স্থানীয় ও ওপেন সোর্স পণ্যের ব্যবহারে বন্ধ হবে সফটওয়্যার আমদানি

Send
জিশান হাসান
প্রকাশিত : ১৫:৫৪, আগস্ট ২৬, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৫৫, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১৭

জিশান হাসানঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত একটি সংবাদ পড়ে আমার আনন্দ হলো। ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের সফটওয়্যার রফতানির আর্থিক পরিমাণ ১৯১ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অবশ্য, আত্মতুষ্টি অর্জনের আগে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন নিট রফতানির হারই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় যেকোনও শিল্পের অবস্থান বোঝার সংকেত। আমদানির হারকে রফতানির হার থেকে বাদ দিয়ে যে পরিমাণ রফতানি অবশিষ্ট থাকে তাই নিট রফতানি। যেকোনও খাতে ইতিবাচক নিট রফতানির মানে হলো ওই দেশটি বিশ্বের কাছ থেকে যা কেনে তার চেয়ে বেশি বিক্রি করে এবং এবং সত্যিকার অর্থে দেশটি ওই খাতে স্বাধীন।
যখনই আমরা বাংলাদেশের সফটওয়্যারের নিট রফতানি হিসেব করার চেষ্টা করি তখন আমরা বড় ধরনের একটি সমস্যায় পড়ে যাই। আমরা জানি, দেশের প্রচুর সংখ্যক কম্পিউটার এমএস উইন্ডোজ এবং এমএস অফিসের পাইরেটেড ভার্সন ব্যবহার করে। এগুলোর জন্য টাকা পরিশোধ করা হয় না, কিন্ত আইন অনুযায়ী এর জন্য টাকা দিতে হয়। আইন অনুযায়ী সফটওয়্যার পাইরেসি অবৈধ (যদিও ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনগুলো খুব একটা জোরালোভাবে প্রয়োগ করা হয় না এবং সেকারণে পাইরেটেড ডিভিডি ও মাউক্রোসফট সফটওয়্যার এর ছড়াছড়ি দেখা যায়)। যদিও আমরা প্রকাশিত পরিসংখ্যান এবং বাজার মূল্যের ভিত্তিতে পাইরেটেড মাইক্রোসফট সফটওয়্যারের বাজার মূল্য নিরূপণ করতে পারি।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৬ সালে বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন মানুষের জন্য ২.৪টি কম্পিউটার রয়েছে। যদি আমরা ধরে নিই যে এখনও কম্পিউটারের সংখ্যা সেরকমই আছে তবে সে অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে কম্পিউটারের সংখ্যা হয় (২.৪/১০০)x ১৬৫ মিলিয়ন অর্থাৎ প্রায় ৪ মিলিয়ন। এ কম্পিউটারগুলোর প্রত্যেকটিতে এমএস উইন্ডোজ এর পাইরেটেড কপি আছে যার মূল্য ১০০ ডলার এবং এমএস অফিসের পাইরেটেড কপি আছে যার মূল্য ২০০ ডলার (সর্বমোট ৩০০ ডলার)। সে অনুযায়ী বাংলাদেশে সর্বমোট পাইরেটেড মাইক্রোসফট সফটওয়্যারের মূল্য দাঁড়াচ্ছে ৩০০ ডলার x ৪ মিলিয়ন কম্পিউটার=১২০০ মিলিয়ন ডলার। বড় অংকের টাকা। তবে বছর বছরই এ পরিমাণ খরচ হবে না। যদি প্রত্যেকটি কম্পিউটারের মেয়াদ ৫ বছর করে ধরি, তবে বার্ষিক প্রতিস্থাপনজনিত খরচ হবে ১২০০ মিলিয়ন ডলার/৫ বছর = বছরপ্রতি ২৪০ মিলিয়ন ডলার। অনুমাননির্ভর এ হিসেব থেকে পাওয়া এ খরচের পরিমাণ বাংলাদেশের সফটওয়্যার আমদানিজনিত আয় থেকে বেশি; সুতরাং এ হিসেব অনুযায়ী এ দেশ হলো সফটওয়্যার এর নিট আমদানিকারক।

একদিকে সম্মানযোগ্য অবস্থানে পৌঁছানোর জন্য স্থানীয় সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোকে সাধুবাদ জানানো উচিত। তবে আমাদের একটি কথা মনে রাখা দরকার যে এখনও আমরা আন্তর্জাতিক আইটি বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারিনি; আমাদের আমদানির মূল্য (ব্যবহৃত পাইরেটেড সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে) এখনও আমাদের রফতানির চেয়ে বেশি।

আমাদের বর্তমান শিথিল ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি এনফোর্সমেন্ট আমাদেরকে এ অস্বস্তিকর সত্য থেকে রক্ষা করছে, কিন্তু মাইক্রোসফট কপিরাইটসে পুলিশিং জোরদার করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে। এর থেকে আমরা আশা করতে পারি অন্য উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশ থেকেও ধীরে ধীরে পাইরেটেড ডিভিডি হারিয়ে যাবে। তখন এদেশকে আমদানিকৃত এমএস সফটওয়্যারের জন্য সত্যিকার অর্থে মূল্য পরিশোধ করতে হবে এবং সফটওয়্যার রফতানি থেকে আয়কৃত বৈদেশিক আমদানিকৃত বিলের কারণে হারিয়ে যাবে। আমদানি বাতিলের সহজ এক কৌশলের মধ্য দিয়ে দেশ প্রচুর লাভবান হতে পারে। এমএস সফটওয়্যারকে ফ্রি/ওপেন সোর্স সফটওয়্যার দিয়ে প্রতিস্থাপিত করে আমরা সহজে বার্ষিক ২৪০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির পরিমাণ এড়াতে পারি। এমএস অপিসের জায়গায় সহজে লিবরা অফিসকে প্রতিস্থাপন করা যাবে যা www.libreoffice.org  থেকে বিনামূল্যে ডাউনলোড করা যায়। এতে এমএস অফিসের মতো ওয়ার্ড প্রসেসর, স্প্রেডশিট এবং প্রেজেন্টেশন টুল রয়েছে। এমএস উইন্ডোজকে সহজেই উবন্টু লিনাক্স (www.ubuntu.com/desktop) দিয়েও বিনামূল্যে প্রতিস্থাপিত করা যায়। এদের ফাংশনের মিল রয়েছে এবং এটি ব্যবহার সহজ।

মজিলা ফায়ারফক্স ওয়েব ব্রাউজার এবং মজিলা থান্ডারবার্ড ইমেইল সফটওয়্যারও উবন্টু লিনাক্সের মধ্যে রয়েছে যা মাইক্রোসফট এক্সপ্লোরার এবং আউটলুকের বিকল্প হিসেবে কাজ করে।

লিনাক্সে এডোব ফটোশপ এবং ইলাস্ট্রেটরের মতো ফ্রি (www.gimp.org and www.inkscape.org) সফটওয়্যার রয়েছে। বাংলাদেশে কাজী ফার্মস গ্রুপ, সেন্ট্রাল উইমেন’স ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ট্রিবিউন এবং দীপ্ত টিভির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এরইমধ্যে ফ্রি/ওপেন সোর্স সফটওয়্যার ব্যবহার করছে। এর মধ্য দিয়ে সফটওয়্যার লাইসেন্স ফি বাবদ কোম্পানি ও দেশের লাখ লাখ অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে। অন্য কোম্পানি ও সরকারি দফতরগুলোরও এভাবে এগিয়ে যাওয়া উচিত।

একবার যদি পাইরেটেড/আমদানিকৃত সফটওয়্যারকে লিবরা অফিস ও লিনাক্সের মতো ফ্রি/ওপেন সোর্স দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা যায় তবে বাংলাদেশি সফটওয়্যারের রফতানির হার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পৌঁছাবে। তখন নিট রফতানি হবে। দেশের লাখ লাখ টাকা বাঁচবে। এর জন্য সরকারের তথ্য প্রযুক্তি বিভাগ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লিনাক্স নিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এতে তারা কম্পিউটার ব্যবহারকারীদেরকে নতুন বিকল্প নিয়ে সহায়তা দিতে পারবে। আইটি বিভাগের সদস্যদেরকে লিনাক্স ও ফ্রি/ওপেন সোর্স সফটওয়্যার নিয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

 লেখক: পরিচালক, টুএ মিডিয়া লিমিটেড

/টিএন/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ