X
শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২
১৬ আশ্বিন ১৪২৯

অর্থনীতিতে বিদ্যমান চাপ সাময়িক: ঢাকা চেম্বার

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
১৪ আগস্ট ২০২২, ১৮:২৫আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২২, ১৮:২৫

অর্থনীতিতে বিদ্যমান চাপ সাময়িক বলে মত প্রকাশ করেছেন ঢাকা চেম্বারের আলোচকরা। তার বলেন, শুধুমাত্র বাংলাদেশের অর্থনীতিই নয়, বৈশ্বিক সংকেটর কারণে পুরো বিশ্বব্যবস্থাই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, জ্বালানি সংকট এবং সাপ্লই চেইনের বিপর্যস্ত অবস্থার মুখোমুখি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। এ অবস্থায় আমাদের অর্থনীতিতে বিদ্যমান চাপ সাময়িক।

রবিবার (১৪ আগস্ট) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে ২০২১-২২ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জানুয়ারি-জুন-২০২২) বাংলাদেশের অর্থনীতির সামগ্রিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক সেমিনারে ঢাকা চেম্বারের আচোলকরা এসব কথা বলেন। সেমিনারে প্রধান অথিতি হিসেবে ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে সংসদ সদস্য ও এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম (মহিউদ্দিন) বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ঢাকা চেম্বারেরর ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি আরমান হক।

মূল প্রবন্ধে ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রাহমান অর্থনীতিতে বৈশ্বিক সংকট ও করোনা মহামারির প্রভাব, এলডিসি উত্তরণ, জাতীয় বাজেট ও মুদ্রানীতির বাস্তবায়ন অবস্থা, মুদ্রাস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান, কৃষি, উৎপাদন ও সেবা খাত নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি বলেন, ‘বৈশ্বিক সংকটের কারণে গত অর্থবছরে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৯.৫ শতাংশ। আমাদের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৪০.১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়াও করোনা মহামারির কারণে জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার ২৩.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। যদিও গত অর্থবছরে আমাদের রফতানি প্রথমবারের মতো ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।’

তিনি জানান, এলডিসি উত্তরণের কারণে আমাদের রফতানি আয় প্রায় ৫.৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কমে যেতে পারে, যা মোকাবেলায় বিদ্যমান শুল্ক প্রতিবন্ধকতা নিরসন, বাণিজ্য সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে ‘রিজিওন্যাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনেমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সেপা)’ সই এবং দ্রুত ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিতকরণ করা অপরিহার্য।

ডিসিসিআই সভাপতি উল্লেখ করেন, বৃহৎ অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শতভাগ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পুরো রাজস্ব ও শুল্ক ব্যবস্থার অটোমেশন এবং করজাল সম্প্রসারণের কোনও বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের ঋণ গ্রহণের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ আশাব্যঞ্জক নয় বলে মত প্রকাশ করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি। বৈশ্বিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন প্রভাবিত হওয়ায় স্থানীয় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে ভোগান্তিতে পড়ছে দেশের সাধারণ জনগণ। এ অবস্থা নিরসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিলাসবহুল ও অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিকে নিরুৎসাহিত করছে। তবে স্থানীয় বাজারে ডলারের মূল্যের অস্থিতিশীলতা নিরসনে আশু পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান, রিজওয়ান রাহমান। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং ডলারের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি আমাদের রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে ব্যাহত করতে পারে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন তিনি।

কৃষি ও কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের আধুনিকায়ন, চামড়া খাতে বন্ড লাইসেন্সের সীমা ৩ বছর পর্যন্ত বর্ধিতকরণ, ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ট্যাক্স হলিডে সুবিধা সম্প্রসারণ ও এপিআই উৎপাদনে ভ্যাট এবং এসিডি প্রত্যাহার, হালকা প্রকৌশল খাতের স্থানীয় উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বল্প সুদে ঋণ সহায়তা প্রদান, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধা প্রাপ্তিতে ব্যাংক ঋণ নীতিমালার সহজীকরণ ও নতুন সংজ্ঞায়ন, দেশের দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে একটি দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রম সম্প্রসারণের আহ্বান জানান ঢাকা চেম্বার সভাপতি।     

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, ‘স্থানীয় বাজারে ডলারের ওপর চাপ কমানো, ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার অতিদ্রুত বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বৈশ্বিক সংকটের কারণে পণ্য আমদানি ব্যাহত হওয়ায় মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, তবে অর্থনীতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার তেমন কোনও কারণ নেই।’ বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকে আমানতের সুদের হার কিছুটা বৃদ্ধির বিষয়টি পুনঃবিবচেনা করা যেতে পারে বলে প্রতিমন্ত্রী অভিমত ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, ‘গত অর্থবছরে দেশের উৎপাদন খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ২৩ শতাংশ, যা আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ইতিবাচক দিককে বহন করে। হয়রানি রোধ, কর আহরণ বৃদ্ধি এবং করজাল সম্প্রসারণে দেশের রাজস্ব কাঠামোর অটোমেশনের কোনও বিকল্প নেই।’

তিনি উল্লেখ করেন, ২০২১-২২ অর্থবছরে আমরা প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক বিদেশে পাঠাতে সক্ষম হয়েছি, যার ফলে আমাগীতে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ পাট, চামড়া ও তথ্য-প্রযুক্তি প্রভৃতি খাতের প্রতিটি হতে ১ বিলিয়ন ডালারের বেশি পণ্য রফতানি করতে সক্ষম হয়। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের রফতানি আরও বাড়াতে সম্ভাবনাময় খাতগুলোর ওপর বেশি নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।   

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ্য সদস্য ও এফবিসিসিআই’র প্রাক্তন সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম (মহিউদ্দিন) বলেন, ‘কোভিডকালীন সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ব্যবসায়ী সমাজ বিশেষ করে এসএমই খাতের জন্য কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই জ্বালানি সংকটে রয়েছে। আমাদের টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে অফশোর গ্যাস কূপ অনুসন্ধান কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।’

মহিউদ্দিন জানান, ‘এ মূহুর্তে বৈশ্বিক অর্থনীতির অবস্থা বেশ ভালো নয়। সাপ্লাইচেইন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে, তারপরও আমাদের রিজার্ভ সাড়ে ৫ মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতে সক্ষম, যা বেশ স্বস্তিদায়ক।

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অস্বস্তিকর অবস্থাকে সাময়িক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার বিষয়গুলোকে যচেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রখেছে। দেশের ব্যবসায়ী সমাজের পাশাপাশি সার্বিকভাবে অর্থনীতির অধিকতর অগ্রগতির লক্ষ্যে রাজস্ব বিভাগকে হয়রানির মনোভাব পরিহার করে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’ 

ওয়েবিনারের নির্ধারিত আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মো. হাবিবুর রহমান এবং বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম অংশগ্রহণ করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘মুদ্রা প্রবাহ স্থিতিশীল রাখার মাধ্যমে অর্থনীতির গতিধারা অব্যাহত রাখতে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন করে আসছে এবং বিশেষ করে কোভিড মোকাবিলায় বেশ কিছু প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদান করেছে। ভারত ও চীনের মতো বেশ কিছু দেশের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।’

বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমাদের ম্যানুফেকচারিং খাতে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্য হারে কম থাকায় শিল্প-কারখানায় পণ্য উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায় ব্যয় বাড়বে। মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে স্থানীয় বাজারে দাম সমন্বয়ের আহ্বান জাননা তিনি।

এছাড়াও ব্যাংক এবং খোলাবাজারে ডলারের ক্রয়-বিক্রয়ের তারতম্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি। ডলারের ক্রয়-বিক্রয়ের তফাত এক টাকার বেশি হওয়া উচিত নয় বলে মত প্রকাশ করেন তিনি। ব্যবসায়ীদের হয়রানি রোধে তিনি রাজস্ব কাঠমো পুরোপরি অটোমেশনের আহ্বান জানান এবং সাব-কন্ট্রক্টিংয়ের ওপর এনবিআর প্রবর্তিত শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন।      

 

/জিএম/আরকে/
সম্পর্কিত
গ্রেটার নিউ ইয়র্ক চেম্বারের সঙ্গে এফবিসিসিআই'র চুক্তি সই
গ্রেটার নিউ ইয়র্ক চেম্বারের সঙ্গে এফবিসিসিআই'র চুক্তি সই
এফবিসিসিআই সভাপতিকে সম্মাননা দিলো নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি
এফবিসিসিআই সভাপতিকে সম্মাননা দিলো নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি
‘মাঝারি আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলার ঝুঁকি বেশি’
‘মাঝারি আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলার ঝুঁকি বেশি’
ব্যবসা সহজ করতে বন্দরে টেস্টিং ল্যাব চায় এফবিসিসিআই
ব্যবসা সহজ করতে বন্দরে টেস্টিং ল্যাব চায় এফবিসিসিআই
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বেনাপোল সীমান্তে ৭ পিস্তল উদ্ধার, যুবক আটক
বেনাপোল সীমান্তে ৭ পিস্তল উদ্ধার, যুবক আটক
কর্ণফুলীতে নিখোঁজ ব্যবসায়ীর সন্ধান মেলেনি
কর্ণফুলীতে নিখোঁজ ব্যবসায়ীর সন্ধান মেলেনি
রোহিঙ্গা ইয়াবা ব্যবসায়ীসহ ২ জন গ্রেফতার
রোহিঙ্গা ইয়াবা ব্যবসায়ীসহ ২ জন গ্রেফতার
লাইভ চলাকালে সাংবাদিকের ওপর হামলা: আসামি বিএমডিএ কর্মচারীর পদোন্নতি
লাইভ চলাকালে সাংবাদিকের ওপর হামলা: আসামি বিএমডিএ কর্মচারীর পদোন্নতি
এ বিভাগের সর্বশেষ
গ্রেটার নিউ ইয়র্ক চেম্বারের সঙ্গে এফবিসিসিআই'র চুক্তি সই
গ্রেটার নিউ ইয়র্ক চেম্বারের সঙ্গে এফবিসিসিআই'র চুক্তি সই
এফবিসিসিআই সভাপতিকে সম্মাননা দিলো নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি
এফবিসিসিআই সভাপতিকে সম্মাননা দিলো নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি
‘মাঝারি আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলার ঝুঁকি বেশি’
‘মাঝারি আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলার ঝুঁকি বেশি’
ব্যবসা সহজ করতে বন্দরে টেস্টিং ল্যাব চায় এফবিসিসিআই
ব্যবসা সহজ করতে বন্দরে টেস্টিং ল্যাব চায় এফবিসিসিআই
প্রতিবছর ২০ নারী শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেবে এফবিসিসিআই
প্রতিবছর ২০ নারী শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেবে এফবিসিসিআই