রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে স্বাগত, কিন্তু...

Send
রাহমান নাসির উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৯:০২, নভেম্বর ১৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০০, নভেম্বর ১৫, ২০১৮

রাহমান নাসির উদ্দিনবহুল আলোচিত এবং বহুল প্রত্যাশিত ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন’ প্রক্রিয়া আগামীকাল ১৫ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে। প্রথম দফায় ৪৮৫টি পরিবারের ২৬৬০ জন রোহিঙ্গা ফেরত যাবে। প্রতিদিন যাবে ১৫০ জন করে। এ প্রক্রিয়া প্রাথমিকভাবে চলবে আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। এরপর ধারাবাহিকভাবে এ প্রক্রিয়া চলতে থাকবে। এ খবর আমাদের জানাচ্ছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়নামারের রাষ্ট্রদূত। প্রথম দফায় যারা ফেরত যাবে, তাদের থাকার জন্য ভারত ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত ২৮৫টি ঘর তৈরি করে দিয়েছে। আর চীন তৈরি করে দিচ্ছে প্রায় হাজারখানেক ঘর। যে চীন রোহিঙ্গা-প্রশ্নে নিঃশর্তভাবে মিয়ানমারকে সাপোর্ট করেছে, এবং রাখাইনে এক্সটেনসিভ ইকোনমিক জোন করার জন্য ৭.৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, সেই চীন রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার জন্য অনুদান দিয়ে ঘর তৈরি করে দিচ্ছে। এটা কিসের আলামত? যে ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তার ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের অংশ হিসাবে মিয়ানমারে বিনিয়োগ করছে এবং তার  সারা জীবনের শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সাথে টেক্কা দেওয়ার জন্য রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের পাশে থেকেছে। এদিকে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী’ বলে বাংলাদেশের সঙ্গে খাতির রাখার খাতিরে পাশে থাকার (কথার!) কথা বলেছে, কিন্তু রোহিঙ্গা জেনোসাইড প্রশ্নে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ কৌশল অবলম্বন করেছে, সেই ভারত আর চীন যখন অতি দরদ দিয়ে প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গাদের থাকার বন্দোবস্ত করছে, তখন কোথায় জানি সন্দেহ-সন্দেহ গন্ধ পাওয়া যায়। প্রতিকূলের হাওয়া যখন অতিমাত্রায় অনুকূল হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে মতলব আছে। তারপরও আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি দীর্ঘ আলোচনা-সমালোচনার পরও মিয়ানমারকে যে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য করতে পেরেছে, এটা বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য এবং এ কৃতিত্ব অকৃত্রিমভাবে বাংলাদেশকে দিতে হবে। আর দশজন বাংলাদেশি সংবেদনশীল মানুষের মতো,আমিও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে স্বাগত জানাই, কিন্তু এখনই প্রত্যাবাসনের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ যেহেতু প্রস্তুত নয়,সেহেতু তড়িঘড়ি করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার কারণে পুরো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ একটা অনিশ্চয়তা এবং ঝুঁকির মধ্যে পড়বে কিনা, সেটা বিবেচনায় নেওয়াটাও জরুরি বলে আমি মনে করি।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে শুরু করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং ধর্মীয় ও জাতিগত উগ্রবাদীরা নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের ওপর যে জেনোসাইড, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ এবং নিপীড়ন চালিয়েছে তা নিকট ইতিহাসে বিরল ও নজিরবিহীন। ঘটনার তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, খোদ জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা একে বলেছে ‘টেক্সটবুক এক্সাম্পল অব এথনিক ক্লিনজিং’ এবং নানান মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন গবেষণাও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর এ হত্যাকাণ্ড এবং নারকীয় নিষ্ঠুরতাকে শনাক্ত করেছে ‘জেনোসাইড’ এবং ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসাবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও (আইসিসি) এটাকে ‘জেনোসাইড’ এবং  ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ নিষ্ঠুরতা এবং বর্বরতার বিবরণ দিয়ে ২০১৮ সালে আগস্ট মাসে জাতিসংঘ কর্তৃক মনোনীত তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সে রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৭ সালে ২৫ আগস্টের মিয়ানমারের বর্বরতা, গণহত্যা, জেনোসাইড এবং নির্বিচার ধর্ষণ থেকে বাঁচতে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে প্রায় ৭ লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা, ঘটনা শুরুর দুই মাসের মধ্যে রাখাইনের হত্যা করা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গাকে, শত শত নারীকে গণধর্ষণ করা হয়েছে এবং প্রায় ৩৮৫টি গ্রাম পুরোপুরি জ্বালিয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে।

এরকম একটি অবস্থায়, মিয়ানমারের এত সহজে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার কথা না। তাছাড়া এক সপ্তাহ আগেও মিয়ানমারের একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকতা, যিনি রাখাইনে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার তদারকি করছিলেন, বললেন, ‘সন্ত্রাসীদের কে ফেরত আনতে চায় বলুন?’ শুধু মিয়ানমারের সরকারি কর্মকর্তা নয়, মিয়ানমারের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারাও নিয়মিত বলে যাচ্ছেন ‘রোহিঙ্গারা অবৈধ বাঙালি, তারা মিয়ানমারে থাকতে পারবে না’। তিন সপ্তাহ আগে যখন জাতিসংঘের কর্মকর্তাকে রাখাইনে গিয়ে ভিজিট করার অনুরোধ করলো, তখন কট্টরপন্থী রোহিঙ্গাবিরোধী নেতা আর্শিন ভিরোথ প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘মিয়ানমারে  জাতিসংঘের লোকজন আসলে তাদের কচুকাটা করা হবে’। খোদ জাতিসংঘ কয়েক সপ্তাহ আগেও বলেছে, মিয়ানমারে এখনও জেনোসাইড চলছে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য রোহিঙ্গাদের নিরাপদ বসবাসের জন্য এখনও তৈরি নয় বলে জানিয়েছে। এরকম একটি অবস্থায়, কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থায়, তড়িঘড়ি করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করাটা কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাছাড়া যদিও বাংলাদেশ দাবি  করছে, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা এ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত কিন্তু জাতিসংঘ দাবি করেছে, এ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর ব্যাপারটি নিয়ে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার কোনও পক্ষই তাদের সঙ্গে কোনও শলাপরামর্শ করেনি।

এসব বিবেচনায়, এভাবে একা একা জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে প্রত্যাবাসন শুরু করা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, ‘রোহিঙ্গারা এমনিতেই ঝুঁকির মধ্যে আছে। বাংলাদেশ তাদের আবারও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে’।

এখানে মনে রাখা জরুরি যে, গোটা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় অংশীজন হচ্ছে চারটি পার্টি– বাংলাদেশ, মিয়ানমার, রোহিঙ্গা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। বাংলাদেশ চায় যেকোনোভাবেই হোক এবং যত দ্রতই হোক, এ ‘বোঝা’ ঘাড় থেকে নামাতে এবং সেটা বাংলাদেশের জায়গা থেকে কোনোভাবেই অযৌক্তিক নয়। এবং এটা সহজেই বোধগম্য যে, বাংলাদেশ সে চেষ্টাই করছে। অন্যদিকে মিয়ানমার কোনোভাবেই রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মন থেকে চায় না কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপের কারণে সে নিতে বাধ্য হচ্ছে। তবে এখানেই মিয়ানমারের নগদ লাভ হচ্ছে, তারা বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে ‘সেল’ করতে পারবে যে তারা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তরিক। আর মিয়ানমারের এর ‘দেখানোপনার’ সুযোগটা মূলত বাংলাদেশই করে দিচ্ছে। তাই তো ভয়টা আরও বেশি। কারণ, দেখানোর কাজ শেষ হলে, মিয়ানমার নির্ঘাৎ বেঁকে বসবে এবং বেইমানি করা তার নিয়মিত চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য। আর রোহিঙ্গারা মনে-প্রাণে এ অবস্থায় কোনোভাবেই রাখাইনে ফিরতে চায় না। আমি উখিয়া-টেকনাফে দীর্ঘদিন রোহিঙ্গাদের মধ্যে মাঠকর্ম করেছি, অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা রাখাইনে ফিরতে চায় যদি তাদের জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়, যদি তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় এবং যদি তাদের আর দশজন মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে দেওয়া হয়। তারা চায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর মতো কিছু একটা কিছুদিনের জন্য হলেও রাখাইনে মোতায়েন করা হোক, যাতে তারা একটু সাহস পায়। এবং তারা কোনোভাবেই এটা মনে করে না যে রাখাইনে এখনই ফিরে যাওয়ার মতো কোনও পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তাই প্রথম দফায় যাদের ফেরত পাঠানোর জন্য তালিকা তৈরি করা হয়েছে, তাদের অনেকেই এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে বলে সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাহলে জোর করে কেন? আর চতুর্থ হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, যারা এখনই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হোক সেটা চায় না। জাতিসংঘ তাদের আপত্তি জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারও মনে করেন, এখনই প্রত্যাবাসন নয়। তারা আগে রাখাইনে গিয়ে পরিস্থিতি দেখতে চান এবং সে মোতাবেক মিয়ানমারকে একটা চিঠিও দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু মিয়ানমার জবাব দেয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু না করতে বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সবাই যখন না করছে, বাংলাদেশ কেন সবাইকে বাদ দিয়ে একা মিয়ানমারকে নিয়েই প্রত্যাবাসন শুরু করছে, সেটা অনেকের কাছে বোধগম্য নয়।

তবে এটা অনেকের কাছে বোধগম্য যে, ‘শরণার্থী সমস্যা জিইয়ে’ রাখার মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিজের একটা রাজনীতি আছে। কিন্তু এত বড় শরণার্থী সমস্যা বাংলাদেশের পক্ষে একা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কথাও বাংলাদেশকে শুনতে হবে। বিশেষ করে জাতিসংঘকে সঙ্গে রেখে বাংলাদেশকে এ শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে এবং সে কারণেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায়ও জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করতে হবে। শুধু মিয়ানমারকে ভরসা করে তাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে ফেরত পাঠালেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না, এটা বাংলাদেশকে বুঝতে হবে। কেননা, ১৯৭৮ এবং ১৯৯১-৯২ সালের কথা আমরা যেন ভুলে না যাই। কারণ, কথা দিয়ে কথা না রাখার  মিয়ানমারের পুরনো ‘খাসলত’। মিয়ানমারের চোখ উল্টাতে এক মিনিটও লাগে না। তাছাড়া আমাদের মনে রাখতে হবে শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। কয়েক হাজার পাঠিয়ে, বাকিদের ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা যেন কোনোভাবে ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে সেটা বিবেচনায় রাখতে হবে। রোহিঙ্গাদের যথাযথভাবে প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সমস্যার সত্যিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কিন্তু তড়িঘড়ি করে কোনও সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে নতুন করে সমস্যা তৈরি করছি কিনা, সেটাও বিবেচনায় রাখা সমান জরুরি।

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং রিসার্স ফেলো হিসেবে উচ্চতর গবেষণা করছেন।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ