বাংলাদেশের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশের কাছে এখন জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হয়ে উঠেছে দেশের বাইরে যাওয়া। কয়েক বছর আগেও বিদেশে উচ্চশিক্ষা ছিল মূলত উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের স্বপ্ন। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারও সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে জমি বিক্রি করছে, সঞ্চয় ভাঙছে, ঋণ নিচ্ছে। অনেক অভিভাবকের কাছে এখন সবচেয়ে বড় সাফল্য— সন্তানকে যেকোনোভাবে বিদেশে পাঠানো। এটি শুধু একটি সামাজিক প্রবণতা নয়; বরং দেশের শিক্ষা, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি তরুণদের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। প্রশ্ন উঠছে— কেন দেশের তরুণরা নিজেদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে দেখতে পারছে না? কেন উন্নত শিক্ষা, নিরাপদ জীবন ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের আশায় তারা একের পর এক দেশ ছাড়ছে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে উঠে আসে কয়েকটি বাস্তবতা— উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগ, বেকারত্ব, কম বেতন, মেধার যথাযথ মূল্যায়নের অভাব, গবেষণার দুর্বল পরিবেশ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।
বিদেশে পড়তে অর্থ পাঠানো বেড়েছে তিন গুণ
তরুণদের বিদেশমুখী হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো হয়েছিল ২১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে সেই ব্যয় বেড়ে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই দাঁড়িয়েছে ৭৩ কোটি ৬ লাখ ডলারে। পুরো অর্থবছর শেষে এ ব্যয় ১০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছানোর আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থাৎ মাত্র ছয় বছরে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশিদের ব্যয় বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বিদেশে পড়তে পাঠানো এই অর্থ প্রায় দেশের ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক সরকারি বরাদ্দের সমান। অর্থাৎ যে অর্থ দিয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা যেতো, তার বড় অংশই চলে যাচ্ছে বিদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে।
কেন বাড়ছে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে যাওয়ার পেছনে একক কোনও কারণ নেই। বরং এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষাগত ও মানসিক নানা কারণের সম্মিলিত ফল।
১. কর্মসংস্থানের সংকট
দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হলেও সেই অনুপাতে মানসম্মত চাকরি তৈরি হচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বেকারত্ব উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেই। উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ১৩ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ যত বেশি শিক্ষিত, চাকরি পাওয়ার অনিশ্চয়তাও যেন তত বেশি। দীর্ঘদিন চাকরি না পাওয়া কিংবা নিজের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ না পাওয়ার হতাশা অনেক তরুণকে বিদেশমুখী করছে।
২. কম বেতন, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়
যারা চাকরি পাচ্ছেন, তাদের অনেকেরই শুরুতে মাসিক আয় ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় এই আয় দিয়ে একটি সম্মানজনক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক তরুণের প্রশ্ন– একই পরিশ্রম করে যদি বিদেশে কয়েক গুণ বেশি আয় করা যায়, তাহলে দেশে থেকে সংগ্রাম করার কারণ কী?
৩. শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের অসামঞ্জস্য
বিশ্ববিদ্যালয়ে যা শেখানো হচ্ছে, বাস্তব চাকরির বাজারে তার অনেক কিছুরই চাহিদা নেই। ফলে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়লেও দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না। আবার প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, গবেষণা, আধুনিক ল্যাব, শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা– এসব ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও পিছিয়ে। এই সীমাবদ্ধতা তরুণদের বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে আকৃষ্ট করছে।
মেধার মূল্যায়ন নিয়ে হতাশা
তরুণদের বড় একটি অংশ মনে করেন, দেশে অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে পরিচিতি, প্রভাব কিংবা স্বজনপ্রীতি বেশি কার্যকর। চাকরি, পদোন্নতি কিংবা গবেষণার সুযোগ– সব ক্ষেত্রেই মেধার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেকেই বিশ্বাস করেন, বিদেশে অন্তত দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিজের অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের আকাঙ্ক্ষা
বিদেশে যাওয়ার পেছনে শুধু অর্থ নয়, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাও বড় কারণ। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা, আইনের শাসন, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং পরিকল্পিত নগরজীবন– এসব বিষয় তরুণদের কাছে বিদেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে। অনেকের মতে, বিদেশে পরিশ্রম করলে সফল হওয়ার সুযোগ বেশি, যেখানে দেশে অনেক সময় সেই নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।
উচ্চশিক্ষা এখন স্থায়ী হওয়ার সিঁড়ি
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫২ হাজার ৭৯৯ শিক্ষার্থী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গেছেন। এক দশক আগে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ২৪ হাজারের কিছু বেশি। বর্তমানে মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য। শিক্ষাবিদদের মতে, বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের লক্ষ্য শুধু ডিগ্রি অর্জন নয়; বরং স্থায়ীভাবে সেখানেই কর্মজীবন গড়ে তোলা। এ কারণেই বিদেশে পড়তে যাওয়া অনেকেই আর দেশে ফিরছেন না।
সামাজিক মানসিকতায়ও বড় পরিবর্তন
এক সময় বাবা-মায়েরা চাইতেন সন্তান চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা বিসিএস ক্যাডার হোক। এখন অনেক পরিবারের স্বপ্ন বদলে গেছে। তারা চান, সন্তান যেন বিদেশে গিয়ে স্থায়ী হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতিদিন বিদেশে থাকা বন্ধু বা সহপাঠীর জীবন দেখে অনেক তরুণ মনে করছেন, সফল জীবনের ঠিকানা যেন দেশের বাইরেই।
বিদেশের জীবনও সহজ নয়
বিদেশ মানেই সুখের জীবন– এমন ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়। উচ্চ টিউশন ফি, বাড়িভাড়া, সাংস্কৃতিক পার্থক্য, একাকিত্ব, মানসিক চাপ, খণ্ডকালীন চাকরির সংকট–এসব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তবু অনেক তরুণের কাছে বিদেশের সংগ্রামও দেশের অনিশ্চয়তার চেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হচ্ছে।
বাড়ছে ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বা মেধাপাচারের ঝুঁকি
যখন একটি দেশের সবচেয়ে মেধাবী ও উদ্যমী তরুণেরা একের পর এক দেশ ছাড়তে শুরু করে, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকে না; এটি রাষ্ট্রের জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কারণ গবেষণা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদ– সব ক্ষেত্রেই তখন ঘাটতি তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে যাওয়া বন্ধ করাই সমাধান নয়। বরং এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে তরুণরা দেশে ফিরে আসতে আগ্রহী হন। এর জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণায় বড় বিনিয়োগ, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম, উচ্চশিক্ষিতদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান এবং স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা। একই সঙ্গে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্য কমিয়ে আইনের শাসন এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। তরুণদের বিশ্বাস করাতে হবে– দেশেও যোগ্যতার মূল্য আছে, পরিশ্রম করলে সফল হওয়া সম্ভব।
নীরব সতর্কবার্তা
বাংলাদেশের তরুণদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কোনও সাময়িক ঘটনা নয়; এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন। আজকের তরুণরা শুধু বেশি বেতনের চাকরি খুঁজছে না। তারা খুঁজছে মর্যাদা, ন্যায়সঙ্গত মূল্যায়ন, নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ। রাষ্ট্র যদি সেই পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় ব্যয়ের অঙ্ক যেমন বাড়তেই থাকবে, তেমনি বাড়বে মেধাপাচারের ঝুঁকিও। কারণ একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ সমাজ। তারা যদি নিজের দেশেই ভবিষ্যৎ দেখতে না পায়, তবে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যান একসময় অর্থহীন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়, বরং তরুণদের মনে এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা– স্বপ্ন পূরণের জন্য বিদেশই একমাত্র পথ নয়, বাংলাদেশও হতে পারে সম্ভাবনার দেশ।

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বললেন ‘এটি কল্পনার বাইরে’






