রাজপথে রক্তের দাগ! হৃদয়ে রক্তক্ষরণ! মঙ্গলবার রাজপথে যে ৬ তরুণের প্রাণ ঝরে গেলো অকালে, তারা তো আমাদেরই সন্তান, স্বজন। মুক্তিযোদ্ধারা একাত্তরের সম্মুখ সমরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য প্রাণ বাজি রেখেছিলেন। তারাও নিশ্চয়ই নিজ দেশে প্রিয় সন্তানদের রক্তের শোকে কাতর। তরুণদের আবেগকে একইভাবে কেউ কেউ রাজনীতির নানান খাতে ব্যবহার করেছেন। কমলমতি শিক্ষার্থীদের আবেগের অন্তরালে কেউ ক্ষমতার পালাবদলের উপযুক্ত সময় গণ্য করে পানি ঢেলেছেন। ঠিক একইভাবে একাত্তরের পরাজিত শক্তির প্রতিভূরা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বিষোদগার করার সুযোগ নিয়েছে।
তাই বলি, দেশের সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগতিশীল রাজনীতির সুযোগ করে দিন। দেশের পরম আরাধনার অমূল্য রতন স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা কারা কী সেই ইতিহাস জানান সুযোগ করে দিন। পাশাপাশি রাজাকার কারা ও কী অমানবিক কাজ করে ইতিহাসে কাপুরুষ হিসেবে চিহ্নিত– সেই বোধের জায়গায় জাগরণে সহায়তা করুন। তা না হলে একাত্তরের পরাজিত শক্তির সঙ্গে সুযোগসন্ধানী নানান শক্তি এই তরুণদের আবেগ ও অজানাকে পুঁজি করে বারবার দেশের মৌলিক ভিত্তি নড়বড়ে করে দেওয়ার উদ্যোগ নেবে।
মাত্র ৫৩ বছরে নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীন দেশের গৌরবের মাহাত্ম্য হারালো? পরম ঘৃণ্য রাজাকার-আলবদর, যারা ইতিহাসের নিকৃষ্ট আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত, সেই তাদের পক্ষে স্লোগান দিলো দেশের তথাকথিত একদল তরুণ। যারা নিজেদের মেধাবী গণ্য করে মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধী আন্দোলনের নামে স্বাধীন দেশের পরাধীন শক্তির পক্ষে লড়ছে? তাও প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে রাজাকার হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। এই ভয়াবহ সত্য স্বাধীনতার মাত্র ৫৩ বছর বয়সে, যখন স্বাধীন দেশ অর্জনের পথে লাখো শহীদের পক্ষে তাদের স্বজন প্রিয়জনেরা জীবিত। ধুঁকে ধুঁকে হলেও বেঁচে আছেন অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা। আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলনের ঐতিহাসিক ইতিহাস।
১৯৭১-এর ২রা মার্চ ঐতিহাসিক বটতলায় প্রথম পতাকা উত্তোলন ও নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাস প্রতিবছর স্মরণ করা হয়। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনতার পথে স্বাধিকারের চেতনায় অমর একুশ ফেব্রুয়ারির পথপরিক্রমায় এ দেশের রাজনৈতিক ও মননের বুনন গেঁথে দিয়েছে।
এই বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরেই সূচিত হয়েছে ৯০’র স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন; সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজাকার ধ্বনিতে কেঁপেছে রাতের অন্ধকার? তখন নিশ্চিতভাবে কেঁদেছে এ দেশের লাখো শহীদের আত্মা এবং জীবিত যুদ্ধাহতরা। হৃদযন্ত্রের কম্পনের সঙ্গে চোখের পানিতে সয়লাব করেছেন নিশ্চিত। মাত্র ৫৩ বছর আগে পরাধীনতার কঠোর শৃঙ্খল কীভাবে বাঙালির নিত্যদিনের জীবন ছিল? লেখাপড়ার সীমিত ব্যবস্থা, চাকরিতে বৈষম্য, মেধাবী হওয়ার পরেও সিভিল সার্ভিসে কিংবা সেনাবাহিনীর চাকরিতে প্রবেশযোগ্যতা যে ছিল না, এ কথা ভুলে গেলো সবাই?
এরা কোন প্রজন্ম, যারা ইতিহাসের বিপরীত পথে হেঁটে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবগাথাতে অভক্তি ও অরুচিতে ভুগছে? কারণ কী? কারা তাদের এই ইতিহাসবিমুখ করে পেছনে নিয়ে যাচ্ছে? এদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করা দরকার! স্বাধীন দেশের মাত্র ৫৩ বছরের ইতিহাস উল্টোপথে নিতে পারে কি?
স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধারা যেন ‘গরিবের বউ’!
স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধারা যেন ‘গরিবের বউ’ হয়ে উঠেছে। কৌতুকের ছলে গরিবের সুন্দরী বউকে যেভাবে ভাবি ডেকে খানিক মজা নেওয়া যায়, সেই পরিস্থিতি যেন দেশের কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা শুরু করেছে।
কারণ সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে গত ৫ জুন হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের মূল অংশ প্রকাশ করা হয়েছে। বহুল আলোচিত ওই রায়ের মূল অংশে বলা হয়েছে– প্রয়োজনে কোটা কম বা বেশি করা যাবে। কোনও পাবলিক পরীক্ষায় যদি কোটা থেকে আবেদনকারী চাকরিপ্রার্থী না পাওয়া যায় তবে সাধারণ মেধা তালিকায় থাকা প্রার্থীর মাধ্যমে তা পূরণ করার স্বাধীনতা থাকবে। এই যে পরিবর্তন-পরিবর্ধনের সুযোগ উচ্চ আদালত দিলো, এই বিষয়ে আন্দোলনকারীদের কথা বলার বা কাঙ্ক্ষিত পথে এগিয়ে যাবার একটি অনবদ্য সুযোগ তৈরি হলো। তারপরও কেন মাঠ সরগরম করছে শিক্ষার্থীরা?
যেখানে স্বয়ং প্রধান বিচারপতি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেছেন, রাস্তায় স্লোগান দিয়ে আদালতের রায় পরিবর্তন করা যায় না। আন্দোলনকারীদের তিনি নিজেদের সন্তান গণ্য করে শিক্ষার্থীরা ভুল বুঝে এটা করছে বলেও স্নেহময় মন্তব্য করেছেন। সর্বোপরি প্রধান বিচারপতি আন্দোলনকারীদের প্রতি সংবেদনশীলতা প্রকাশ করে প্রতিবাদকারীদের আইনজীবীর মাধ্যমে তাদের বক্তব্য তুলে ধরারও সুযোগ দিয়েছেন।
এ ক্ষেত্রে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা যদি যৌক্তিকভাবে দেশের বিপুল সংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর কল্যাণের কথা চিন্তা করে মাঠে নামে তবে তো এই সুযোগ লুফে নেওয়ার কথা! তা না করে পথ আটকে, ব্যারিকেড দিয়ে, বিক্ষোভ মিছিল সহযোগে পথের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপির নামে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার উদ্দেশ্য কি?
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধিতা করাই কি আন্দোলনের উদ্দেশ্য?
যুক্তির খাতিরে এই প্রসঙ্গে বলতে হচ্ছে, ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর নবম থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে নিয়োগে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করা হয়। সেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করা হয়। যে বীর মুক্তিযোদ্ধা পিতারা অসীম ত্যাগে দুঃসাহসিকতায় এ দেশকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করলো সেই বীরদের সন্তানেরা এ দেশে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির যোগ্যতা রাখে না?
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্ম কমিশন-‘পিএসসি’র প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আবেদ আলীদের পিএসসির রমরমা ব্যবসার খবর যখন জাতীয় ইস্যু তখনও আন্দোলনকারীরা কেন নিশ্চুপ? পিএসসির পরিচালক থেকে ড্রাইভার একটি দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা কর্মচারী গোষ্ঠী প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িয়ে হাজার কোটি টাকা কামিয়েছে, দেশের লাখ লাখ তরুণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, তখনও মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধীরা প্রতিবাদে সোচ্চার নয় কেন? লাখো তরুণের ভাগ্যে সীমিত সংখ্যক সরকারি চাকরির সুষ্ঠু ও ন্যায্য বণ্টন বিধিতে পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ উত্তরণে দেশের সবাই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পিএসসি’কে ভরসাস্থল গণ্য করে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকে। পিএসসি’র কাছে ন্যায্যতা আশা করে। তখনও একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পিএসসি’র কর্মকর্তা, কর্মচারী, ড্রাইভারের মতো নায়কেরা গ্রেফতার হয়, তরুণদের ভাগ্য অন্ধকার করা এত সব ঘটনা কেন বিচলিত করে না বা করছে না মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের। আজব না?
সরকারি চাকরিতে পোষ্য কোটা আন্দোলনকারীদের চোখে কেন বৈষম্য নয়?
সরকারি ক্যাডার, নন-ক্যাডার, বেসরকারি ব্যাংক, বিমা, স্বায়ত্তশাসিত চাকরির স্বপ্ন তো দূরের কথা, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের পথ আটকে আছে পোষ্য কোটায়। মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধীরা পোষ্য কোটা ইস্যুটি কি আমলে নেবেন? কারণ স্বপ্নের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক শূন্য নম্বর কম পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ বঞ্চিত করে। অথচ এমনও দৃষ্টান্ত আছে যে ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থী ন্যূনতম পাস নম্বর পায়নি– ফেল করেছে, তারাও পোষ্য কোটায় ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের সন্তানদের জন্য এই যে পোষ্য কোটার ব্যবহার, তা মেধার বৈষম্য নয়? প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা, কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে এ দেশের সংবিধানের ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদ সবার জন্য সমান সুযোগের কথা বলছে। যদিও ২৯ নম্বরের উপ-অনুচ্ছেদে পিছিয়ে থাকা সেই অনগ্রসর প্রতিবন্ধী ও বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর বিশেষ বিধান রেখেছে। কিন্তু সরকারি চাকরিজীবী, যাদের বেতন ভাতার সঙ্গে হালের নানান উৎসব ভাতাও দিচ্ছে সরকার। উপরন্তু রয়েছে চিকিৎসা ও আবাসন সুবিধা, সময়মতো বেতন-বোনাসের পাশাপাশি চাকরি শেষে প্রভিডেন্ট ফান্ডের আওতায় এককালীন অর্থ প্রাপ্তি এবং পেনশন সুবিধা।
সরকারি চাকরি মানে ‘সোনার হরিণ’, সেদিক থেকে সরকারি চাকরিজীবীরা কোন দিক থেকে সমাজের পশ্চাৎপদ যে তাদের সন্তানদের জন্য পোষ্য কোটা বহাল রয়েছে? সরকারি পোষ্য কোটা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের বক্তব্য কি? বড্ড জানতে ইচ্ছা করছে! আবার রেলওয়ের চাকরিতে ১৪তম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেডে মোট শূন্যপদে ৪০ শতাংশ পোষ্য কোটা– এই তথ্য কি মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধীরা জানে? এটা কি বৈষম্য নয়?
মো. রোকনুজ্জামান নামে এক আইনজীবীকে ধন্যবাদ তিনি এই বিষয়টি মহামান্য হাইকোর্টের নজর এনেছেন এবং রবিবার হাইকোর্টের এক দ্বৈত বেঞ্চে প্রাথমিক শুনানি হয়েছে। বিজ্ঞ ও মাননীয় দুই জন বিচারক রেলওয়েতে চাকরির ক্ষেত্রে পোষ্য কোটার এই বিধান সংবিধানের সঙ্গে কেন সাংঘর্ষিক, এই মর্মে রুল জারি করেছেন। এতে সংশ্লিষ্টদের আগামী ১০ দিনের মধ্যে জবাব দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত। এই যে ৪০ শতাংশ পোষ্য কোটা এই বিষয়টি মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধীরা কীভাবে দেখছেন? বৈষম্য নাকি সমতা উত্তর দেবেন কারা?
জাতীয় নেতা হওয়ার দৌড়ে আবারও ব্যবহার হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধী আন্দোলন?
রাজধানীর শাহবাগের রাজপথের চত্বরে মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধীদের আন্দোলন, অবরোধ ও স্লোগান নিছক স্বাধীনতাবিরোধীদের আস্ফালনে পরিণত হয়েছে।
গত কয়দিনের অবস্থা বিশ্লেষণে এই প্রশ্ন করাটা অসঙ্গত হবে কি? কারণ আদালতে মীমাংসার জন্য থাকা একটি ইস্যুতে উচ্চ আদালত একের পর এক উদ্যোগ নিয়েছে। প্রথমত, সরকারি চাকরিতে কোটা বহাল রেখে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের ওপর ১০ জুলাই এক মাসের জন্য স্থিতাবস্থা দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
দ্বিতীয়ত, ১১ জুলাই সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে গত ৫ জুন হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের মূল অংশ পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করেছেন উচ্চ আদালত। তারপরও কেন মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধীরা আন্দোলনে?
উচ্চ আদালত কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের কোটা সংস্কারের পথে যেভাবে নানান কর্মতৎপর হয়ে উদ্যোগী হচ্ছেন, আন্দোলনকারীদের সেই পথে এগিয়ে চলার কোনও উদ্যম বা আগ্রহ দেখছি না? বরং আন্দোলন জিইয়ে একাত্তরের পরাজিত শক্তিরা স্বাধীনতাবিরোধী মনোভাব পুঁজি করে তরুণদের আবেগকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়ন করতে চায়। আর এ কাজে দেশের বিরুদ্ধে দেশ জাগাতে তরুণদের আবেগের সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। বরাবরের মতোই একাত্তরের পরাজিত শক্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে স্পর্শকাতর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের বিষয়টি। মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধ শব্দগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে ভুলভাবে উপস্থাপন করে ফায়দা নেওয়া কি তাদের উদ্দেশ্য নয়?
ঠিক আজ থেকে ৬ বছর আগে ২০১৮ সালে এই কোটাবিরোধী আন্দোলন করে অনেকেই ফেইস ভ্যালু তৈরি করে লাইম লাইটে এসেছিল। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে এদেরই একজন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-‘ডাকসু’র নেতা বনেছেন। এবারও স্থূল মূল্যবোধহীন নব্য দেশপ্রেমিক এমনকি নব্য স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির অবস্থান নিতে আওয়ামী লীগের ছায়াতলে ভিড়ে সক্রিয় হয়েছে সেই পুরনো পাপী একাত্তরের পরাজিত শক্তির প্রতিভূরা। যারা স্বাধীনতার মূল্য বোঝে না, মুক্তিযুদ্ধ দিনের ভয়াবহতা দেখেনি বাবা, চাচা, দাদার কোলে বসে একাত্তরে স্বজন প্রিয়জন হারানো, পিতার সামনে কন্যাকে ধর্ষণ, মায়ের বুকে থাকা সন্তানকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের বুটের নিচে পিষে মেরেছে– এমন নির্মম বেদনাময় অভিজ্ঞতার কথা আজকের কতজন তরুণ জানেন?
সেই তরুণ প্রজন্মের আবেগ উসকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী চেতনা জাগিয়ে ভাগ্য উন্নয়নের শিকারে নেমেছে মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ! আর নাদান মূল্যবোধহীন নাগরিক সুবিধাপ্রাপ্ত তরুণদের ‘কান নিয়েছে চিলে’ এমন ধারায় পথে নামিয়েছে। যারা মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধী আন্দোলনের নামে নির্ভার হয়ে রাজপথে ‘এক্কাদোক্কা’ খেলছে।
এই দৃশ্য যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় তখন বলতেই হয় দেশের জন্য এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কিছু হতে পারে কি? ওই তরুণেরা নিজের ভাগ্য উন্নয়ন বহু দূরের, ভবিষ্যতে তারা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কী অবদান রাখতে পারবে ভাবুন তো একবার?
মুক্তিযোদ্ধা কোটাই কী একমাত্র যখন গলার কাঁটা:
স্বাধীনতার মাত্র ৫৩ বছর, যদিও অধিকাংশ বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত হয়েছেন। আবার ১৯৭১’র ভয়াল অভিজ্ঞতা স্বচক্ষে দেখেছেন তাদেরও একটি বড় অংশ আজ বেঁচে নেই। তারপরও এটাও তো সত্য, সংখ্যায় অল্প হলেও এখনও জীবিত আছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা। এমনকি যুদ্ধ দিনের ভয়াবহতা দেখেছেন সেই একাত্তরের ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষী বেঁচে আছেন। এছাড়াও তাদের পরবর্তী প্রজন্ম তো সেই দাদা, নানা, মামা, চাচার কোলে বসে যুদ্ধ দিনের সব হারানো বেদনার গল্প শুনেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী নানান উত্থান দেখা একাত্তরের পরাজিত শক্তির বিরোধিতার মুখে টিকে থাকা সেই পরের প্রজন্ম তো মরে নাই! তাদের অনেকেই বিজয় ও স্বাধীনতা দিবসে নিজ বাড়িতে বীর মুক্তিযোদ্ধা পিতাকে লাল সবুজের পতাকা উত্তোলন করা, পতাকাকে স্যালুট ও সালামে সম্মান জানাতে প্রিয় পিতাকে কাঁদতে দেখে বড় হয়েছেন।
এত সব ঐতিহাসিক সাক্ষীদের জীবিতাবস্থায় স্বাধীন দেশে একাত্তরের পরাজিত শক্তির উত্থান থেমে নেই। এর দায় কমবেশি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন এবং রাজনীতিবিদদেরই রয়েছে। আর এরই সুযোগ নিয়েছে দেশি-বিদেশি নানান অপশক্তি আর একাত্তরের পরাজিত পক্ষ। স্বাধীনতা অর্জনে কোনও অবদান না রেখেও বরং বিরোধিতা করে আজ স্বাধীনতার সুফলভোগী ভীরু ও পরাজিত শক্তির প্রতিভূরা বারবার জিতবে, তা তো হতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধা কোটা যখন গলার কাঁটা তখন সরকারিভাবে রাজউকের প্লট কিংবা ফ্ল্যাট বরাদ্দে সরকারি চাকরিজীবী, আমলা, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক সাহিত্যিক, সাংবাদিক এত সব কোটা বহাল কেন?
সরকারি চাকরিজীবীসহ সুবিধাপ্রাপ্ত উল্লেখিত শ্রেণি কোন বিবেচনায় পশ্চাৎপদ যে তাদের জন্য কোটার আওতায় ফ্ল্যাট ও প্লট বরাদ্দ পাবেন? এই কোটায় প্লট ফ্ল্যাট বরাদ্দ সমাজে রাষ্ট্রে বৈষম্য নয়? জেলা শহরে বিভাগীয় পর্যায়ে প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দে কোটা প্রথা বাতিল করুন, না হয় সংযুক্ত করুন স্বাধীন দেশে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ সেই কৃষক ও শ্রমজীবী কোটা।
সর্বোপরি রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা অভাব-অভিযোগ এমনকি চাকরিতে বদলি ও পদোন্নতি, নানান নীতিনির্ধারণীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়-সচিবালয়ে প্রবেশে ভিআইপি, সিআইপি, চিকিৎসকসহ নানান পেশাজীবীদের জন্য বরাদ্দ অ্যাক্রিডিটিশনের নামে যে কোটার সুযোগ তা তুলে দিন। যেন সাধারণ শ্রমজীবী ও কৃষকদের যেকোনও প্রয়োজনে সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ হয়।
লেখক: সাংবাদিক এবং গবেষক
[email protected]/ [email protected]
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।



