শুধু ভিআইপি নয়: মুক্তি চাই মস্তিষ্কের দাসত্ব থেকেও

Send
খায়ের মাহমুদ
প্রকাশিত : ১৮:২৯, আগস্ট ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৯, আগস্ট ২৪, ২০১৯

খায়ের মাহমুদসম্প্রতি সরকারের একজন যুগ্ম সচিবের জন্য মাদারীপুরের কাঠালবাড়ি ফেরিঘাটে একটি ফেরি তিন ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছিল। একই সময় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত তিতাস সাহাকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটিও আটকে পড়ে। তার অসহায় স্বজনরা ফেরিঘাটে দায়িত্বরতদের পা ধরেছেন, কেঁদেছেনও। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। কারও পাথর মন গলেনি। অনুরোধে বার বার উত্তর এসেছে ভিআইপি আছে।
একটি দেশে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা বিভিন্ন কাজে সাধারণত অগ্রাধিকার পায়। তাদের কাজের গুরুত্ব, সময় ও নিরাপত্তার জন্যই এই ব্যবস্থা। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়, এখানেও কিছু মানুষ  অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হন। সমস্যা হয় তখন, যখন এই ভিআইপিদের সংখ্যা অসংখ্য এবং অনিয়ন্ত্রিত একটা অবস্থায় চলে যায়। হযরত শাহ জালাল (রা.) এয়ারপোর্টের ভিভিআইপি এবং ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের জন্য কেবিনেট ডিভিশন থেকে একটা নির্দেশনা দেওয়া আছে। যে তালিকায় সর্বশেষ ব্যক্তিটি হচ্ছেন যুগ্ম সচিব, সুতরাং সেতো স্বীকৃত ভিআইপি। আবার সরকারের যদিও সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের সব কর্মচারীর কর্তব্য হচ্ছে নাগরিকের সেবা করা, তারা মূলত জনগণের সেবক। বাংলাদেশের কোনও আইনে ভিআইপি নামধারী এই সুবিধাবাদীদের অস্তিত্ব নেই। অর্থাৎ ভিআইপি বিষয়টি কোনও আইন সৃষ্ট বিষয় নয়, এটা কেবলই একটা ঔপনিবেশিক ধারণা মাত্র। তবে হ্যাঁ আমাদের একটা কেবিনেট কর্তৃক ইস্যুকৃত ১৯৮৬ সালের অর্ডার অব প্রিসিডেন্স আছে যেটা আসলে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পদের পদক্রম এবং এখনও সর্বশেষ অর্থাৎ ২৫ নম্বরে আছে যুগ্ম সচিব কিন্তু আবারও বলে রাখা ভালো এটা কোনও আইন নয়। এটি কাউকে ভিআইপি হিসেবে ঘোষণাও করেনি। সুতরাং গায়ের জোরে যারা ভিআইপি বলে বেড়ান এবং এভাবে ফেরি আটকে মানুষের মৃত্যুর কারণ হন তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে মামলা করা যায়।

বাংলাদেশে বিশেষ করে, ঢাকা শহরে যেহেতু চলাচলের এখন পর্যন্ত উপায় একমাত্র সড়কপথ, এখানে বসবাসকারীরা প্রায়ই এই ভিআইপি যন্ত্রণায় পড়েন। অধিক ভিআইপি’র চাপে সেই সমস্যা এখন দেশজুড়ে। কিন্তু এমনটা কি হওয়ার কথা ছিল? যে কষ্ট, ত্যাগ ও রক্তের বিনিময় এই স্বাধীনতা সেখানে এমন কোনও সমাজের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল কি?

বাংলাদেশ সংবিধানের দর্শন, মূল প্রস্তাবনা পড়লে এর একটা উত্তর পাওয়া যেতে পারে। প্রস্তাবনার তৃতীয় প্যারাগ্রাফে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ আবার সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ আপনাকে আমাকে দেশের জনগণকে দেশের সব ক্ষমতার মালিক হিসেবে ঘোষণা করছে। এটা ভেবে আপনি কিছুটা স্বস্তি বোধ করতেই পারেন। অনুচ্ছেদ ১৯ বলছে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য সুষম সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করবে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক দূরত্ব ঘোচাবে।যদিও অনুচ্ছেদ ১৯ সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগে পড়ে তাই আপনি এটাকে নিয়ে আদালতে যেতে পারবেন না, তবে এটা যেহেতু রাষ্ট্রের মূলনীতি আপনি আশা করতেই পারেন রাষ্ট্র তার সামর্থ্যের পরিপ্রেক্ষিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে তা পূরণ করার জন্য।

ভিআইপি সংস্কৃতির খারাপ শিকার শুধু আমরাই নই, বরং ভারতীয় উপমহাদেশের প্রত্যেকটা দেশেই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ভিআইপি সংস্কৃতির নিদর্শন গাড়িতে লাল বাতি ব্যবহারের বিরুদ্ধে স্লোগান উঠে ২০১৭ এর দিকে। বিষয়টি খুব দ্রুতই জনপ্রিয়তা পায় ওই সময়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ওই সময় তার মাসিক রেডিও প্রোগ্রাম ‘মান কী বাত’– এ এসে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন ১২৫ কোটি জনগণের দেশে সবাই সমান, এখানে লাল বাতির সংস্কৃতি থাকা উচিত নয়। যার ফলে ওই বছর মে মাসের ১ তারিখ থেকে গাড়িতে লাল বাতির ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু তাতে ভারতে ভিআইপি সংস্কৃতি উঠে গেছে ভাবলে ভুল হবে ওটা বরং আছেই। ২০১৮-এর সেপ্টেম্বরে এক নিবন্ধে টাইমস অব ইন্ডিয়া দাবি করে, ভারত আব্রাহাম লিংকনের গণতন্ত্রের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে দিয়েছে। তাদের দাবি ভারতের গণতন্ত্রের সংজ্ঞা হচ্ছে গভর্নমেন্ট অব দ্য ভিআইপি, বাই দ্য ভিআইপি অ্যান্ড ফর দ্য ভিআইপি। অর্থাৎ সরকার যা কিছু করে তার সব কিছু আসলে উঁচুস্তরের মানুষদের কেন্দ্র করে।

তাহলে কেন এই অসম্ভব পরিস্থিতির জন্ম, এটা তো একদিনে হয়নি। আচ্ছা তিতাসের ঘটনায় ফেরির দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকজন বার বার বলেছে ভিআইপি আছে, কিন্তু তারা কী একবারও ওই ভিআইপি কে বা তার পক্ষে যিনি যোগাযোগ রাখছিলেন তাকে পরিস্থিতি জানানোর চেষ্টা করেছেন? একথা সত্য যে ফেরি যারা চালায় তাদের পক্ষে ওইসব কর্তা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা একটা অসীম সাহসের ব্যাপার। কিন্তু পরিস্থি তো স্বাভাবিক ছিল না।একজন বিবেকবান মানুষ যদি শোনে ফেরিঘাটে একজন মুমূর্ষু রোগী তার জন্য আটকে আছে, সে কি তারপরও বলবে ফেরি ছেড়ো না? ফেরির দায়িত্বে থাকা লোকজন কেন এই বিবেকের পরিচয়টা দিতে পারলো না? কারণ আমাদের মস্তিষ্কের দাসত্ব! আমরা সবাই আসলে একটা ঘোরের মধ্যে আছি, এই ঘোর আমাদের মানবিকতা থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাচ্ছে, আমরা দিনের আলোয় মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলছি, অসুস্থ মানুষকে অপেক্ষা করিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি। ফেরির ওই লোজন বা তার নির্দেশদাতারা একটা ছোট উদাহরণ মাত্র। পথে ঘাটে, ডাক্তারের চেম্বারে, বাস, ট্রেন, লঞ্চের টিকিট কাউন্টারে আপনি অগণিত ভিআইপির দেখা পাবেন এই দেশে। কেউ কেবিনেট ডিভিশনের লিস্টে থাকা ভিআইপি, কেউ রাজনৈতিক ভিআইপি, কেউ দুর্নীতি করে হাজার কোটি বানানো ইকোনমিক এলিট কোটায় ভিআইপি। তাদের চলন-বলন দেখে আমরা পুলকিত হই আর অপেক্ষাই থাকি কখন তাদের সেবা করার সুযোগ মিলবে। কারণ তাদের সেবা মানেই বিশাল ব্যাপার, খুলে যেতে পারে ভাগ্যের চাকা, সমঅধিকার বা আইনের শাসন সেখানে অপ্রাসঙ্গিক।

তেরোশো শতকে ইংল্যান্ডের রাজা ছিলেন তৃতীয় হেনরি তার সময়ের অত্যান্ত বিখ্যাত বিচারক ব্র্যাকটন রাজার নাম না উল্লেখ করে লিখেছিলেন ‘রাজাকে অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা এবং আইনের অধীনে থাকা উচিত, কারণ আইন তাকে রাজা বানিয়েছে।’ আইনের শাসন পড়াতে গিয়ে এই বাণী আমরা সবাই ছাত্রদের শেখাই কিন্তু আমাদের রাজা ভিআইপিদের  কিংবা ফেরি ঘাটের দায়িত্ব প্রাপ্ত ওই লোকদের মতো যারা আমরা ভিআইপিদের কৃপা পেতে চাইকে তাদের কে শেখাবে? সুতরাং শুধু ভিআইপি সংস্কৃতি থেকে মুক্তির আওয়াজ তুললেই হবে না, মুক্তি পেতে হবে মস্তিষ্কের দাসত্ব থেকেও!

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ