৪২ ডলারের শার্ট, সাড়ে ৩ ডলারের কান্না: দায় এবং দরদ

ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ
০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০

ভোরের কুয়াশা ভেদ করে গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী কিংবা টঙ্গীর কোনো এক মেস থেকে ক্লান্ত পায়ে বেরিয়ে আসেন সুমাইয়া। তার কাঁধে ঝোলানো ছোট্ট প্লাস্টিকের ব্যাগটি যেন পুরো পরিবারের বেঁচে থাকার ম্লান স্বপ্ন আর প্রতিদিনের সংগ্রামের নিঃশব্দ বোঝা। কারখানার ভারী লোহার গেট যখন ভোরে খোলে, তখন সেখানে কেবল কিছু মানুষের যান্ত্রিক প্রবেশ ঘটে না; সেখানে প্রবেশ করে কোটি মানুষের ঘামে ভেজা একটি জীবন, যা বিশ্ব পুঁজির বিশাল অট্টালিকার মূল ভিত্তিমূল তৈরি করে। দোকানের শোকেসে ঝলমলে যে শার্টটির গায়ে লেখা থাকে ৪২ ডলার বা ১০০ ডলারের ঝকমকে প্রাইজ ট্যাগ, যার বিপরীতে প্রকৃত উৎপাদন খরচ বা মজুরি শোষণের নির্মম যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে নেমে আসে মাত্র ৩ ডলার ৩০ সেন্টে (সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, ৩ মে ২০১৭), তার পেছনের দৃশ্যপটে রয়েছে এই সুমাইয়াদের অবর্ণনীয় বঞ্চনা ও চোখের জল।

সম্প্রতি পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিয়ে যে আন্দোলন দানা বেঁধেছে, যেখানে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক রাজপথে; তা কেবল কোনো সাধারণ অভ্যন্তরীণ শ্রমবিরোধ বা সাময়িক অসন্তোষ নয়। এটি আমাদের গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন বা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের এমন এক অন্ধকূপের গল্প, যেখানে পুঁজি সীমানা পেরিয়ে পাখির মতো অবাধে বিচরণ করে, আর শ্রম আইন ও মানুষের মৌলিক অধিকারই কেবল রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমান্তেই বন্দী হয়ে পড়ে। প্রশ্ন হলো, এই বৈশ্বিক ও জাতীয় ব্যবস্থার মাঝে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আসলে কী পাচ্ছে? আর এই অচলাবস্থা ভেঙে মানুষের মুক্তির পথ খোঁজার উপায়ই বা কী?

সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি বনাম বৈশ্বিক শোষণের চাকা

আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো সংবিধান। সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদে কৃষক ও মেহনতি মানুষের মুক্তির কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে বলা হয়েছে, ১৫ অনুচ্ছেদে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও কর্মের অধিকার নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় মৌলিক দায়িত্বের কথা ঘোষণা করা হয়েছে, এবং ৩৪ অনুচ্ছেদে সব ধরনের বাধ্যতামূলক শ্রম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র যখন মেহনতি মানুষের এই অধিকারগুলো রক্ষার কথা বলে, তখন বিশ্ব পুঁজির অর্থনৈতিক চাপের কাছে অনেক সময়ই সেই প্রতিশ্রুতিগুলো ফিকে হয়ে যায়।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ডে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা-এর ২৩ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, প্রতিটি শ্রমিকের এমন ন্যায্য ও অনুকূল পারিশ্রমিক পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে, যা তার ও তার পরিবারের জন্য একটি মানবিক মর্যাদা সম্পন্ন জীবন নিশ্চিত করতে পারে। এছাড়া অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি-এর ৭ অনুচ্ছেদেও ন্যায়সংগত মজুরি, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশের সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে।

এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশনগুলোর দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আইএলও কনভেনশন নং ১৩১ (ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ কনভেনশন, ১৯৭০) অনুযায়ী, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সামাজিক প্রয়োজন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচক এবং জীবনযাত্রার ব্যয়কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনায় নেওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া শ্রমিকদের স্বাধীনতা ও সংগঠনের অধিকার সংক্রান্ত আইএলও কনভেনশন নং ৮৭ এবং যৌথ দরকষাকষির অধিকার সংক্রান্ত কনভেনশন নং ৯৮ আজ আমাদের দেশে মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত ও অবমূল্যায়িত।

সরবরাহ শৃঙ্খলের মারপ্যাঁচ এবং ক্রেতা-মালিকের যাঁতাকল

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট গবেষক ও অধ্যাপক মার্ক অ্যানারের গবেষণায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, ২০০০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত পোশাকের উৎপাদন খরচ প্রায় ৪১ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো একদিকে যেমন পণ্যের ন্যায্যমূল্য বছরের পর বছর ধরে কমিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে নিজেরা হাজার কোটি ডলারের মুনাফা করছে।

পত্রিকার সাম্প্রতিক ও বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনগুলোতে বারবার উঠে এসেছে যে, আমাদের কারখানা মালিকরা এক অদ্ভুত উভয় সংকটের গোলকধাঁধায় অবস্থান করছেন। একদিকে বিদেশি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান বা বাইয়ারদের অনমনীয় ও নিষ্ঠুর মূল্যচাপ, অন্যদিকে দেশের বাজারে লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মুখে শ্রমিকদের যৌক্তিক মজুরি দাবি। কারখানার মালিকরা যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য ন্যায্য মূল্য দাবি করেন, ক্রেতারা তখন সহজেই অর্ডার বাতিল করে অন্য সস্তা দেশে চলে যাওয়ার বা উৎপাদনের ঠিকানা বদলানোর হুমকি দেন। ফলে মালিকরা বাধ্য হন সেই চাপের পাহাড় শ্রমিকদের ওপর নামিয়ে দিতে। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও, এই বিশাল সাপ্লাই চেইন থেকে প্রাপ্ত মূল্যের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলোর পকেটে, যারা কারখানার মালিক বা শ্রমিক কারও সাথেই সরাসরি কোনো কর্মসংস্থান বা আইনি সম্পর্কে যুক্ত নয়।

ভূরাজনীতি, শুল্ক ও শ্রমিকের ঘাম

শোষণের এই জাল কেবল কর্পোরেট জগতের মুনাফাখোর বোর্ডের কক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক বাণিজ্য নীতি ও সংরক্ষণবাদ। অতীতে বিভিন্ন সময় দেখা গেছে কীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন নানা অজুহাতে শর্ত ও শুল্কের খাঁড়া ঝুলিয়ে বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতিকে সবসময় চাপের মুখে রাখতে চায়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বহুল প্রচারিত জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে শ্রম অধিকার ও মানবাধিকারের কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, অথচ ইউরোপের নিজেদেরই করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহ শৃঙ্খলে মানবাধিকার সংক্রান্ত যথাযথ ডিউইজিলেন্স বা করপোরেট জবাবদিহি নিশ্চিত করার আইনগুলোতে নানা ফাঁকফোকর রাখা হয়। এই দ্বিমুখী নীতির বেড়াজালে পড়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র অনেক সময় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অহেতুক চাপে শ্রমিকদের যেকোনো ন্যায়সংগত আন্দোলন দমনে কঠোর হতে বাধ্য হয়, যা কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্রের সাথে মানানসই হতে পারে না।

উত্তরণের পথ: কার কী করণীয়?

এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের কোনো অলীক তাত্ত্বিক উপকথার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা এবং কাঠামোগত সংস্কার। ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেভাবে সাপ্লাই চেইন ট্র্যারেবিলিটি এবং লিভিং ওয়েজ বা জীবনযাত্রোপযোগী মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের পথে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সেখান থেকে আমরা বড় ধরনের শিক্ষা নিতে পারি।

রাষ্ট্রকে কেবল বিদেশি ক্রেতাদের প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়নের হাতিয়ার না হয়ে মেহনতি মানুষের সাংবিধানিক অধিকারের প্রকৃত রক্ষক হতে হবে। ন্যূনতম মজুরি বোর্ডকে সম্পূর্ণ স্বাধীন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও কার্যকর করে মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় মজুরি বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। ট্রেড ইউনিয়ন করার সাংবিধানিক অধিকারকে সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা থেকে চিরতরে মুক্ত করতে হবে।

বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমইএ এবং এফবিসিসিআই-কে শুধু নিজেদের মুনাফা সুরক্ষা নয়, বরং সাপ্লাই চেইনের নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষিতে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে ন্যায্য মূল্য আদায় করতে হবে এবং শ্রমিকদের প্রতিপক্ষ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের মূল অংশীজন বা সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বাধ্যতামূলক সঞ্চয় স্কিম এবং নিরাপদ কর্মপেশা নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

পশ্চিমা ক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলোকে তাদের একপেশে ‘কস্ট অফ প্রোডাকশন’ বা উৎপাদন মূল্যের নীতি অবিলম্বে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। ন্যায্য মূল্যে পোশাক ক্রয়ের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দিতে হবে। বিশ্বব্যাংক ও এডিবি’র মতো উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ ও সহায়তার শর্তে কেবল সামষ্টিক অর্থনীতির গাণিতিক সূচক নয়, বরং শ্রমিকদের জীবনমান ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করতে হবে।

শ্রমিক ভাইবোনদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। আপনাদের এই সংগ্রাম কেবল পেটের টানে বাঁচার লড়াই নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সত্যিকারের আত্মমর্যাদাশীল ও মানবিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করার লড়াই। দেশের আপামর জনসাধারণকে উপলব্ধি করতে হবে—গাজীপুরের এই নারী শ্রমিকটির কান্না থামলে আমাদের গোটা অর্থনীতির মেরুদণ্ডই একদিন ভেঙে পড়বে।

আজ সময় এসেছে গভীর আত্মোপলব্ধির। যে শার্টটি গায়ে জড়িয়ে আমরা আধুনিকতার অহংকার করি, তার প্রতিটি সেলাইয়ে মিশে আছে একজন নারীর না বলা বেদনা ও ক্লান্তি। এই শোষণের গোলকধাঁধা থেকে বের হয়ে যদি আমরা একটি মানবিক, সমতাভিত্তিক ও ন্যায়বিচারপূর্ণ সমাজ গঠন করতে না পারি, তবে আমাদের সব উন্নয়ন ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্থহীন এক প্রবঞ্চনা হয়ে দাঁড়াবে। আসুন, সব বিভেদ ভুলে সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্রেতা এবং ব্যবসায়ী সমাজ, সবাই মিলে এক টেবিলে বসি। শ্রমিকের ঘামের সঠিক মূল্য দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে নিয়ে যাই এক অনন্য উচ্চতায়।

লেখক: একজন উন্নয়নকর্মী

/ইউএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
প্রযোজক-নির্মাতাদের নিয়ে যা বললেন পারসা ইভানা
প্রযোজক-নির্মাতাদের নিয়ে যা বললেন পারসা ইভানা
পোশাকশ্রমিকের বিক্ষোভ থেকে নিষিদ্ধ সংগঠনের ৩৩ জন গ্রেফতার
পোশাকশ্রমিকের বিক্ষোভ থেকে নিষিদ্ধ সংগঠনের ৩৩ জন গ্রেফতার
সুপারম্যানের ‘ক্রিপ্টোনাইট’-এর রহস্য লুকিয়ে আছে যে দেশে
সুপারম্যানের ‘ক্রিপ্টোনাইট’-এর রহস্য লুকিয়ে আছে যে দেশে
দুবলার চরে এবারও হচ্ছে না রাসমেলা
দুবলার চরে এবারও হচ্ছে না রাসমেলা
সর্বশেষ সর্বাধিক