দেশে এখন অধিকার আদায়ের যুগ চলছে। যে যা চায়, সেটাকেই অধিকার বলে ঘোষণা করে ফেলছে। কেউ রাস্তা দখলের অধিকার চায়, কেউ শব্দদূষণের অধিকার, কেউ ট্রাফিক আইন না মানার স্বাধীনতা। সেই তালিকায় নতুন সংযোজন হলো নকল করার অধিকার।
সম্প্রতি ভোলার চরফ্যাশনে এইচএসসি পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকরা কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে নকল করতে বাধা দিয়েছেন। ব্যস, অপরাধ হয়ে গেছে। ফলাফল—হামলা, ভাঙচুর, ইটপাটকেল, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, টিয়ারশেল ও মামলা। খবরটি পড়ে প্রথমে মনে হয়েছিল নিশ্চয়ই কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচির বিবরণ পড়ছি। পরে বুঝলাম, না, এটি একটি পরীক্ষা কেন্দ্রের ঘটনা।
একসময় পরীক্ষার হলে নকল করতে গিয়ে ধরা পড়া ছিল লজ্জার বিষয়। পরীক্ষার্থী মাথা নিচু করে বেরিয়ে যেত। এখন সময় বদলেছে। এখন লজ্জা শিক্ষককে পেতে হয়। তিনি কেন নকল করতে দিলেন না? কেন একজন শিক্ষার্থীর ‘সৃজনশীল’ প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করলেন? মনে হচ্ছে, খুব শিগগিরই পরীক্ষার প্রবেশপত্রের সঙ্গে একটি নতুন ঘোষণা যোগ হবে: ‘প্রতিটি পরীক্ষার্থীর নকলের অধিকার সংরক্ষিত। কোনও শিক্ষক এই অধিকার খর্ব করলে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আমরা এমন এক সমাজে পৌঁছে গেছি, যেখানে অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে প্রতিবাদকারীই অভিযুক্ত হয়ে যান। একটু কল্পনা করুন। যদি নকল করাকে সত্যিই অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে পরের দাবিগুলো কী হতে পারে?
প্রথমে বলা হবে, প্রশ্ন কমন না পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা নম্বর বরাদ্দ করতে হবে। কারণ তারা মানসিকভাবে কষ্ট পেয়েছে। এরপর দাবি উঠবে, পরীক্ষার সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারের স্বাধীনতা দিতে হবে। বই খুলে লেখার অনুমতি দিতে হবে। গুগল ব্যবহার নিষিদ্ধ করা যাবে না। আর যারা পরীক্ষার আগের রাতে পড়তে পারেনি, তাদের জন্য বিশেষ বিবেচনায় অতিরিক্ত সময় দিতে হবে। এভাবেই ধীরে ধীরে পরীক্ষা নামক প্রতিষ্ঠানটির আর কোনও প্রয়োজন থাকবে না। সবাইকে সরাসরি সনদ দিয়ে দেওয়া হবে। কারণ সনদই যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে এত আয়োজনের কী দরকার?
অবশ্য এটাও নতুন কিছু নয়। আমরা এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করেছি, যেখানে ফলাফলই সব, প্রক্রিয়া নয়। ডিগ্রি আছে কিনা, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞান আছে কিনা, সেটা কেউ জানতে চায় না। এই মানসিকতার সবচেয়ে বড় শিকার হয় সেই ছাত্রটি, যে রাত জেগে পড়েছে। যে বন্ধুদের আড্ডা ছেড়ে বইয়ের সঙ্গে সময় কাটিয়েছে। যে বিশ্বাস করেছে, পরিশ্রমের মূল্য আছে। কিন্তু পরীক্ষার হলে এসে দেখে, পাশের বেঞ্চের সহপাঠী দিব্যি বই দেখে লিখছে। শিক্ষক বাধা দিলে বাইরে থেকে লোক এসে হামলা করছে। তখন সেই মেধাবী ছাত্রটির কাছে কী বার্তা পৌঁছায়?
বার্তাটি খুব স্পষ্ট—‘তুমি ভুল করেছো। পড়াশোনা করে সময় নষ্ট করেছো। সাহস থাকলে নকল করতে শিখতে।’
এটাই কি আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে শেখাতে চাই? শিক্ষকতা একসময় ছিল সবচেয়ে সম্মানজনক পেশাগুলোর একটি। শিক্ষককে বলা হতো মানুষ গড়ার কারিগর। আজ সেই কারিগরকে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয়। পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকে হিসাব করতে হয়—আজ নকল বন্ধ করলে বাড়ি ফিরতে পারবেন তো? যে সমাজে শিক্ষক ছাত্রকে ভয় পান, সে সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কোনও কারণ নেই।
আরেকটি বিষয় খুবই উদ্বেগজনক। খবর অনুযায়ী, চরফ্যাশনে শুধু পরীক্ষার্থীরাই নয়, বহিরাগতরাও হামলায় অংশ নিয়েছে। অর্থাৎ একটি অন্যায়কে রক্ষা করার জন্য সমাজের আরও অনেক মানুষ এগিয়ে এসেছে। এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর সংকেত। কারণ একটি অপরাধ তখনই শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যখন অপরাধী একা থাকে না; তার পাশে দর্শক দাঁড়ায়, সমর্থক দাঁড়ায়, যুক্তিদাতা দাঁড়ায়। আজ কেউ হয়তো বলবেন, ‘ছেলেমানুষি করেছে।’ কেউ বলবেন, ‘প্রশ্ন কঠিন হয়েছিল।’ কেউ বলবেন, ‘অল্প বয়স, রাগ করে ফেলেছে।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই যুক্তিগুলো কোথায় গিয়ে থামবে?
যদি একজন শিক্ষার্থী নকল করতে না পেরে হামলা করতে পারে, তাহলে একজন চাকরিপ্রার্থী চাকরি না পেয়ে অফিস ভাঙচুর করলে তাকে কী বলবো? একজন রোগী চিকিৎসায় সন্তুষ্ট না হয়ে হাসপাতাল জ্বালিয়ে দিলে কী বলবো? একজন চালক ট্রাফিক আইন মানতে না চেয়ে পুলিশকে মারলে কী বলবো? আইন যদি ব্যক্তিগত আবেগের কাছে পরাজিত হয়, তাহলে রাষ্ট্র বলে আর কিছু থাকে না।
আমরা প্রায়ই বলি, দেশে দক্ষ জনশক্তি নেই। ভালো প্রকৌশলী নেই, দক্ষ চিকিৎসক নেই, মানসম্পন্ন শিক্ষক নেই, গবেষক নেই। কিন্তু তারা আসবে কোথা থেকে? যে ছেলে নকল করে এইচএসসি পাস করবে, সে নকল করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে। নকল করেই চাকরির পরীক্ষায় বসবে। তারপর একদিন হয়তো সে ডাক্তার হবে, প্রকৌশলী হবে, প্রশাসক হবে, বিচারক হবে। সেদিন আমরা আবার বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করবো, এরা এত অদক্ষ কেন? উত্তরটা অনেক আগেই লেখা হয়ে গেছে। পরীক্ষার হলে।
একটি সেতু ভেঙে পড়লে আমরা প্রকৌশলীকে দোষ দিই। ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা গেলে ডাক্তারকে দোষ দিই। দুর্নীতি হলে কর্মকর্তাকে দোষ দিই। কিন্তু খুব কম মানুষই ফিরে তাকাই সেই পরীক্ষার হলের দিকে, যেখানে সততার প্রথম পরীক্ষায় সে পাস করতে পারেনি। নকল কোনও ছোটখাটো অপরাধ নয়। এটি চরিত্রের সঙ্গে করা প্রথম আপস। যে মানুষ নিজের যোগ্যতার ওপর আস্থা রাখতে শেখেনি, সে জীবনের প্রতিটি ধাপেই শর্টকাট খুঁজবে।
পরীক্ষায় নকল, চাকরিতে ঘুষ, ব্যবসায় প্রতারণা, রাজনীতিতে মিথ্যাচার, সবই একই মানসিকতার ভিন্ন রূপ। পার্থক্য শুধু ক্ষেত্রের। আমরা যদি শিকড়টিকে গুরুত্ব না দিই, তাহলে ডালপালা কেটে কোনও লাভ হবে না। অনেকে আবার যুক্তি দেন, ‘সবাই তো নকল করে।’ এই যুক্তির মতো বিপজ্জনক যুক্তি খুব কম আছে। কারণ এটি অন্যায়কে স্বাভাবিক করে তোলে। একসময় সবাই যদি কর ফাঁকি দেয়, তাহলে কি কর ফাঁকি বৈধ হয়ে যাবে? সবাই যদি লালবাতি অমান্য করে, তাহলে কি ট্রাফিক আইন বাতিল হয়ে যাবে? সবাই যদি ঘুষ নেয়, তাহলে কি ঘুষ সততা হয়ে যাবে? অন্যায় মানুষের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। অন্যায়, অন্যায়ই।
এই ঘটনার আরেকটি দিকও আমাদের ভাবায়। পরীক্ষার খাতা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। শিক্ষককে আঘাত করা হয়েছে। পুলিশকে আক্রমণ করা হয়েছে। অর্থাৎ একটি অন্যায় দাবিকে প্রতিষ্ঠা করতে আইনের প্রতিটি স্তরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এ যেন এক অদ্ভুত সামাজিক বিবর্তন। আগে মানুষ অধিকার চাইত অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এখন অন্যায় করার জন্যই অধিকার চাওয়া হচ্ছে।
আজ যদি নকলের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, কাল কেউ চুরি করার অধিকার চাইবে। বলবে, বেকারত্ব আছে, তাই চুরি করেছি। এরপর ডাকাতির অধিকার চাইবে। বলবে, সম্পদের বৈষম্য আছে। তারপর হয়তো খুন করারও অধিকার চাইবে! বলবে, রাগের মাথায় করেছি, মানসিক চাপ ছিল।
শুনতে অদ্ভুত লাগছে? নকলের জন্য পরীক্ষা কেন্দ্রে হামলাও তো একসময় অদ্ভুতই লাগতো। সমাজের অবক্ষয় কখনও একদিনে ঘটে না। একটু একটু করে ঘটে। একটি ভুলকে ক্ষমা করা হয়, আরেকটি ভুলকে যুক্তি দিয়ে বৈধ করা হয়, তারপর সেই ভুলই একদিন নিয়ম হয়ে যায়। সেই কারণেই পরীক্ষার হলে নকল বন্ধ করা কেবল একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি সভ্যতা রক্ষার দায়িত্ব।
যে শিক্ষক নকল ঠেকাতে গিয়ে আহত হয়েছেন, তিনি শুধু একটি খাতা রক্ষা করেননি—তিনি একটি মূল্যবোধকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। যে পুলিশ সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে টিয়ারশেল ছুড়েছেন, তিনি শুধু একটি কলেজের শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করেননি—তিনি আইনের ন্যূনতম কর্তৃত্বটুকু ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। আমরা যদি তাঁদের পাশে না দাঁড়াই, তাহলে কাল আর কেউ এই দায়িত্ব নিতে চাইবেন না। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হয় শুধু তার বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, তার পরীক্ষাকেন্দ্রেও। সেখানে যদি সততা পরাজিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতের আদালত, হাসপাতাল, সেতু, ব্যাংক, সংসদ—সব জায়গাতেই সেই পরাজয়ের প্রতিধ্বনি শোনা যাবে।
তাই আজ প্রশ্নটি নকল নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আমাদের নৈতিক সাহস নিয়ে। আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে যোগ্যতা অর্জন করতে হয়? নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে যোগ্যতা দাবি করলেই পাওয়া যায়? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, আমরা একটি দায়িত্বশীল জাতি হবো, নাকি এমন এক জাতিতে পরিণত হবো, যেখানে প্রথমে নকলের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, তারপর চুরির অধিকার, এরপর ডাকাতির অধিকার, আর শেষ পর্যন্ত হয়তো খুনের অধিকারের দাবিও উঠবে! সেদিন আইন থাকবে, আদালত থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে, সনদ থাকবে— শুধু সভ্যতা থাকবে না।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট




