সেকশনস

দোটানার বৃত্ত

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩:৪৮

বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক কাজী আনিস আহমেদ-এর ৫০তম জন্মদিন আগামীকাল শনিবার। তার লেখালেখির সূচনা কৈশোরেই, বাংলা ও ইরেজি ভাষায়। ‘চল্লিশ কদম’ উপন্যাসিকা প্রথম প্রকাশিত হয় আমেরিকার মিনেসোটা রিভিউ-এ, ২০০০ সালে। গল্পগ্রন্থ ‘গুড নাইট মি. কিসিঞ্জার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ বাংলাদেশে প্রকাশ করে ইউপিএল, ২০১২ সালে এবং যুক্তরাষ্ট্রে দ্যা আননেম্ড প্রেস, ২০১৪ সালে। উপন্যাস ‘দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন মাই হ্যান্ডস’ প্রকাশ করেছে ভিনটেজ/র‌্যানডম হাউজ, ২০১৩ সালে। তার সবগুলো বই কাগজ প্রকাশন থেকে বাংলায় অনূদিত হয়েছে।

কাজী আনিস আহমেদের জন্ম এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা ঢাকাতেই, সেন্ট জোসেফ ও নটরডেম কলেজে। উচ্চতর শিক্ষা আমেরিকায়-ব্রাউন, ওয়াশিংটন ও নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে যথাক্রমে সাহিত্যে ব্যাচেলর, মাস্টার্স ও ডক্টরেট। তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ঢাকা ট্রিবিউন-বাংলা ট্রিবিউনের প্রকাশক।

কাজী আনিস আহমেদের ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে কবি শামীম রেজার সম্পাদনায় বাতিঘর  প্রকাশ করছে একটি মূল্যায়ন-গ্রন্থ ‘অধরা বিশ্বের প্রতিভূ’। উক্ত সংকলন থেকে লেখাটি প্রকাশ করা হলো। 

বিশাল এক ছবি আঁকা হয়েছে ছোট্ট ক্যানভাসে; কেমন করে, এ এক বিস্ময়। কাহিনির ব্যাপ্তি সদ্য চাপা দেয়া কবরের নিচে হঠাৎ করে শিকদার সাহেবের কান খাড়া হওয়া থেকে শুরু করে খড়মের সাঁইত্রিশ পদক্ষেপ গোনার মধ্যে সীমিত। তবে শিকদার সাহেবের কি আদৌ জ্ঞান ফিরেছিল, নাকি এ নেহাতই কল্পনা? বড় গল্পের মতো আকারের উপন্যাসিকার শুরুর প্যারা আর শেষের কয়েকটি লাইন বারকয়েক পাঠ করলেও অবস্থাটি নিশ্চিত বোঝা যায় না। কাহিনির প্রধান চরিত্র, শিকদার সত্যিই হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে মারা গেছেন, নাকি গ্রামের সরল বোকাসোকা লোকগুলো তার অজ্ঞান অবস্থাকে মৃত্যু মনে করে মাটিচাপা দিয়ে ধীর পায়ে দূরে সরে যাচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার পুরোপুরি পাঠকের বরাতে রেখে লেখক তার মনোযোগ দীর্ঘ সময়ের জন্য দখল করে ফেলেন।

এ রকম দোটানা অবশ্য মানুষের জীবনে নতুন কিছু নয়। যেমন জীবনের প্রায় প্রত্যেকটি ঘটনাকেই অন্তত দুটো ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা যায়। দুটো বিশ্লেষণ দুরকমের সম্ভাবনার দুয়ার খোলে। দলগতভাবে মানুষ চিরকাল পরিণতির ভিন্নতা নিয়ে আলাপ করতে পছন্দ করে। উইলিয়াম ফকনার বা শহীদুল জহিরের কল্পকাহিনিতে মানুষ যেমন দলগতভাবে সিদ্ধান্ত নেয় বা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। ‘ফোর্টি স্টেপস’ বা অনুবাদে ‘চল্লিশ কদম’-এর  পটভূমি হিসেবে আবিষ্কার করা উপনিবেশ আমলের এক গ্রাম, জামশেদপুরের মানুষেরাও তার ব্যতিক্রম নয়।

কাজী আনিস আহমেদের ‘ফোর্টি স্টেপস’ বইটি ২০০০ সালে আমেরিকার মিনেসোটা রিভিউ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। বিস্ময়করভাবে লেখক আলোচ্য প্রথম প্রকাশিত বইটিতেই আশ্চর্য রকম দক্ষতার প্রমাণ রাখতে সক্ষম হন। কল্পকাহিনিটির সফলতার কারণ খুঁজতে গিয়ে তার পটভূমি, সময়কাল কিংবা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে প্রথমেই দৃষ্টিপাত না করে বরং এক অদ্ভুত বিষয় নিয়ে আলাপ করা যায়। ভাবলে অবাক হতে হয় লেখক সুদূর আমেরিকার একটি পত্রিকায় উপন্যাসিকাটি প্রকাশ করেছেন, যা লিখিত হয়েছে সেখানকার প্রচলিত ভাষা, ইংরেজিতে, অথচ অবিভক্ত ভারতের প্রত্যন্ত কোনো গ্রামের মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাহিনি অবলীলায় বর্ণনা করেছেন। বর্ণনার মধ্যে তিনি ভিনদেশি পাঠকের সুবিধার কথা চিন্তা করে পটভূমি বা অদেখা সংস্কৃতিতে লালিত চরিত্রগুলোয় কোনো বাহুল্য আনেননি। অতীতের নিরিখে তারা যেমন, লেখকের কলমে তারা ঠিক তাই। অথচ এই বিপুল ভৌগোলিক ও সামাজিক দূরত্ব কাহিনির শব্দচয়ন বা আবেশ সৃষ্টিতে এতটুকু বাধার সৃষ্টি করেনি। ঠিক যেমন দুর্বোধ্য মনে হয় না সালমান রুশদি যখন পাঞ্জাবের প্রত্যন্ত গ্রামের রীতিনীতি বা সংস্কৃতির কথা ইংরেজিতে লেখেন আর তা প্রকাশিত হয় ইংল্যান্ডে। এটা আশ্চর্যের বিষয় মূলত আরও এক কারণে; কাহিনিটি বর্ণনার কায়দা অনেকাংশে ধর্মীয় আচার-ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল, যে ধর্ম বা দূরদেশে তার পালনের প্রক্রিয়া সেখানকার পাঠকের জন্য আনকোরা বিষয়। প্রধানত এই কারণটিই বইটিকে অনেক বইয়ের মাঝখানে বিশেষ প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। আর এটুকু বিবেচনায় রাখলে কাজী আনিস আহমেদ যে বাংলাদেশের ইংরেজি ভাষার লেখক হিসেবে নিজের অভ্যুদয় ঘটিয়েছেন, তার সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায়।

কাহিনির শুরুতে পাঠক দেখতে পান যে মূল চরিত্র শিকদার সাহেব ছয় ফুট মাটির নিচে, কবরে শুয়ে আছেন। শিকদার হঠাৎ আবিষ্কার করেন যে তাকে সেখানে শুইয়ে মাটিচাপা দেয়া হয়ে গেছে এবং গ্রামের লোকজন কবরঘনিষ্ঠ জায়গা থেকে সরেও যেতে শুরু করেছেন। ঠিক ওই মুহূর্তে পাঠক বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন—তবে কি এই কাহিনিটা মৃত কোনো মানুষের মৃত্যুপরবর্তী কার্যক্রম কিংবা নেহাতই মৃত্যুপরবর্তী অতিপ্রাকৃত ঘটনা? ওদিকে চরিত্র, শিকদার সাহেব নিজেও বিভ্রান্ত হন যে তিনি প্রকৃতপক্ষে বেঁচে আছেন নাকি মৃত? বিভ্রান্তি নিয়ে কিছু জল্পনাকল্পনা চলে। তবে কাহিনি এগিয়ে চলে লেখকের জবানিতে, যা অনেকটা চরিত্রের অন্তর্গত কথন বলেই মনে হয় কখনো কখনো। শিকদার সাহেব যেন মনে মনে ভাবতে থাকেন কী করে তিনি ওই কবরের ভেতরে গিয়ে পৌঁছলেন। মনে পড়ে তিনি জমির আলের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সংজ্ঞাহীন হয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন আর তারপর থেকে সম্ভবত অজ্ঞানই ছিলেন। কারণ, এর মাঝখানে স্মৃতি বলতে তার কিছু থাকে না। বরং কিছু সম্ভাবনা তিনি দাঁড় করিয়ে নেন যে গ্রামের লোকেরা তাকে মৃত ধরে নিয়ে শেষকৃত্যের যাবতীয় কার্যকলাপ চালিয়ে গেছে আর শেষ পর্যন্ত তার ঠিকানা হয়েছে একটা কবরের নিচে। কাহিনির আরও বেশ কিছু বাঁক পেরিয়ে জানা যায় যে তার আগের দিন পেশায় চিকিৎসক, শিকদার সাহেব রোগী দেখতে দেখতে অসুস্থ বোধ করে এক দীর্ঘ ঘুমে ঢলে পড়েছিলেন। তারপর ঘুম ভাঙলে তার হয়তো পরের দিন ওভাবে পড়ে যাবার কথা তার মাথায় আসেনি। অন্যদিকে তার আফসোস হয় যে এত দিন ক্রমাগত চিকিৎসা দিয়েও তিনি গ্রামের বোকা লোকগুলোকে কিছুই শেখাতে পারেননি! তারা তার নাকে হাত দিয়ে তো অন্তত নিশ্চিত হতে পারত যে তিনি মারা গেছেন কি না। আবার পরিতাপের বিষয় হলো, যে ইয়াকুব মোল্লার সঙ্গে তিনি বহুবার ধুরন্ধর চালাকি করে মানুষকে ঠকানোর বন্দোবস্ত করেছেন, সেই মোল্লাই হতবুদ্ধি হয়ে তার জানাজা পড়িয়ে কবরে দ্রুত শুইয়ে দেবার ব্যবস্থা করেছে।

অল্প বয়সে শিকদার সাহেব ডাক্তারি পড়তে গিয়েছিলেন কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের চেয়ে শিল্পের প্রতি আগ্রহ বেশি থাকায় পড়াশোনা আর এগোয়নি। তবে ওই আগ্রহের কারণে খুঁজে পেয়েছিলেন ডসন নামের এক বন্ধুকে, যে শিকদারের সমগ্র জীবনে বিশেষ ভ‚মিকা রাখে। বিদেশি হওয়া সত্ত্বেও ডসন ঘটনাচক্রে জামশেদপুরের বাসিন্দা হয়ে যায়। অসুস্থতার কারণে একসময় শিকদারের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে ডসন শিকদারের স্ত্রীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। সেখানে কাহিনির টুইস্ট মৃদুভাবে এলেও পরে তাকে তীব্র করে আরেক ঘটনা, সম্পর্কের পরিণতিতে শিকদারের স্ত্রী নূরজাহান সোনালি চুলের এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়।

এ রকম জীবনপ্রবাহ হয়তো বহু কল্পকাহিনির মধ্যেই চোখে পড়ে। তবে এই কাহিনিতে লক্ষণীয় ঝরঝরে গদ্য আর অল্প-স্বল্প বর্ণনায় অতীতের এক জনপদের নিখুঁত ছবির সঙ্গে তা পাঠকের মনে অন্য ব্যঞ্জনায় বাজে। কাহিনির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো কবরের নিচে জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায়, যা কিনা পাঠককেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়, শিকদার সাহেব খড়মের পদক্ষেপ গোনেন আর প্রশ্নোত্তরকারী দুই ফেরেশতা মুনকির ও নাকিরের অপেক্ষা করেন। ফেরেশতারা আসবে কি আসবে না, এই দোটানার অবসরে কাহিনির বর্ণনা চলে। এ যেন কয়েক সেকেন্ডে এক আস্ত লোকালয়ের আনাচে-কানাচে ঘুরে আসা। যেখানে ছোট্ট শহরের বুকে ছোট ছোট ব্যাপ্তি নিয়ে চরিত্রেরা আসে অথচ তাদের জীবনপ্রণালি, তাদের আশা-ভরসা, তাদের ঐকান্তিক ইচ্ছাকে সম্বল করে পাঠকের মনে স্থান করে যায়। অতীতের কল্পিত সেসব চরিত্রের মধ্যে পাঠক নিজের জীবনের ছায়া দেখতে পায়। একজন ইউরোপিয়ান ছাত্র হুট করে পাঠকের চেনা দেশি চরিত্রে পরিণত হয়, গল্পে গল্পে বেরিয়ে আসে পরমা সুন্দরী অথচ বিশ্বাসঘাতক স্ত্রীর কথা, মানুষকে নিষ্ঠা শেখানো ধর্মীয় নেতা শিকদার সাহেবের সঙ্গে একজোট হয়ে মানুষের সম্পদ কেড়ে নিতে মিথ্যার জাল বোনে। এ রকম চরিত্রগুলোও হয়তো আমাদের চোখে একেবারে অদেখা নয় কিন্তু শিকদার সাহেবকে সত্যিই জ্যান্ত কবর দেয়া হয়েছে, নাকি ওদিকে মুনকির-নাকির প্রায় পৌঁছে গেল, এ রকম একটা দোটানার মধ্যে প্রাসঙ্গিক কিংবা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে বলিষ্ঠ বর্ণনা বিপুল আবেদন তৈরি করে।

সরাসরি একজন ধর্মীয় নেতার চরিত্র এবং সমগ্রভাবে প্রাচীন রীতিনীতিসংবলিত একটি মুসলিম সমাজের সম্ভ্রান্ত মানুষ ও গ্রামের সাধারণ মানুষদের মনমানসিকতা তুলে ধরতে গিয়ে লেখককে স্বাভাবিকভাবেই ইসলাম ধর্মের নিয়মকানুনের ব্যাপারে মন্তব্য করতে হয়েছে; কখনো লেখকের জবানিতে, কখনোবা চরিত্রের মুখ দিয়ে। এই সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয় ঘটনাপ্রবাহে স্বভাবতই দারুণ মানিয়ে গেছে। মুসলিমদের নির্ধারণ করা পবিত্র রং হিসেবে খ্যাত সবুজ রঙের কুর্তা ইয়াকুব মোল্লার গায়ে চড়াতে যেমন লেখক ভুলে যাননি, অন্যদিকে কিছু ঘটনাও অবলীলায় এসেছে। শিকদার সাহেব মুনকির-নাকির ফেরেশতার কথা ভাবতে ভাবতে তাদের কার্যক্রমের ব্যাপারে অনুমান করতে চেষ্টা করেন। ভাবেন, কবরে শেষ মাটি দেয়া লোকটি ঠিক চল্লিশ কদম সরে গেলেই কেন তারা আসে? কেন উনচল্লিশ কদম পরে নয়? শিকদার সাহেব আরও ভাবেন, এই যে পৃথিবীময় প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে এত এত মানুষ মারা যাচ্ছে, তাদের প্রত্যেকের কাছে একই সঙ্গে ঠিক চল্লিশটি পদক্ষেপ গুনে গুনে তারা সময়মতো হাজির হয় কী করে। আবার ফেরেশতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে আপাত-সন্দেহপোষণকারী শিকদার তার বন্ধু ডসনকে একবার বোঝাতে চেষ্টা করেন যে ছবি আঁকলে তার প্রাণীর ছবি আঁকা উচিত নয়, যা কিনা ইসলামে নিষিদ্ধ। তখন ফেরেশতাদের কাজে সন্দেহ স্থাপনকারী আগের সেই শিকদারের ভ‚মিকায় চট করে নেমে আসে ডসন, উত্তর দেয়, নিজে মুসলমান নয় বলে সে খুশি। আরেকবার, জামশেদপুরে এক প্রাচীন রত্নখচিত মসজিদের নিচে খুঁড়ে যখন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সেখানে তার চেয়েও প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করে, তখন স্বাভাবিকভাবে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী এবং মসজিদের মিনার আবিষ্কারে পুলকিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিপরীত অনুভূতির সৃষ্টি হয়।

বাস্তবে মসজিদের মিনারের নিচে বেলেপাথরের গায়ে নর্তকীর মূর্তির অস্তিত্ব আবিষ্কার যেন তখন কাবা শরিফের অতীতের কথা মনে করায় যেখানে যুদ্ধ করে মূর্তি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল। পুরো কাহিনিজুড়েই এরকম বেশ কিছু ইঙ্গিতপূর্ণ ধর্মীয় বিশ্লেষণ দেখা যায়, যা কাহিনিটিকে সেই সময় থেকে শুরু করে আজকের ধর্মান্ধ সময় অব্দি অর্থপূর্ণ একটি অবয়ব দিতে প্রয়াস পায়। এভাবে ‘চল্লিশ কদম’ বইটির ক্ষেত্রে ধর্মীয় আচার-আচরণ এবং ধর্ম-পরিচালিত জীবনধারা একটি বড় ভূমিকা পালন করে। তবে লেখক এই কাহিনির পরে তার অন্যান্য লেখায় ধর্মীয় বিষয়-আশয়কে তেমন গুরুত্বপূর্ণ করে তুলে ধরেননি। হতে পারে কাহিনির ভিন্নতার কারণে, হতে পারে সচেতনভাবে। ২০১৫ সালে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি ‘ফোর্টি স্টেপস’ বইটির বিষয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, ‘একসময় নবীন লেখক হিসেবে সালমান রুশদির ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ বই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও আইনি লড়াইয়ের প্রক্রিয়া আমার মনে এক অমোচনীয় ছাপ ফেলে। ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে লেখার ব্যাপারে ‘রুশদি অ্যাফেয়ার’-এর দুঃসহ অভিজ্ঞতা থেকে আমি লেখক হিসেবে এক দিকনির্দেশনা পাই। ‘চল্লিশ কদম’ বইটি ছাড়া আমি আমার অন্য কোনো কল্পকাহিনিতে ধর্মীয় আচারবিধির বিষয়ে কোনো মতামত দিইনি, বিশেষ করে কটাক্ষ করে কখনো কিছু বলিনি। কিন্তু সোজা কথায়, এই বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়াও বাস্তবে অসম্ভব।’ 

বস্তুত কল্পকাহিনিটি উপনিবেশ আমলের মুসলিম সমাজের টুকরো ছায়া। ওইটুকু ছায়াকে অনুসরণ করলে ওই সময়ের মুসলিম সমাজে প্রচলিত সংস্কৃতিকে উপলব্ধি করা যায়। যে সংস্কৃতির ছিল নিজস্ব নিয়মকানুন এবং আপন শব্দভাণ্ডার। ইংরেজিতে লিখিত ‘ফোর্টি স্টেপস’ বইটিতে শব্দের সাবলীল ব্যবহার থাকার পরেও যারা ওই প্রাচীন সংস্কৃতির ভেতরের কথা জানেন, পাঠকালে তাদের কানে নিঃসন্দেহে সেই সময়ের প্রচলিত শব্দগুলোই বেজে উঠবে। এই প্রসঙ্গে বইটির অনুবাদ নিয়ে দুটো কথা না বললেই নয়। ‘ফোর্টি স্টেপস’ বইটি অনুবাদ করেছেন প্রখ্যাত ও গুণী অনুবাদক মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায়। অনুবাদক সাবলীল অনুবাদের গুণে যথাযথভাবে ভ‚য়সী প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু স্থানমাফিক তার শব্দের ব্যবহার দেখলে বিস্ময় জাগে। তিনি যখন দিশি আদমি, তসবির, বিবি, দাওয়াখানা, হাম্মাম, জেনানা, শাদি, দহলিজ, ফেরেব্বাজি, মুনাফা, রসুইঘর এবং এ ধরনের আরও অনেক শব্দ ব্যবহারে অনুবাদটিকে সমৃদ্ধ করেছেন, তখন সত্যি কথায় পাঠকের সামনে হারিয়ে যাওয়া একটি সমাজের চিত্র অবিকৃতভাবে উপস্থিত হয়। কারণ শব্দের সমাহারে গাঁথা ভাষাই তো সেই সূত্র, যা দিয়ে আঁকা ছবিকে অনুসরণ করে পাঠক যুগান্তরে উপস্থিত হতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে ২০০৬ সালে বইটির বাংলা অনুবাদ ‘চল্লিশ কদম’ প্রকাশিত হবার পরে ২০১৬ সালে যখন বেঙ্গল লাইটস প্রথম বাংলাদেশে ইংরেজি প্রকাশনা হিসেবে ‘ফোর্টি স্টেপস’ প্রকাশ করে তখন বাংলাদেশে বইটির প্রাককথনে অনুবাদে প্রাচীন শব্দের ব্যবহারকে একটি ‘সমস্যা’ বলে উল্লেখ করা হয়। ‘সমস্যা’র কারণ হিসেবে বলা হয় যে এই শব্দগুলো এখনকার লেখক-পাঠকদের কাছে প্রচলিত নয়। এ ক্ষেত্রে বলতেই হয় যে, অনুবাদ কেবল ভাষান্তর তো নয়! অনুবাদ কেবল অন্য ভাষাভাষীকে অপরিচিত কাহিনির অন্তর্গত বিষয় বোঝানোর উদ্দেশ্যে করা হয় না। অনুবাদের শক্তি হলো ভিন্ন দেশের, ভিন্ন যুগের জীবন আর সংস্কৃতিকে পৃথিবীর অন্য অংশের অন্য ভাষাভাষীর কাছে তুলে ধরা। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে অনুবাদটি যথার্থভাবে সফল তার শব্দের ব্যবহারের বিশেষত্বের জন্যই। আজকের প্রচলিত শব্দ প্রতিস্থাপনে যা কোনোমতেই ফুটত না। ‘চল্লিশ কদম’ যিনি পড়েছেন নিঃসন্দেহে বিষয়াদি ছাড়াও, একসময়ের জনপ্রিয় অথচ কালান্তরে বাংলা ভাষার হারিয়ে যাওয়া শব্দগুলো তার মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলবে।  

টানটান উত্তেজনার কল্পকাহিনিটি নিয়ে ভাবতে গেলে বারবার একটাই ভাবনা ধাওয়া করে, শিকদার সাহেব কি মৃত নাকি জীবিত! শেষের দিকে এসে লেখক জানান, ‘মরার সময়ে তাঁর চোখ দুটোও নাকি খোলা ছিল, খোদ মোল্লাই তাঁর চোখের পাতাগুলো বুজিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু শিকদার সাহেবের চোখ দুটি যদি এখনও ড্যাবড্যাব করে খোলা থাকে, তাহলে কী হবে?’ এ রকম দুটো বাক্য পাঠককে বারেবারে সিদ্ধান্তহীনতার কথা মনে করিয়ে দিতে বাধ্য। আর লেখক নিজেও শেষ করেন ঠিক সেভাবেই, সমাপ্তিকে টেনে নিয়ে যান কাহিনির শুরুর বাক্যে, খোদ শিকদার সাহেবের মতোই পাঠকের মাথার ভেতরেও বৃত্তাকারে অনুরণিত হতে থাকে কাঠের খড়মের শব্দ, ছত্রিশ, সাঁইত্রিশ...

আরও পড়ুন :

জীবন লিখতে লিখতে | জহর সেনমজুমদার 

ক্ষমতার পঠন : ইতিহাস আর উপন্যাসের বোঝাপড়া | সুমন রহমান

স্বপ্ন নেই, আশাভঙ্গও নেই | সেবন্তী ঘোষ 

বি-উপনিবেশায়নের জ্বালামুখ | হামীম কামরুল হক

বিস্ময়মুগ্ধতা ও ডুবসাঁতার | মোস্তাক আহমেদ

//জেডএস//

সম্পর্কিত

শারদীয় সংখ্যা ২০২০

শারদীয় সংখ্যা ২০২০

অনুবাদের কৈফিয়ত

অনুবাদের কৈফিয়ত

অনুবাদ : চর্চা থেকে তত্ত্বজ্ঞান

অনুবাদ : চর্চা থেকে তত্ত্বজ্ঞান

অনুবাদ সাহিত্যের কলাকৌশল

অনুবাদ সাহিত্যের কলাকৌশল

তর্জমা প্রসঙ্গে

তর্জমা প্রসঙ্গে

স্মৃতিতে দুর্গাপূজা

স্মৃতিতে দুর্গাপূজা

অধরা বিশ্বের প্রতিভূ

অধরা বিশ্বের প্রতিভূ

বিস্ময়মুগ্ধতা ও ডুবসাঁতার

বিস্ময়মুগ্ধতা ও ডুবসাঁতার

সর্বশেষ

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৭

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৭

পুরস্কার লেখককে অনুপ্রাণিত করে : মুহাম্মদ সামাদ

পুরস্কার লেখককে অনুপ্রাণিত করে : মুহাম্মদ সামাদ

কবিতাকে নতুন পথ দেখাতে চেয়েছি : হাসনাইন হীরা

কবিতাকে নতুন পথ দেখাতে চেয়েছি : হাসনাইন হীরা

পাপড়ি ও পরাগের ঝলক

পাপড়ি ও পরাগের ঝলক

আমার হৃদয়ে তার সোনালি স্বাক্ষর

আমার হৃদয়ে তার সোনালি স্বাক্ষর

মায়া তো মায়াই, যত দূরে যায়...

মায়া তো মায়াই, যত দূরে যায়...

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.