বেলেল্লাপনা আর বেহায়াপনা!

হারুন উর রশীদ
১৪ এপ্রিল ২০১৬, ১৮:০০আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০১৬, ১৮:১৭

হারুন উর রশীদ বাংলা নববর্ষ এলেই আমরা কিছু শব্দ শুনতে পাই। এরমধ্যে প্রধান যে শব্দগুলো কানে বাজে, সেগুলো হলো বেলেল্লাপনা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, নগ্নতা, বেগানা নারী-পুরুষ ও নাচানাচি। আরও শুনি হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি ও ভারতীয় সংস্কৃতি। আর এই শব্দগুলো যে শুধু এখন শোনা যাচ্ছে, তা নয়। পাকিস্তান আমলেও শোনা যেত বলে জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা বলেন।  সময় বদলেছে। পরাধীনতার আগল ভেঙে আমরা স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু বদলায়নি এই শব্দগুলো। আর বদলাননি তারা, যারা পাকিস্তান আমলেও একই কথা বলতেন।
এবার আমি বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ নিয়ে এই সময়ে তাদের কথার কিছু উদ্ধৃতি দিচ্ছি।
৯ এপ্রিল ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে আওয়ামী ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মুহম্মদ আবুল হাসান শেখ শরীয়তপুরী বলেছেন, ‘এই দেশের ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা পহেলা বৈশাখের নামে কোনও বেলেল্লাপনা ও বেহায়াপনা মেনে নেবেন না। ইসলামে পহেলা বৈশাখ, পহেলা জানুয়ারি নববর্ষ পালন জায়েজ নেই। তাই রাষ্ট্র ধর্ম ইসলামের দেশে হারাম দিবস পালনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা ও আর্থিক সহযোগিতা বন্ধ করতে হবে।’
১১ এপ্রিল হেফাজতে ইসলাম বাংলা নববর্ষ নিয়ে এক বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে তারা বলেছেন, ‘বর্ষবরণের উৎসবের নামে নারী-পুরুষ পরস্পরের মুখে উল্কি আঁকা, জীবজন্তুর মুখোশ পরা, নারীরা লালপাড়ের সাদা শাড়ি পরে কপালে শাখা-সিঁদুর লাগিয়ে সম্মিলিত উলুধ্বনি দেওয়া, এগুলোর সবই হিন্দু ধর্মীয় রীতি। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এসব পালন করতে পারেন। কিন্তু মুসলমানদের জন্য এসব পালনের কোনও সুযোগ নেই। বর্ষবরণের নামে মুসলমানদের ঈমান-আকিদাবিরোধী ভিনদেশি হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতির প্রসার ঘটানোর চেষ্টা চলছে।’
আর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম  একইদিনে এক বিবৃতিতে বলেছেন, পহেলা বৈশাখের নামে দেশব্যাপী অশ্লীলতা-বেহায়াপনা ও নগ্নতার ছড়াছড়ির মধ্য দিয়ে  মুসলিম জাতিসত্তাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিগত পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানগুলোয় নারী নির্যাতনের দৃষ্টান্ত আছে। পহেলা বৈশাখের চেতনাকে কৌশলে ভারতমুখী করা হচ্ছে।’

 

আরও পড়তে পারেন:  বর্ষবরণে কদর কমেছে পান্তা-ইলিশের

বাংলা নববর্ষ বাঙালির আবহমান সংস্কৃতির অংশ। আর এই দেশে, এই জনপদে নানা ধর্মের লোকের বসবাস। প্রতিটি ধর্মের যেমন নিজস্ব সংস্কৃতি থাকে, তেমনি একটি ভূখণ্ড , জনপদ ও জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতিও থাকে। এর মধ্যে ফারাক যেমন থাকে, তেমনি থাকে ঐক্যও। এই জনপদে ইসলাম এসেছে সুফি-সাধকদের হাত ধরে। আর তারা এখানকার নিজস্ব সংস্কৃতিতে গ্রহণ করেই ইসলামের প্রচার করেছেন। কেউ যদি ইসলামের নামে এখানে আরবের সংস্কৃতি চালু করতে চান, তাহলে আমরা তা মানতে পারি না। আরবের পোশাক সেখানকার আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে, সেখানকার মরুময়তা আর চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে আরবরা পোশাক পরেন। এই পললভূমির পোশাক আর জীবনাচরণ নিশ্চয়ই আরব বেদুইনের মতো হবে না। যারা তা চান, তারা আসলে সংস্কৃতি বিষয়টিই বোঝেন না।

আমার মনে হয়, ইসলামের নামে কিছু মানুষ তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চান। আসতে চান লাইম লাইটে আসতে। আর তারা এটা করতে গিয়ে এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেন, যে শব্দগুলো নিজেই অশ্লীল। এটা কভারেজ পাওয়ার হয়তো একটা মোক্ষম উপায়। আর তারা এই ধরনের শব্দ উচ্চারণ করে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পান বলে আমার ধারণা। একশ্রেণির কথিত ইসলামি চিন্তাবিদের মধ্যেও আমি এই প্রবণতা দেখেছি। তারা ওয়াজের (ইসলামি আলোচনা) নামে যখন নারী ও তরুণ তরুণীদের নিয়ে কথা বলেন, তখন যেসব শব্দ ব্যবহার করেন, সেগুলো চরম বিকৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়। বাংলা ওয়াজ নামে একটি ফেসবুক পেজ আছে। যে কেউ চাইলে সেখানে এসব বিকৃত রুচির আলোচনা শুনতে পারেন। আর এটা করে যে তিনি (যিনি ওয়াজ করেন) এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পান, তা তাদের অঙ্গভঙ্গি দেখলেই বোঝা যায়।

বাংলা নববর্ষ—পহেলা বৈশাখের বিরোধিতা করে কতিপয় ইসলামি নেতা এবং পীর কাম রাজনীতিবিদ যেসব শব্দ ব্যবহার করেছেন, তা কোনও সুরুচির পরিচয় বহন করে না। তারা এসব শব্দ ব্যবহার করে পুরো বাঙালি জাতিকে অপমান করেছেন। তারা বঙালি সংস্কৃতিকে অপমান করে বিকৃত আনন্দ পেয়েছেন। এই বিকৃত আনন্দ লাভকারীদের কথা জানা ছিল ফ্রয়েডেরও। এটাকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। তা হলো অবদমিত ইচ্ছার প্রকাশ ঘটে ভাষার মাধ্যমে। সন্ত্রাস যেমন শব্দ দিয়ে হয়, তেমনি বিকৃত আনন্দ পাওয়ারও একটি মাধ্যম হলো বিকৃত ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা। এটা যারা প্রয়োগ করেন বরং তাদের জন্যই বেলেল্লাপনা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, নগ্নতা—এসব ভাষা যথার্থ।

 

আরও পড়তে  পারেন: আমি কাউকে ইলিশ খেতে নিষেধ করিনি: প্রধানমন্ত্রী

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখে আছে রং আর প্রাণ। আছে ভালোবাসা, আছে মুক্ত প্রকাশ। এই উৎসব অন্ধকার বিনাশী অসাম্প্রদায়িক। এটার আছে সর্বজনীন রূপ। এটা এই জনপদে একমাত্র উৎসব, যা সবাইকে এক করে, এক সুতায় বাঁধে। জীবনের জয়গান গায়, গাইতে শেখায়। নানা রং, গান আর সুরে আমরা জীবনের নানা ইতিবাচক দিক দেখি। আর এই উৎসবে ভয়ে পালিয়ে যায় সব সাম্প্রদায়িক শক্তি, কুপণ্ডুক আর অসুর।

তার প্রমাণ যতই হাক-ডাক দিক না কেন, কথিত ধর্মীয় নেতাদের কিন্তু পহেলা বৈশাখে আর সরব দেখা যায়নি। তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা লুকিয়ে ছিলেন। যে রকম আলো দেখলে পালিয়ে যায় অশুভ।

 

আরও পড়তে পারেন: ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকে বিকৃত রুচির পরিচয় মনে করি: প্রধানমন্ত্রী

এই চক্রটি পাকিস্তান আমলেও সক্রিয় ছিল। তারা রবীন্দ্রসংগীতে হিন্দুয়ানি বলতেন। তারা আরবি হরফে বাংলা প্রচলনেরও চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পারেননি। এখনও পারবেন না, জানি। এরপরও মাঝেমধ্যেই তারা ডাক দিয়ে ওঠেন সুযোগ বুঝেই। আর এ জন্য সরকারও দায় এড়াতে পারে না। ভোটের রাজনীতিতে ক্ষমতায় যেতে এই তাদের দরকার হয়। দরকার হয় নতুন রাজনৈতিক দলের। কিন্তু তারা যে অপশক্তি, তা কেন বোঝে না রাজনৈতিক দলগুলো।

বর্ষবরণে ছায়ানটের গান, চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা, রবীন্দ্র সরোবরের অনুষ্ঠানকে যদি বলেল্লাপনা বা বেহায়ানা বলা হয়, মিছিলে নারী-পুরুষের সমান পায়ে এগিয়ে যাওয়া যদি অশ্লীলতা হয়, রবীন্দ্রসংগীত যদি হিন্দুয়ানি হয়, তাহলে তো এসব শব্দের নতুন করে অর্থ নির্ধারণ করতে হবে। ভাষার পণ্ডিত ছেড়ে কথিত ইসলামি নেতার কাছে বাংলা শিখতে হবে। বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি জানতে আরব দেশে যেতে হবে।

হায়! যার ভাষা অশ্লীল, তিনিই এখন শ্লীলতা শেখাতে চান। যার কথায় বেহায়পনা, তিনিই আজ হায়ার কথা বলছেন। যাদের বয়ানের সময় অঙ্গভঙ্গিতে চরম নগ্নতা প্রকাশ পায়, তারাই আজ ভব্যতার কথা বলছেন।

আমি সাফ বলে দিতে চাই, রুচিহীনের কাছে রুচির তালিম নিতে চাই না। তাদের প্রতিরোধ করতে চাই।

লেখক: সাংবাদিক

ইমেইল:  :  [email protected]

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বশেষসর্বাধিক