ব্যাংকে টাকা আছে তো? আজই জানুন আপনার সঞ্চয় কতটা নিরাপদ

গোলাম মওলা
৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৫ আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৯

ব্যাংকে টাকা জমা রাখলেই যে সঞ্চয় পুরোপুরি নিরাপদ, এমন নিশ্চয়তা নেই। দেশের ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক চিত্র আমানতকারীদের নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি ব্যাংক পুঞ্জীভূত লোকসানে রয়েছে। এসব ব্যাংকের মোট লোকসানের পরিমাণ ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রয়েছে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক, একটি বিদেশি ব্যাংক এবং ১৫টি বেসরকারি ব্যাংক।

ব্যাংক খাতের দুর্বলতার আরেকটি বড় উদাহরণ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকটি কর-পরবর্তী ৩ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা লোকসান করেছে। অথচ আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল প্রায় ৭৯ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা থেকে এত বড় লোকসানে পড়ায় ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এ অবস্থায় সাধারণ আমানতকারীদের মনে প্রশ্ন—ব্যাংকে রাখা টাকা আসলে কতটা নিরাপদ? নিজের ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো না খারাপ, তা কীভাবে বুঝবেন? ব্যাংক সমস্যায় পড়লে কত টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে?

লোকসানে ২২ ব্যাংক, উদ্বেগে আমানতকারীরা

অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি পুঞ্জীভূত লোকসানে ছিল। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত লোকসানের পরিমাণ ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা।

লোকসানে থাকা চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হলো জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক। দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানও লোকসানে রয়েছে।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে এবি, বাংলাদেশ কমার্স, এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, আইসিবি ইসলামিক, আইএফআইসি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, মেঘনা, ন্যাশনাল, গ্লোবাল ইসলামী, পদ্মা, সীমান্ত, সোশ্যাল ইসলামী, দ্য প্রিমিয়ার ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাতের পরিচালন মুনাফা ছিল ৭৮৯ কোটি টাকা। তবে সব ধরনের ব্যয় ও প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের পর নিট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ খেলাপি ঋণ, ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণে ঘাটতি, মূলধন সংকট এবং দুর্বল সম্পদমান ব্যাংকগুলোর আয় করার সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে পরিচালন পর্যায়ে মুনাফা থাকলেও শেষ পর্যন্ত অনেক ব্যাংককে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

ইসলামী ব্যাংকের লোকসান ৩ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা

ব্যাংক খাতের এই সংকটের মধ্যে বড় ধাক্কা খেয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটি প্রায় ৭৯ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল।

ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের ৪১৪তম সভায় তৃতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুমোদনের পর এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকেই ব্যাংকটির লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটি মুনাফা করেছিল।

লোকসানের প্রভাব পড়েছে ব্যাংকটির শেয়ারবাজারের আর্থিক সূচকেও। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে একক হিসাবে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২০ টাকা ৫১ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৪৯ পয়সা।

একই সময়ে ব্যাংকটির নিট সম্পদমূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর একক হিসাবে ব্যাংকটির নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৬ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে নিট সম্পদমূল্য কমেছে প্রায় ৩ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা।

ব্যাংকের আর্থিক বিবরণীতে লোকসানের কারণ হিসেবে বিনিয়োগ আয় কমে যাওয়া, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং আমানতের বিপরীতে মুনাফা ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর ইসলামী ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে বিপুল অঙ্কের অর্থ বের করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে গ্রুপটির বিরুদ্ধে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। এসব ঋণের বড় অংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ হারায় এস আলম গ্রুপ। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটির পরিচালনায় স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ব্যাংকটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

১২ ব্যাংককে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা

ব্যাংক খাতের সংকটের আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তার তথ্যে। সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২টি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা জরুরি তারল্য সহায়তা নিয়েছে।

এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পেয়েছে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার ৮৪৩ কোটি, এক্সিম ব্যাংক ১২ হাজার ১০ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পেয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা।

এ ছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি 

ইসলামিক ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংকও তারল্য সহায়তা পেয়েছে।

তারল্য সহায়তা বলতে বোঝায়, কোনো ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া বা দৈনন্দিন লেনদেন পরিচালনার জন্য নগদ অর্থের সংকটে পড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জরুরি অর্থ নেওয়া। তবে তারল্য সংকট মানেই ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে, এমন নয়।

ব্যাংকে টাকা থাকলে কতটা সুরক্ষা পাবেন?

আমানতকারীদের সুরক্ষায় বাংলাদেশে নতুন আমানত সুরক্ষা আইন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের আমানত সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের মতো পরিস্থিতিতে পড়লে একজন আমানতকারী সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষা পাবেন।

আগে এই সীমা ছিল ১ লাখ টাকা। নতুন আইনে তা দ্বিগুণ করা হয়েছে। তবে একই ব্যাংকের একাধিক শাখায় একজন ব্যক্তির একাধিক হিসাব থাকলেও সেগুলো একত্রে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ একটি ব্যাংকে ৫ লাখ বা ১০ লাখ টাকা জমা থাকলে আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষা পাওয়া যাবে। বাকি অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি ব্যাংকের সম্পদ উদ্ধার ও অবসায়ন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।

তাই আমানতকারীদের মনে রাখা প্রয়োজন, ব্যাংকে জমা থাকা পুরো অর্থ আমানত সুরক্ষা আইনের আওতায় নিশ্চিত নয়।

নিজের ব্যাংকের অবস্থা জানবেন যেভাবে

নিজের সঞ্চয় কতটা নিরাপদ, তা জানতে ব্যাংকের কয়েকটি আর্থিক সূচক সম্পর্কে ধারণা রাখা জরুরি।

প্রথমত, ব্যাংকের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন দেখতে হবে। সেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ, মুনাফা, মূলধন পর্যাপ্ততা ও প্রভিশন ঘাটতির তথ্য পাওয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে হবে। আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা ফেরত দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত নগদ অর্থ ও সহজে নগদে রূপান্তরযোগ্য সম্পদ ব্যাংকের রয়েছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, ব্যাংকের ক্রেডিট রেটিং বা ঋণমান যাচাই করা যেতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা, বিশেষ তদারকি, প্রশাসক নিয়োগ কিংবা ব্যাংক একীভূতকরণের মতো সিদ্ধান্তের দিকেও নজর রাখতে হবে।

সব টাকা একটি ব্যাংকে রাখবেন?

আর্থিক ঝুঁকি কমাতে বড় অঙ্কের সঞ্চয় একটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত না রাখাই ভালো। প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক ব্যাংকে অর্থ ভাগ করে রাখা যেতে পারে। এতে কোনো একটি ব্যাংক সমস্যায় পড়লে পুরো সঞ্চয় একই ঝুঁকিতে পড়বে না।

তবে শুধু বেশি সুদ বা মুনাফার প্রস্তাব দেখে ব্যাংক নির্বাচন করা উচিত নয়। ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, সুনাম, খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা বিবেচনায় নিতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য কিছু অর্থ সহজে উত্তোলনযোগ্য হিসাবেও রাখা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, ব্যাংকে টাকা রাখা মানেই সঞ্চয় অনিরাপদ—এমন নয়। তবে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, লোকসান ও তারল্য সংকটের যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে আমানতকারীদের সতর্ক থাকা জরুরি। নিজের ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা জানা, সঞ্চয় একাধিক ব্যাংকে ভাগ করে রাখা এবং আমানত সুরক্ষার সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকাই হতে পারে ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের ঝুঁকি কমানোর অন্যতম উপায়।

/আইএএম/
সম্পর্কিত
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব তলব
৭ নভেম্বর বন্ধ থাকবে দেশের সব ব্যাংক
প্রাইভেটকারে এসে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তার ৫ লাখ টাকা ছিনতাই
সর্বশেষ খবর
পরিবারকে না জানিয়ে দেশে ফিরেছিলেন নারী, পুনের ফ্ল্যাটে মিললো মরদেহ
পরিবারকে না জানিয়ে দেশে ফিরেছিলেন নারী, পুনের ফ্ল্যাটে মিললো মরদেহ
একদিনের ব্যবধানে সোনার দামে বড় পতন
একদিনের ব্যবধানে সোনার দামে বড় পতন
সমুদ্রের তলা দিয়ে ট্রেনযাত্রা, হংকংয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা
সমুদ্রের তলা দিয়ে ট্রেনযাত্রা, হংকংয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা
সৌদিতে আগুনে নিহত ৭ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পৌঁছেছে 
সৌদিতে আগুনে নিহত ৭ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পৌঁছেছে 
সর্বাধিক পঠিত
শততম ছবিতে চমক, শেষ ছবিতে বিদায়: আলমগীর-শাবানা জুটির গল্প
শততম ছবিতে চমক, শেষ ছবিতে বিদায়: আলমগীর-শাবানা জুটির গল্প
প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে ভিন্ন বার্তা প্রভার
প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে ভিন্ন বার্তা প্রভার
ধানক্ষেতে আত্মগোপন করেও শেষ রক্ষা হলো না আওয়ামী লীগ নেতার
ধানক্ষেতে আত্মগোপন করেও শেষ রক্ষা হলো না আওয়ামী লীগ নেতার
রেলপথে যুক্ত হচ্ছে দুই মহাসাগরীয় করিডর
রেলপথে যুক্ত হচ্ছে দুই মহাসাগরীয় করিডর
প্রথম দিনে বাজারে ঢুকেছে হাজার টন ইলিশ, দাম কত?
প্রথম দিনে বাজারে ঢুকেছে হাজার টন ইলিশ, দাম কত?