শরণার্থী যিশুর জন্মভূমিতে বিপন্ন শিশুদের মুক্তিকামী প্রতিরোধ

Send
বাধন অধিকারী
প্রকাশিত : ১৭:৪৩, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪৫, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৭

বাধন অধিকারীযখন এই নিবন্ধটি লিখতে শুরু করেছি, ততক্ষণে বড়দিনের প্রথম প্রহর শুরু হয়েছে। আজকের এই দিনটিতেই জন্ম হয়েছিল ফিলিস্তিনি শিশুসন্তান যিশুখ্রিস্টের। খ্রিস্ট ধর্মানুসারে, মা মেরি ও তার স্বামী যোসেফ তৎকালীন মিসরীয় সাম্রাজ্য থেকে এই ফিলিস্তিনে যাত্রা করেছিলেন অত্যাচারী রাজার হাত থেকে বাঁচতে। যে জেরুজালেমকে আজ জায়নবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করা হয়েছে, সেখানে মেরি ও যোসেফ শরণার্থী জীবন বেছে নিয়েছিলেন যিশুর নিরাপদ জন্ম নিশ্চিতে। এই জেরুজালেমেরই ছোট্ট শহরতলি বেথেলহামে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন শরণার্থী যিশু।
আমার সঙ্গে সদ্য পরিচয় হয়েছে ইতালীয় শিশু-অধিকারকর্মী লুসিও বেনিনাতির সঙ্গে। তিনি পৃথিবীর সমস্ত বিপন্ন শিশুর মধ্যেই ওই যিশুকে খুঁজে ফেরেন। তাই আজ বড়দিনে তার কথা মনে এসেছে সবার আগে।

এবার বিশ্বজুড়ে বড়দিন উদযাপিত হচ্ছে এমন একটা সময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নগ্নবাসনা নিয়ে হাজির হয়েছেন ন্যাকড‌্ ক্যাপিটালিজমের সফল প্রয়োগকারী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় মিত্র সৌদি আরবকে পরোক্ষ অস্ত্র করে, দেশের ভেতরের ইহুদি লবির নিরঙ্কুশ সমর্থন অব্যাহত রাখতে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের জায়নবাদী বাসনা বাস্তবায়নে শরিক হয়েছেন তিনি। যিশুর জন্মস্থান জেরুজালেমকে তিনি ঘোষণা করেছেন ইসরায়েলি রাজধানী। দেশটির বর্তমান শাসক বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলছেন, হাজার হাজার বছর ধরেই নাকি জেরুজালেম ইসরায়েলের অংশ। দাবিটি যে সর্বাংশে মিথ্যা বছর দশেক আগে তার দুর্দান্ত প্রমাণ হাজির করেছেন খোদ একজন ইসরায়েলি অধ্যাপক। শোলমো স্যান্ড নামের ওই ইতিহাসবিদ তেলআবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠ দান করেন। ২০০৮ সালে ‘ইনভেনশন অব দ্য জুয়িশ পিপল’ নামে একটি বই  লেখেন তিনি। বের হওয়ার প্রথম ১৯ সপ্তাহজুড়ে ইসরায়েলের বেস্ট সেলার তালিকায় থাকা হিব্রু ভাষার বইটির ইংরেজি অনুবাদ বের হয় ২০০৯ সালে। তিনি দেখিয়েছেন, ইসরায়েলের রাষ্ট্রবাসনার জায়নবাদী প্রকল্পটি কতখানি মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। জিউসরাও রূপান্তরিত (কনভার্টেড), মধ্যপ্রাচ্যে তারাও অভিবাসী; এই বিষয়টির আলোকে ঐতিহাসিক, পৌরাণিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ফরেনসিক প্রমাণ হাজির করে বইটিতে তার স্পষ্ট প্রমাণ হাজির করেছিলেন তিনি।

যে জেরুজালেম শরণার্থী যিশুর নিরাপত্তা হয়েছিল, সেই জেরুজালেমই আজ শিশুদের জন্য নিরাপত্তাহীনতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। পাঠক ভাবুন তো, যদি আজকের ক্রিসমাসে যিশুর জন্ম দেওয়ার কথা ভাবতেন মাতা মেরি, তিনি কী রকম বিপন্নতার মুখোমুখি হতেন? আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এরইমধ্যে খবর লিখেছে, পশ্চিমতীরে যিশুর জন্মস্থান বেথেলহেমে ইসরায়েলি বাহিনী বাধা সৃষ্টি করেছে উৎসব আয়োজনে। এখন ভেবে দেখুন তো, যদি মা মেরি যিশুকে জন্ম দিতে চাইতেন, তাহলে কি তিনি বেথলেহেমে প্রবেশ করতে পারতেন? এমনকী ইসরায়েলি তল্লাশি চৌকিতে আরও অনেক ফিলিস্তিনি নারীর মতো মেরিরও মৃত্যু হতে পারতো। শহরটির বেশিরভাগ জায়গা ইসরায়েলি জায়নবাদের দেয়ালে বন্দি। সেই দেওয়ালগুলো আটকে রেখেছে খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক যিশু কিংবা ইসলামের নবী ঈসার জন্মতীর্থকে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে লাঞ্ছিত করেছেন জুয়ার দান হিসেবে।

ফিলিস্তিনি ভূমিতে বড়দিন তাই উৎসব হয়ে আসেনি এবার। যিশুর বেড়ে ওঠার শহর নাজারাথের মেয়র আগেই ঘোষণা করেছেন এবার উৎসব হবে না সেখানে। অন্যদের কথা বাদ রেখে কেবল শিশুদের কথাই বলছি।  চিত্রটা বুঝতে সহায়ক হবে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান থেকে। সবশেষ তারা ২০১৬ সালের শেষ তিন মাসে পরিসংখ্যান দিয়েছে। ওই তিন মাসে পশ্চিমতীর, গাজা উপত্যকা ও পূর্ব জেরুজালেমে শিশুদের অধিকার হরণের ১ হাজার ৩০৫টি ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছে জাতিসংঘ। এসব ঘটনার শিকার হয়েছে ১০ হাজার ৮৩১ জন শিশু। ওই ৩ মাসে ইসরায়েলি বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ৪ শিশু। আহত হয়েছে ৮১ জন। আর বিচ্ছিন্নভাবে জেরুজালেমকে ইসরায়েলি রাজধানীর স্বীকৃতি দেওয়ার আগের দিন—৫ ডিসেম্বর থেকে ১৮ই ডিসেম্বরের এক পরিসংখ্যানে জাতিসংঘ জানিয়েছে, মাত্র ১৪ দিনে ৩৪৫ জন শিশু আহত হয়েছে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায়।   

আমার মনে এখন প্রশ্ন জাগছে—গড়ে প্রতিদিন ২৪ জনেরও বেশি শিশুর এই জখমের ঘটনাকে কী বলবেন ইতালীয় শিশু-অধিকারকর্মী লুসিও বেনিনাতি? যিনি পৃথিবীর সমস্ত বিপন্ন শিশুর মধ্যেই ওই যিশুকে খুঁজে ফেরেন। ব্রাদার লুসিও ফিলিস্তিনে নয়, কাজ করেন বাংলাদেশের শিশুদের নিয়ে। তার সঙ্গে সদ্যপরিচয়, প্রিয় অনুজ জোবায়ের শামীমের সৌজন্যে। এখানে গৃহযুদ্ধ নেই ঠিক। এখানে এমজিডিতে ভালো সাফল্য এসেছে, সেটাও হয়তো ঠিক। তবে শিশুদের অধিকারহীনতা ফুরোয়নি। শিশুশ্রম রয়েছে, রয়েছে নানা ধারার অমর্যাদা। সে সব বিপন্নতার কথা বাদই দিলাম। তবে কাওরান বাজারের রাস্তায়, তেজগাঁওয়ের বস্তিতে, হাতিরঝিলের সৌন্দর্যের ভেতর, ফার্মগেটে নয় কেবল, রাজধানীসহ দেশজুড়ে রয়েছে ঘরহীন ক্ষুধার্ত শিশুরা। তাদের জন্য সুরক্ষিত আবাস নিশ্চিত করাই লুসিও’র ধর্ম। একদা এই ইতালীয় ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার তেজগাঁওয়ের বস্তিকেই আবাস বানিয়েছিলেন। শিশুরা তাকে দেখলেই আনন্দ পায়, আমি নিজে দেখেছি। ক্যাথলিক চার্চের খিস্টানিটি ছড়িয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক প্রয়াসের থেকে যোজন যোজন দূরে এই ব্রাদারের অবস্থান। তিনি শিশুদের বাইরে আর কোথাও খুঁজতে যান না যিশুকে। সে শিশু খ্রিস্টান, নাকি মুসলমান, নাকি ইহুদি, নাকি নাস্তিক, কিচ্ছু যায়-আসে না তার। যিশু তো আসলেই সবার।

বিপন্ন শিশুদের মধ্যে যিশুকে খুঁজে নেওয়ার লুসিও’র দর্শন আমাকে অনুপ্রাণিত করে। যিশুর জন্মস্থান ফিলিস্তিনের শিশুদের বিপন্নতাকেও সে কারণেই আমি কেবল বিপন্নতা হিসেবে দেখি না। তাদের প্রতিদিনের লড়াইকেই বড় করে দেখি। আহমেদ তামিমি নামের ১৬ বছর বয়সীমেয়েটি, দখলদার বাহিনীর হাতে হত্যাযজ্ঞের ভয় তুচ্ছ করে সেনাসদস্যকে যে থাপ্পড় বসিয়ে দিতে পারে, ফিলিস্তিনের অধিকাংশ শিশুই তার মতো। ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদার মধ্য দিয়ে গুলতি আর পাথর দিয়ে তারা রচনা করছে একটি মুক্তিকামী প্রতিরোধের অমর কাব্য। তারা প্রত্যেকেই একেক জন মারণাস্ত্রে রূপান্তরিত হয়ে দখলদার ইসরায়েলকে প্রতিহত করার শক্তি বাড়াচ্ছে। এটাই মুসলিম বিশ্বাসীদের নবী ঈসার প্রতিরোধের জায়নামাজ। এটিই যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার যন্ত্রণা। এসব শিশুর মুক্তিকামী প্রতিরোধই আজকের যুগে যিশুর পুনরুত্থান।

লেখক: সহ-বার্তা সম্পাদক ও ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ইন চার্জ, বাংলা ট্রিবিউন  

 

/এমএনএইচ/এফএএন/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ