কী, কেন, কীভাবে

আমিরাত-ইসরায়েল জোটের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে তুর্কি-সৌদি-পাকিস্তান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৪৫আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৯:১৪

চলতি বছরের গ্রীষ্মে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের এক মিত্র দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক লানা নুসাইবেহ। বৈঠকটি সাধারণ মনে হলেও বৈঠক শেষে ইউরোপীয় দেশটির কর্মকর্তারা যে অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেরেন, তা ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বৈঠকের পর এক ইউরোপীয় কর্মকর্তা জানান, ‘ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাত পুরোপুরি এক কাতারে দাঁড়িয়েছে। এটি একেবারেই স্পষ্ট যে এই অংশীদারত্বের কোনও সীমা নেই।’

আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যকার জোরালো সম্পর্কের বিপরীত রূপ দেখা যাচ্ছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের পর। এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এশিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের ক্ষমতার করিডোরে নানা প্রশ্ন হাজির হচ্ছে। অনেকেই এই চুক্তিকে আমিরাত-ইসরায়েল জোটের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছেন। তবে কোনও প্রত্যক্ষ সংঘাতের মুখে পড়ামাত্রই এই তিন দেশ একে অপরকে কতটা সমর্থন জোগাতে পারবে, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত হতে চেষ্টা করছেন পশ্চিমা ও আরব দেশের কর্মকর্তারা।

উদাহরণস্বরূপ, মক্কা চুক্তির ঘোষণার পর সৌদি আরবের জাজান তেল শোধনাগারে হামলা চালায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। তবে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে রিয়াদকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি পাকিস্তান বা তুরস্ক। অন্যদিকে, এ বছরের শুরুর দিকে ইরান থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়েছিল আমিরাত, তখন দেশটিতে আয়রন ডোম আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠিয়েছিল ইসরায়েল। পাশাপাশি ইরানের ওপর শত শত হামলায় আবুধাবির সঙ্গে যোগ দেয় তেল আবিব। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধের সময় ইসরায়েল আমিরাতের জন্য অনেক বড় একটা কাজ করেছে, যা আবুধাবি ভুলবে না।

তবে দুই জোটের মধ্যে রয়েছে কৌশলগত বড় পার্থক্য। ইসরায়েল ও আমিরাতের সামরিক সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও তাদের সম্পর্ক এখনও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পর্দার আড়ালেই রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা থিওডোর সিঙ্গার বলেন, প্রথম নজরে আমিরাত-ইসরায়েল জোট দুই পক্ষকেই আরও দৃশ্যমান সুবিধা এনে দিচ্ছে; তবে মক্কা চুক্তি শেষ পর্যন্ত অনেক বেশি বিস্তৃত এবং কম লেনদেননির্ভর ভূমিকা রাখতে পারে।

মক্কা ক্লাবের পরিধি আরও বাড়তে পারে

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের তুঙ্গে থাকার সময় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন আমিরাত সফর করেছিলেন, তখন তার সফরের খবর প্রকাশ্যে আসতেই তা অস্বীকার করেছিল আবুধাবি। কূটনৈতিক এই অস্বস্তি এটাই নির্দেশ করে যে ইসরায়েল ও আমেরিকান বলয়ের বাইরে এই জোট কতটা অজনপ্রিয়।

অন্যদিকে, মক্কা চুক্তিটিকে উদযাপন করা হয়েছে প্রকাশ্যে। ইসলামের পবিত্রতম নগরীতে জুমার নামাজে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান একসঙ্গে শরিক হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আনা হয়।

কয়েক দশক ধরে গোপনে সহযোগিতা চালিয়ে আসা আমিরাত ও ইসরায়েল ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ্যে আনে। তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রধান কারণ ছিল একপক্ষে ইরান এবং অন্যপক্ষে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি পারস্পরিক বিদ্বেষ। পাশাপাশি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানানো সৌদির সঙ্গে আমিরাতের ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতাও দুই দেশকে কাছাকাছি এনেছে।

তবে বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করেন, আমিরাত ও ইসরায়েল জোটের কৌশলগত গভীরতার অভাব রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক ভূ-রাজনৈতিক উপদেষ্টা আইহাম কামেল বলেন, আমিরাত-ইসরায়েল জোট একটি রাজনৈতিক চুক্তি হলেও মূলত সামরিক ও গোয়েন্দা উপাদানগুলোই এর মূল পরিচয় প্রকাশ করে।

তিনি আরও বলেন, ন্যাটোর অনুচ্ছেদ-৫-এর মতো প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মক্কা চুক্তির মূল ভিত্তি সামরিক হলেও এর ব্যাপক রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে কৌশলগত গভীরতার অভাব ইসরায়েল ও আমিরাতের জন্য একটি ভৌগোলিক বাস্তবতাও বটে। আমিরাত সোমালিল্যান্ডে একটি সামরিক ঘাঁটি সম্প্রসারণ করছে, যা ইসরায়েল ব্যবহার করতে পারে বলে কথা উঠলেও সোমালিল্যান্ডকে বিশ্বজুড়ে কেবল ইসরায়েলই স্বীকৃতি দিয়েছে। অন্যদিকে আমিরাত ও ইসরায়েলের ভারত ও ইথিওপিয়ার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের বহু দেশ ইসরায়েলের ওপর ক্ষুব্ধ, বিশেষ করে গাজায় সংঘটিত যুদ্ধ ও গণহত্যার কারণে যা সম্প্রতি জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোও নিশ্চিত করেছে।

আইহাম কামেল বলেন, আমিরাত-ইসরায়েল সহযোগিতা অনেক বেশি দ্রুত কাজ শেষ করার দিকে মনোযোগী। অন্যদিকে মক্কা চুক্তি কিছুটা ধীরগতিতে এগোলেও এর জনসমর্থনের একটি বড় ভিত্তি রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই ক্লাবের পরিধি আরও বাড়তে পারে।

হুমকি নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা

কাগজে-কলমে মক্কা চুক্তি একটি বিশাল জোট। ন্যাটোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী রয়েছে তুরস্কের, জি-২০ ভুক্ত একমাত্র আরব অর্থনীতি সৌদি আরব এবং পাকিস্তান হলো একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম দেশ। সৌদি ও পাকিস্তান কয়েক দশক ধরে একে অপরের নির্ভরযোগ্য মিত্র হলেও উভয় দেশ ভিন্ন ভিন্ন হুমকির সম্মুখীন।

সৌদি আরব ইরানকে তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুতর হুমকি মনে করে। ২০১৫ সালে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়তে সৌদি আরব আমিরাতের সঙ্গে জোট বাঁধলেও পাকিস্তান সে সময় সামরিকভাবে জড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তেহরানের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেয়। অন্যদিকে কিছু দিন আগেও মুসলিম ব্রাদারহুড ইস্যুতে তুর্কি ও সৌদি সম্পর্ক বেশ তিক্ত ছিল। ২০১৯ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি দূতাবাসে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের অডিও ফাঁস হওয়ার পর সম্পর্ক আরও তলানিতে ঠেকে। অতি সম্প্রতি সিরিয়া ও সুদান ইস্যুতে আঙ্কারা ও রিয়াদ তাদের অবস্থান এক জায়গায় আনতে পেরেছে।

চ্যাথাম হাউসের পারস্য উপসাগীয় বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিল কুইলিয়াম বলেন, তিনটি ভিন্ন অঞ্চলে কাজ করায় তাদের হুমকির ধারণাও ভিন্ন। এই তিন দেশের একযোগে কাজ করার জন্য প্রচুর শক্তি, প্রচেষ্টা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন হবে।

অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ইসরায়েল ও আমিরাতের সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে। গত মে মাসে প্রতিরক্ষা কেনাকাটার জন্য দুই দেশ একটি যৌথ তহবিল গঠন করে। কুইলিয়াম আমিরাত-ইসরায়েল জোটকে ‘অধিক সক্রিয় ও কার্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন।

কোন জোটটি প্রতিরক্ষায় বেশি সমন্বিত?

তুরস্ক জানিয়েছে, তাদের নতুন মিত্ররা যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করবে এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা গভীর করবে। আঙ্কারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ড্রোন বিক্রি করতে চাইছে। তবে এই তিন দেশের মধ্যকার সমন্বয় একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। পাকিস্তানের প্রধান সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী হলো চীন। তুরস্ক তাদের তৈরি কাআন ফাইটার জেট সৌদির কাছে বিক্রি করতে চাইলেও রিয়াদ এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, রিয়াদ দুটিই কিনবে এমন সম্ভাবনা কম।

এ ছাড়া পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের যে প্রতিরক্ষা গভীরতা রয়েছে, তার সমকক্ষ হতে পারবে না। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ফেলো এলিজাবেথ ডেন্ট বলেন, ইসরায়েলের কাছে রয়েছে বিশাল সামরিক শিল্প, বিস্তৃত গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। আমিরাতের কাছে মূলত মার্কিন তৈরি সরঞ্জাম রয়েছে, যা ইসরায়েলি ব্যবস্থার সঙ্গেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান প্রকাশ্যে চুক্তি করায় এই জোটের পরিধি বড় হওয়ার ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা হয়তো আমিরাত-ইসরায়েল পারবে না। ডেন্ট বলেন, মক্কা চুক্তিতে প্রচুর কৌশলগত গভীরতা ও পারস্পরিক প্রতিরক্ষার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা নিশ্চিতভাবেই এক শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। তবে দেশগুলো আগে থেকে সমন্বিত না হওয়ায়, তাদের এখনও অনেক পথ যেতে হবে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

/এএ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নিয়ে সৌদি যুবরাজ ও মার্কিন সেন্টকম প্রধানের বৈঠক
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
জাপানে ‘নজিরবিহীন’ ভারী বৃষ্টিতে নিহত ৮, বিপাকে হাজারো মানুষ
সর্বশেষ খবর
মেট্রো স্টেশনে গোপনে তরুণীর ভিডিও করার অভিযোগ, যুবক আটক
মেট্রো স্টেশনে গোপনে তরুণীর ভিডিও করার অভিযোগ, যুবক আটক
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নিয়ে সৌদি যুবরাজ ও মার্কিন সেন্টকম প্রধানের বৈঠক
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নিয়ে সৌদি যুবরাজ ও মার্কিন সেন্টকম প্রধানের বৈঠক
সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে নিহতদের পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা করে
সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে নিহতদের পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা করে
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে সংসদে বিশেষ অধিবেশনের আহ্বান বিরোধীদলীয় নেতার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে সংসদে বিশেষ অধিবেশনের আহ্বান বিরোধীদলীয় নেতার
সর্বাধিক পঠিত
বন্ধ হলো সামিটের এলএনজি সরবরাহ, ‘বাড়বে’ ভোগান্তি
বন্ধ হলো সামিটের এলএনজি সরবরাহ, ‘বাড়বে’ ভোগান্তি
ডাকবাংলোতে ডেকে কর্মকর্তাকে পেটালেন পৌরসভার সিইও, ডিসি বললেন র‌বিবা‌রের ম‌ধ্যে বদ‌লি
ডাকবাংলোতে ডেকে কর্মকর্তাকে পেটালেন পৌরসভার সিইও, ডিসি বললেন র‌বিবা‌রের ম‌ধ্যে বদ‌লি
বাংলাদেশে ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করছে আল-কায়েদা, সতর্ক করলো জাতিসংঘ
বাংলাদেশে ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করছে আল-কায়েদা, সতর্ক করলো জাতিসংঘ
‘শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের সমাপ্তি’, নতুন জীবন শুরু করতে চান ছাত্রদলের রাকিব 
‘শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের সমাপ্তি’, নতুন জীবন শুরু করতে চান ছাত্রদলের রাকিব 
একসঙ্গে এক থানার দুই কর্মকর্তাসহ ৫ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত
একসঙ্গে এক থানার দুই কর্মকর্তাসহ ৫ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত