্পের শেষে রয়েছে গল্পসূত্র।

‘ভিনদেশের সেরা দুই ডজন গল্প’ গ্রন্থের প্রতিটি গল্পেই গল্পকারের দেশ এবং সময় ছাড়াও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মূল্যবোধ ও ঘাত-প্রতিঘাতের বিষয় ফুটে উঠেছে। প্রতিটি গল্পের দীর্ঘ আলোচনা বা সমালোচনা, এমনকি চুলচেরা বিশ্লেষণ না করে বাছাইকৃত কয়েকটি গল্পের সারকথা বা মূল বিষয় এবং অসাধারণ বৈশিষ্ট্য অতি সংক্ষেপে আলোকপাত করা হয়েছে ভূমিকায়।

বইটি প্রকাশ করছে ‘দিব্য প্রকাশ’, প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২১, ১২:২৬

[আবুল হাসান ষাটের দশকের অন্যতম কবি। জন্মেছিলেন ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট, মাত্র ২৯ বছর বয়সের জীবনে তিনি সৃষ্টি করেছেন অমূল্য সোনালি শস্য। তার মৃত্যুর প্রায় উনিশ বছর পর প্রকাশিত হয় ‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’। যার ভূমিকা লেখেন দেশবরেণ্য কবি শামসুর রাহমান। সেই ভূমিকাটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো কবি আবুল হাসানের জন্মদিন উপলক্ষ্যে।]

পঞ্চাশের দশকের কয়েকজন কবি বাংলাদেশের কবিতার নতুন জমি তৈরি করলেন, আবাদ করলেন সেই জমি মেধা ও শ্রমে। এই জমিতে পা রেখেই ষাটের দশকের সিকদার আমিনুল হক, রফিক আজাদ এবং আবদুল মান্নান সৈয়দ বিশিষ্টতা অর্জন করেন। তাঁদের আবির্ভাবের পরই সানাউল হক খান, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা এবং অকালপ্রয়াত আবুল হাসানের কাব্যশস্য হিলহিলিয়ে ওঠে। সর্বপ্রথম আবুল হাসানের কবিতা পড়ি ‘সংবাদ’-এর সাহিত্য সাময়িকীতে। সেই বৈশিষ্ট্যহীন কবিতার লেখকের নাম ছিল আবুল হোসেন। তখন আবুল হাসান আবুল হোসেন নাম লিখতেন। বোধহয় সেটাই ছিল তাঁর পিতৃদত্ত নাম। অল্প দিনের মধ্যেই হাসানের মনে পড়ে যায় যে, চল্লিশের দশকের একজন বিখ্যাত কবির নামও আবুল হোসেন। তাই তিনি হোসেন থেকে হাসান-এ রূপান্তরিত হলেন। এই নাম পরিবর্তনের পর তাঁর কবিতাও বদলে যেতে লাগলো। একজন খাটি কবির জন্ম হলো। এই কবির জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কবিতায় ভরপুর ছিল। যেন হাওয়ায়, ধূলোয়, গাছের পাতায়, পাখির ডানায়, নদীর জলে, দিনের কোলাহলে, রাত্রির নিস্তব্ধতায় তিনি কবিতা পেয়ে যেতেন অবলীলায়। যিনি সর্বক্ষণ কবিতার ধ্যানে মগ্ন নন তার পক্ষে অসম্ভব এই কবিতা-আহরণ।

আবুল হাসান মাত্র ২৯ বছর বয়সে মারা যান। তাঁর মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ক্ষীণায়ু জন কীটস্ এবং সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথা। জানি না, কত বছর বয়সে তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। তাঁর কবিজীবন দীর্ঘ নয়। তাঁর সংক্ষিপ্ত কাব্যচর্চা আমাদের উপহার দিয়েছে ‘রাজা যায় রাজা আসে’, ‘যে তুমি হরণ করো’ এবং ‘পৃথক পালঙ্ক’-এরমতো তিনটি উজ্জ্বল কাব্যগ্রন্থ। তাছাড়া তাঁর অগ্রন্থিত কবিতার সংখ্যাও কম নয়। আবুল হাসান যেসব কবিতা গ্রন্থভুক্ত করেন নি সেগুলোতেও হাসানীয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

আবুল হাসান রচনা সমগ্র আবুল হাসান বরিশালে জন্মগ্রহণ করে। তাঁর শৈশব কেটেছে বরিশালের মনোমুগ্ধকর নৈসর্গিক পরিবেশে। সেখানকার গাছগাছালি, নদীনালাকে তিনি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন তাঁর কবিতায়, যেমন করেছেন ঢাকা বাসের অভিজ্ঞতাকে। গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের মিলিত অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতাকে বর্ণাঢ্য, সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর কবিতা সহজেই পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে। গোড়ার দিকে তাঁর কবিতায় জীবনানন্দ দাশ এবং আরো কোনো কোনো কবির ছায়া লক্ষ করা গেছে। অনুজ কবির উপর অগ্রজ কবির প্রভাব পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ কোনো কবিই ভুইফোড় কিছু নন। একটি ধারাবাহিকতার অন্তর্গত তিনি; অতীতের কাব্যকৃতি একজন নতুন কবিকে তার শিল্পসৃষ্টির পক্ষে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। নতুন কবি তার নিজস্ব এলাকা সৃষ্টি করেন পূর্বসূরীদের অর্জনকে কাজে লাগিয়ে, তাঁদের কাব্যকলার কাঠামোয় বন্দী হয়ে নয়। নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পেতে হয় তাকে। আবুল হাসান তার নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পান প্রাথমিক অনুশীলনের প্রক্রিয়ার মধ্য থেকেই।

আবুল হাসান মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত কবি, কবি ছাড়া আর কিছুই নন। তাঁর প্রতিটি নিঃশ্বাসে বয়ে গেছে কবিতা। তাঁর এলোমেলো জীবনের ছাপ পড়েছে তার কবিতাতেও। এই এলোমেলোমি তাঁর কবিতার দুর্বলতা এবং শক্তি। আবুল হাসানের কবিতার আপাত-অসংলগ্নতা এমনই হৃদয়গ্রাহী যে পাঠক অভিভূত হয়ে পড়েন। তাই, তরুণ কবিদের কাছে তিনি এত প্রিয়। যখন কোনো কোনো তরুণ কবির রচনায় আবুল হাসানের পংক্তিমালার ছায়া দেখতে পাই, তখন বিস্মিত হই না। তিনি যৌবনের বিষণ্নতা, নৈঃসঙ্গ্য এবং দীর্ঘশ্বাসের কবি। তাঁর শিল্প-সৌন্দর্য বোধ যেমন তীক্ষ্ণ তেমনি তীব্র মানুষের প্রতি তাঁর মমতা, জীবনের প্রতি ভালোবাসা। কবি-সমালোচক আবু হেনা মোস্তফা কামাল যথার্থই বলেছেন, “চূড়ান্ত ব্যবচ্ছেদ করলে তাঁর (আবুল হাসানের) ভেতরে মায়া ও মমতা, মানুষের জন্যে দুঃখবোধ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না।” একজন সত্যিকারের কবিই তো যীশু খৃষ্টের মতো সকল মানুষের হয়ে দুঃখ পান।

আবুল হাসান তাঁর একটি কবিতায় বলেছেন, “শিল্প তো নিরাশ্রয় করে না। কাউকে দুঃখ দেয় না।” সেই একই কবিতায় তিনি লেখেন,

“শিল্প তো স্বাতীর বুকে মানবিক হৃৎপিণ্ড,
তাই আমি তার হৃৎপিণ্ডে যাই চিরকাল রক্তে আমি
শান্তি আর শিল্পের মানুষ।”

হ্যাঁ, তিনি শান্তি আর শিল্পের মানুষ, সর্বোপরি মানবপ্রেমী প্রকৃত কবি। এজন্যেই তাঁর রচনা সমগ্র আমাদের অবশ্যপাঠ্য। একজন কবির মূল্যায়নের জন্যে তাঁর প্রধান এবং গৌণ সকল রচনাই পড়া প্রয়োজন। কখনো কখনো গৌণ রচনাতেও কবির কোনো বিশেষ দিক প্রতিফলিত, যা তাঁর পাঠকদের জানা খুবই জরুরি। বাংলাদেশের কাব্যমানচিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার অধিকারী আবুল হাসান তার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও। আমরা যারা তাঁর কবিতার গুণমুগ্ধ পাঠক তারা জানি, তিনি ক্রমশ পরিণতির দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এই পরিণতির স্বাক্ষর বহন করছে আবুল হাসানের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথক পালঙ্ক’। এই ‘পৃথক পালঙ্ক’ তাঁর কবিতার স্বাতন্ত্র্যের পরিচায়ক। তিনি চিরদিন ‘পৃথক পালঙ্ক’-এ-সমাসীন থাকবেন।

বিদ্যাপ্রকাশ এই অকালমৃত কবির রচনা সমগ্র প্রকাশ করে পাঠক সমাজের কৃতজ্ঞতা ভাজন হয়েছেন। আমরা বিদ্যাপ্রকাশের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। আমার এই ক্ষুদ্র রচনা আবুল হাসানের কবিকৃতির প্রতি সুবিচার করতে পারে নি। এখানে আমি একজন সতীর্থ হিসেবে তাঁর কবিতার প্রতি আমার অনুরাগ প্রকাশ করেছি মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। কবি বিষয়ে আলোচনা পাঠের চেয়ে তাঁর কবিতাবলী নিবিষ্ট চিত্তে পাঠ করাই বেশি জরুরি। বাংলাদেশের কবিগোষ্ঠীর যাঁদের কবিতা আমৃত্যু বার বার পড়বো, আবুল হাসান নিঃসন্দেহে তাঁদের অন্যতম।
২৬.০১.৯৪

/জেডএস/

সম্পর্কিত

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

ধারাবাহিক—এক

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২১, ১৩:৩৭

[১৯৩০-৩৯ সময়পর্বে প্যারিসে বসবাসকালের অভিজ্ঞতা নিয়ে মিলার এই উপন্যাসিকাটি লেখেন। ওঁর ‘ট্রপিক অফ ক্যান্সার’, ‘ব্ল্যাক স্প্রিং’, ‘ট্রপিক অফ ক্যাপ্রিকর্ন’, ‘দ্য রোজি ক্রুসিফিকশন’—ট্রিলজি, এগুলোর মতোই ‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’ও একটি আত্মজৈবনিক আখ্যান। ’৩০-এর দশকের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতাই এতে রয়েছে, যে সময়টায় মিলার ‘ব্ল্যাক স্প্রিং’ উপন্যাসটি লিখছিলেন। থাকতেন শহরতলি ক্লিশির একটা ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে বন্ধু আলফ্রেড পার্লেসের সাথে ভাগ করে। লেখক জীবনের এক প্রতিকূল অবস্থার সাথে তখন লড়ছেন মিলার। প্যারিস থেকে নিউ ইয়র্কে ফেরার অল্প কিছুদিন বাদে ১৯৪০-এ লেখেন এই উপন্যাসিকাটি। পরে, ১৯৫৬ সালে বিগ সারে থাকার সময়, যখন তিনি ‘নেক্সাস’-এর ওপর কাজ করছেন, এতে কিছু সংযোজন, পরিমার্জন করেন।
‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’ গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ফ্রান্সে, অলিম্পিয়া প্রেস থেকে, ১৯৫৬ সালেই। আমেরিকায় মিলারের ‘ট্রপিক অফ ক্যান্সার’-এর ওপর দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে চলা অশ্লীলতার অভিযোগ তথা আইনি নিষেধাজ্ঞা ১৯৬৪-৬৫ নাগাদ উঠে যাবার পর ওঁর অন্যান্য বইয়ের সাথে এই উপন্যাসিকাটিও আমেরিকায় প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে। প্রকাশক, গ্রোভ প্রেস।
মিলারের ফোটোগ্রাফার-বন্ধু জর্জ ব্রাসেই ওঁর ‘হেনরি মিলার: দ্য প্যারিস ইয়ার্স’ বইতে জানিয়েছেন যে, মিলারের মতে (‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’র) ‘টাইটল ইজ কমপ্লিটলি মিসলিডিং’।       
উল্লেখ থাকে যে, উপন্যাসিকাটির দুটি অংশ। প্রথমাংশ, ‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’, দ্বিতীয়াংশ ‘মারা ম্যারিগনান’। যদিও, দুটি অংশই মূল গ্রন্থে দু মলাটের ভেতর রয়েছে এবং তাদের মধ্যে স্থান, কাল ও পাত্রের বহুলাংশে সাদৃশ্য থাকলেও, আখ্যানের ক্রমিক পরিণতির দিক থেকে বা কাহিনির ধারাবাহিক বিন্যাসে অংশ দুটিতে প্রত্যক্ষ বা অনিবার্য কোনও যোগ নেই। আমি এখানে শুধু প্রথমাংশটিরই অনুবাদ করেছি।
অনুসন্ধিৎসু পাঠকের জন্য বলা, মিলারের ‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’ অবলম্বনে সিনেমা তৈরি হয়েছে দু’বার। প্রথমটি একটি ড্যানিশ প্রোডাকশন, ১৯৭০ সালে। দ্বিতীয়টি ছিল ফরাসি নির্মাণ, ১৯৯০ সালে পরিচালক ক্লদ শাব্রল এটা নিয়ে সিনেমা করেন। ১৯৯১ সালে, আমেরিকার সাহিত্যের ওপর ভিত্তি করে এইচবিও চ্যানেল একটি অ্যান্থলজি সিরিজ করেছিল, তাতে এই উপন্যাসের দ্বিতীয় ভাগ অর্থাৎ ‘মারা ম্যারিগনান’ অবলম্বনে একটি ৩০ মিনিটের শর্ট ফিল্ম তৈরি হয়, যার নাম ছিল ‘মারা’।  
উপন্যাসিকাটিতে ফ্রান্সের একাধিক রাস্তাঘাট, জায়গা, স্থাপত্য নিদর্শন এবং শিল্প ও সাহিত্য-ব্যক্তিত্বের নাম রয়েছে। বাঙালির জিভে তাদের যথাযথ উচ্চারণ কী হবে বা কী হওয়া উচিত তা নিয়ে পণ্ডিতমহলে বিতর্ক চিরকাল থাকবে। আমি একটা স্বাভাবিক ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছি। যা হয়তো বিশুদ্ধ ফরাসি উচ্চারণ নয় তবে তার কাছাকাছি, আবার বাঙালির জিভেও বেমানান নয়।
আরেকটি কথা, যে সমস্ত ফরাসি নাম বা শব্দ এই উপন্যাসে তথা এই অনুবাদে রয়েছে, তাদের সম্পর্কে পরিশিষ্টে সামান্য কিছু পরিচিতি উল্লেখের চেষ্টা করেছি। যাতে আগ্রহী পাঠকের কাছে উপন্যাসে জড়িয়ে থাকা পরিমণ্ডলটির আবহ সাবলীল হয়। সেপ্টেম্বর—অক্টোবর, ২০১৬। —অনুবাদক।] 

এ লেখা যখন লিখছি, রাত নেমে এসেছে। লোকজন সব ডিনারে চলল। সারাটাদিন ছিল ধূসর। প্যারিসে যেমন হামেশাই দেখা যায়। চিন্তায় হাওয়া লাগাতে ব্লকগুলোর আশপাশ দিয়ে হাঁটছি। করতে কিছুই পারছি না, শুধু ভাবছি নিউ ইয়র্ক আর প্যারিস এই শহর দুটোর মধ্যে কী ভীষণ তফাত। সেই একই সময়, একইরকম দিন, এমনকী এই ধূসর শব্দটাও, যা এইসব সঙ্গ থেকেই আসে, সেই গ্রিসাইলের সাথে অল্পই সাযুজ্য তার, একজন ফরাসির কানে যা চিন্তা ও অনুভূতির একটা জগৎ জাগিয়ে তুলতে সক্ষম। অনেক আগে, প্যারিসের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, দোকানের জানলায় রাখা জলরঙের কাজগুলো মন দিয়ে দেখতে দেখতে, আমি সেই জিনিসটার একক অনুপস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলাম যাকে পেইন’জ গ্রে[১] বলে। এটা আমি উল্লেখ করলাম কারণ, সবাই-ই জানে প্যারিস সবিশেষভাবে এমন এক শহর যার নির্দিষ্ট কোনও সংজ্ঞা নেই। উল্লেখ করলাম কারণ, আমেরিকান শিল্পীরা তৈরি করা ফরমায়েসি ধূসরকেই ব্যবহার করে অতিরিক্ত এবং বদ্ধমূলভাবে। ফ্রান্সে এই ধূসরমালা অসীম; এখানে ধূসর তার পরিণাম-লুপ্ত।

ধূসরতার এই বিপুল পৃথিবী নিয়ে ভাবছিলাম যাকে আমি এই প্যারিসেই চিনেছি। কারণ এরকম সময়ে, এমনিই যখন বুলেভার ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম, অধীর আগ্রহে মনে হল ঘরে ফিরে যাই, লিখি, আমার স্বাভাবিক অভ্যেসের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী একটা লেখা। ওখানে আমার সময় ফুরোলে আমি আবার প্রবৃত্তিগতভাবে ঠিক ভিড়ে মিশে যাব। এখানে এই ভিড়, সবরঙের শূন্যতা, সবকিছুর সূক্ষ্ম তারতম্য, সব ভেদ ও স্বাতন্ত্র্য, আমাকে নিয়ে যাবে আমার ভেতরে, ফিরিয়ে নিয়ে যাবে আমার ঘরে, আমার কল্পনার মধ্যে এক নিরুদ্দিষ্ট জীবনের সেই জটিল ও মিশ্র উপাদানগুলোকে খুঁজতে, যখন সেগুলো সংমিশ্রিত ও আত্তীকৃত হয়ে প্রতিপালিত আর সুসংগত অস্তিত্বের সৃষ্টির দিকে হয়তো কী অনিবার্যভাবে পুনরুৎপাদন করছে কোমল ও স্বাভাবিক ধূসরকে। এরকম একটা দিনে, এরকম সময়ে র‌্যু লাফিত্তের[২] যে কোনও জায়গা থেকে সাক্রে কয়্যেরের[৩] দিকে তাকিয়ে দেখাটাই আমাকে স্বপ্নাবেশে নিয়ে যেতে সক্ষম। এমনকী যখন আমি ক্ষুধার্ত কিংবা ঘুমনোরও কোনও জায়গা নেই তখনও আমার ওপরে এই দৃশ্যটার এরকমই প্রভাব চলত। পকেটে আমার হাজার ডলার থাকলেও আমি জানি এমন কোনও দ্রষ্টব্য নেই যা আমার মধ্যে এরকম স্বপ্নাবেশ জাগাতে পারে।

প্যারিসের ধূসর দিনগুলোয় আমি সাধারণত মঁমার্তের[৪] ক্লিশির দিকে হাঁটি।

ক্লিশি থেকে অবারভিলারের[৫] দিকে একের পর এক কাফে, রেস্তোরাঁ, থিয়েটার, সিনেমাহল, কাপড়ের দোকান আর হোটেল। এটা প্যারিসের ব্রডওয়ে যা ৪২নং আর ৫৩নং রাস্তার মাঝখানের অল্প বিস্তৃতিটার দিকে সংযুক্ত হয়েছে।

ব্রডওয়ে সর্বদাই ছুটছে। মাথা ঘুরিয়ে দেয় আর ঝলমলে। বসার কোনও জায়গা নেই। মঁমার্ত আলস্যপরায়ণ, মন্থরগতি, উদাসীন আর গতানুগতিক, খানিকটা বাজেই আর নোংরা, সম্মোহন করার মতো রূপসী সে নয়, ঝকমকে নয় কিন্তু ধুঁইয়ে ধুঁইয়ে ওঠা আগুনে দেদীপ্যমান।

ব্রডওয়ে রোমাঞ্চকর, এমনকী কখনও জাদুকরী, কিন্তু সেখানে আগুন নেই, তাপ নেই কোনও— সে এক ঝকঝকে আলোকিত অ্যাজবেস্টস্‌, বিজ্ঞাপনের প্রতিভূদের স্বর্গ। মঁমার্ত অতি ব্যবহারে জীর্ণ, নিষ্প্রভ, বেওয়ারিশ, ন্যাংটো লম্পট, ভাড়াটে সেনার মতো শুধু টাকার জন্য কাজ করে, অশ্লীল। যদি এমন কিছু থাকে, যা বিরক্তিকর অথচ আকর্ষণীয়, কিন্তু কপট কুটিলতার সাথে বিরক্তিকর, সেরকম আবাধ্য লম্পট সে। খানকতক বার এখানে রয়েছে যা একচেটিয়াভাবে বেশ্যা, দালাল, ঠগ আর জুয়াড়িতে ভর্তি, ওদের হাজারবার নিরস্ত করলেও শেষ অব্দি তোমায় চুষে নেবে আর দাবি করবে ঠকেছে বলে।    

এই বুলেভারের প্রধান বস্তু হল রাস্তার ধারের হোটেলগুলো, যাদের কদর্যতা এতোটাই বদ আর কুটিল যে সেখানে ঢোকার চিন্তামাত্র তুমি কেঁপে উঠবে, তবু এটা অনিবার্য যে এদের মধ্যে কোনও একটায় কোনও-না-কোনও দিন তুমি একটা রাত অন্তত কাটাবে, হয়তো একটা সপ্তাহ বা একটা মাস। এমনকী হয়তো এই জায়গাটার প্রতি আসক্তই হয়ে পড়বে এটা দেখে যে, একদিন তোমার গোটা জীবনের আদলটাই পালটে গেছে এবং একসময় যাকে তুমি হীন, জঘন্য ভেবেছ এখন তাকেই মোহময়, চমৎকার মনে হচ্ছে। বৃহৎ প্রেক্ষিতে, আমার সন্দেহ, মঁমার্তের এই কপট মোহের কারণ প্রকাশ্য ও বেআইনি যৌনব্যবসা।

সেক্স জিনিসটা রোম্যান্টিক নয় বিশেষত যখন তা বিকিকিনির হাটে এসেছে। কিন্তু ছেয়ে থাকা একটা সুগন্ধ সে তৈরি করতে পারে, একটা ঝাঁজালো অতীত-আর্তি। যা দুর্ধর্ষ আলোকিত গে হোয়াইট ওয়ের[৬] চেয়েও অনেক অনেক বেশি রহস্যময় আর সম্মোহনকারী। প্রকৃতপ্রস্তাবে আবছা, অন্ধকারময় আলোতেই যৌনজীবনের শ্রীবৃদ্ধি; আলো-আঁধারির ছায়াতেই এর ঘর, নিওন আলোর ঝলসানি এখানে নয়।

ক্লিশির এক কোণে কাফে ওয়েপলার, যা দীর্ঘদিন ধরে বহুবার যাওয়া আমার অত্যন্ত প্রিয় এক জায়গা। দিনের পুরোটা সময় সমস্তরকম আবহাওয়ায় তার ভেতরে, বাইরে আমি বসেছি। একটা আস্ত বইয়ের মতো আমি একে জানি। ওয়েটার, ম্যানেজার, ক্যাশিয়ার, বেশ্যা, খদ্দের এমনকী বাথরুমে থাকা অ্যাটেন্ডেন্টদের মুখগুলো আমার স্মৃতিতে এমনভাবে খোদাই করা আছে যেন তারা একটা বইয়ের অলঙ্করণ, যে বই আমি রোজ পড়েছি। মনে পড়ে, সেই প্রথম যখন এসেছিলাম কাফে ওয়েপলারে, আমার স্ত্রীর সাথে, ১৯২৮ সেটা; রোয়াকের ওপরে একটা ছোট্ট টেবিলে মাতাল বেহেড হয়ে এক বেশ্যাকে যখন মরে পড়ে যেতে দেখলাম, আর দেখলাম কেউ তাকে ধরার জন্য ছুটেও গেল না, কীরকম প্রবল ধাক্কা খেয়েছিলাম আমি এটা দেখে, মনে পড়ে। ফরাসিদের এই নির্বিকার ঔদাসীন্য হতবাক আর আতঙ্কিত করে দিয়েছিল আমাকে; এখনও করে, ওদের মধ্যে যেসব ভালো গুণ রয়েছে পরবর্তীকালে সেসব জানার পরেও। ‘এ কিছু না, সামান্য একটা বেশ্যা... একটু মাতাল হয়ে পড়েছিল আর কি’। এখনও আমি এই শব্দগুলো শুনতে পাই। আজও তারা আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে যায়। কিন্তু এটাই প্রকৃত ফরাসিয়ানা, এই মনোভাবটা, আর তুমি যদি এটা মেনে নিতে না শেখো, ফ্রান্সে তোমার অবস্থানটা খুব সুখপ্রদ হবে না।  

ধূসর দিনগুলোয়, যখন বড় কাফেগুলো ছাড়া সর্বত্র ঠান্ডায় জমে গেছে, রাতে ডিনারে যাবার আগে কাফে ওয়েপলারে এক-দু ঘণ্টা কাটাবার জন্য আমি উন্মুখ হয়ে থাকতাম। কামোদ্দীপনার এমন সুসময় ভাসিয়ে নিয়ে যেত এই জায়গাটাকে, যা উঠে এসেছে এক ঝাঁক বেশ্যার হাত ধরে, যারা জমায়েত করে থাকত ঢোকার মুখটার কাছে। ধীরে ধীরে তারা খদ্দেরদের কাছে নিজেদের বিলি-বণ্টন করে দিলে, জায়গাটা তখন শুধু কামনায় উষ্ণই হয়ে উঠত না, মিষ্টি একটা সুগন্ধের মাধুর্যে ভরে যেত।

আবছা আলোয় সুগন্ধী জোনাকির মতো তারা ডানা ঝাপটাত। যারা খদ্দের খুঁজে নেবার মতো ভাগ্যবান হত না, রাস্তায় পায়চারি করত অলসভাবে, তারপর সাধারণত আবার ফিরে আসত একটু বাদেই, তাদের পুরনো জায়গায়। গর্বে অন্যদের মুখ তখন ঝকঝক করছে, সন্ধের পালা শুরু করতে তারা প্রস্তুত। যে কোণটায় সাধারণত ওরা জড়ো হত সেটা যেন একটা এক্সচেঞ্জ মার্কেট, এই সেক্স মার্কেটেরও ওঠা-নামা আছে অন্য এক্সচেঞ্জ মার্কেটের মতোই। বর্ষার দিনগুলো সাধারণত এখানে ভালো ব্যবসা-পাতির দিন, আমার চোখে তা-ই মনে হয়েছে। প্রবাদ আছে, একটা বর্ষার দিনে তুমি দুটো কাজই করতে পারো যখন বেশ্যারা কখনও তাস পিটিয়ে সময় নষ্ট করে না।

সেই দিনটাও ছিল বর্ষারই দিন, শেষবিকেলের দিক। কাফে ওয়েপলারে এক নবাগতাকে লক্ষ করলাম। আমি বেরিয়েছিলাম কেনাকাটা করতে, আমার হাত ভর্তি হয়ে আছে বই আর কিছু ফোনোগ্রাফ রেকর্ডে। সেদিন নিশ্চয়ই আমেরিকা থেকে একটা অপ্রত্যাশিত অর্থপ্রাপ্তি ঘটেছিল যার ফলে কেনাকাটা যা করেছি তারপরেও কয়েকশো ফ্রাঙ্ক তখনও আমার পকেটে। আমি বসে আছি ওই এক্সচেঞ্জের জায়গাটায়, ক্ষুধাময় এক মহিলামহল পরিবেষ্টিত হয়ে; ক্রমাগত খুঁচিয়ে যাওয়া বেশ্যার দল আর যা কিছু আমার সামনে দিয়ে যাচ্ছে সেসবে আমার কোনও প্রতিবন্ধকতাই হচ্ছিল না, কারণ আমার চোখ তখন একনজরে তাক করে আছে মোহসঞ্চারী ওই নবাগতা সুন্দরীর দিকে, যে অনেকটা তফাতে কাফের দূরবর্তী কোণে বসে আছে। তাকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় সুন্দরী এক যুবতি বলেই মনে হল যে তার প্রেমিকের সাথে দেখা করবে বলে এসেছে এবং নির্ধারিত সময়ের অনেকটা আগেই চলে এসেছে। যে মদটা মেয়েটা অর্ডার করেছিল নামমাত্রই ছুঁয়েছে সেটা। তার টেবিলের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া পুরুষদের দিকে সে পূর্ণ এবং স্থির দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, কিন্তু তা থেকে কিছুই বোঝা যায় না— ব্রিটিশ বা আমেরিকান মহিলাদের মতো একজন ফরাসি মহিলা কখনওই তার দৃষ্টি সরিয়ে নেয় না। নিরুদ্বিগ্ন স্থির চোখে তাকিয়ে সে চারপাশ মাপছে, কিন্তু দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কোনও স্পষ্ট প্রয়াস তাতে নেই। সে ছিল নিঃশব্দ পদসঞ্চারী এবং সম্ভ্রম উদ্রেককারী, আগাগোড়া স্থিতিসাম্যে টান টান আর নিজেকে ধরে রাখা একজন।

সে অপেক্ষা করছিল। আমিও অপেক্ষা করছিলাম। আমি উৎসুক ছিলাম দেখতে যে সে কার অপেক্ষায় বসে আছে।

আধঘণ্টা পর, যে সময়টায় আমি বেশ ক’বার তার চোখাচোখি হলাম এবং ধরে ফেললাম, এ মেয়ে অপেক্ষা করছে যেকোনও কারুর জন্যেই, যে সঙ্গত আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটা করবে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত মাথা বা হাত নেড়ে ইশারাটুকুই করতে হয় যাতে মেয়েটি তার টেবিল ছেড়ে উঠে আসবে এবং তোমার সাথে যোগ দেবে— যদি সে ঠিক সেই ধরনের মেয়ে হয়। কিন্তু তখনও আমি একেবারে নিশ্চিত হতে পারিনি। আমার চোখে তো সে দেখতে খুবই সুন্দর, সুপুষ্ট, উথলে ওঠা যাকে বলে— মানে বলতে চাইছি যত্নে লালিত আরকি।  

যখন ওয়েটার আরেকবার রাউন্ডে এল আমি মেয়েটিকে দেখিয়ে ওকে জিগ্যেস করলাম যে চেনে কিনা। ওয়েটার যখন বলল ‘না’, আমি বললাম ওকে এখানে আসতে বলো, আমার সাথে জয়েন করুক। আমি মন দিয়ে ওর মুখ লক্ষ করছিলাম যখন ওয়েটার ওকে মেসেজটা দিচ্ছিল। ওর মুখে হাসি এবং আমার দিকে তাকিয়ে অল্প মাথা নাড়ানোটা দেখে আমার যেন একটা রোমাঞ্চ দিয়ে গেল। আমি আশা করেছিলাম যে ও জলদি উঠে পড়বে এবং এদিকে চলে আসবে, কিন্তু তার বদলে বসেই রইল এবং আবার হাসল, এবারে আরও মৃদু, আর সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা ঘুরিয়ে জানলা দিয়ে একদৃষ্টে স্বপ্নমাখা চোখে তাকিয়ে রইল। মাঝখানে ঢুকে পড়তে আমি একটু সময় দিলাম এবং দেখলাম নড়াচড়ার কোনও লক্ষণই তার নেই, এবারে আমি উঠে দাঁড়ালাম, সোজা হেঁটে গেলাম ওর টেবিলের দিকে। যথেষ্ট আন্তরিকভাবেই সে আমায় স্বাগত জানাল, যেন বাস্তবিকই আমি তার বন্ধু, কিন্তু আমি লক্ষ করলাম ও যেন একটু আচ্ছন্ন হয়ে আছে নেশায়, প্রায় অপ্রস্তুত। আমাকে বসতে দিতে চায় কি চায় না ঠিক নিশ্চিত ছিলাম না আমি, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি বসে পড়লাম এবং ড্রিঙ্ক অর্ডার করে চট করে ওর সাথে কথা বলতে শুরু করে দিলাম। (চলবে)

পরিশিষ্ট
১. পেইন’জ গ্রে (Payne’s grey) : নীল, লাল, কালো এবং শাদা রঞ্জকে তৈরি একটি কম্পোজিট পিগমেন্ট। বিশেষত জলরঙের ছবিতে ব্যবহার করা হয়। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ শিল্পী উইলিয়াম পেইনের নামানুসারে এই নাম।
২. র‌্যু লাফিত্তে (Rue Laffitte) : প্যারিসের একটি রাস্তা। বর্তমানে এর বিস্তৃতি বুলেভার্দ দে ইতালিয়েনস থেকে র‌্যু নত্‌রদাম দে লরেত্তে অবধি। এই রাস্তাটার একেবারে শুরুর মুখে, অর্থাৎ বুলেভার্দ দে ইতালিয়েনসের জংশন থেকে সাক্রে কয়্যেরকে দেখে মনে হয় নত্‌রদাম গির্জার শৃঙ্গভাগে দাঁড়িয়ে আছে।   
৩. সাক্রে কয়্যের (Sacré Coeur) : ১৯১৪ সালে নির্মিত প্যারিসের রোমান ক্যাথলিক চার্চ। ইংরিজিতে পুরো নাম, ব্যাসিলিকা অফ দ্য সেক্রেড হার্ট অফ প্যারিস। ১৮৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে ফরাসিদের পরাজয় এবং ওই বছরই সমাজতান্ত্রিক পারি কম্যিউনের জাতীয় স্মৃতিতে শহরের সবচেয়ে উচ্চবিন্দুতে মঁমার্তের শৃঙ্গভাগে রোমান-বাইজেন্টাইন স্থাপত্যরীতির এই চার্চ। ফরাসি রক্ষণশীলতার নৈতিক ভাষ্যের মূর্ত প্রকাশ বলে একে ধরা হয়। এর গম্বুজের চূড়া থেকে প্রায় গোটা প্যারিস শহরটাকে দেখা যায়। 
৪. মঁমার্ত : ফরাসি উচ্চারণে মঁমার্ত্র (Montmartre)। এটা প্যারিসের অষ্টাদশ প্রশাসনিক শাখার অন্তর্গত এক পাহাড়ি টিলা। এর চূড়াভাগে থাকা শ্বেত-গম্বুজওয়ালা সাক্রে কয়্যের গির্জা আর গোটা এলাকা জুড়ে ছড়ানো নৈশ কাফেগুলির জন্যে অধিক পরিচিত মঁমার্ত। দালি, পিকাসো, ভ্যান গঘ প্রমুখ বহু শিল্পী বিশ শতকের শুরু থেকে এখানে এসেছেন, থেকেছেন দীর্ঘকাল, তাঁদের কাজ করেছেন।
৫. অবারভিলে (Aubervillers) : প্যারিসের উত্তর-পূর্বের শহরতলিতে অবস্থিত একটি ফরাসি কম্যিউন।    
৬. গে হোয়াইট ওয়ে : ১৯০২ সাল থেকে নিউইয়র্কের ব্রডওয়েকে ‘গ্রেট হোয়াইট ওয়ে’ বলা হয়। মিউজিকাল গে হোয়াইট ওয়ে ১৯০৭-এর অক্টোবরে ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ক্যাসিনো থিয়েটারে চালু হলে, ‘গ্রেট হোয়াইট ওয়ে’র বদলে নাট্যশহর ব্রডওয়েকে সাধারণত ‘গে হোয়াইট ওয়ে’ নামেই ডাকা হত এর ডাকনাম হিসেবে। বিশ শতকের পঞ্চাশ এবং ষাটের দশক থেকে ‘গে’ শব্দটি ‘সমকামী’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। আবার ওই সময় থেকেই টেলিভিশনের দর্শক বাড়ার সাথে সাথে আমেরিকার সংস্কৃতির ওপর ব্রডওয়ে মিউজিকালের বিপুল প্রভাব ও জনপ্রিয়তাও কমতে শুরু করে। এখন ‘গে হোয়াইট ওয়ে’ কথাটি কদাচিৎ ব্যবহৃত হতে দেখা যায়, যদি বা হয়, তাহলে ‘গে’ শব্দের সমকামী ব্যবহারকেই এতে উল্লেখ করা হয়।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ০০:০০

এল্ রেতিরো খামারবাড়ি

উঠোনে গুটিহীন শতরঞ্জ খেলে
সময়। গাছের একটি ডালের ক্যাঁচক্যাঁচ 
শব্দ ছিন্ন করে রাতকে। প্রান্তর যদি হত 
ধূলোর লীগ আর পোড়ো স্বপ্ন। 
দুই ছায়া, আমরা অনুলিপি করি যা উচ্চারণ করে
অপর ছায়ারা: হেরাক্লাইটাস্ ও গৌতম।  

(রোসা প্রোফুন্দা, ১৯৭৫; কাব্যগ্রন্থ থেকে)


বৃষ্টি

আচমকা সন্ধ্যা হল সারা
কেননা এখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি
ঝরছে বা ঝরছিল। একটা কিছু এই বৃষ্টি
নিঃসন্দেহে যা ঘটে অতীতে।

যে শোনে এই বৃষ্টির শব্দ তার মনে পড়ে 
সেই সময় যখন সুপ্রসন্ন নিয়তি
তাকে ফিরিয়ে এনেছিল এক ফুলের কাছে যার নাম গোলাপ
আর বিহ্বল-করা লালিমার লাল। 

এই বৃষ্টি যা ঢেকে দেয় জানালার শার্সিকে
বিভা ছড়াবে হারিয়ে যাওয়া শহরতলিতে
আঙুরগাছের কালো আঙুর কোনো এক

উঠোনজুড়ে যা আর নেই আজ। বৃষ্টিভেজা 
সন্ধ্যা আমাকে এনে দেয় স্বর, প্রিয় আকাঙ্ক্ষিত স্বর,
আমার বাবার, যিনি ফিরেছেন এবং মারা যাননি। 

(এল আসেদোর, ১৯৬০; প্যারাবল্ ও কবিতার গ্রন্থ থেকে)


হেরাক্লাইটাস্

দ্বিতীয় গোধূলি।
ঘুমে ঢলে পড়া রাত। 
শোধন আর বিস্মৃতি। 
প্রথম গোধূলি।
সকাল যা ছিল প্রভাত।
বহুল দিন যা হবে ক্লান্ত বিকেল।
দ্বিতীয় গোধূলি।
সময়ের অন্য স্বভাব, রাত।
শোধন আর বিস্মৃতি। 
প্রথম গোধূলি...
চোরা প্রভাত, আর প্রভাতে
গ্রীকের আশঙ্কা।
কী জাল এটা
ভবিষ্যত, বর্তমান আর অতীতের?
কী নদী এটা
যা দিয়ে বয়ে যায় গঙ্গা?
কী নদী এটা যার উৎসটা অচিন্তনীয়?
কী নদী এটা
যা বয়ে নেয় পুরাণ আর তলোয়ার?
তার কাছে ঘুমিয়ে থাকা নিরর্থক। 
দৌড়ায় ঘুমে, মরুভূমিতে, ভূভাণ্ডারে।
নদী আমাকে ধারণ করে এবং আমি ওই নদী।
এক সস্তা সারবস্তু, রহস্যময় সময় দিয়ে তৈরি আমি।
হয়তো উৎসটা আমার মাঝে। 
হয়তো আমার ছায়া থেকে 
উদ্ভুত, সর্বনাশা ও অলীক, দিনগুলি। 

(এলোহিয়ো দে লা সোমব্রা, ১৯৬৯; কাব্যগ্রন্থ থেকে)
 

/জেডেএস/

সম্পর্কিত

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

সর্বশেষ

আফগান ইস্যুতে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন, পাকিস্তানকে আমন্ত্রণ রাশিয়ার, বাদ ভারত

আফগান ইস্যুতে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন, পাকিস্তানকে আমন্ত্রণ রাশিয়ার, বাদ ভারত

ঢাবি উপাচার্যকে মার্কিন দূতাবাসের অভিনন্দন

ঢাবি উপাচার্যকে মার্কিন দূতাবাসের অভিনন্দন

সব রেকর্ড ভেঙে করোনায় একদিনে ২৬৪ জনের মৃত্যু

সব রেকর্ড ভেঙে করোনায় একদিনে ২৬৪ জনের মৃত্যু

ভারতকে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করতে দেওয়া হয়নি: মরিশাস

ভারতকে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করতে দেওয়া হয়নি: মরিশাস

আকবরের কাছে এই পুরস্কার গর্বের, অনুপ্রেরণার

শেখ কামাল ক্রীড়া পুরস্কারআকবরের কাছে এই পুরস্কার গর্বের, অনুপ্রেরণার

প্যানেল মেয়রের কারখানায় কাঠমিস্ত্রির লাশ

প্যানেল মেয়রের কারখানায় কাঠমিস্ত্রির লাশ

মডেল পিয়াসার দুই সহযোগী মিশু ও জিসান রিমান্ডে

মডেল পিয়াসার দুই সহযোগী মিশু ও জিসান রিমান্ডে

নিশিতার কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুকে হারানোর শোক

নিশিতার কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুকে হারানোর শোক

রাজউক ও অন্যান্য সংস্থাকে মশকনিধন অভিযানের নির্দেশ স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর

রাজউক ও অন্যান্য সংস্থাকে মশকনিধন অভিযানের নির্দেশ স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর

বিশ্বের সবচেয়ে মোটা গাছ

বিশ্বের সবচেয়ে মোটা গাছ

টিকা ছাড়া শরীরে খালি সিরিঞ্জ পুশ, ২ নার্সকে প্রত্যাহার

টিকা ছাড়া শরীরে খালি সিরিঞ্জ পুশ, ২ নার্সকে প্রত্যাহার

বসুন্ধরা কিংস-মোহনবাগান লড়াই ২৪ আগস্ট

বসুন্ধরা কিংস-মোহনবাগান লড়াই ২৪ আগস্ট

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

বিংশ শতাব্দীর ফরাসি কবিতা ।। পর্ব-এককরেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

হেলেন ।। জর্জ সেফেরিস

হেলেন ।। জর্জ সেফেরিস

মেঘ অথবা শূন্যতরঙ্গ

মেঘ অথবা শূন্যতরঙ্গ

সৈয়দ মিনারের গীতিকবিতা

সৈয়দ মিনারের গীতিকবিতা

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

© 2021 Bangla Tribune