হিমালয় ও আন্দিজ পর্বতমালার মধ্যবর্তী অঞ্চলে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকার একমাত্র বরফাচ্ছাদিত চূড়া ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া অঞ্চলের সুদিরমান পর্বতমালা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই পর্বতের ‘চিরস্থায়ী বরফ’ এখন বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে। আগামী এক বা দুই বছরের মধ্যে পুঞ্চাক জয়া (কার্সটেনস পিরামিড) চূড়ার অবশিষ্টাংশ বরফও সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।
উনবিংশ শতাব্দীতে পুঞ্চাক জয়া চূড়ার আশপাশে প্রায় ১ হাজার ৯০০ হেক্টর এলাকা হিমবাহে ঢাকা ছিল, যা বর্তমানে কমে মাত্র ১৬ হেক্টরে নেমে এসেছে। চেক হিমবাহ বিশেষজ্ঞ মেরি স্যাবাক্কা জানান, মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তন এবং কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধিই এই হিমবাহ গলে যাওয়ার কারণ। তাপমাত্রা বাড়ার ফলে তুষারপাতের পরিবর্তে বৃষ্টিপাত বেশি হচ্ছে, যা প্রক্রিয়াটিকে ত্বরান্বিত করছে।
ডেনিশ গবেষক ক্লাউস থাইম্যান ও তার দল ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা চালিয়ে জানিয়েছেন, ২০০০ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই হিমবাহের ৯৫ শতাংশই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তিনি বলেন, সেখানে এখন প্রায় কোনও বরফই অবশিষ্ট নেই। এটাই বাস্তব সত্য।
পাপুয়ার এই বরফাচ্ছাদিত পর্বত স্থানীয় অন্তত পাঁচটি আদিবাসী গোষ্ঠীর কাছে তাদের আধ্যাত্মিক জগতের কেন্দ্রবিন্দু। মনি জনগোষ্ঠীর কাছে এটি ‘ম্বাইংগেলা’ এবং আমুংমে জনগোষ্ঠীর কাছে ‘নেমাংকাবি’ বা ‘সাদা তীর’ নামে পরিচিত। এটি তাদের কাছে সততা, পবিত্রতা ও নৈতিকতার প্রতীক।
আমুংমে পরিবেশকর্মী অ্যাডলফিনা কুম হিমবাহ গলে যাওয়ার এই মানসিক আঘাত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, মক্কা ধ্বংস হলে মুসলিমদের কেমন অনুভূতি হবে? রোম বা ভ্যাটিকান ধ্বংস হলে ক্যাথলিকদের কেমন লাগবে? আমুংমে জনগণের কাছে নেমাংকাবি ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঠিক তেমনই এক অনুভূতি।
তিনি আরও বলেন, পবিত্র পর্বত বা পূর্বপুরুষের স্থান নষ্ট হলে সমাজ শক্তির উৎস হারায়। এটি অনেকটা গাছের শিকড় উপড়ে ফেলার মতো।
বরফ গলার পাশাপাশি গত শতকে এই অঞ্চলে সোনা ও তামার বিশাল খনি আবিষ্কৃত হওয়ায় শিল্পায়ন ও খনি উত্তোলনের ফলে সেখানকার পরিবেশ ও প্রাকৃতিক রূপ ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা এলফ্রিডা নাটকিমে বলেন, প্রতিবার এই পর্বত দেখলে আমি যেমন বিস্মিত হই, তেমনি এক গভীর দুঃখও অনুভব করি। কোম্পানিগুলো আসার পর থেকে আমি তাদের শোষণের চিত্র দেখেছি, তবে এই উন্নয়ন অনেকের জীবনযাত্রার মাধ্যমও তৈরি করেছে।
গবেষকদের মতে, চিরস্থায়ী হিসেবে খ্যাত এই হিমবাহ সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেলে পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু ইতিহাসের একটি অমূল্য তথ্যভাণ্ডার চিরতরে হারিয়ে যাবে।
সূত্র: বিবিসি
সৌদি আরবকে সহযোগিতা করতে তুরস্কের পিছুটান কোথায়?
৩০ বিলিয়ন ডলারের শুল্ক হ্রাসে রাজি চীন ও যুক্তরাষ্ট্র