পে স্কেল বাস্তবায়ন হচ্ছে, সরকার টাকা পাচ্ছে কোথায়?

গোলাম মওলা 
০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪১ আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪১

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। চলতি অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে বকেয়াসহ নতুন কাঠামোর বেতন পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে— বাড়তি এই ব্যয়ের টাকা আসবে কোথা থেকে? 

রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়া, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় এবং বিদেশি ঋণের তুলনায় পরিশোধের চাপের মধ্যে সরকারের অর্থের চাহিদা বেড়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়ছে।

তবে সরকারের ব্যাংকঋণ নিয়ে আলোচনায় একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলামে সরকার যে পরিমাণ টাকা তোলে, সেটিই সরকারের নিট ঋণ নয়। নিলামের বড় অংশ আগের ঋণ পরিশোধ বা পুরোনো ঋণ নবায়নে (রোলওভার) চলে যায়। ফলে নিলামের মোট অঙ্ক দেখে সরকারের প্রকৃত ঋণের চাপ বোঝা যায় না।

তারপরও নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সময় সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা এবং এর ফলে ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

নিলামে কোটি কোটি টাকা, নিট ঋণ কত?

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। 

অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলামের মাধ্যমে সরকার ৫৬ হাজার কোটি টাকা তুলেছে। কিন্তু ওই মাসে সরকারের নিট ব্যাংকঋণ ছিল প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ নিলামে তোলা পুরো ৫৬ হাজার কোটি টাকা সরকারের নতুন ব্যয় মেটাতে ব্যবহার হয়নি। এর বড় অংশ আগের ঋণ পরিশোধ ও নবায়নে গেছে। 

এ কারণে সরকারের ঋণের প্রকৃত চাপ বুঝতে হলে নিলামে কত টাকা তোলা হয়েছে, তার পাশাপাশি নিট ঋণের হিসাবও দেখতে হয়। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নিট ৯ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল। 

অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের শুরুতেই সরকারের ব্যাংকঋণের চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। 

টাকা আসছে মূলত বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে

সরকারের ব্যাংকঋণের সর্বশেষ চিত্রে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট— নতুন ঋণের বড় অংশ আসছে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে।

আগস্ট শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরকারের ঋণ ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা বেড়ে ৬ লাখ ৮ হাজার ২৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। অন্যদিকে একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ৩ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা কমে ৯০ হাজার ৩২৩ কোটি টাকায় নেমে আসে। 

আরও সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরকারের ঋণ বেড়েছে ২৬ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। এতে এসব ব্যাংকে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৮ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। 

অন্যদিকে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ৭৮৮ কোটি টাকা কমেছে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের নতুন ঋণের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে বাণিজ্যিক ব্যাংক।

পে স্কেলের টাকা, সঙ্গে অন্যান্য ব্যয়ের চাপ

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের নিয়মিত বেতন-ভাতার পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। চলতি মাসের বেতনের সঙ্গে বকেয়া পরিশোধের পরিকল্পনা থাকায় এ চাপ আরও বাড়তে পারে। 

এর সঙ্গে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের বাড়তি ব্যয়। আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় সরকারের নিজস্ব আয় দিয়ে সব ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি ঋণের ছাড়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধ বেশি হওয়ায় বিদেশি উৎস থেকেও কাঙ্ক্ষিত অর্থ আসছে না। ফলে সরকারের ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের ব্যবধান মেটাতে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। 

অক্টোবর-ডিসেম্বরে নিট ঋণ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি 

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর— এই তিন মাসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের লক্ষ্য ৩০ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। 

আগের প্রান্তিকে নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ নিট হিসাবে সরকারের ঋণ নেওয়ার গতি কিছুটা কমার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু একই সময়ে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের অর্থের চাহিদা বাড়ছে। 

এখানেই সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে রাজস্ব আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে নিট ঋণের গতি কিছুটা কমলেও ব্যাংক খাত থেকে সরকারের অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজন থাকছে। 

ব্যাংকে তারল্য থাকায় আপাতত চাপ কম

সরকার ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিলেও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বর্তমানে তুলনামূলক কম। বিনিয়োগের গতি দুর্বল থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন ঋণের চাহিদাও কমেছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে তুলনামূলক বেশি তারল্য রয়েছে। এ অবস্থায় সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও তাৎক্ষণিকভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের জোগানে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

একজন ব্যাংকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় সরকারের ঋণ নেওয়ার কারণে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা অতিরিক্ত তারল্য থেকেই সরকারের ঋণের বড় অংশের জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।’ 

সামনে বাড়তে পারে সুদব্যয়ের চাপ

সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু এখন টাকা পাওয়া নয়; ভবিষ্যতে এই ঋণের সুদ কীভাবে পরিশোধ করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের ঋণের স্থিতি যত বাড়বে, সুদ পরিশোধের ব্যয়ও তত বাড়বে। বিশেষ করে রাজস্ব আয় যদি ঋণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে, তাহলে সরকারের বাজেটে সুদব্যয়ের অংশ আরও বড় হতে পারে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে থাকা অর্থের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বাড়ার অর্থ হলো সরকারি কোষাগারে তারল্যের চাপ রয়েছে। রাজস্ব আয় বাড়ানো না গেলে এবং ব্যয়ের লাগাম টানা না গেলে ঋণনির্ভরতা কমানো কঠিন হবে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান অবশ্য মনে করেন, সরকারের ঋণ নেওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। এ নিয়ে এখনই উদ্বেগের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে তিনি রিজার্ভ মানির দ্রুত প্রবৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করে মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের দিকটিও নজরে রাখার কথা বলেছেন। 

আসল সমাধান রাজস্ব বাড়ানোয়

অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়া আপাতত সামলানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই সমাধান নয়। কারণ ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ একসময় সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।

পে স্কেল বাস্তবায়ন, বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও অন্যান্য সরকারি ব্যয়ের চাপ সামলাতে সরকারকে তাই একদিকে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে হবে, অন্যদিকে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে।

বিশেষ করে কর আদায়ের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি কমানো এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো না গেলে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমবে না। তখন আজকের নেওয়া ঋণ আগামী দিনের সুদব্যয়ের চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে।

অর্থাৎ পে স্কেল বাস্তবায়নের অর্থ সরকার এখন ব্যাংক থেকে সংগ্রহ করতে পারলেও মূল প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে— এই ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হবে কীভাবে? সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এখন সেটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

/এসটি/ 
সম্পর্কিত
ব্যাংকের কার্ড-এটিএম সেবায় বিঘ্ন: আইটি প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তলব
একসঙ্গে ১৯ ব্যাংকের কার্ড-এটিএম সেবা বন্ধ, ভোগান্তিতে পড়তে পারেন গ্রাহক
পদ্মা ব্যাংক বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়নি: বাংলাদেশ ব্যাংক
সর্বশেষ খবর
চরিত্রহীন পড়ুয়ার শরৎপাঠ
চরিত্রহীন পড়ুয়ার শরৎপাঠ
বাংলাদেশিদের ‘সমকামী’ সাজিয়ে ভুয়া আশ্রয় আবেদন, যুক্তরাজ্যে গ্রেফতার ৩
বাংলাদেশিদের ‘সমকামী’ সাজিয়ে ভুয়া আশ্রয় আবেদন, যুক্তরাজ্যে গ্রেফতার ৩
আবেগঘন বিদায়ী ভাষণে কী বললেন মেসি
আবেগঘন বিদায়ী ভাষণে কী বললেন মেসি
কেন হঠাৎ চুলের যত্নে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন পুরুষেরা
কেন হঠাৎ চুলের যত্নে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন পুরুষেরা
সর্বাধিক পঠিত
ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে নতুন গাইডলাইন দিলো আইভ্যাক
ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে নতুন গাইডলাইন দিলো আইভ্যাক
১৯৪৭ সালের পর আসাম থেকে বাংলাদেশে আসছে প্রথম কোনও নৌযান
১৯৪৭ সালের পর আসাম থেকে বাংলাদেশে আসছে প্রথম কোনও নৌযান
মান-অভিমান ভুলে এক মঞ্চে ফিরছেন জিৎ-দেব
মান-অভিমান ভুলে এক মঞ্চে ফিরছেন জিৎ-দেব
‘মানবিক’ বিবেচনায় যুব মহিলা লীগ নেত্রীর মুক্তি চাইলেন ছাত্রদল নেতা
‘মানবিক’ বিবেচনায় যুব মহিলা লীগ নেত্রীর মুক্তি চাইলেন ছাত্রদল নেতা
কবে বিয়ে করবেন কেয়া পায়েল, জানালেন নিজেই
কবে বিয়ে করবেন কেয়া পায়েল, জানালেন নিজেই