X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

নির্বাচন কমিশন আইন হতে বাধা কোথায়?

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২১, ১৮:০৭

আমীন আল রশীদ নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনও তিন বছরের বেশি সময় বাকি। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনও কারণে সংসদ ভেঙে গেলে, ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে।

বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সংসদ ভেঙে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বর্তমান সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি। সুতরাং এর মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি। ফলে এর পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে যেকোনও দিন নির্বাচন হতে হবে।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এখনই জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তরফেও  মাঠের রাজনীতিতে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার ‘পরামর্শ’ দেওয়া হয়েছে। আলোচনায় আসছে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের ইস্যুটিও। কেননা, বর্তমান হুদা কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারিতে। এবারও যে গত বছরের মতো সার্চ কমিটির মাধ্যমেই কমিশনারদের নিয়োগ করা হবে, তা মোটামুটি নিশ্চিত। গত ৪ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি একটি সার্চ কমিটি করবেন। তার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে।

সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চার জন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনও আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’

যদিও আজ পর্যন্ত এ সম্পর্কিত কোনও আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। গত ৭ অক্টোবর রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘করোনাভাইরাসের এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের জন্য আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হবে না।’

প্রশ্ন হলো, একটি আইনের খসড়া প্রস্তুত, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন, সংসদে উত্থাপন, সংসদীয় কমিটিতে যাচাই-বাছাই শেষে পাস করতে তিন মাস কি যথেষ্ট সময় নয়? আইনমন্ত্রী যে করোনা পরিস্থিতির কথা বলেছেন, সেটিও এখন আর খুব বেশি উদ্বেগের বিষয় নয়। করোনা পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। জীবনযাপন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও খুলেছে। খুলনার একটি হাসপাতালে একটানা ১৪ দিন কোনও করোনা রোগী ভর্তি না হওয়ায় সেখানের কোভিড ইউনিট বন্ধ করা হয়েছে। তার মানে করোনার কারণে এখন আর কোনও আটকে থাকার সুযোগ নেই।

তারপরও ধরা যাক এই সময়ের মধ্যে আইন প্রণয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো স্বাধীনতার গত ৫০ বছরেও কেন এই আইনটি হলো না বা করা গেলো না? এখানে কি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব নেই? এর একটি কারণ কি এই যে নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন থাকলে যেহেতু সেখানে কোনও প্রক্রিয়ায় কমিশন গঠিত হবে, সেটি সুস্পষ্ট থাকবে; আইন হলে সেখানে কারা নির্বাচন কমিশনের সদস্য হতে পারবেন, কে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হবেন, তাদের যোগ্যতা কী হবে; পেশাগত জীবনে তাদের ট্র্যাক রেকর্ড; রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ইত্যাদি বিষয় যেহেতু আইনে উল্লেখ থাকবে; নিয়োগ পাওয়ার আগেই তাদের ব্যাপারে যেহেতু নাগরিকরা জানতে পারবেন এবং গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের ব্যাপারে মতামত জানানোর সুযোগ থাকবে; এমনকি তাদের ক্ষমতা ও এখতিয়ারও আইনে স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে— ফলে সেই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীনদের পক্ষে ‘নিজেদের পছন্দের লোকদের’ দিয়ে কমিশন গঠন কঠিন হবে?

এ কারণেই কি অতীতের কোনও সরকারই নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য কোনও আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়নি? আগামী সংসদ নির্বাচনের পরেও যে নতুন সরকার গঠিত হবে—তারাও কি সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি সময়োপযোগী, গণতান্ত্রিক ও সর্বজনগ্রাহ্য একটি আইন করবে?

এটাও ঠিক আইন করলেই যে এমন একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করা যাবে, যারা সব ধরনের ভয়ভীতি ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে, দেশ ও জনগণের পক্ষে থেকে অবাধ-সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারবে—সেই নিশ্চয়তাও কেউ দিতে পারবে না। কারণ, নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীন হলেও তারা যে প্রকারান্তরে স্বাধীন নন, সেটি নানাভাবেই প্রমাণিত হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন যে নির্বাহী বিভাগের চোখ রাঙানির বাইরে গিয়ে মেরুদণ্ড সোজা রেখে স্বাধীনভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় সেটি খুব কঠিন। তারও চেয়ে বড় কথা, যারা এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন, তারা আসলে কতটা নিরপেক্ষ থাকতে চান, তাদের নিজেদের কমিটমেন্ট কতটুকু, নাকি তারা নির্বিঘ্নে রাষ্ট্রীয় কিছু সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার স্বার্থে আর দশটা সরকারি চাকরির মতোই পাঁচ বছর সময়কাল অবিবাহিত করতে চান—সেটিও বিরাট প্রশ্ন।

নির্বাহী বিভাগের খবরদারির ভেতরে থেকে স্বাধীনভাবে অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরিচালনার জন্য যে ধরনের ব্যক্তিত্ব, যে ধরনের মানসিকতা ও দেশপ্রেম থাকা দরকার—সেরকম মানুষের সংখ্যা নিশ্চয়ই অনেক বেশি নয়। আবার সেরকম মানুষ থাকলেও তাদের অনেকেই এই দায়িত্বে আসতে চাইবেন না বা তাদের নামগুলো কোনোভাবেই এই প্রক্রিয়ার ভেতরে আসবে না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও শিক্ষক থেকে শুরু করে মসজিদ কমিটির সভাপতিও যখন রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পান—তখন নির্বাচন কমিশনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে থাকা ‘নিরপেক্ষ’ মানুষেরা দায়িত্ব পাবেন—সেটি ভাবতে ভালো লাগে; কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন।

সম্প্রতি দেশের ৫৪ জন বিশিষ্ট নাগরিকও বিবৃতি দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি আইন করার দাবি জানিয়েছেন। বিবৃতিদাতারা বলেছেন, ‘বিগত দুই নির্বাচন কমিশনের ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ আচরণের কারণে নির্বাচনি ব্যবস্থায় মানুষের আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। নির্বাচনি ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা ফেরাতে নির্বাচন কমিশন এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যেটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। এ জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার খুঁজে বের করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত অনুসন্ধান কমিটিকে হতে হবে দলনিরপেক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।’

নির্বাচন কমিশন একটা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান; যাদের নিরপেক্ষতা ও সাহসের ওপর নির্ভর করে দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ। এ রকম একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে যারা দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের নৈতিক মানদণ্ড, তাদের ব্যক্তিত্ব, তাদের জানাশোনা অবশ্যই আর দশটা প্রতিষ্ঠানের মতো হবে না। কিন্তু আমাদের নির্বাচন কমিশন বারবারই বিতর্কিত হয়েছে। ‘আজিজ মার্কা কমিশন’ বলে একটা প্রবাদও চালু হয়ে গেছে।

আগে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি সরাসরি নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দিতেন। সেখানে প্রথমবারের মতো ২০১২ সালে সার্চ বা অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে ইসি নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর বর্তমান কমিশনও গঠিত হয় সার্চ কমিটির মাধ্যমে। যদিও এই কমিটি নিয়েও বিতর্ক হয়েছিল।

২০১২-২০১৭ মেয়াদে রকিব কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই একজন কমিশনার সাংবাদিকদের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একজন কমিশনারের আচরণের প্রতিবাদে ইসি বিটের সাংবাদিকরা নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে মানববন্ধন করেন। দেশের ইতিহাসে এ রকম ঘটনা এর আগে কখনও ঘটেনি। অবশেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাংবাদিকদের ডেকে নিয়ে ওই কমিশনারের আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনেও নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই স্রোতের বিপরীতে গিয়ে নানারকম কথাবার্তা বলে আলোচিত এবং কখনও সমালোচিত হচ্ছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। একাধিক ঘটনায় তিনি যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তা স্পষ্টতই তার বাকি চার সহকর্মীর বিপরীত। তিনি একাধিকবার ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন। এমনকি কমিশন বৈঠক থেকে বেরিয়েও গেছেন। তার অতি সাম্প্রতিক একটি মন্তব্য দিয়ে লেখাটা শেষ করা যাক। তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচন এখন কতিপয় জটিল অসুখে আক্রান্ত। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় গণতন্ত্রের অবস্থা সংকটাপন্ন। একক ডাক্তারের পক্ষে তাকে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করতে হবে।’

জনাব তালুকদারের এই বক্তব্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চমার্গীয় রসিকতাও বটে। তবে এও ঠিক, রোগাক্রান্ত নির্বাচনকে বাঁচাতে হলে নির্বাচন কমিশনার কারা হবেন, তাদের যোগ্যতা কী হবে—সেটি ঠিক করা সবার আগে জরুরি।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বৃষ্টিতে ভিজতে চান লুৎফর হাসান-রূপা!
বৃষ্টিতে ভিজতে চান লুৎফর হাসান-রূপা!
গতবারের চেয়ে কিছুটা বাড়িয়ে পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ
গতবারের চেয়ে কিছুটা বাড়িয়ে পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ
কাঠগড়ায় তারকারা: দেশ মানে না আপনি মোড়ল!
কাঠগড়ায় তারকারা: দেশ মানে না আপনি মোড়ল!
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শপথবাক্য ঠিকমতো পড়ানো হয় না
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শপথবাক্য ঠিকমতো পড়ানো হয় না
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ