ভালো কাজের হোটেল ও একজন ভালো ভিসির প্রত্যাশা

চিররঞ্জন সরকার
২০ মার্চ ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ২২ মার্চ ২০২৬, ১৫:৫০

ঢাকার একটি ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগের কথা দিয়ে শুরু করা যাক। সেখানে বিত্তহীন, নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ বিনামূল্যে খাবার পান— কিন্তু শর্ত আছে। তাকে বলতে হবে, সেদিন তিনি কী একটি ভালো কাজ করেছেন, কিংবা অন্তত একটি ভালো কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করতে হবে। কেউ হয়তো অসুস্থ ব্যক্তিকে রাস্তা পার করে দিয়েছেন, বৃদ্ধ লোককে সাহায্য করেছেন, অচেনা ব্যক্তিকে পথ চিনিয়ে দিয়েছেন, কিংবা গাড়ি ধাক্কা দিয়ে ঠেলে দিয়েছেন। আবার, সবজির দোকানে পানি পৌঁছে দেওয়া অথবা বিনা পয়সায় গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার মতো ভুরি ভুরি উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে ‘ভালো কাজের হোটেল’-এ এলে। কেউবা কোনও ভালো কাজই করেননি, কিন্তু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন— তিনিও খাবার পাবেন।

এই ছোট্ট শর্তটি আসলে বড় একটি সামাজিক বার্তা বহন করে— ভালো কাজকে স্বীকৃতি দিন, মানুষ নিজেই ভালো হতে চাইবে। প্রণোদনা সব সময় অর্থ দিয়ে হয় না, কখনও কখনও স্বীকৃতি, সম্মান কিংবা সামান্য উৎসাহই মানুষকে বদলে দিতে পারে।

এই ধারণাটি আমাদের বৃহত্তর সমাজে কতটা অনুপস্থিত, তা ভেবে দেখা দরকার। বিশেষ করে যাদের চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও কাজ সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে— সেই বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, নীতিনির্ধারক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের জন্য কি আমরা কোনও “ভালো কাজের প্রণোদনা কাঠামো” তৈরি করতে পেরেছি? বাস্তবতা হলো, পারিনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে উল্টো চিত্রই দেখা যায়— ভালো কাজের চেয়ে গোষ্ঠীগত আনুগত্য বা রাজনৈতিক সুবিধাই মূল্যায়নের মাপকাঠি হয়ে ওঠে।

সম্প্রতি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে সচেতন মহলে হতাশা দেখা গেছে। কারণ দলীয় অনুগত শিক্ষক বা সংগঠনের নেতাদেরই বারবার এই পদে বসানো হচ্ছে। ফলে শিক্ষকতার চেয়ে শিক্ষক রাজনীতিই অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশ শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী সমাজ। আর এই সমাজের শীর্ষে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা ভিসি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যাকে বলা হয় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’, তার উপাচার্য পদটি কেবল প্রশাসনিক নয়— এটি একটি জাতির নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বাতিঘর। কিন্তু গত কয়েক দশকে আমরা কি এমন কোনও ভিসিকে পেয়েছি, যিনি সত্যিকারের ব্যতিক্রমধর্মী ও দূরদর্শী কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন?

২০২৪-এর আগস্টের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়াজ আহমেদের ৩৬ পৃষ্ঠার সিভি আলোড়ন তুলেছিল, যেখানে ছিল তার যোগ্যতা ও কৃতিত্বের বয়ান। আশা করা হয়েছিল— তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এমন কিছু করবেন, যা ইতিহাস হয়ে থাকবে। কিন্তু সদ্য বিদায়ী এই উপাচার্যের প্রায় ১৮ মাসের কার্যকালকে মূল্যায়ন করলে এক ধরনের হতাশাই সামনে আসে। অনেকেই মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এত অনুকূল পরিবেশ—সরকারি সমর্থন, তুলনামূলক শান্ত ক্যাম্পাস— খুব কম ভিসিই পেয়েছেন। অর্থাৎ, বড় ধরনের সংস্কার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য এটি ছিল এক “সোনালি সুযোগ”। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো হয়েছে?

প্রথম থেকেই একটি অভিযোগ শোনা গেছে— নেতৃত্বের মধ্যে নিরপেক্ষতার ঘাটতি। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারার ছাত্রসংগঠন প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছে বলে বহু শিক্ষক-শিক্ষার্থী মনে করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায়, যেখানে মতের বৈচিত্র্যই হওয়া উচিত শক্তি, সেখানে যদি প্রশাসন কোনও এক পক্ষের প্রতি ঝুঁকে পড়ে, তাহলে তা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানচর্চার স্থান নয়— এটি ন্যায্যতা, সহনশীলতা এবং যুক্তির চর্চার জায়গা।

এই সময়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর একটি ছিল— নিজেদের ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের ছাত্রদের দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়া। শিক্ষক দৌড়ে পালাচ্ছেন, আর ছাত্ররা তাড়া করছে— এমন দৃশ্য কোনও সভ্য শিক্ষাঙ্গনের সঙ্গে যায় না। ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড-এও কিছু বিপথগামী ছাত্র তাদের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। সেই দুঃস্বপ্নের ছায়া যদি আজকের ক্যাম্পাসে ফিরে আসে, তবে তা কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি একটি গভীর নৈতিক বিপর্যয়।

প্রশ্ন হলো, এই ঘটনাগুলোর পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? দায়ীদের বিরুদ্ধে কি দৃশ্যমান কোনো বিচার হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে, তাহলে তা একটি বিপজ্জনক বার্তা দেয়—বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যায় করলেও পার পাওয়া যায়। এর ফলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের যে আস্থার ভিত্তি, তা ভেঙে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব সমাজেও পড়ে, কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তো ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরি হয়।

‘ভালো কাজের হোটেল’ থেকে খাবার খেতে হলে একজন শ্রমজীবীকেও প্রমাণ দিতে হয় যে তিনি সমাজের জন্য মঙ্গলজনক কিছু করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শীর্ষ পদে আসীন হয়েও অনেকে কোনও সত্যিকারের ‘ভালো কাজ’ ছাড়াই বিদায় নেন। ‘ভালো কাজের হোটেল’-এ একজন শ্রমজীবী মানুষকে বলা হচ্ছে— ভালো কিছু করো, তুমি সম্মান পাবে। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কি আমরা উল্টো বার্তা দিচ্ছি না—ক্ষমতার কাছাকাছি থাকো, তাহলেই তুমি নিরাপদ?

শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও অসহিষ্ণুতা দেখা গেছে। একটি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার কারণে একজন শিক্ষককে ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে তার ছবি টানিয়ে অপমান করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের জন্য ভয়াবহ। মতের ভিন্নতা থাকবে— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভিন্নতাকে যদি অপমান, ভয়ভীতি বা সামাজিক বয়কটের মাধ্যমে দমন করা হয়, তাহলে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যায়।

আরেকটি প্রতীকী কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো— একটি আবাসিক হলের নাম পরিবর্তন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে থাকা একটি হলের নাম বদলে ফেলা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ইতিহাস, স্মৃতি এবং জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সংবেদনশীল বিষয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত আলোচনা, সংলাপ এবং সংবেদনশীলতা প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু সমালোচনার পাশাপাশি একটি বড় প্রশ্নও থেকে যায়— কী করা যেত?

একজন ভিসির হাতে যে সুযোগ থাকে, তা কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি এক ধরনের ঐতিহাসিক দায়িত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণার জন্য উপযুক্ত ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে যেকোনো ভিসির জন্য অগ্রাধিকার হতে পারে। কেননা, আজকের বিশ্বে গবেষণাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শক্তি। সেমিকন্ডাক্টর গবেষণার মতো ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগ করলে বাংলাদেশ প্রযুক্তিগতভাবে একধাপ এগিয়ে যেতে পারতো।

মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটি কাঠামো গড়ে তোলাও ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। প্রবাসী বাংলাদেশি গবেষক ও বিদেশি স্কলারদের জন্য এ দেশে খণ্ডকালীন অধ্যাপনার সুবিধা চালু করা যেতে পারে। শিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহ দিতে প্রকাশনার ওপর ইনসেনটিভ চালু করা যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হতে পারে ভিসির ক্ষমতার কাঠামোগত পরিবর্তন। ভিসিকে একটি প্রশাসনিক পদে সীমিত রেখে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিকে পুরোপুরি অ্যাকাডেমিক মানদণ্ডে নিয়ে আসা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান অনেক বেড়ে যেত। এতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাব কমে গিয়ে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হতো।

এখানেই আবার আমরা শুরুতে ফিরে আসি। একটি ছোট হোটেল শ্রমজীবী মানুষকে ভালো কাজের জন্য উৎসাহিত করছে। আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো— যেখানে জাতির মেধা গড়ে ওঠে, সেখানে কি আমরা ভালো কাজের জন্য একইভাবে প্রণোদনা তৈরি করতে পারছি?

সমস্যা শুধু ব্যক্তি নয়; এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা। আমরা এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি, যেখানে ‘ভালো কাজ’ অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়, আর ‘খারাপ কাজ’ রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় টিকে থাকে। এই সংস্কৃতি বদলাতে না পারলে, কোনো ভিসি একা খুব বেশি কিছু করতে পারবেন না। আবার, একজন দূরদর্শী ভিসি চাইলে এই সংস্কৃতির পরিবর্তনের সূচনা করতে পারেন—সাহস, সততা এবং দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে।

শেষ পর্যন্ত, একজন ভিসির সাফল্য মাপা উচিত তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার দিয়ে। তিনি কি এমন কোনও প্রতিষ্ঠানিক পরিবর্তন করে গেছেন, যা তার পরেও টিকে থাকবে? তিনি কি শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, যুক্তিবোধ ও সহনশীলতার বীজ বপন করতে পেরেছেন? তিনি কি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ককে আরও সম্মানজনক ও বিশ্বাসভিত্তিক করতে পেরেছেন?

যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের আবার নতুন করে ভাবতে হবে—কীভাবে আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিচালিত করতে চাই। ‘ভালো কাজের হোটেল’-এর মতো ছোট উদ্যোগ যদি মানুষকে বদলে দিতে পারে, তাহলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব কেন পারবে না?

সম্ভবত আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন— একজন এমন ভিসি, যিনি ক্ষমতা নয়, প্রভাবের কথা ভাববেন; নিয়ন্ত্রণ নয়, প্রেরণার কথা ভাববেন। যিনি বুঝবেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয় চালানো মানে শুধু প্রশাসন নয়— এটি একটি নৈতিক প্রকল্প, একটি বৌদ্ধিক আন্দোলন।

সেই দিনই হয়তো আমরা বলতে পারব— আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সত্যিকার অর্থেই সমাজকে ভালো কাজের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্য সুখবর
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্য সুখবর
মৌমাছির রানি হয়ে ওঠার রহস্য কী
মৌমাছির রানি হয়ে ওঠার রহস্য কী
তিন বছর নয়, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে কীভাবে ভুল করলো দেশের প্রায় সব মিডিয়া
তিন বছর নয়, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে কীভাবে ভুল করলো দেশের প্রায় সব মিডিয়া
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
সর্বশেষসর্বাধিক