X
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২
২৩ আষাঢ় ১৪২৯

যে কারণে মানসম্পন্ন চিকিৎসা শিক্ষা পদ্ধতি গড়তে হবে

আপডেট : ৩১ মে ২০২১, ১৬:৩৪

স ম মাহবুবুল আলম মেডিক্যাল শিক্ষার উদ্দেশ্য স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, যা নিরাপদ ও উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করবে। ওয়ার্ল্ড ইনোভেশন সামিট ফর হেলথ তার বিশেষ রিপোর্টে বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে ১৫ মিলিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর ঘাটতি পূরণ করতে হবে। এডিজি ৩.গ-এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে- “স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা, এই খাতে নতুন জনবল নিয়োগ, নিয়োজিত জনবলের স্থায়িত্ব এবং তাদের প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা করা”। স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত্তি ও চালিকাশক্তি। দেশের স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের সূতিকাগার। স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী অবকাঠামো ও বিশেষ সক্ষমতা নিয়ে তৈরি। প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা গবেষণার তিন লক্ষ্যের সমন্বয়ে রোগীদের উচ্চমান ও সর্বশেষ আধুনিক চিকিৎসা প্রদান, উচ্চ দক্ষতার চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবী তৈরি করা এবং গবেষক তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। প্রতিষ্ঠানগুলো চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই তিন লক্ষ্যের ঊর্ধ্বে নতুন উদ্ভাবন, সর্বশেষ আবিষ্কৃত প্রযুক্তির প্রচলনও পরিবর্তনের ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করে নির্দেশনা দানসহ সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে।

উচ্চ চিকিৎসা সেবা, শিক্ষা (জনশক্তি তৈরি) এবং গবেষণা- এই ত্রিমুখী লক্ষ্যে বাংলাদেশের হতদরিদ্র স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে? তারা কি সেই নেতৃত্ব দিতে সক্ষম? আমরা গার্মেন্টসের বাজার প্রতিযোগিতায় ভিয়েতনামকে অতিক্রম করতে তাড়নায় থাকি। কিন্তু ভিয়েতনাম যখন করোনার শুরুতেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকৃত আরটি পিসিআর টেস্ট কিট তৈরি করে তা আমাদের অক্ষমতাকে আহত করে না। একটি অ্যান্টিজেন-অ্যান্টি বডি কিট তৈরির সক্ষমতা দূরের কথা, তৈরি কিটের কার্যকারিতা বিশ্বাসযোগ্যভাবে যাচাইয়ের সক্ষমতা নেই। আমাদের অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ইন্ডাস্ট্রিকে সঙ্গে নিয়ে একটি নিজস্ব ভ্যাকসিন তৈরির সক্ষমতা আশা করা কি অসঙ্গত ছিল?

এসব গবেষণালব্ধ আবিষ্কারের জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করে অগ্রগামী স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা কর্ম উপেক্ষিত। স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থা, চিকিৎসকদের অবহেলা ইত্যাদি অভিযোগ নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত বিষোদগার ছড়াচ্ছি। কিন্তু কার্যকর স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি যে মানসম্মত চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, সে সম্পর্কে আমাদের জনগণ ও নীতিনির্ধারকদের কোনও সচেতনতা বা আক্ষেপ নেই। আমরা কি বুঝতে পারছি না স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থার নিউক্লিয়াস স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেন্টার অব এক্সসেলেন্স হিসেবে গড়ে তোলার গুরুত্ব?

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং কর্মকালীন প্রশিক্ষণ- ইত্যাদি শিক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশে ভূমিকা রাখছে মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, বিএমডিসি, বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ও মেডিক্যাল কলেজ। বিগত কয়েক দশকে সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা ১০৭টিতে বৃদ্ধি পেয়ে বছরে ১০,০৪৭ জন ছাত্র ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে সেখান থেকে কতজন দক্ষ, নিবেদিত চিকিৎসক বের হচ্ছে? মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র ভর্তি থেকে শুরু করে নিয়োগ পরবর্তী অব্যাহত প্রশিক্ষণের প্রতিটি ধাপ সংকটে খাবি খাচ্ছে। আমরা একে একে সংকটগুলো লক্ষ করি-­

ছাত্র ভর্তিতে ত্রুটি: যে মাল্টিপল চয়েস প্রশ্নে পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে নির্বাচন করা হচ্ছে তাতে একজন ছাত্রের চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষার মতো জটিল ও চাপযুক্ত বিষয় গ্রহণ করার ক্ষমতা বা তার যোগাযোগ দক্ষতা, মোটিভেশন ও মানবিক দিক যাচাই হচ্ছে না। বিগত বছরগুলোতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ভর্তি পরীক্ষায় ভয়াবহ দুর্নীতি এক বিশাল ক্ষত তৈরি করেছে।

অ্যাক্রিডিটেশন মান: বাংলাদেশে মেডিক্যাল কলেজসমূহের অ্যাক্রিডিটেশন কর্তৃপক্ষ নামসর্বস্ব বিএমডিসি। সিএমই ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষার মান উন্নয়নে দুর্বল ভূমিকা রাখছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠানসমূহের অ্যাক্রিডিটেশন দিতে দেশে কোনও জাতীয় স্বাধীন অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষার মান বৃদ্ধি করে গ্লোবাল অ্যাক্রিডিটেশন অর্জনের শর্ত পূরণ করে এগিয়ে যেতে হবে। বিএমডিসির সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।

ফ্যাকাল্টি বিকাশ: একটি স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম ও তার সফলতা সম্পূর্ণভাবে তার অনুষদগুলোর (ফ্যাকাল্টি) ওপর নির্ভর করে। এখানে মেডিক্যাল শিক্ষক হওয়ার জন্য কোনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নিতে হয় না। মেধাবীদের ফ্যাকাল্টি হিসেবে তৈরি করা, অব্যাহত বিকাশ ও ধরে রাখার জন্য কোনও নীতিমালা, প্রক্রিয়া বা সংবেদনশীলতা দেখা যায় না। এ ছাড়া সরকারি চাকরি করে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের চাপ, ক্লান্তি, হতাশা, সহানুভূতিহীনতা, নিজের কাজে অসন্তুষ্টি নিয়ে ক্ষয়ে যাওয়া ফ্যাকাল্টিগণ কতটুকু সময় দিতে পারছেন ছাত্র প্রশিক্ষণে ও গবেষণায়!

কারিক্যুলাম: ১৯১০ সালের ফ্লেক্সনার রিপোর্টের ভিত্তিতে শিক্ষা কারিক্যুলাম চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষা পদ্ধতিতে যে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে তার সীমাবদ্ধতা ৫০ বছরের আগে চিহ্নিত হলেও সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে কারিক্যুলাম রূপান্তরে। স্নাতক কোর্স পুনর্বিন্যাস, বেসিক ও ক্লিনিক্যাল সায়েন্সের একীভূতকরণ, পাঠ্যক্রমে কমিউনিটি স্বাস্থ্য সমস্যাকে প্রাধান্য দেওয়া, নতুন পাঠদান উপাদানের সংযোজন, যেমন-নৈতিকতা, যোগাযোগ দক্ষতা, লিডারশিপ, দলগতভাবে কাজ করা ইত্যাদি, দ্রুত ক্লিনিক্যাল এক্সপোজার, কম্পিটেন্সিভিত্তিক কারিক্যুলাম, শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ পদ্ধতিতে স্মল গ্রুপ টিচিং, ছাত্র-কেন্দ্রিক শেখার ধারা প্রবর্তন, মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকীকরণ করা ইত্যাদি স্বীকৃত পদক্ষেপ চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল অবকাঠামো, উচ্চ ছাত্র শিক্ষক অনুপাত, অপ্রস্তুত ফ্যাকাল্টি ও তাদের অনীহা চিকিৎসা শিক্ষায় মান উন্নয়নে কার্যত ভূমিকা রাখতে পারেনি। চিকিৎসা শিক্ষা পাঠ্যক্রম মূল্যায়ন ও উন্নয়ন একটি ক্রমাগত পরির্বতনশীল প্রক্রিয়া, উল্টোদিকে যারা দায়িত্বে আছেন তারা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনকে বাধাগ্রস্ত বা বিলম্বিত করছেন নিজদের সুবিধা ধরে রাখতে।

প্রযুক্তি ও তথ্য প্রযুক্তির যোগ: সিমুলেশন টুল, স্কিল ল্যাব এখনও সংযোগ হয়নি কোনও মেডিক্যাল কলেজে। পোস্ট গ্রাজুয়েট প্রশিক্ষণেই আমাদের সামর্থ্য ঘটেনি প্রয়োজনীয় এই সব প্রশিক্ষণ সামগ্রীর ব্যবহারের। তথ্য প্রযুক্তির অফুরন্ত শক্তির কিছু অংশ কাজে লাগাতে পারলে এই কোভিড মহামারিতে বছরজুড়ে শিক্ষা খাতে সুনামির ক্ষতি অনেক কমিয়ে আনা যেত। কোনও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষায় তথ্য প্রযুক্তির নানা ব্যবহারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলেনি। শিক্ষায় থ্রি-ডি মডেল, ডিজিটালাইজেশন ও প্রযুক্তির ব্যবহার অনুপস্থিত।

চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক মান অর্জন: যোগ্য নেতৃত্ব, সুষ্ঠু নীতিমালা ও উন্নত ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলতে হবে গবেষণা ও সৃজনশীলতার পরিবেশ। ফ্যাকাল্টির বিকাশ, ক্যারিক্যুলামের যুগোপযোগী উন্নয়ন ঘটবে বিজ্ঞানমুখী, প্রমাণভিত্তিক চর্চার উপযোগী প্রতিষ্ঠানের ভেতরে। অবকাঠামোর উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ সামগ্রী সংগ্রহ বা প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটাতে অব্যাহত অর্থায়ন মসৃণ থাকতে হবে।

ইন্টার্নশিপ তত্ত্বাবধান: ইন্টার্নশিপ যথাযথ পর্যবেক্ষণ ছাড়া শেষ হয় ও প্রশিক্ষণ শেষে কতটুকু দক্ষতা তৈরি করতে পেরেছে তারও মূল্যায়ন পদ্ধতি রাখা হয়নি।

বাংলাদেশে চিকিৎসক (এমবিবিএস/বিডিএস)-সহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর (নার্স ও মিডওয়াইফ, ফার্মাসিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মী) ব্যাপক ঘাটতি বিদ্যমান। আরও প্রকট ঘাটতি দক্ষ ও উজ্জীবিত স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর। চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মীর অনুপাতের ভারসাম্যহীনতায় স্বাস্থ্যসেবার মান অনেক নিম্ন এবং ক্ষেত্রবিশেষে অকার্যকর।

নার্স ও মিডওয়াইফ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ: বাংলাদেশে নার্স ও মিডওয়াইফের ব্যাপক স্বল্পতার সঙ্গে তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে নানা ধরনের সংকট ও সীমাবদ্ধতা স্বাস্থ্যসেবাকে অদক্ষ ও অনিরাপদ করে রেখেছে। অবকাঠামো, ফ্যাকাল্টির অভাব, পুরনো ক্যারিক্যুলাম, শিক্ষা উপকরণের দুরবস্থা, অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি সংকটে নার্সিং শিক্ষা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আমাদের নার্সিং পেশাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। উজ্জীবিত ও পারদর্শী নার্স তৈরি করতে নীতিনির্ধারকদের প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিতে হবে নার্সদের পেশাগত অবস্থান, বেতন কাঠামো ও সামাজিক অবস্থা উন্নয়নে। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মীদের শিক্ষার মান, ট্রেড লাইসেন্স ও নিয়োগ নিয়ে নীতিনির্ধারণে সরকার এবং জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা চরম উদাসীনতা ও অদূরদর্শিতা দেখাচ্ছে। স্নাতকোত্তর ও কর্মকালীন প্রশিক্ষণের অবস্থা আরও ভয়াবহ। গত পঞ্চাশ বছরে নানা স্বেচ্ছাচারিতায় একটি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রির জন্য কত মেধাবী তরুণ চিকিৎসকের সবচেয়ে সক্রিয় কর্মজীবন থেকে জাতি বঞ্চিত হয়েছে তার হিসাব নেই। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণে সীমিত সময়ে দক্ষতা তৈরি ও আন্তর্জাতিক মান অর্জনে ব্যাপক বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনী অনুশীলন প্রয়োজন। একটি সমন্বিত স্নাতকোত্তর চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। স্বাস্থ্য শিক্ষার উদ্দেশ্য একজন স্বাস্থ্য পেশাজীবীর জীবনব্যাপী শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করে রাখা।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের মাধ্যমে স্বশাসন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। এমন একটি বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে অবিশ্বাস্য দলীয় রাজনীতি, স্বজনপ্রীতি, বিশৃঙ্খলা প্রকট হয়ে উঠে যার ফলে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে তেমন কোনও অবদান রাখতে পারেনি। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক প্র্যাকটিসের সুযোগ দেওয়া হলেও প্রাইভেট প্র্যাকটিস রহিত করা হয়নি।

আমরা কারিক্যুলাম রূপান্তর, ফ্যাকাল্টি উন্নয়ন ইত্যাদিকে সামনে আনতে পারি। তবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কী ধরনের হবে তা নির্ধারণ না করে মোটিভেটেড, দক্ষ স্বাস্থ্য জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার অনুপস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা সংকুচিত হয়ে তা হয়ে উঠে ব্যয়বহুল, হাসপাতালমুখী ও কিউরেটিভ উচ্চ প্রযুক্তির। সচ্ছল, প্রশিক্ষিত ডাক্তাররা ছুটবে প্র্যাকটিসমুখী কোনও ক্লিনিক্যাল বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের জন্য। মেডিক্যাল কলেজের বেসিক সাবজেক্টে, ফরেনসিক মেডিসিনে কেউ ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী হবে না। অবহেলিত হবে কমিউনিটিভিত্তিক প্রিভেনটিভ, প্রমোটিভ স্বাস্থ্য কার্যক্রম। স্বাস্থ্যকর্মীর ব্যাপক ঘাটতি সত্ত্বেও বেড়ে যাবে স্বাস্থ্যকর্মীর বেকারত্ব ও নিম্নমানের কাজে যোগদান। তাই এই সময়ে ঢাকা শহরে একজন নবীন বেসরকারি ডাক্তারের চেয়ে একজন রিকশাওয়ালার মাসিক আয় বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের দ্রুত ও অসম ব্যাপ্তি চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কলেজগুলোর দুর্বল অবকাঠামো, ফ্যাকাল্টির অভাব, শিক্ষা সামগ্রীর সংকট, দুর্নীতি, অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে দুর্বল মেধার ছাত্র ভর্তি বা মধ্যবিত্তের সর্বস্ব বন্ধক রেখে স্বপ্ন পূরণে বিনিয়োগ ইত্যাদি স্বাস্থ্য খাতে বিরূপ মানসিকতার জনশক্তির সংযোগ ঘটাচ্ছে। স্বাস্থ্য শিক্ষায় স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ের খুব ক্ষুদ্র অংশই ব্যয়িত হচ্ছে। স্বাস্থ্য শিক্ষায় উচ্চমান ও সমমান তৈরিতে অর্থায়নের প্রধান অংশই আসতে হবে রাষ্ট্রীয় উৎস থেকে।

স্বাস্থ্যকে আমরা সংবিধানে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছি, স্বাস্থ্যসেবা অর্থায়ন কৌশলপত্রে (২০১২-২০৩২) স্বাস্থ্য বাজেট জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশে উন্নীত করা ও স্বাস্থ্যসেবা পেতে ২০৩২ সালে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ৩২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাস্তব ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের পথে না এগিয়ে উল্টোমুখে হাঁটছে। ক্রমাগত ব্যক্তি পর্যায়ে ছেড়ে দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিম্নমানের, অনিরাপদ ও অপ্রবেশগম্য হয়ে উঠছে। বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকলে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জিত হবে না। যারা বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বা বিমা ব্যবস্থায় সমাধান দেখছেন তারা প্রকারান্তরে ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা অতিরিক্ত মূল্যের বেসরকারি খাতের পক্ষে স্বাস্থ্যে বর্তমানের বিশৃঙ্খলা ও সেবা জনগণের নাগালের বাইরে রাখতে চাইছেন। বাংলাদেশের মানুষের বর্তমান বার্ষিক মাথাপিছু গড় আয়ে বেসরকারি বিমা কার্যকর হবে না। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আগ্রহ থাকে না। স্বাস্থ্য খাতের সমস্ত সেবা, সামগ্রীকে কোডিংয়ের আওতায় এনে প্রতিটি সেবার অর্থমূল্য ও মান স্বচ্ছতার সঙ্গে সেবা প্রদানকারী (বিক্রেতা) ও সেবা গ্রহণকারীর (ক্রেতা) কাছে প্রতীয়মাণ করে শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও তদারকি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা সাপেক্ষেই কেবল বিমা পদ্ধতি কাজ শুরু করতে পারে। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যর্থ প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকতে হবে। শক্তিশালী পাবলিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শক্তিশালী সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরি হলেই বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মান উন্নত হবে, প্রতিযোগিতামূলক হবে। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা হবে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের প্রধান নিয়োগকারী। স্বাস্থ্য শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে তখন ভবিষ্যতের চিকিৎসকের মন ও মননের বিকাশ হবে কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা পূরণের দায়িত্ববোধ থেকে।

যেভাবে শুরু হতে পারে:

স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের আওতার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। আর্থিক ও অনার্থিক প্রণোদনা এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকে সহজ করবে। জ্ঞান, গবেষণায় আগ্রহীরা অর্থ ও নিরাপত্তার পেছনে না ছুটে প্রতিষ্ঠান ও জনশক্তি তৈরির কারিগরে রূপান্তরিত হবে। আমাদের প্রতিবেশী দেশে এসব মডেলে বিশ্বমানের ইনস্টিটিউট তৈরি হয়েছে। সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে, রূপান্তরে চিকিৎসা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিতে হবে যেখানে সহযোগী হতে পারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংক ও ওইসিডি, যার লক্ষ্যের মধ্য থাকবে–

১. স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের শিক্ষার মান উন্নয়ন;

২. জনস্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণকে জোরালো করা ও মানবসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি;

৩. প্রাইমারি স্বাস্থ্যসেবা দলের সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়ন;

৪. স্বাস্থ্যসেবা কর্মকাণ্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ডাটাবেস নির্মাণ, যা সুযোগ করে দেবে বাস্তব সময়ে বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের।

শুধু স্বাস্থ্যসেবা নয় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা জরুরি। মানহীন স্বাস্থ্যসেবা যেমন ব্যাপক অপচয়মূলক তেমনই ক্ষতির কারণ। চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষা পদ্ধতিকে এমনভাবে বিন্যাস করতে হবে যে সেখান থেকে তৈরি হওয়া জনশক্তি যেন সে দেশের জনগোষ্ঠীকে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সর্বোত্তমভাবে স্বাস্থ্যসেবা দিতে সক্ষম হয়। এর জন্য প্রয়োজন সুকঠিন রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা, বিনিয়োগ ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে সঠিক পথরেখা তৈরি। যেখানে স্বাস্থ্য শিক্ষা পদ্ধতির মান উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র থেকে সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে একই সূত্রে যুক্ত রাখবে। লক্ষ্যাভিমুখী সুপরিকল্পিত সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকারকে তা দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে। বিলম্বিত পদক্ষেপ শুধু জনদুর্ভোগকে দীর্ঘস্থায়ী করবে না, বাস্তবায়নও কঠিন করে তুলবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। সিনিয়র কনসালটেন্ট ও ল্যাব কো-অর্ডিনেটর, প্যাথলজি বিভাগ, এভার কেয়ার হাসপাতাল।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল, শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
নড়াইলে অধ্যক্ষকে লাঞ্ছনাঅভিযুক্ত শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল, শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
বিয়ে করছেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী, কনে সম্পর্কে যা জানা গেছে
বিয়ে করছেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী, কনে সম্পর্কে যা জানা গেছে
আম দিয়ে ঈদ ডেসার্ট
ঈদ রেসিপিআম দিয়ে ঈদ ডেসার্ট
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ২৫ কিলোমিটারে যানজট
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ২৫ কিলোমিটারে যানজট
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ