মিডিয়ার ফেয়ারনেস পর্যবেক্ষণ করবে, এমন প্রতিষ্ঠান থাকলে কেমন হয়

ইকরাম কবীর
০৩ মে ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ১৪ মে ২০২৬, ২১:০৬

বছর দশেক আগে, বিবিসি বাংলার সকালের রেডিও অনুষ্ঠানে পত্রিকা পর্যালোচনার একটা পর্ব ছিল। সম্পাদক সাবির মুস্তাফা তখন সবসময় আমাদের পরামর্শ দিতেন, পত্রিকা পর্যালোচনা করার জন্যে অতিথি হিসেবে আমরা যেন শুধু সংবাদকর্মীদেরই স্টুডিওতে না আমন্ত্রণ জানাই। আমরা যেন শিল্পী, সাহিত্যিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উন্নয়ন কর্মী, শিক্ষক– এমন অতিথিদেরও সংবাদ বিশ্লেষণ ও সংবাদ ট্রিটমেন্টের জন্যে স্টুডিওতে কথা বলার সুযোগ দিই। তাঁর যুক্তি ছিল– একজন সংবাদকর্মী তো তাঁর মতো করে আলোচনা করতেই পারেন, কিন্তু অন্যান্য পেশাজীবী করবেন সাংবাদিকতার বাইরের দৃষ্টি দিয়ে, সেটাও আমরা জানতে চাই। তাঁর এই গাইডেন্স আমার খুব ভালো লেগেছিল।

তারও কিছু বছর আগে, ২০০০ সালে, ভারতে এক লেখক সম্মেলনে গিয়ে আমার দেখা পর্যবেক্ষক সংস্থা ফেরারনেস অ্যান্ড অ্যাকিউরেসি ইন রিপোর্টিং (এফএআইআর)-এর এক কর্মীর সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকে মিডিয়ায় ফেয়ারনেসের বিষয়ে একটা স্পষ্ট ধারণা তখন পেয়েছিলাম। খবর দেখা, শোনা ও পড়া এখন আমাদের সারাদিনের কাজেরই অংশ হয়ে গেছে। ইচ্ছে করলেই সংবাদ না জেনে, না দেখে জীবন যাপন করা সম্ভব নয়। টেলিভিশনে-ইউটিউবে

বিতর্ক, অনলাইন পোর্টালে ক্ষণে-ক্ষণে খবর, সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা ভিডিও– সবই দেখছি ও শুনছি। সবাই এসব খবর কতটা বিশ্বাস করছে, তা আমি বলতে পারবো না। তবে সবার মনে সাংবাদিকতার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে, যা সমাজের মানুষদের সঙ্গে আলাপচারিতায়ই বোঝা যায়। যে খবর আমরা জানছি, তা ব্যালেন্সড কিনা— তা নিয়ে আমাদের মনে প্রশ্ন থেকেই যায়। খবরে কি সব পক্ষের কথা বলা হচ্ছে? সাধারণ মানুষের মনকে কি কোনও একটা দিকে ধাবিত করা হচ্ছে?

সংবাদমাধ্যম শুধু তথ্য পরিবেশনই করে না, মানুষের মত-মানসিকতাও তৈরি করে। এই মাধ্যম আমাদের রাগান্বিত করতে পারে, আমাদের ভয় দেখাতে পারে, আশাও দিতে পারে। এটি আবার নির্বাচনকেও প্রভাবান্বিত করতে পারে, পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কাউকে নেতা বা ভিলেনেও রূপান্তরিত করতে পারে। তাই আমরা মনে করি, মিডিয়ার স্বাধীনতা যেমন চাই, তেমনই আমাদের মিডিয়া দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছে কিনা, সেই বিষয়েও আমরা আগ্রহী। কে মিডিয়াকে পর্যবেক্ষণ ও কাভারেজ বিশ্লেষণ করছে— তা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। কিন্তু এ কাজ করবে কে? সরকারের মন্ত্রণালয়? নাহ, মন্ত্রণালয় পারবে না, কারণ সরকারকে আমাদের মিডিয়া-শাসনে বেশি আগ্রহী বলে মনে হয়। তাহলে?

বিশ্বের অনেক দেশেই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এক এক দেশে এক এক রকম পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। কোথাও প্রেস কাউন্সিল আছে, কোথাও মিডিয়া ওয়াচডগ আছে, কোথাও ফ্যাক্ট-চেকিং নেটওয়ার্ক আছে, কোথাও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে, যারা মানুষ মিডিয়াকে কতটা বিশ্বাস করে, তা বোঝার চেষ্টা করে। যেমন রিপোর্টারস উইদআউট বর্ডার্স প্রতি বছর বিশ্বে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচক প্রকাশ করে। কোথায় সাংবাদিক নিরাপদে কাজ করতে পারছে, কোথায় ভীতিকর

পরিস্থিতি বিরাজমান— তা নিয়ে তথ্য প্রকাশ করে। এরা কর্তৃপক্ষের মতি-গতি পর্যবেক্ষণ করে। আবার কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস সাংবাদিকদের ওপর হামলা, কারাবন্দি ও গুম হওয়া ও হত্যার তথ্য তুলে ধরে। ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্ট-চেকিং নেটওয়ার্ক বিশ্বজুড়ে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর মান পর্যবেক্ষণ করছে।

কিন্তু সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোর মান পর্যবেক্ষণ করছে কে? ব্রিটেনে ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রেস স্ট্যান্ডার্ড অর্গানাইজেশন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মানুষদের অভিযোগ গ্রহণ করে। অস্ট্রেলিয়ান প্রেস কাউন্সিল সংবাদমাধ্যমের নৈতিকতা ও আচরণবিধি নিয়ে কাজ করে। ভারতে প্রেস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্ব – এই দুই দিক নিয়েই বিশ্লেষণ করে। এসব প্রতিষ্ঠান কাউকে দোষারোপ করে না, শুধু সমাজের মানুষদের মধ্যে এক ধরনের আলোচনার জন্ম দেয়।

আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আছে— যারা সরাসরি মিডিয়ার পক্ষপাত, ভুল তথ্য, করপোরেট প্রভাব, একপাক্ষিকতা নিয়ে কাজ করে। ফেরারনেস এ্যান্ড অ্যাকিউরেসি ইন রিপোর্টিং-এর কথা একটু আগেই বললাম, তারা অনেক বছর ধরে আমেরিকান মিডিয়ার কাভারেজ বিশ্লেষণ করে আসছে। ব্রিটেনে ‘মিডিয়া লেন্স’ নামে এক প্রতিষ্ঠান আছে— যারা সংবাদমাধ্যমের ভাষা, সংবাদ ফ্রেমিং ও মিডিয়া কখন মানুষের কথা বলছে না— তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজম মানুষদের মিডিয়া ব্যবহারের ধরন, আস্থা ও ডিজিটাল বিবর্তন নিয়ে গবেষণা করে।

আবার কে কেমন কাভারেজ পাচ্ছে, সেই প্রশ্নও একটা বড় বিষয়। নারীদের জীবনের সমস্যা ও সমাধান সংবাদে কতটা প্রাধান্য পাচ্ছে? শ্রমজীবী মানুষ সংবাদে কতটা গুরুত্ব পাচ্ছেন? গ্রাম-গঞ্জের খবর প্রথম ও শেষ পৃষ্টায় এলো কিনা— এমন সব প্রশ্ন আমাদের সামনে আসে। এ নিয়ে গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং প্রজেক্ট বিশ্বজুড়ে গবেষণা করে। তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অনেক দেশের খবরেই নারী ও প্রান্তিক মানুষের উপস্থিতি বাস্তবতার তুলনায় কম।

সংবাদমাধ্যমের ন্যায্যতা বা ভারসাম্য রক্ষা করার জন্যে আসলে কোনও জাদুর কাঠি নেই। বরং সমাজের মানুষেরা বা অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান যদি প্রশ্ন তোলে, তথ্য দেয়, সমালোচনা করে— তাহলে একটা সুস্থ চেক-অ্যান্ড ব্যালেন্স তৈরি হতে পারে। আমাদের দেশে কি এমন কিছু প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন? আমি মনে করি, খুবই প্রয়োজন।

কারণ আমাদের মিডিয়া এখন একটা বড় পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। টেলিভিশন, পত্রিকা, ইউটিউব, ফেইসবুক, অগুনতি অনলাইন পোর্টাল– এসব মাধ্যমে কে কী করছেন, তার গভীর পর্যালোচনা না থাকলে দেশের মানুষ অনেক অ-তথ্য ও কু-তথ্য বিশ্বাস করা শুরু করবেন। আমাদের সংবাদের গতি বেড়েছে, কিন্তু মান কতটুকু বেড়েছে, সেই প্রশ্ন করতে চাই। প্রতিযোগিতা বেড়েছে, কিন্তু দায়িত্বশীলতা কতটুকু বেড়েছে তাও জানতে চাই।

আমরা শিরোনাম দেখে আলোড়িত হই, কিন্তু খবরের ভেতরে তথ্যের গভীরতা নেই দেখে হতাশ হই। টকশোতে উচ্চ স্বর বেশি, কিন্তু বিশ্লেষণ কম। ঘটনা যাচাইয়ের আগেই আমরা মিডিয়ায় মতামত পেয়ে যাই। কখনও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ, কখনও করপোরেট স্বার্থের অভিযোগ, আবার কখনও গুজবের বিস্তার। আবার শুদ্ধ, সুন্দর সাংবাদিকতা কতটা হচ্ছে, তাও আমরা সবসময় বুঝতে পারছি না। কিন্তু হচ্ছে, আমাদের এখানেই সুন্দর সাংবাদিকতা হচ্ছে। সেটা নিয়ে আলোচনা করার জন্যেও কাউকে না কাউকে প্রয়োজন।

তাই, এমন এক বাস্তবতায় আমাদের দেশে যদি মিডিয়ার ফেয়ারনেস নিয়ে আলোচনা করবে এমন কয়েকটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়া যেতো, তাহলে আমাদের চেক অ্যান্ড-ব্যালেন্সের কাজটা হয়ে যেতো। সরকার একে নিয়ন্ত্রিত করবে না, কোনও দলীয় মানুষদের নিয়ে এটি গঠিত হবে না, কোনও মালিক-গোষ্ঠীর হাতেও থাকবে না। এটি হবে শুধুই জনস্বার্থ-ভিত্তিক, সৎ একটি প্রতিষ্ঠান। তো, এর কাঠামো কেমন হতে পারে?

এমন প্রতিষ্ঠানে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সম্পাদক ছিলেন এমন কেউ, অনুসন্ধানী সাংবাদিক, শিক্ষক, ডিজিটাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ, নারী অধিকার প্রতিনিধি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, তরুণেরা, তথ্য বিশ্লেষক, মিডিয়া আইন বিশেষজ্ঞ— এমন সব মানুষদের নিয়ে এই প্রতিষ্ঠান গঠন করা যেতে পারে। এটি আমার ভাবনা। এর বাইরেও আরও পরামর্শ আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে করা যেতা পারে।

এমন প্রতিষ্ঠান কী করবে?

বড় জাতীয় ইস্যুগুলোতে মিডিয়ার কাভারেজের ভারসাম্য বিশ্লেষণ করবে। ভুল খবর পরিবেশিত হলে সেই সংবাদ প্রতিষ্ঠান কীভাবে তা সংশোধন করছে, তা নিয়ে আলোচনা করবে, নির্বাচনের সময় সব পক্ষ সমান কাভারেজের সুযোগ পাচ্ছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণ করবে। সংবাদমাধ্যমে শিশু, নারী, শ্রমজীবী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, গ্রামাঞ্চল এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কথা কতটা বলা হয় এবং কেমন করে উপস্থাপন করা হয়, তার একটা ইনডেক্স প্রকাশ করবে। এই প্রতিষ্ঠান মিডিয়া ওপর জনগণের আস্থা আছে কী নেই, তা নিয়ে জরিপ প্রকাশ করবে। শিশুদের ছবি, ধর্ষণের সংবাদ, আত্মহত্যা, সহিংসতা— এসব সংবেদনশীল কাভারেজে নৈতিক মানদণ্ড মানা হচ্ছে কিনা, তা পর্যালোচনা করবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মিডিয়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বা রাষ্ট্রের পক্ষ নিয়ে, তথ্য দেওয়ার নামে মিডিয়াতেই মানুষদের বিচার করে ফেলছে কিনা, তা দেখতে হবে।

অনেকেই হয়তো প্রশ্ন তুলবেন, এতে কি মিডিয়ার স্বাধীনতা বিঘ্নিত হবে না? হ্যাঁ, যদি প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্র দ্বারা প্রভাবাহ্নিত হয়, তাহলে অবশ্যই বিঘ্নিত হবে। কিন্তু যদি এটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ হয়– তাহলে এই আলোচনায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাই আরও বেশি মজবুত হবে। কারণ, তখন সঠিক সাংবাদিকতা ও প্রপাগান্ডার মধ্যে পার্থক্য মানুষ সহজে বুঝতে পারবে।

আজকের পৃথিবীর সংকট শুধু তথ্যের অভাব নয়, বিশ্বাসের অভাব। আমরা জানি না কাকে বিশ্বাস করবো। এখন দেখছি, সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম গালিকে পুরস্কৃত করছে, মিথ্যা কথা আলোর বেগে ছড়িয়ে দিচ্ছে, মানুষে-মানুষে বিরোধকে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করেছে। এমন পরিস্থিতি আসলে এক অবিশ্বাসের পরিস্থিতি— এই অবিশ্বাস গণতন্ত্রকেও দুর্বল করে এবং সমাজকে ক্লান্ত করে। আমরা যদি সত্যিই শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম আমরা চাই, তাহলে শুধু নতুন নতুন মিডিয়া প্রতিষ্ঠান খুললেই হবে না, আস্থা তৈরি করতে হবে। আর আস্থা তৈরি হয় স্বাধীনতা, ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থেকে।

এখন সময় এসেছে আমাদের মিডিয়া ইন্ড্রাস্ট্রির আচরণ নিয়ে কথা বলার, সম-আলোচনা করার, মিডিয়া মানুষের কথা বলছে কিনা তা দেখার, মিডিয়া জনগণের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ তা বোঝার, মিডিয়া সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলতে পারছে কিনা, তা ভাবার। এমনটি হলে, মিডিয়াই পারবে একটি পরিণত সমাজের দিকে আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। মিডিয়া সবসময়ই পেরেছে।

লেখক: কথা সাহিত্যিক
[email protected]

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
খাল খনন শেষে ৬৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও
খাল খনন শেষে ৬৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও
‘দুই দিন ধরে খাইনি, ভাত নিয়ে আসো’ বলার পর অসুস্থ যুবককে পিটিয়ে হত্যা
‘দুই দিন ধরে খাইনি, ভাত নিয়ে আসো’ বলার পর অসুস্থ যুবককে পিটিয়ে হত্যা
আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ভাইরাল, সেই রুনা ডিবির হাতে গ্রেফতার
আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ভাইরাল, সেই রুনা ডিবির হাতে গ্রেফতার
বিনামূল্যে হবে ২৮০০ শিশুর হৃদরোগ পরীক্ষা, থাকছেন চীনা বিশেষজ্ঞরা
বিনামূল্যে হবে ২৮০০ শিশুর হৃদরোগ পরীক্ষা, থাকছেন চীনা বিশেষজ্ঞরা
সর্বশেষসর্বাধিক