বর্তমানে বাজারে অধিকাংশ সবজির দাম চড়া। পাশাপাশি বয়লার ছাড়া প্রায় সব ধরনের মুরগির দামও ঊর্ধ্বমুখী। ডিমের দাম কয়েকদিন আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও এখনও আগের তুলনায় বেশি। ব্যবসায়ীদের দাবি, সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও বন্যার কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাজারে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তবে আলু, পেঁয়াজের দাম কিছুটা বাড়লেও তা অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। আদা ও রসুনের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
সোমবার (৩ আগস্ট) রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বরের কাঁচাবাজারে সরেজমিনে ঘুরে এই চিত্র দেখা যায়।
অধিকাংশ সবজি বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে
বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি দেশি টমেটো ১৬০ টাকা, ভারতীয় টমেটো ১২০ টাকা, দেশি গাজর ৮০ টাকা, চায়না গাজর ১০০ টাকা, লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, সাদা গোল বেগুন ১২০ টাকা, কালো গোল বেগুন ১৫০ টাকা, দেশি শসা ৮০ টাকা, উচ্ছে ১০০ টাকা, করলা ১২০ টাকা, কাকরোল ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৮০ টাকা, হাইব্রিড পটল ৭০ টাকা, দেশি পটল ১২০ টাকা, চিচিঙ্গা ১০০ টাকা, ধুন্দল ৮০ টাকা, ঝিঙা ৮০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, কচুর লতি ১০০ টাকা, মূলা ৭০ টাকা, কচুরমুখী ৮০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৩২০ টাকা, ধনেপাতা ২০০ টাকা, হাইব্রিড শসা ৬০ টাকা, পেঁপে ৫০ টাকা এবং মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া লাউ ৮০ টাকা, চাল কুমড়া ৭০ টাকা, ফুলকপি ও বাঁধাকপি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কাঁচা কলা প্রতি হালি ৪০ টাকা এবং লেবু প্রতি হালি ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এক্ষেত্রে দেখা যায় উল্লেখিত ৩২ ধরনের সবজির মধ্যে ২৪টির দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা বা তারও বেশি। বাকি সবজিগুলোর দাম ৪০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে রয়েছে।
এদিকে যে কাঁচামরিচের দাম গত মাসেও ছিলো প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৫০টাকা, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। এ সময়ের মধ্যেই চারশো টাকা কেজিতেও বিক্রি হয়েছে কোথাও কোথাও। তবে সরকারের কাঁচামরিচ আমদানির খবরে কিছুটা কমতে শুরু করেছে দাম। যদিও ক্রেতারা বলছেন এখনও দাম অত্যধিক। অপরদিকে বিক্রেতারা বলছেন বৃষ্টি বন্যার সময়ে প্রতি বছরই এই দাম বেড়ে থাকে।
সবজি বিক্রেতারা জানান, তিন দিন আগের তুলনায় অধিকাংশ সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ২৫ টাকা কমেছে। কয়েকদিন আগে আড়তে সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছিল। বর্তমানে সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় বাজারে দামও কিছুটা কমেছে।
তারা আরও বলেন, ‘‘বৃষ্টি ও বন্যায় কাঁচামরিচের গাছের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় প্রতি বছর এই সময়ে মরিচের দাম বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে ভারত থেকে আমদানি শুরু হওয়ায় দাম কিছুটা কমেছে। দুই দিন আগে প্রতি পাল্লা (৫ কেজি) মরিচ ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা নেমে এসেছে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। বাজারে দেশি মরিচের তুলনায় ভারতীয় মরিচের সরবরাহই বেশি।
মরিচ বিক্রেতা মো. জুলহাস বলেন, ‘‘গতকাল ৪০০ টাকা কেজি বিক্রি করেছি। আজ (৩ আগস্ট) ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকায় বিক্রি করছি। ভারতীয় মরিচ আরও আসবে, তাই সবাই দ্রুত বিক্রি করে ফেলতে চাইছে। তবে ৫ কেজি মরিচের মধ্যে প্রায় ২৫০ গ্রাম নষ্ট হয়ে যায়। তাই খুব কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হয় না ‘’
আলু-পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল
আলু, পেঁয়াজ, আদা ও রসুনের বাজার এখনও সাধারণ ক্রেতার নাগালের মধ্যেই রয়েছে। যদিও পেঁয়াজের দাম ও আলুর দাম কিছুটা বাড়তি। তবে সেটাও এখন পর্যন্ত সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে বলা যায়।
আজকের (৩ আগস্ট) বাজারে দেশি ও ক্রস জাতের পেঁয়াজ ৬০ টাকা কেজি, লাল ও সাদা আলু ৩০ টাকা, বগুড়ার আলু ৪০ টাকা, দেশি রসুন ৯০ থেকে ১০০ টাকা, চায়না রসুন ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা এবং ভারতীয় আদা ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ী আবু সাইদ বলেন, ‘‘যারা পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেছিলেন, তাদের অনেকেরই পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে। ১০০ কেজি সংরক্ষণ করলে ভালো পাওয়া যায় ৭০ কেজির মতো। এই ঘাটতির কারণেই বাজারে দাম বাড়ে। তাই এখন দাম কিছুটা বাড়তি।’’
মুরগি ও ডিমের দামও বাড়তি
বাজারে সব ধরনের মুরগির দাম এখনও তুলনামূলক বেশি। প্রতি কেজি বয়লার মুরগি ১৮৭ থেকে ১৯৭ টাকা, কক মুরগি ৩১৫ থেকে ৩২০ টাকা, লেয়ার মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া গরুর মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ডিমের বাজারে প্রতি ডজন লাল ডিম ১৩৫ টাকা, সাদা ডিম ১২০ থেকে ১২৫ টাকা এবং হাঁসের ডিম ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মুরগির দাম বেশি থাকার প্রসঙ্গে আতিফা চিকেন হাউজের বিক্রেতা মো. রমিজ বলেন, ‘‘বন্যার কারণে অনেক মুরগি মারা গেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী মুরগি পাওয়া যাচ্ছে না। ফিডের দামও বেড়েছে। সব মিলিয়েই মুরগির দাম বেড়েছে। কবে কমবে, বলা যাচ্ছে না।’’
আল-আমিন চিকেন হাউজের বিক্রেতা মো. খোকন মিয়া বলেন, ‘‘দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন হলো। দীর্ঘদিন দাম কম থাকায় অনেক খামারি উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছিলেন। এখন চাহিদা বেড়েছে কিন্তু সরবরাহ কম, তাই দাম বেড়েছে।’’
বি. বাড়িয়া চিকেন হাউজের বিক্রেতা মো. সুলতানও বলেন, ‘‘বন্যায় ক্ষতি হয়েছে। তাই দাম বেড়েছে। কবে কমবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।’’
এদিকে ডিমের দাম বাড়তি থাকা নিয়ে আনোয়ার ডিমের আড়তের এক বিক্রেতা বলেন, ‘‘শুক্রবার লাল ডিম ১৪০ টাকা ও সাদা ডিম ১৩০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন কিছুটা কমেছে।’’
ডিম বিক্রেতা মো. রিফাত খান বলেন, ‘‘বন্যার কারণে খামার এলাকা ডুবে আছে। পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। তবে আমরা খুচরা বিক্রেতা হওয়ায় পুরো বিষয়টি জানি না। মাসের মাঝামাঝিতে কিছুটা কমলেও এখন আবার বেড়েছে।’’
সহিদ ডিম ঘরের বিক্রেতা মো. সামিউল ইসলাম বলেন, ‘‘২০ দিন আগেও সব ধরনের ডিমের দাম ২০ টাকা কম ছিল। কয়েক দিনের ব্যবধানে এতটা বেড়েছে। কিছু জিজ্ঞেস করলে পাইকাররা বলে বৃষ্টি, রাস্তা ভাঙা ও শ্রমিক খরচ বেড়েছে।’’
তবে আমাদের দেশে অনেক সময় সামান্য অজুহাতেও দাম বেড়ে যায়। বৃষ্টি কমলে দামও কমতে পারে, যুক্ত করেন তিনি।
হেলাল ডিমের আড়তের এক বিক্রেতার ভাষ্য, ‘‘ডিমের সরবরাহ আছে। দাম বাড়ার তেমন কারণ নেই। আড়ত পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বাজারও স্বাভাবিক হবে।’’
মুদি পণ্যের দাম অপরিবর্তিত
বর্তমানে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত পোলাওয়ের চাল ১৯০ থেকে ২৩৩ টাকা, খোলা পোলাওয়ের চাল ১৬০ থেকে ২১০ টাকা, ছোট মসুর ডাল ১৫০ টাকা, মোটা মসুর ডাল ৯০ টাকা, বড় মুগ ডাল ১৪০ টাকা, ছোট মুগ ডাল ১৭০ টাকা, খেসারির ডাল ১০০ টাকা, বুটের ডাল ১১০ টাকা, ছোলা ৮০ থেকে ৯৫ টাকা এবং মাশকলাইয়ের ডাল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৯৮ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ১৯০ টাকা, কৌটাজাত ঘি ১ হাজার ৪২০ থেকে ১ হাজার ৫৫০ টাকা, খোলা ঘি ১ হাজার ৪০০ টাকা, প্যাকেটজাত চিনি ১১০ টাকা, খোলা চিনি ১০৫ টাকা, দুই কেজির ময়দার প্যাকেট ১৪৫ টাকা, আটার প্যাকেট ১৩০ টাকা এবং খোলা সরিষার তেল ২২০ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে।
মসলার বাজারে এলাচি ৫ হাজার ২০০ টাকা, দারুচিনি ৫৬০ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ৪৫০ টাকা, সাদা গোলমরিচ ১ হাজার ৩৫০ টাকা, কালো গোলমরিচ ১ হাজার ২৮০ টাকা, কাজুবাদাম ১ হাজার ৫৫০ টাকা এবং কাঠবাদাম ১ হাজার ৩৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
দেখা যায় সব পণ্যের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও পোলাওয়ের চালের দাম বেড়ে অনেক বেশি। জানা যায়, প্যাকেট পোলাওয়ের চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৪০ টাকা এবং খোলা পোলাওয়ের চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫০ টাকা করে।

গ্যাসের অভাবে থমকে যাচ্ছে শিল্পের চাকা, সংকটের শঙ্কা







