প্রিয় শিল্পী, এত চ্যানেল থাকার পরও বাঁচার প্রশ্ন কেন?

Send
জুলফিকার রাসেল
প্রকাশিত : ১০:৪৮, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৬, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৬
জুলফিকার রাসেল‘শিল্পে বাঁচি, শিল্প বাঁচাই’—এই স্লোগান নিয়ে ৩০ নভেম্বর, বুধবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হয়েছিল টেলিভিশন সংশ্লিষ্ট ১৩টি সংগঠন। শিল্পী ও কলাকুশলীদের স্মরণকালের সবচে’ বড় এই সমাবেশের সমন্বয় করেছে সংগঠনগুলো নিয়ে গঠিত ফেডারেশন অব টেলিভিশন প্রফেশনালস অর্গানাইজেশন।
তাদের দাবি পাঁচটি।  প্রিয় শিল্পী ও কলাকুশলী, আপনাদের দাবিগুলো নিয়ে আমার ব্যক্তিগত ভাবনা শেয়ার করছি।
আপনাদের প্রথম দাবি: দেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলে বাংলায় ডাবকৃত বিদেশি সিরিয়াল/অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ করতে হবে।
- এই দাবির পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি আছে। যেসব টিভি চ্যানেল এটা বন্ধ করার দাবি তুলেছে, তাদের অনেকেই ডাবকৃত অনুষ্ঠান আগে প্রচার করেছে। তারা কেন প্রচার করেছিল? আপনারা তখন প্রশ্ন করেছিলেন কি? আমার মনে হয়, দর্শকদের আগ্রহ ছিল বলেই করেছিল।  আর এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বাণিজ্যও। আপনারা সবসময়ই বলেন, দর্শক ভারতের টিভি চ্যানেলমুখী। তার মানে হচ্ছে, আমাদের মূল প্রতিযোগিতা ভারতের সঙ্গে। তাদের বিশাল বাজার। প্রায় ১০০ কোটি দর্শক শুধু ভারতেই। টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেয় এমন কোম্পানির সংখ্যা কয়েক হাজার। তাদের ব্যবসাও পৃথিবীজুড়ে। একটি অনুষ্ঠান নির্মাণ করতে প্রচুর টাকা খরচ করতে পারে। তাই তাদের অনুষ্ঠানও দর্শকদের ধরে রাখার মতো সে রকম জাঁকজমকপূর্ণ হয়, বিনোদনমূলক হয়। সিরিয়াল শুধু নয়। ফিল্ম, রিয়েলিটি শো—সব কিছুতেই টাকার ছড়াছড়ি। মানও সে রকম। তাদের সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতা হবে কী করে? ওখানে একটি সিরিয়ালের একটি পর্বের বাজেট বাংলাদেশি টাকায় কমপক্ষে ৫০ লাখ। এখানে একটি পর্বে সে রকম বাজেট দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ বাজার ছোট, টিভিতে বিজ্ঞাপন দেয় এমন কোম্পানির সংখ্যা কম।  কোম্পানিগুলোর মার্কেটও ছোট। সুতরাং এদেশে টেকনিক্যালি ভারতের মানের সিরিয়াল বানানো সম্ভব নয়। প্রতিযোগিতা করতে হবে কনটেন্ট দিয়ে। সেই কনটেন্ট যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। কনটেন্ট যদি না থাকে, উপস্থাপনা যদি ভালো না হয় তাহলে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াও সম্ভব নয়।
হঠাৎ বাংলায় ডাবকৃত অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না- নতুন টিভি চ্যানেল দীপ্ত’র বাংলায় ডাবকৃত তুরস্কের সিরিয়াল ‘সুলতান সুলেমান’ দিয়ে শুরু। তারা এটি প্রচার করে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছে। জেনেছি, এটির একপর্ব নির্মাণের খরচ প্রায় ১ লাখ ডলার। বাংলাদেশের হিসাবে এক কোটি টাকার কাছাকাছি। তাই নির্মাণশৈলী, স্পেশাল ইফেক্ট, মিউজিকসহ বিভিন্নভাবে এর কোয়ালিটি আন্তর্জাতিক মানের। এদেশের একটি টিভি চ্যানেল যদি সেই অনুষ্ঠান ১ হাজার থেকে ৩ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা) খরচ করে এনে বাংলায় ডাব করে প্রচার করে এবং এর মাধ্যমে এদেশের দর্শক সেটি দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে তাহলে সমস্যা কোথায়? এই সময় তো বেশিরভাগ দর্শক ভারতের চ্যানেলই দেখতেন! আপনারাই তো বলেন, দর্শক ভারতমুখী হচ্ছে। সেখান থেকে একটা দেশি চ্যানেল তাদের দেশে ফেরাতে পারছে- এটা তো প্রশংসার দাবি রাখে। একসময় আমরা সবাই বিটিভিতে ‘আলিফ লায়লা’, ‘সোর্ড অব টিপু সুলতান’ প্রাণভরে দেখেছি।  বাংলায় ডাবকৃত বলে প্রশংসাও করেছি। এর মাধ্যমে জেনেছি একটা সময়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।
এদেশের টিভি চ্যানেলের কোন মালিক আছেন যিনি চাইবেন না দর্শক টানতে? আমি মনে করি, সবাই-ই চান। একটি চ্যানেলের মূল টার্গেট যদি দর্শকপ্রিয়তা অর্জন হয়, তাহলে সেই চ্যানেল দর্শক টানার জন্য অর্থ খরচ করবে—এতে আশ্চর্যের কী আছে? একটি চ্যানেল তার টাকা কোথায় লগ্নি করবে, কিভাবে করবে—সেটা তার ব্যাপার। বিতর্ক হতে পারে অনুষ্ঠানের কনটেন্ট নিয়ে। অনুষ্ঠানটি সমাজকে ভুলপথে নিচ্ছে কিনা, তা নিয়ে। কত টাকা খরচ করছে, তা নিয়ে নয়। বিদেশি সিরিয়াল দিনের ক’ঘণ্টা চলে? একঘণ্টা? তাহলে বাকিটা সময় অন্য চ্যানেলগুলো ভালো অনুষ্ঠান দিয়ে দর্শক টানতে পারছে না কেন? অনুষ্ঠান বন্ধের দাবি না করে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে সামনে এগুনো জরুরি।
 
দ্বিতীয় দাবি: টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ ক্রয় ও প্রচারের ক্ষেত্রে এজেন্সির হস্তক্ষেপ ছাড়া  চ্যানেলের অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে।
 
- অ্যাড এজেন্সির কাজ হচ্ছে বিজ্ঞাপন বানানো ও প্রচার করা, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি। অনুষ্ঠানের কোনটা, কিভাবে, কাকে নিয়ে প্রচার হবে, না হবে—সেটা অবশ্যই একটি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান বিভাগই নির্ধারণ করবে। এজেন্সি তার পছন্দের অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপন দিতে পারে। পছন্দ না হলে দেবে না। কিন্তু আগে থেকেই যদি বলে দেওয়া হয়—এই শিল্পীকে নিতে হবে, তাকে দিয়ে বানাতে হবে। তাহলে চ্যানেলের অনুষ্ঠান বিভাগের ক্রিয়েটিভিটা কোথায়? তাদের অনুষ্ঠানের মৌলিকত্ব কোথায়? আর শিল্পী আগে থেকেই নির্ধারণ করে দেওয়ার কারণ কী? ভেতরে অন্য গল্প নেই তো? অল্প কয়েকজন শিল্পী দিয়ে সব অনুষ্ঠান বা নাটক হলে একই মুখ দেখার জন্য দর্শকের কতটা আগ্রহ থাকে? জানা যায়, গুটি কয়েক ব্যক্তির মাধ্যমে অ্যাড এজেন্সির একটা সিন্ডিকেট হয়েছে। এই সিন্ডিকেট অনেক ক্ষমতাধর চ্যানেলগুলোর চেয়েও। তারা কেন চ্যানেলগুলোর চেয়ে ক্ষমতাধর হবে? কারা তাদের ক্ষমতাধর হতে সাহায্য করেছে? তাদের স্বার্থ কী? গুটিকয়েক ব্যক্তির কারণে টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানের সৃজনশীলতাই নষ্ট হওয়ার পথে।
 
তৃতীয় দাবি: টেলিভিশন শিল্পের সর্বক্ষেত্রে এআইটি (অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স)-এর ন্যূনতম ও যৌক্তিক হার পুনঃনির্ধারণ করতে হবে।
 
- শিল্পীদের সম্মানী বা পারিশ্রমিকের অংক থেকে প্রযোজককে ১৫% অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয়। এর ফলে অনেক প্রযোজক ট্যাক্সের অজুহাতে সম্মানী কম দেওয়ার চেষ্টা করেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রযোজকরা অর্ধেক সম্মানীও দেন না। সব দেশেই শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে সম্পৃক্তরা সমাজের কাছ থেকে বিশেষ সম্মান পেয়ে থাকেন। ক্রিয়েটিভ কাজে ট্যাক্সে রেয়াত দেওয়া হয়। কিন্তু এদেশে পুরোপুরি ভিন্ন একটি চিত্র দেখা যায়। নানাভাবে তাদের অসম্মানিত করা হয়। এ থেকে পরিত্রাণের পথ খোঁজা খুবই জরুরি।  আমি মনে করি, একজন সৎ প্রযোজক কোনোভাবেই শিল্পীকে ঠকানোর চেষ্টা করবেন না।
 
চতুর্থ দাবি: দেশের টেলিভিশন শিল্পে বিদেশি শিল্পী ও কুশলীদের অবৈধভাবে কাজ করা বন্ধ করতে হবে। বিশেষ প্রয়োজনে কাজ করতে হলে সরকারের অনুমতি ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোয় নিবন্ধিত হতে হবে।
 
- ‘অবৈধভাবে’—এই শব্দটির সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত। কিন্তু বিদেশি শিল্পী এনেছে বলে চ্যানেলকে গালিগালাজ করে ধুয়ে ফেলতে হবে, এর সঙ্গে আমি একমত নই।
আমাদের দেশের শিল্পী রুনা লায়লা উপমহাদেশের অন্যতম সেরা শিল্পী। অনেক ভাষায় গান করেন তিনি। যোগ্যতা দিয়েই তিনি এই বিশাল স্থান দখল করেছেন। তাই আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। এদেশের সেরা লেখকদের একজন হ‌ুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা ভারতে দেখে গর্বে বুক ভরে গেছে। নায়করাজ রাজ্জাক বা ববিতার সিনেমা কলকাতার টিভিতে দেখে গর্ব হয়। জেমস যখন ভারত মাতিয়েছেন, তখনও গর্ব হয়েছে। কলকাতায় গিয়ে যখন ফিডব্যাক, এলআরবি, মাইলস, অর্ণব-এর গান শুনেছি। একইরকম গর্ব হয়েছিল। এখন আমাদের ফেরদৌস, জয়া আহসান, শাকিব খান, নুসরাত ফারিয়া ভারতে কাজ করেন—আমার মতো অনেকেরই গর্ব যেমন হয়, তেমনি অনেকের কাছ থেকে শুনতে হয়, ‘ওরা তো ভারতেই পড়ে থাকে। দেশের প্রতি কোনও টান নেই।’
সত্যিই অবাক করার মতো। এদেশে ভারতের কেউ এলে বলি, ‘ওদের এখানে কেন সুযোগ দেওয়া হচ্ছে? আমরা তো সে রকম সুযোগ পাই না।’ আবার যারা সুযোগ পান, তাদের কথার বজ্রবাণে আঘাত করতে ছাড়ি না। কেন? যারা সুযোগ পান না তাদের ভেতরে কি এক ধরনের জেলাসি কাজ করে?
আমি যখন প্রথম ভারতের শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করি, তখন অনেকেই বলেছেন, আমি নাকি ভারতীয় শিল্পীদের প্রমোট করছি। যারা বলেছেন, তাদের অনেককেই আগে-পরে ভারতীয় শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করে ধন্য হতে দেখেছি।
কলকাতার শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার খুব ইচ্ছে ছিল আমার। সেখানে এক সপ্তাহ/দু’সপ্তাহের জন্য গিয়ে আমি চাইলেই কি কোনও শিল্পীর কণ্ঠে গান ধারণ করাতে পারতাম? কে আমাকে স্থান দিত? লিরিক নিয়ে কোথায় কোথায় ঘুরতাম? যৌথ অ্যালবামের মাধ্যমে সেখানকার অনেক শিল্পীর সঙ্গে পরিচিত হই। সারেগামা এইচএমভি’র মতো প্রতিষ্ঠান থেকে আমার অ্যালবাম রিলিজ হয় ২০০৫ সালে। ধীরে ধীরে অনেক খ্যাতিমান শিল্পীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়। এখন কলকাতার অনেক শিল্পী আমার গান করেন। সে দেশের অডিও কোম্পানি থেকে আমার লেখা গান নিয়ে অ্যালবাম রিলিজ হয়। শিগগিরই আমার লেখা বাংলা গান হিন্দিতে রূপান্তর করে সাতটি গানের পুরো একটি অ্যালবাম রিলিজ হচ্ছে ভারতের একটি বড় কোম্পানি থেকে।  গাইছেন ভারতের একজন জনপ্রিয় শিল্পী।
অনেক প্রশ্নই করা যেতে পারে। দেশের বিপিএল-এ কেন বিদেশি ক্রিকেটার খেলবে? দেশের ফুটবল লিগে কেন বিদেশি ফুটবলার খেলবে? দেশে প্রস্তুতকৃত টিভি-ফ্রিজ থাকতে কেন বিদেশি টিভি-ফ্রিজ ব্যবহার করতে হবে। দেশে তৈরি ওয়ালটন মোবাইল সেট না কিনে কেন আইফোন, স্যামসাং, নকিয়া কিনবে? সাকিব-মুস্তাফিজরা কেন বিদেশে খেলবে? এ রকম হাজারো প্রশ্ন।
বাংলাদেশে সিনিয়র খ্যাতিমান শিল্পীরা বলেন, আজকাল রিয়েলিটি শোয়ের শিল্পীদের দিয়ে টিভি চ্যানেল ভরে গেছে। কোনও শিল্পী ভালো গাইলে রিয়েলিটি শো থেকে এলে সমস্যা কোথায়? টিভি চ্যানেল যখন কম ছিল, তখন কি বাইরে থেকে খুব বেশি শিল্পী আসতো? এখন আসার কারণ কী? দেশে ২৬টা টিভি চ্যানেল।  এই চ্যানেলগুলোতে ঘুরে-ফিরে ৫০-৬০ জন উল্লেখ করার মতো শিল্পীই পারফর্ম করছেন। আগে একটা টিভি চ্যানেল ছিল।  ৫০-৬০ জনকেও অনেক বেশি মনে হতো। এখন ৫০০ জন পারফর্ম করলে হয়তো এসব নিয়ে কথা বলার যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যেত। একই মুখ, একই গান একঘেয়ে হয়ে যায় না কি? টিভিতে প্রতিদিন রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন, সৈয়দ আবদুল হাদী, সুবীর নন্দী, সামিনা চৌধুরী, কনকচাঁপাকে দেখতে ভালো লাগবে কি? এক মোশাররফ করিমকে সব টিভি চ্যানেলে বারবার দেখে ক্লান্ত হচ্ছেন না কি? তুমুল জনপ্রিয় হলেও, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘বহুব্রীহি’,‘সংশপ্তক’, ‘বারো রকম মানুষ’ বারবার দেখতে ভালো লাগতো কি? হ‌ুমায়ূন  আহমেদ শেষদিকে এসে যখন অনেক নাটক লিখতেন, পরিচালনা করতেন—তাকেও অনেক সমালোচনা শুনতে হয়েছে। কারণ একইরকম মনে হচ্ছিল।
অন্যকে মিষ্টি কম খেতে বলবেন বলে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.) আগে নিজেই মিষ্টি খাওয়া কমিয়ে দিয়েছিলেন। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো নিজেদের শুধরে নিয়ে সেটা করবে কি? অডিও ইন্ডাস্ট্রি আজ ধ্বংসের মুখে। টিভি বা রেডিও চ্যানেলগুলো গান প্রচার করে, অথচ শিল্পী, গীতিকার, সুরকার—কাউকেই কোনও রয়্যালিটি দেয় না। নাটকে গান চালায়, অনুমতিরও প্রয়োজন মনে করে না। গীতিকবি, সুরস্রষ্টাদের নাম দেয় না। কখনও হয়তো সৌজন্য দেখিয়ে শিল্পীর নাম দেয়। আমরা নিজেরা পাইরেসির বিরুদ্ধে কথা বলি, অন্যদিকে কম্পিউটারে পাইরেটেড সফটওয়্যার, অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করি। নিজেরাই সিডি না কিনে অনলাইনে গান শুনি। নিজেদের তো শুধরাতে হবে আগে।
 
পঞ্চম ও শেষ দাবি: ডাউনলিংক চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করতে হবে।
 
- আমি মনে করি, এই দাবি তোলার আগে নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত কেন বিদেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে এদেশের কোনও কোনও কোম্পানি? সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন দেয় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। তারা তো দেবেই। তাদের মার্কেট এখন পুরো ভারতে। প্রাণ (ইন্ডিয়া) নামে তাদের ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। ওদেশে আমাদের একটি ব্র্যান্ড ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছে; এর জন্য তো আমাদের গর্ব হওয়ার কথা! কোনও কোম্পানির পণ্যের বিদেশে যদি চাহিদা থাকে তাহলে সেদেশে তারা বিজ্ঞাপন দেবে না? এছাড়া আর কারা বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, কেন দিচ্ছে? এদেশের টিভিতে অল্প খরচে বিজ্ঞাপন দিয়ে যদি পণ্যের যথাযথ প্রচার হয়, তাহলে কেন তারা বাইরে যাবে? তার মানে হচ্ছে—এদেশের চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা বেশি দর্শকের কাছে পণ্যকে পৌঁছে দিতে পারছে না বা তারা সন্তুষ্ট হতে পারছে না।  বাংলা ট্রিবিউনে বিজ্ঞাপন দিয়ে যদি পণ্যের যথাযথ প্রচার না হয়, ইমেজ না বাড়ে তাহলে কোনও কোম্পানি কেন এখানে বিজ্ঞাপন দেবে? আমি কোন মুখে তখন বলব—আপনি প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, বিডিনিউজ, বাংলাদেশ প্রতিদিনে বিজ্ঞাপন না দিয়ে আমাকে দিন। কে, কোথায় বিজ্ঞাপন দেবে—সেটা তার সিদ্ধান্ত। বৈধপথে দেশের আইনকানুন যথাযথভাবে মেনে দিচ্ছে কিনা, সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন। 
অন্যদিকে, বিদেশি টিভি চ্যানেল এদেশে প্রচারের ক্ষেত্রে একটা বড় অংকের ডাউনলিংক ফি আরোপ করা দরকার। তাহলে রাজস্ব বাড়বে। ভারতে আমাদের একটি চ্যানেল ঢুকতে গেলে যদি ৬ কোটি টাকার মতো ফি দিতে হয়, তাহলে এখানেও যুক্তিসঙ্গত একটা ফি থাকা উচিত।
 
শেষ কথা
চ্যানেল মালিকরাই বলেন, দুই-চারটি ছাড়া তাদের কোনোটিই লাভজনক নয়। তাহলে এতগুলো টিভি চ্যানেল কোন কারণে? হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো সেবা দেওয়ার জন্যে? এদেশে পুরোপুরি বিনোদনমূলক কিংবা স্পোর্টস, শিক্ষামূলক চ্যানেল নেই কেন? সব চ্যানেলেই সংবাদ প্রচার করতে হবে কেন? এতো চ্যানেলে টকশো হচ্ছে যে কখনও কখনও আলোচকই খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপরও কেনো সবাইকেই টকশো করতে হবে? এর পেছনে ব্যবসা, নাকি অন্য কোনও কারণ আছে? দর্শক না দেখলে, ব্যবসা না থাকলে—এত টিভি চ্যানেল কেন? আর এতো চ্যানেল থাকার পরও শিল্পীদের বাঁচার প্রশ্ন কেন? অনেকেই বলেন, টিভি চ্যানেলগুলো কমদামে অনুষ্ঠান কিনতে চায়।  মুক্তবাজারে ক্রেতারা কম দামে কিনতে চাইবে, বিক্রেতারা বেশি দামে বিক্রি করতে চাইবে। চাহিদার সূত্র অনুযায়ী, ভালো জিনিসের দাম বেশি হবেই। তাহলে আপনারা কম টাকায় কেন অনুষ্ঠান বিক্রি করেন?
 
 

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, বাংলা ট্রিবিউন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ