এলডিসি উত্তরণ: গর্বের মুহূর্ত, নাকি বিপদের দোরগোড়া?

ড. প্রণব কুমার পাণ্ডে
০৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:০২

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে গত ৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এক বহু-অংশীদার পরামর্শ সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের সামনে স্পষ্ট করে বলেছেন, বাংলাদেশ এখনও এলডিসি উত্তরণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণ, অভ্যন্তরীণ দায় এবং উচ্চ সুদে ঋণ-নির্ভরতাকে তিনি প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই স্বীকারোক্তি এলো ঠিক সেই দিন, যেদিন জাতিসংঘের হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিস একটি স্বাধীন মূল্যায়ন প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে। প্রতিবেদনটি বলছে, বাংলাদেশ যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ করলেও বাণিজ্য প্রস্তুতি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে।

পরিসংখ্যানে এই অপ্রস্তুতির ছবিটা আরও স্পষ্ট। বিশ্বব্যাংকের মাইক্রোসিমুলেশন ভিত্তিক প্রাক্কলন ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ; ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ২ শতাংশে — এই বৃদ্ধি নব্বইয়ের দশক থেকে অর্জিত উন্নয়নের আংশিক বিপরীত যাত্রা। ২০২৫ সালে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণ টেকসইতা বিশ্লেষণে বাংলাদেশকে ‘নিম্ন ঝুঁকি’ থেকে ‘মধ্যম ঝুঁকি’ শ্রেণিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। লজিস্টিকস খরচ জিডিপির ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় মাত্র ১০ শতাংশ। ব্যাংকিং খাত এখনো খেলাপি ঋণের বোঝায় ন্যুব্জ। এই অবস্থাকে সামনে রেখেই পড়তে হবে আগামী ২৪ নভেম্বরের তাৎপর্য।

২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণ করবে বলে নির্ধারিত। ১৯৭৫ সাল থেকে বহন করে আসা এই তকমা ঘোচানো নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বাংলাদেশ মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়, মানব সম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক — এই তিনটি মানদণ্ড পরপর দুটি পর্যালোচনায় পূরণ করেছে। কিন্তু যোগ্যতা অর্জন আর প্রস্তুতি এক জিনিস নয়। ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকার নিজেই জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটির কাছে উত্তরণের প্রস্তুতি মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছে। এই আবেদনটিই বলে দিচ্ছে, ভেতরে কতটা অনিশ্চয়তা। উত্তরণের এত কাছে এসে সময় চাওয়া মানে স্বীকার করা যে, কাঠামোগতভাবে দেশটি এখনও প্রত্যাশিত মানে পৌঁছায়নি।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে রুপ নিলে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। প্রকৃতপক্ষে, শেখ হাসিনার সরকার এলডিসি উত্তরণকে নিজেদের উন্নয়নের মুকুটমণি হিসেবে দেখত এবং এ নিয়ে আন্তরিকভাবে উৎসাহীও ছিল। উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ ছিল তাদের জন্য একটি গর্বের অর্জন। তবে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন আর উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতা গড়ে তোলা — এ দুটি ভিন্ন বিষয়। রফতানি বৈচিত্র্য, শ্রম ও পরিবেশ মানের উন্নয়ন, ব্যাংকিং সংস্কার এবং জিএসপি+ যোগ্যতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা — এই ক্ষেত্রগুলোতে কাজ শুরু হলেও যতটুকু গতি প্রয়োজন ছিল, ততটুকু অর্জিত হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন এবং শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে ক্ষয় করেছে, যা উত্তরণের প্রস্তুতিকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে।

বর্তমান বাস্তবতায় এলডিসি উত্তরণের জন্য ছয়টি বড় ঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছে — বাণিজ্য সুবিধার ক্ষয়, রাজস্ব ভঙ্গুরতা, ঋণ টেকসইতার চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, কাঠামোগত প্রতিযোগিতার ঘাটতি এবং জলবায়ু অর্থায়নে সীমিত প্রবেশাধিকার। এগুলো কোনো একক সরকারের একক ব্যর্থতার ফল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।

নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নেন। তাকে ঘিরে দেশে-বিদেশে প্রত্যাশা ছিল বিশাল। কিন্তু সেই সময়কাল ছিল গভীরভাবে উত্তাল। এলডিসি উত্তরণ পরিকল্পনা সেই অস্থিরতার ভিড়ে হারিয়ে গেছে। স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি বা এসটিএস মাত্র ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গৃহীত হয়েছে — উত্তরণের মাত্র কয়েক মাস আগে। বাস্তবায়নের জন্য কার্যত সময়ই নেই। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের বড় ব্যর্থতা।

বর্তমানে বাংলাদেশের ৭৫ থেকে ৭৮ শতাংশ রফতানি ইইউ, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং জাপানে শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশ করে। উত্তরণের পর এই চিত্র আমূল পাল্টে যাবে। ইইউতে শুল্ক শূন্য থেকে বেড়ে ৯ থেকে ১২ শতাংশ, কানাডায় ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ এবং জাপানে ৭ থেকে ১৩ শতাংশ হতে পারে। সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে তৈরি পোশাক খাতে। এই খাতেই মোট রফতানির ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে এবং কর্মরত আছেন ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিক, যাদের বেশিরভাগই নারী। আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এলডিসি সুবিধা হারানোর পর বাংলাদেশ বার্ষিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত রপ্তানি আয় হারাতে পারে, যা মোট রফতানির প্রায় ১৪ শতাংশ।

পোশাকের বাইরেও ধাক্কা আসবে। ট্রিপস ওয়েভার হারানোর ফলে ৩ বিলিয়ন ডলারের স্থানীয় জেনেরিক ওষুধ শিল্পকে ব্যয়বহুল পেটেন্ট ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে, যা সাধারণ মানুষের ওষুধের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশ্বব্যাংকের আইডিএ সুবিধা থেকে সরে বাজারভিত্তিক ঋণে যেতে হবে, ফলে ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়বে। জিএসপি+ কি বিকল্প? হয়তো, কিন্তু জিএসপি+ স্কিম ইইউর মাত্র ৬৬ শতাংশ পণ্য কভার করে এবং বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ইইউর জিএসপি আমদানিতে এত বড় অংশ দখল করে যে এলিজিবিলিটির থ্রেশহোল্ড পেরিয়ে পোশাক খাত এই সুবিধা থেকেও বাদ পড়তে পারে।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন জিতে ক্ষমতায় এসেছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। শক্তিশালী সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। কিন্তু ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সময় মাত্র কয়েক মাস। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সামনে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং শিল্প খাতের পুনর্গঠন। এর পাশাপাশি ইইউর সাথে জিএসপি+ আলোচনা, রপ্তানি বৈচিত্র্যের নীতি প্রণয়ন, ব্যাংকিং সংস্কার — সবকিছু একসাথে। এটি যেকোনো মানদণ্ডেই বিশাল চ্যালেঞ্জ। দেশের ১৬টি শীর্ষ ব্যবসায়িক সংগঠন যৌথভাবে ৩ থেকে ৫ বছরের স্থগিতাদেশ চেয়েছে। তাদের উদ্বেগ উড়িয়ে দেওয়ার নয়। কিন্তু স্থগিতাদেশ নিজে থেকে কোনো সমস্যার সমাধান করে না — সময় নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে।

এলডিসি উত্তরণকে একটি সমাপ্তিবিন্দু নয়, বরং একটি সময়সীমা হিসেবে দেখা উচিত। ২৪ নভেম্বর আসবেই। হাসিনার শাসনামলের অসম্পূর্ণ সংস্কার, অন্তর্বর্তী সরকারের বিলম্বিত পরিকল্পনা এবং বিএনপির সামনে স্তূপীকৃত চ্যালেঞ্জ — এই তিন স্তরের জটিলতা একটি জাতির সামনে একটিই প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে: সনদ পাওয়া আর টিকে থাকা কি এক কথা? বাংলাদেশ ইতিহাসে বারবার প্রতিকূলতা জয় করেছে। কিন্তু এবার আর কোনো বিশেষ সুবিধার ছাতা থাকবে না। থাকবে শুধু নিজের সক্ষমতা, নীতির দৃঢ়তা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। উত্তরণের সনদ দেশের উন্নয়নের স্বীকৃতি — কিন্তু সেই স্বীকৃতি ধরে রাখতে হলে দরকার সাহসী সংস্কার, কার্যকর কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য। প্রশ্ন হলো, সেটুকু কি আছে?

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক।

/এম/  

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
সর্বশেষসর্বাধিক